১

চমন বাহার জর্দা দিয়ে পান চিবুতে চিবুতে স্ত্রী রেজিয়া বেগমসহ স্টার জলসা দেখছে হাতেম আলী।

হাতেম আলী এলাকার সর্দার গোত্রীয় লোক। ছোটখাটো চাকরির ফাঁকে প্রভাবশালী লোকজনের নেক নজরে থেকে থেকে এলাকায় বিষয়-সম্পত্তিও করেছে ভালোই। তবে বিষয়-সম্পত্তি যে সব প্রভাবশালীর বদৌলতে হয়েছে তা নয়। তার পরিশ্রম ও বুদ্ধির জোরেই একে একে বিষয়-সম্পদ-যশ-খ্যাতি সব ধরা দিয়েছে। চোর-ডাকাত-বাবু-পুলিশ সবার সঙ্গে সখ্য রাখার গুণটি বিধাতা তাকে ভালোভাবেই দিয়েছে। কীভাবে ক্ষমতাবানকে খুশি রেখে ক্ষমতাহীনের কাছাকাছি থাকা যায়, তা হাতেম আলী ছাড়া এ অঞ্চলের কেউ এত ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেনি।

নিশ্চিন্তপুর গ্রামের সব লোক তার এই দ্বিচারী স্বভাবের কথা জানলেও সামনে কিছু বলে না কিংবা হাতেম আলী সেই সুযোগ কাউকে দেয় না। সর্বভুক তেলাপোকার মতোই তার সর্বাঙ্গ চকচক করে, যেকোনো জায়গায় সে বসতে পারে মাছির মতো, সে মিষ্টি হোক কিংবা মল।  

 

২

হাতেম আলীর মন আজ বেজায় অস্থির। আগামীকাল এলাকায় সাবের সাহেব আসবেন। সাবের সাহেব এলাকার সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ, নানা জায়গায় তার জানাশোনা। তার কথায় থানার ওসি কি জেলার, এসপি, ইউএনও-ডিসি সব এক লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। সাবের সাহেবের সঙ্গে সখ্য আছে বিধায় হাতেম আলী এলাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মক্তব-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতে পারে। সাবের সাহেব এলে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী কাজ না দেখালে তার ক্ষমতা ঠিকভাবে প্রদর্শিত হয় না। যেমন পুকুরে মাছ কীভাবে লাফায়, কার্ফু মাছ কীভাবে বাচ্চা ফোটায়, দেশী মোরগ কীভাবে ডিমে তা দেয় ইত্যাদি।   

এবার নতুন কী দেখাবে তা নিয়ে খুব পেরেশানিতে আছে হাতেম আলী। হাতেম আলী এই পেরেশানির সময় ভুল জায়গায় পানের পিক ফেলে সবসময়। পিক ফেলার পাত্রে পিক না ফেলে ফেলল স্ত্রীর পায়ে ও শাড়িতে। পেরেশানির ওপর আবার পেরেশানি রেজিয়া বেগমের রাগ খুব ভয়ঙ্কর। সহজে রাগে না কিন্তু রাগলে দফারফা। মেয়েজামাইয়ের উপহার দেয়া নতুন শাড়িতে পানের পিক পড়ায় বিরক্ত হলেও স্বামীকে কিছু বলে না। বরং নতুন বিবাহিত বউয়ের মতোই মশকরা করেই বলে,  

-কিগো স্টার জলসার পাখির শাড়ি পরা দেখি মাথা আউলাইয়া গেছে নি, আমারটাতে একদম রঙ লাগাই দিলা।

- না আসলে বিষয় হইছে কি, আমার বয়স বাড়লেও তোমার কিন্তু এখনো বয়স বাড়ে নাই, তাই তোমার পায়ের দিকে চোখ যাইতেই শরীরে মনে হয় বিজলি চমকাইছিল।

- হ তোমার যে বয়স বাড়ছে কিন্তু সাধ কমে নাই, তা রাইতের বেলায় টের পাই

- বিষয়টা হইছে ...

হাতেম আলী আমতা আমতা করে, বিষয়টা হইছে বলা হাতেম আলীর একটা মুদ্রাদোষ। অতিরিক্ত উত্তজিত অবস্থায় এটার দ্রুত পুনরাবৃত্তি ঘটে।

 

হাতেম আলী লজ্জা পায়, স্ত্রী কি তার বয়সজনিত অক্ষমতার কথাই প্রকাশ করল নাকি, হাতেম আলীর কপালে চিন্তার বলিরেখা দেখা দেয়। পুরুষ মানুষের আবার বয়স কী, কালই কবিরাজের কাছে গিয়ে শক্তিবর্ধক হালুয়া নিয়ে আসবে। কিন্তু সাবের সাহেবকে কী চমক দেখাবে? 

