অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
(১৩শ কিস্তি)
দ্বিতীয় অধ্যায়
‘অনুবাদকরা ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ’
‘মার্টিন লুথার: জার্মান ভাষার কারিগর’ (প্রথমাংশ)
জার্মান ভাষার ইতিহাসে অনুবাদ একটি মৌলিক উপাদান। বাইবেল-সম্পৃক্ত ও সাহিত্য-বিষয়ক টেক্সট সেই অষ্টম শতক থেকেই এ ভাষায় অনূদিত হয়ে আসছে; আর সে সময়ই বাইবেল-সম্পৃক্ত পরিভাষা কোষ সংকলিত হয়েছিল। জার্মান ভাষায় অনুবাদের কিছু উল্লেখযোগ্য পর্ব হচ্ছে: ১. তেইশেনের (Tatian) দ্বিতীয় শতকের লাতিন সংস্করণ থেকে নিউ টেস্টামেন্টের অনুবাদ; ফুলদা (Fulda) মঠে ৮২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কাজটি করা হয়। ২. অটফ্রিড ফন ওয়েইসেনবার্গের সুসমাচার গ্রন্থ; ৮৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে প্রাচীন হাই (বা পার্বত্যাঞ্চলীয়) জার্মান ভাষায় অনূদিত। ১০০০ সালের দিকে ‘জার্মান নটকার’কৃত (Notker the German, আনুমানিক ৯৫০-১০২২ খ্রি.) স্তোত্রগুলোর অনুবাদ।
{Notker de Deutsche (Notker de Deutsche): তিনি তৃতীয় নটকার বা নটকার লাবেও নামেও পরিচিত ছিলেন। সেন্ট গলের সন্ন্যাসী ছিলেন তিনি। তাঁর সময়ে সেটি জার্মান ধ্রুপদী সংস্কৃতির অন্যতম বর্ধিষ্ণু কেন্দ্র ছিল। সেন্ট গল বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত।}
নটকারের অনুবাদের বিশেষত্ব ছিল যথার্থতা, শৈলীগত অনমনীয়তা এবং একটি বাচিকতা, যা কথ্যভাষাকে প্রতিফলিত করে। তাঁর অনুবাদকর্মের সূচনাবিন্দু হচ্ছে ধর্মগ্রন্থের টীকা-ভাষ্য, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল টেক্সট অনুধাবন।
মধ্যযুগে মূল গ্রিক বা হিব্রু থেকে বাইবেল অনূদিত হয়নি, বরং লাতিন ভালগেট থেকে হয়েছে। স্বদেশী ভাষায় বাইবেল অনুবাদের মধ্য দিয়েই একটি লিখিত ভাষা হিসেবে প্রাচীন হাই জার্মানের উদ্ভব এবং বিকাশ। লাতিনের প্রভাবে জার্মান একটি সাহিত্যিক ভাষায় বিকশিত হয় এবং শিগগিরই তা কেবল বাইবেল অনুবাদেই নয়, অন্যান্য ধরনের লেখায়ও ব্যবহার হতে থাকে। মধ্যযুগের শেষ নাগাদ জার্মান ভাষায় পরিশীলিত ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক ধ্যান-ধারণা আলোচিত হতে থাকে। ফলে তা সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে লাতিনকে ছাড়িয়ে যেতে এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার পরও জার্মান ভাষাটি বিপুল বৈচিত্র্যসম্পন্ন উপভাষাসংবলিত একটি আঞ্চলিক ভাষা হিসেবেই রয়ে যায়, যা প্রধানত ব্যবহারিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার হতো। যোগাযোগের একটি বৈধ ধরন হিসেবে এবং বিচিত্র ধরনের ধ্যান-ধারণা প্রকাশের সম্ভাবনাবিশিষ্ট একটি ভাষা হিসেবে হাই জার্মান ভাষা বিকশিত হওয়ায় এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করায় সে ভাষার ইতিহাসে অনুবাদের ভূমিকা আর ততটা অত্যাবশ্যকীয় ছিল না। কিন্তু তার পরও ভাষাটির চলমান বিকাশের ধারায় অনুবাদ যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, তা নয়। এক্ষেত্রে এনলাইটেনমেন্টের সময়ের অনুবাদগুলো বিশেষ উল্লেখের দাবিদার: যেমন— হাইনরিশ ভসের (১৭৫১-১৮২৬) হোমার অনুবাদ, ক্রিস্টোফার মর্টিন ভাইল্যান্ডের (১৭৩৩-১৮১৩) শেক্সপিয়ার অনুবাদ; জোহান জ্যাকব বডমারের (১৬৯৮-১৭৮৩) মিল্টন অনুবাদ এবং জোহান ক্রিস্টফ গটশেডের (১৭০০-৬৬) ফরাসি সাহিত্য অনুবাদ।
