অরুন্ধতী রায়ের নতুন বই দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেসের প্রচ্ছদে শোভা পাচ্ছে একটি কবরের ছবি। ছবিটি তুলেছেন দিল্লির এক সাংবাদিক— মায়াঙ্ক অস্টিন সুফি। ছবিটি নিয়ে সামান্য রহস্যও আছে, এখন পর্যন্ত আলোকচিত্রী ছাড়া বইসংশ্লিষ্ট কেউই কবরটির অবস্থান সম্পর্কে জানেন না, এমনকি অরুন্ধতী রায়ও না। তবে এটা নিশ্চিত যে, কবরটি দিল্লিতেই কোথাও অবস্থিত।
লেখক, আলোকচিত্রী মায়াঙ্ক অস্টিন সুফি কাজ করেন হিন্দুস্তান টাইমস মিডিয়ায়। তার লেখা প্রকাশ হয় মিন্টে। দিল্লির ঐতিহ্য, স্থাপনার ওপর তার লেখা ও ছবি নিয়ে কয়েকটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। অরুন্ধতী রায় তার নতুন উপন্যাসের প্রচ্ছদের জন্য কবরের ছবি চেয়েছিলেন মায়াঙ্কের কাছে। এখন যেমন বাংলাদেশে চিকনগুনিয়া আর ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে, তেমনি সুফি যখন সেই কবরের ছবিটি তুলেছিলেন, তখন দিল্লিতেও ছিল এ জ্বরদ্বয়ের প্রকোপ। মায়াঙ্ক বলেন, সময়টা ছিল গত বছরের ‘ডেঙ্গু আর চিকনগুনিয়ার মৌসুম।’
ছবির ব্যাপারে রায় মায়াঙ্ককে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন আবার কিছু স্বাধীনতাও ছিল। রায় চাইছিলেন একটি কবরের কিংবা কোনো পাথরখণ্ডের ছবি— যা দেখতে সমাধির মতো। সুফি বলেন, ‘তবে শর্ত ছিল সমাধিটা যেন সুনির্দিষ্ট না হয়। অর্থাৎ দ্য গড অব স্মল থিংসের প্রচ্ছদের মতো, যেখানে পানি দেখা যায়, তবে সেটা কোনো স্রোত নয় আবার অন্য কোনো পানির আধারের মতোও নয়।’
অরুন্ধতী রায়ের নতুন উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেসের গল্পে কবরস্থান একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কাহিনীতে দেখা যায়, একসময়ের আফতাব পরবর্তীতে আনজুম (হিজড়া) জীর্ণ এক পারসিয়ান কার্পেট দিল্লির এক কবরস্থানে বিছিয়ে সেটাকেই নিজের ঘরবাড়ি করে তোলে। আনজুমের এ কবরস্থানের বাড়িতে আসতে থাকেন অনেক অতিথি, এদের নিয়েই এগোতে থাকে উপন্যাসের গল্প।
নিজের ওয়েবসাইট দিল্লিওয়ালার জন্য গল্প আর ছবি সংগ্রহ করতে মায়াঙ্ক সুফি দিল্লি শহর চষে বেড়ান। তিনি শহরের কয়েকশ কবরের ছবি তুলেছেন। সুফি শহরের দরগাগুলোর নিয়মিত অভ্যাগত। হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগা থেকে শুরু করে মেহরুলি, চিরগা দিল্লি— সবখানেই তার নিয়মিত যাতায়াত। তবে সুফি বিখ্যাত সন্তদের সমাধির চেয়ে তাদের আশপাশে অযত্নে ছড়িয়ে থাকা কম পরিচিত বা অপরিচিত সমাধিগুলোর ছবি তোলেন।
অরুন্ধতী রায়ের বইয়ের প্রচ্ছদের কবরের ছবিটি তোলার স্মৃতিচারণ করে সুফি বলেন, ‘সেই কবরটার কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তুমুল বৃষ্টি নামছিল, কবরটি অসাধারণ সুন্দর লাগছিল, কেউ একজন কবরটির ওপর একটা গোলাপ রেখে গিয়েছিল।’ সুফি জানান, দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার ইচ্ছা হচ্ছিল কবরটির ছবি তোলার কিন্তু একটা সমস্যা ছিল; কবরটির চারপাশে প্রচুর পানি জমে ছিল আর তখন ছিল ডেঙ্গু আর চিকনগুনিয়ার মৌসুম। তাই সুফি কিছুটা ভয় পাচ্ছিলেন। সুফি বলতে থাকেন, ‘কিন্তু সেই কবরটা এত সুন্দর ছিল যে, আমি বিভিন্ন দিক থেকে একের পর এক ছবি তুলতে থাকি।’ সুফি কবরটির কয়েকশ ছবি অরুন্ধতী রায়ের কাছে পাঠান— সাদা পাথরের ওপর একটা লাল গোলাপ আর কোনায় ঝুলে আছে একটা মরা মাছি। ছবিটা অরুন্ধতী রায় ও প্রচ্ছদের শিল্পী ডেভিড এলরিজ উভয়েরই মনে ধরে।
মায়াঙ্ক নিজে অরুন্ধতী রায় ও তার লেখার ভক্ত। অরুন্ধতীর নতুন উপন্যাসের ইতিহাস মায়াঙ্কের আলোকচিত্রে ধরা আছে। দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস বইটির পেছনের ফ্ল্যাপে রায়ের যে ছবিটি ব্যবহার হয়েছে, সেটাও সুফির তোলা।
অরুন্ধতী রায়ের প্রথম উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশ হয়েছে ২০ বছর আগে। বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত বইটির সব সংস্করণই সুফির সংগ্রহে আছে। গত মাসে বইটির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে, তিনি সেটাও সংগ্রহ করেছেন। দ্য গড অব স্মল থিংসে কেরালার যে আয়মানাম গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও ঘুরে এসেছেন। তার কথায়, ‘দ্য গড অব স্মল থিংস আমি বহুবার পড়েছি। কোনো ভারতীয় লেখকের লেখা উপন্যাসের মধ্যে এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেই লেখক জীবনের আরো ২০টি জটিল বছর কাটিয়ে নতুন উপন্যাস লিখেছেন।’
দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেসের প্রচ্ছদের জন্য সুফি যে কবরটির ছবি তুলেছেন, সেটার অবস্থান বা পরিচয় কিন্তু তিনি রহস্যেই ঢেকে রেখেছেন। শুধু এটুকুই জানিয়েছেন— কবরটি দিল্লিতেই আছে। এমনকি অরুন্ধতী রায়ও জানেন না কবরটি দিল্লির কোথায় অবস্থিত। সুফি বলেন, ‘এটা আমার গোপন রহস্য... তবে কেউ আমার চলাফেরার ধরন অনুসরণ করলে কবরটা খুঁজে পেতে পারেন।’
মিন্টে প্রকাশিত এলিজাবেথ কুরুভিল্লার লেখা অবলম্বনে