 

৩

রেজিয়া বেগম বুদ্ধিমতী। পঁচিশ বছরের সংসারজীবনে সে তার স্বামীর প্রতিটা পদক্ষেপই খেয়াল করেছে। তার স্বামী যে একটা নিকৃষ্ট শয়তান লোক, তার থেকে ভালো কেউ জানে না। কিন্তু রেজিয়া বেগমের প্রতি তার ভালোবাসার কমতি নেই। এটাও রেজিয়া বেগম বুঝে, তাই স্বামী যখন চিন্তিত থাকে মাঝে মাঝে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে থাকে। ধূর্ত লোকের স্ত্রীদেরও নানা ছলাকলা করতে হয়।

রেজিয়া বেগমও সবার সঙ্গে দারুণভাবে মিশে যেতে পারে, হোক এলাকার উঠতি মাস্তান কিংবা পাড়ার বয়স্ক লোক।

রেজিয়া বেগমের মাথায় বুদ্ধি আসে, স্বামীকে বলে, ‘সাবের সাহেবকে এবার আমার হাতের রান্নাটাই না হয় খাওয়াও না, ঢাকা শহরে কি-না-কি খায়! তুমি নিজ হাতে বাজার করবে, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার ব্যবস্থা করো।’ হাতেম আলী স্ত্রীর বুদ্ধিতে প্রীত হয়। রেজিয়া বেগমও স্বামীর সম্মতিতে খুশি হয়।

 

৪.

সকাল থেকে রেজিয়া বেগমের হেঁসেল জমজমাট। কেউ মসলা বাটে তো কেউ মাংস কাটে। পৃথিবীর সব মানুষ নিজ নিয়মে জীবনের হিসাব করে। এই সাতসকালে ৬০ বছরের নুরু বেগমের মসলা বাটতে আসারও এক ধরনের হিসাব আছে। বড় মানুষেরা বড় বড় হিসাব করে। রান্নার তদারকিতে ব্যস্ত রেজিয়া বেগম। দুপুরের আগেই রান্না শেষ করতে চায়। শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর করেই সাবের সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হতে চায়। এদিকে হাতেম আলী ফোনে বারবার খবর নিচ্ছে— সাবের সাহেব কতটুকু এলেন। এই ব্যাকুলতায় আন্তরিকতার চেয়ে স্বার্থ হাসিল হয়তো মুখ্য, সেটা সাবের সাহেবও জানেন। এতটুকু বুদ্ধি না থাকলে তিনি তো হাতেম আলীর মতো টাউটদের ভগবান হতে পারেন না। 

 

৫

সাবের সাহেব গ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছেন নিশ্চিত হয়ে রওনা হয় হাতেম আলী সাবের সাহেবের বাড়ির দিকে। নিজে সবার সামনে থেকে সাবের সাহেবকে সালাম দিয়ে তার খোঁজখবর নিতে হবে। এ কাজে তাকে সঙ্গ দেয় তার কিছু বিশ্বস্ত লোক। ক্ষমতার খেলায় কেউ বেশিদিন বিশ্বস্ত থাকে না। তাই হাতেম আলীর সঙ্গে প্রতিবার নতুন লোক যায়। সাবের সাহেব যেন এক লোককে দুবার না দেখেন কিংবা কেউ যেন সাবের সাহেবের কাছে ঘেঁষতে না পারে তার জন্য এ সতর্কতা।

সাবের সাহেবের কাছে নানা লোক আসে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান পেতে। তিনি সবার সমস্যার কথা শুনে আশ্বস্ত করেন এবং হাতেম আলীকে সবকিছুর নোট নিতে বলেন। পীরের বাড়িতে যেমন মুরিদেরা নানা সমস্যার আরোগ্য লাভে আসে, সাবের সাহেবের বাড়িতেও সে অবস্থা। হাতেম আলী যত্নসহকারে সবার নোট নেয়। যাওয়ার সময় লোকজন হাতেম আলীকেও বলে যায় যে যার মতো করে। এখানেই হাতেম আলীর শক্তির উৎস। এ উেসর কাছ থেকে শক্তি পেতে সবাই মরিয়া, তাই কেউ সহজে হাতেম আলীকে ঘাঁটায় না।

 

৬

গোলাপি রঙের শাড়ি পরে, মুখে হালকা প্রসাধনের প্রলেপ নিয়ে বসার ঘরে বসে আছে রেজিয়া বেগম। সাবের সাহেবকে নিজ হাতে পরিবেশন করে খাওয়াবে। গোলাপি শাড়িতে রেজিয়া বেগমকে অনেক কম বয়সী ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। কিছু মানুষ চোরাবালির মতো গ্রাস করে নিতে জানে বয়সের ছাপ। রেজিয়া বেগম যেন জাদুকরের মতো চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিয়েছে মুখের সব বলিরেখা, মেছতা কিংবা বয়সের ছাপ। তার ফর্সা মুখে ফুটে উঠেছে শুভ্র এক গ্রামীণ সৌন্দর্য।