{শেক্সপিয়ারের অন্যান্য জার্মান অনুবাদক বিশেষ করে শ্লেগেল ও টিয়েক সম্পর্কে তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।}
একই রকমের গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে সময়ে ভাষাতত্ত্ব ও অনুবাদের রীতিনীতি সম্পর্কিত নিয়মিত আলাপ-আলোচনা। অবশ্য একটি একীভূত, জাতীয় জার্মান ভাষা উদ্ভূত হতে অনেক সময় লেগেছিল এবং প্রক্রিয়াটি অষ্টাদশ শতকের অবসানের আগে সমাপ্ত হয়নি। এই এক হাজার বছরব্যাপী বিবর্তনে মার্টিন লুথারের (১৪৮৩-১৫৪৬) বাইবেল অনুবাদ ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ পর্বে মূলত তাঁর রচনা ও বিশেষ অবদানই তুলে ধরা হবে পাঠকের সামনে।
ধর্মসংস্কার আন্দোলন এবং সেটার ভাষাতাত্ত্বিক ও যোগাযোগমূলক চাহিদা, আর সেই সঙ্গে সে সময়ে প্রচলিত অনুবাদের ঐতিহ্যের পটভূমিতেই কেবল অনুবাদক হিসেবে মার্টিন লুথারের রচনার প্রভাব উপলব্ধি করা যেতে পারে। তাছাড়া কেবল লুথারের ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিই না, সেই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্ব, ভাষাতাত্ত্বিক সক্ষমতা এবং অনন্য সৃজনশীলতার কথাও এ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখা জরুরি।
ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে জার্মানিতে বিভিন্ন সামাজিক দ্বন্দ্ব এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যে, তা ব্যাপক একটি আন্দোলনের জন্ম দেয় এবং এ আন্দোলন কিছু সময়ের জন্য সমাজের সব শ্রেণীকে রোমক গির্জার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করে তোলে। সে সময়ে গির্জার কোনো সংস্কারের ওপর নির্ভর করেই কেবল সামাজিক নানা সংস্কার ঘটা সম্ভব ছিল। লুথার যে বাইবেলকে নিয়মবদ্ধভাবে সাধারণ মানুষের ভাষায় তুলে ধরেছিলেন, সেটা এ আন্দোলনকে একটি মতাদর্শগত কাঠামো দান করে, অর্থাৎ এটিকে একটি কর্মসূচি তথা প্রকল্পের রূপদান করে, যদিও সেটা লুথারের উদ্দেশ্য ছিল না, কারণ তাঁর কাজগুলো ছিল তাঁর ধর্মতত্ত্বের ফল। পূর্বেকার বা আদি হাই জার্মান ভাষায় বাইবেল অনূদিত হয়েছিল। লুথারের আগেই সেই অনুবাদ সম্পন্ন হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের নিজেদের ভাষায় পড়ার মতো একটি বাইবেলের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সেটা সেই অনূদিত বাইবেল এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছিল।
{লুথারের আগে হাই জার্মান ভাষায় অন্তত ১৪টি সম্পূর্ণ বাইবেলের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। চলনক্ষম টাইপ ব্যবহারকারী গোড়ার দিকের মুদ্রকদের অন্যতম জোহান মেন্টেল (১৪১০-৭৮) ১৪৬৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে স্ট্রাসবুর্গে একটি সম্পূর্ণ বাইবেল ছেপেছিলেন। ১৪৭৮ সালের পর চারটি লো (সমতল এলাকার) জার্মান সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল।}
লুথারের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা পুব মধ্য জার্মানির ভাষাতাত্ত্বিক অঞ্চলে, যেখানে একটি প্রমিত বা আদর্শ স্থাপনকারী (নরম্যাটিভ) ভাষা— পরিশীলিত একটি সাহিত্যিক ভাষা— এরই মধ্যে বিকাশ লাভ করেছিল। লুথার বাইবেল অনুবাদ করতে গিয়ে যে সাহিত্যিক জার্মান ভাষার এই পুব মধ্য জার্মান প্রকারান্তরটি (variant moveable printing type) ব্যবহার করলেন, তাতে এ রূপটির বাড়তি প্রতিষ্ঠা ও প্রমিতকরণে অনুপ্রেরণার জোয়ার এল। ওদিকে জনসাধারণের ভেতর বাইবেলের ব্যাপক প্রচারের কারিগরি পূর্বশর্তটি ছিল— স্বভাবতই চলনক্ষম মুদ্রণ টাইপ (movable printing type), যা গুটেনবার্গ ৮০ বছর আগে তৈরি করে গিয়েছিলেন।
