আজিম আজিমজাদের পেইন্টিংটিতে কবি ইমাদাদ্দিন নেসিমির মৃত্যুর দৃশ্য আঁকা হয়েছে। বর্তমান সিরিয়ার আলেপ্পোতে তত্কালীন আমিরের ফরমান নিয়ে কবিকে হত্যা করা হয়। হত্যার প্রক্রিয়াটি ছিল রোমহর্ষক। তাঁর গা থেকে চামড়া ছিলে ফেলা হয়েছিল। কারণ ধর্মীয় আদর্শগত বিরোধ ও ঈর্ষা।

চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের মরমিবাদী কবি ইমাদাদ্দিন
নেসিমির জন্ম আলেপ্পো কিংবা আজারবাইজানের সামান্থিতে, সম্ভবত ১৩৬৯ সালে। পুরো নাম সৈয়দ আলী ইমাদাদ্দিন নেসিমি। তিনি আজারবাইজানি কিংবা তুর্কি। নেসিমি তাঁর ‘দিওয়ান’-এ যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা আজারবাইজানে প্রচলিত ছিল। এ ভাষার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবহারকারী তুর্কি। ভাষাটির নাম— টার্কিক। এখন এ ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৭ কোটি। ইসলাম ধর্মীয় গবেষকরা মনে করেন, তাঁর জন্ম বাগদাদের কাছাকাছি নেসিমি শহরে।

নেসিমির গুরু বিতর্কিত ধর্মীয় নেতা ফজলুল্লাহর মতবাদ প্রচারের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। ফজলুল্লাহ মনে করতেন, তিনি নিজেই স্রষ্টার প্রকাশ, তাঁর মধ্য দিয়েই স্রষ্টা প্রকাশিত। ধর্মদ্রোহী হওয়ার অপরাধে ফজলুল্লাহরও মৃত্যুদণ্ড হয়। ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নেসিমিকে গ্রেফতার করে। আমির তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চাননি। কিন্তু তাতে ধর্মগুরুদের প্ররোচনায় দেশে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে— এ আশঙ্কায় তিনি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। মতাদর্শগত বিরোধীরাও তাঁকে এ আদেশ দিতে বাধ্য করে।

নেসিমি তিন ভাষায় লিখতেন— আজারবাইজানি টার্কিক, পার্সি ও আরবি। তিনি গজল, কাসিদা ও রুবাই রচনা করেছেন। তাঁর গজলের সংখ্যা প্রায় ৩০০ এবং রুবাই দেড় শতাধিক।

অসাধারণ কিছু প্রেমের কবিতা লিখেছেন: তিনিও কম ধার্মিক নন, প্রেমিকার বাড়ির দরজার সিঁড়িতে সেজদায় মাথা নত করেন।

নেসিমির সমাধি আলেপ্পোতে— এটি এখন কবির ভক্ত ও অনুসারীদের অন্যতম তীর্থস্থান।

নেসিমির ৬০০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সময় তাঁকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে।

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর একটি জেলার নাম তাঁর সম্মানে ‘নেসিমি’ রাখা হয়েছে। নেসিমি ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিক একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানকার অনেক গ্রাম, সড়ক-মহাসড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার নামে, এমনকি একটি আন্ডারগ্রাউন্ড রেলস্টেশনও।

মুক্তচিন্তার মানুষ বরাবরই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিরুদ্ধ মত অপছন্দ হতে পারে, কিন্তু অপছন্দ হলেই চামড়া ছিলে হত্যা করতে হবে! নির্যাতনের ধারা বদলেছে, গোঁড়াদের মৌল চরিত্র এতটুকুও বদলায়নি।

৬০০তম মৃত্যুবর্ষে কবি ইমাদাদ্দিন নেসিমির জন্য অশেষ শ্রদ্ধা।

 

 

তাতে কী এসে যায়?