সাবের সাহেব আসামাত্রই রেজিয়া বেগম স্বামীর মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। হাত-মুখ ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে এগিয়ে দেয়া, সপ্রতিভভাবে কখন মাছ লাগবে কখন ঝোল লাগবে জিজ্ঞেস করা।

অতি বুদ্ধিমান লোকেরা সহজে হকচকিত হয় না কিংবা সেই ভাব প্রকাশ করে না। রেজিয়া বেগমের স্নিগ্ধ আতিথেয়তায় মুগ্ধ সাবের সাহেব তার মুগ্ধতা কাউকেই বুঝতে দেননি। সাবের সাহেবের এই নির্লিপ্ততা রেজিয়া বেগমের কাছে একটু অস্বাভাবিক ঠেকলেও তার মুখের হাসিতে সব ঢাকা পড়ে গেল। হাতেম আলীর মুখের হাসিতেও কোনো অস্বাভাবিকতা কেউ লক্ষ করল না। 

 

৭

সাবের সাহেব গত বছর তার স্ত্রীকে হারিয়েছে। দুই ছেলেমেয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রী নিয়ে বিদেশে বসবাস করছে দীর্ঘদিন। এত ব্যস্ততার মাঝেও তার ভেতর এক ধরনের শূন্যতা কাজ করে, তার একান্ত সময়গুলোতে। লোকলজ্জার ভয়ে এত দিন একাকিত্বের অবসানের কথা চিন্তাও করেননি।

তিনি ক্ষমতাবান, চাইলে নিজের অর্ধেক বয়সী কিংবা তারও ছোট কাউকে এ বয়সেও বিয়ে করতে পারেন অনায়াসে। আজকাল খুব বেশি বেশি নিজের একলা সময়ে রেজিয়া বেগমকে মনে পড়ছে, সেই তোয়ালে এগিয়ে দেয়া, সেই মাছ পাতে উঠিয়ে দেয়া।

 

৮

গতকাল কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে হাতেম আলী। তার বাড়িতে কলেজের সব শিক্ষক এসেছেন। রেজিয়া বেগম তার স্বভাবসুলভ সামাজিকতায় সবাইকে আপ্যায়ন করে খোঁজখবর নেয়। রেজিয়া বেগমও তার স্বামীর সাফল্যে খুব উত্ফুল্ল। তার স্বামীর ক্ষমতা আর তার ক্ষমতা একসূত্রে গাঁথা। সাবের সাহেবের প্রতি হাতেম আলীর কৃতজ্ঞতার শেষ থাকে না। রেজিয়া বেগম তার স্বামীর এ অর্জনের কিছুটা কৃতিত্ব দাবি করতেই পারে।

 

৯

ভীষণ গরম পড়ছে আজ, রেজিয়া বেগম বাড়ির দক্ষিণের পুকুরঘাটে বসে পান চিবুচ্ছে। হঠাৎ পাশে থাকা ফোন বেজে ওঠে। অপরিচিত নম্বর ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। রেজিয়া বেগমের ফোনে সাধারণত অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে না। ফোন রিসিভ করার পর তার শরীর ভয়ে কাঁপতে থাকে।

তার মতো সাধারণ একজন মানুষকে সাবের সাহেব ফোন দিয়ে ধন্যবাদ জানাবেন, তার কল্পনায় ছিল না। প্রায় ৫ মিনিট কথা হলো। কেমন যেন উত্ফুল্ল এক অনুভূতি নিয়ে রেজিয়া বেগম এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেল ঘরে এসে। সাবের সাহেবের মতো লোক সকাল-বিকাল একেকটা হাতেম আলী তৈরি করতে পারেন। রেজিয়া বেগম আজ আবার সেই গোলাপি শাড়িটা পরেছে। নিজেকে নিজে আয়নায় দেখে। দীর্ঘদিন যত্ন নেয়া লেবুগাছটার দিকে উদাস হয়ে তাকায়। তার নিচে বসে আছে একটি লাল মোরগ। এটাকেও রেজিয়া বেগম নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছে, আগামীবার মেয়েজামাই এলে জবাই দেবে। হঠাৎ মোরগের চেহারার সঙ্গে হাতেম আলীর চেহারার অদ্ভুত রকমের মিল খুঁজে পায় হাতেম আলীর স্ত্রী।

রেজিয়া বেগম এখন নিজেই অপরিচিত সেই নম্বরে ফোন করছে।