সে সময়ের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যেই একটি একীভূত জাতীয় ভাষার আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন মাত্রায় মূর্ত রূপ পেয়েছিল, তবে উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই তা বিশেষভাবে শক্তিশালী ছিল। যে বাচিক ধরনগুলোর ব্যাপক আঞ্চলিক প্রচলন এবং ব্যাপক সামাজিক ভিত্তি ছিল, সেগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে লুথার নতুন যোগাযোগভিত্তিক চাহিদাগুলোকে বিবেচনার মধ্যে নিয়েছিলেন। তিনি সব ধরনের প্রভাবের ব্যাপারেই, তবে বিশেষ করে আপার জার্মান ভাষাতাত্ত্বিক অঞ্চলের প্রভাব সম্পর্কে উদার ছিলেন।
লুথার তন্নিষ্ঠভাবে লাতিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষা অধ্যয়ন করেছিলেন, সেই সঙ্গে তিনি জনগণের মুখের ভাষার প্রতিও বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাঁর অনুবাদ যাতে সবচেয়ে যথার্থ ও কার্যকর হয়, সেজন্য তিনি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞর সহায়তা নিয়েছিলেন, যেমন— গ্রিক ভাষার জন্য ফিলিপ মেলাংকথন (Philipp Melanchthon), হিব্রুর জন্য ম্যাথাউস অরোগালুস (Matthäus Aurogallus, বা Goldhahn) এবং লাতিনের জন্য ক্যাসপার ক্রুসিগার (Casper Cruciger)। এছাড়া সুনির্দিষ্ট প্রতিশব্দ-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে তিনি বিভিন্ন পেশাজীবীর যেমন— বনরক্ষক এবং শিকার ও শিকারের পশু-পাখির তত্ত্বাবধায়কদের বুদ্ধি-পরামর্শ নিতেন। এছাড়া ছিল লুথারের নিজের তুলনারহিত সৃজনশীলতা এবং কাব্যিক সংবেদনশীলতা। উল্লিখিত সব উপাদানের অবদানের কারণেই তাঁর অনুবাদ আজো এমন ব্যাপক প্রভাবসঞ্চারী।
লুথারের ভাষাতাত্ত্বিক কৃতিত্বের মূলে রয়েছে অনুবাদের বিশেষ কিছু রীতিনীতি। প্রথমত. তিনি বাইবেলের আদি ভাষায় ফিরে যাওয়ার কথা বলতেন: ওল্ড টেস্টামেন্টের জন্য হিব্রু, নিউ টেস্টমেন্টের জন্য গ্রিক (যদিও লাতিন ভালগেটটিকে তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করতে চাইতেন না)। এটি একটি উদ্ভাবনকুশল ভাষাবিদ্যাগত কর্মকৌশল, যা মানবতাবাদী দার্শনিকদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। ক্যাথলিক গির্জা ভালগেটকে বাইবেলের দাপ্তরিক সংস্করণ হিসেবে ঘোষণা করলেও লুথার সেটাকে সত্যিকারের একটি প্রামাণিক টেক্সট হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আরেকটি নীতি ছিল লুথারের লক্ষ্য-সংস্কৃতি কর্মকৌশল (target-culture approach)। বাইবেলকে তাঁর যুগের মনোভঙ্গি ও চৈতন্যর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো করে তৈরি করতে সেখানে তিনি বেশকিছু পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থটিকে একটি জার্মান টেক্সটে পরিণত করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, কেবল শব্দার্থগত সমতা যথেষ্ট নয়। লুথার চেয়েছিলেন, বাইবেলে যেসব ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে, সেসব যেন মূল পাঠক-শ্রোতার কাছ থেকে স্থান ও কালগত দিকে থেকে বহু দূরবর্তী তাঁর পাঠকদের কাছে সহজেই বোধগম্য হয়।
ক্রমশ...