 

দোষের আলখেল্লা আমিই পরে নিলাম

সম্মান আর সদগুণের বোতল আমি পাথরে চূর্ণ করে দিই।

             তাতে কী এসে যায়?

 

কখনো কখনো আমি উত্থিত হই, ওপর থেকে বিশ্বকে দেখি

কখনো আমি মাটিতে নেমে আসি, ভালোবাসায় নিজেকে হারাই।

                তাতে কী এসে যায়?

 

কখনো কখনো পবিত্র গ্রন্থে জীবনের মানে পাঠ করি

কখনো আমি শুঁড়িখানায় যাই, মাতাল হই

           তাতে কী এসে যায়?

 

কখনো কখনো প্রেমিকার জন্য গোলাপ তুলতে আমার বাগানে যাই

এই গোলাপের চাষ আমিই করি, গোলাপ জমাই।

              তাতে কী এসে যায়?

 

গোঁড়া ধার্মিকরা ভালোবাসার এই সুরা পাপ মনে করে

এই পাপ আমার, আমি পাপে গ্লাস পূর্ণ করি, চুমুক দিই।

              তাতে কী এসে যায়?

 

ধার্মিকরা মসজিদের কুলঙ্গিতে মাথা আনত করে

আমি সেজদা দিই প্রেমিকার দরজার সিঁড়িতে, মুখ তুলি

          তাতে কী এসে যায়?

 

আমার শত্রুরা বলে সুন্দরকে ভালোবাসা পাপ

আমি তো প্রেমিকাকে ভালোবাসি, সানন্দে তার মূল্য দেব

               তাতে কী এসে যায়?

 

তারা নেসিমিকে জিজ্ঞেস করে

তোমার আর তোমার প্রেমিকার ভালো যাচ্ছে তো?

ভালো যাক মন্দ যাক আমার প্রেমিকা আমারই।

         তাতে কী এসে যায়?

 

দুটো পৃথিবী আমি ধারণ করে আছি

 

দুটো পৃথিবী আমি ধারণ করে আছি

       কিন্তু এই পৃথিবী আমাকে ধারণ করতে পারে না

আমি সর্বত্র হাজির এক সত্তা

       দুই পৃথিবীই আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

কারণ আমার ভেতর পৃথিবী এবং স্বর্গ

       এবং সৃষ্টি সবই আছে

স্রষ্টাকে যে মানে বেশ জানে সন্দেহ

       ও আন্দাজ আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

আমিই মুক্তো ও ঝিনুক দুটোই

     কেয়ামতের শিঙ্গা, বেহেশতের পুলসিরাত

পণ্যের এত পসরা এত সম্পদ

     পার্থিব কোনো বৈভব আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

যদিও আমি অসীম সাগর

      আমার নাম আদম, আমি মানুষ

আমি সিনাই পর্বত এবং দুই পৃথিবী

     এ আবাস আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

আমি আত্মা এবং শব্দ

     আমি দুই পৃথিবী এবং কাল

বিশেষ করে এটা খেয়াল রেখো

    পৃথিবী ও কাল আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

আমি নক্ষত্র, আমি আকাশ, দেবদূত

     আমার কাছে স্রষ্টার বার্তা আসে

তোমার জিহ্বা সামলে রেখো, চুপ থেকো

       কোনো জিহ্বা আমাকে ধারণ করতে পারে না।

 

(কবিতার অংশ)

 

অবগুণ্ঠন

ঘোমটা দিয়ে তোমার মুখ আমার কাছ থেকে আড়াল করতে চাও?

                      দয়া করে এ কাজটি করো না

 

তুমি চাও আমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরুক

                  দয়া করে এ কাজটি করো না

 

তুমি গোলাপের ওপর তোমার মুখোশের চুম্বন বিছাতে চাও

আমার তোমার প্রেমিকাকে বিপন্ন করতে

              দয়া করে এ কাজটি করো না।

 

 

(কবিতার অংশ)