অনুবাদ: শওকত হোসেন
[অরুন্ধতী রায়ের নতুন উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস বেরোচ্ছে ৬ জুন হামিশ হ্যামিল্টন থেকে।
এখানে বইটির প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ প্রকাশিত হল]
বুড়ো পাখিগুলো কোথায় গিয়ে মরে?
গাছের মতোই কবরস্থানে থাকত ও। ভোরে কাকের দলকে বিদায় জানাত, স্বাগত জানাত বাদুরের ঝাঁককে। গোধূলিতে করত ঠিক উল্টোটা। মাঝখানের সময়টাতে ওর উঁচু মগডালে আবছায়া শকুনগুলোর প্রেতাত্মার সঙ্গে আলাপ করত। কেটে ফেলে দেয়া অঙ্গের কষ্টের মতো ওদের নখ আঁকড়ে বসার মৃদু জ্বলুনি অনুভব করত। নিজেদের খেয়ালেই গল্প থেকে বিদায় নেয়ায় ওরা মোটেই দুঃখ পায়নি বলেই আঁচ করেছে ও।
এখানে প্রথম আসার পর একটুও পিছু না হটে গাছের মতোই নৈমিত্তিক নির্মমতার কয়েকটা মাস সহ্য করেছে ও। কোন ছেলেটা ওর দিকে পাথর ছুড়ে মারল দেখতে যায়নি, ওর বাকলে আঁচড় টেনে লেখা অপমানের কথা দেখতে ঘাড় ফেরানোর কথাও ভাবেনি। লোকজন খিস্তিখেউড় করলে— বিনা সার্কাস ভাঁড়, রাজবাড়ী ছাড়া রানী— প্রতিটি কষ্ট চাপা দিতে পাতার ঝিরিঝিরি সংগীতকে কাজে লাগিয়ে হাওয়ার মতো ডালপালার নিচ দিয়ে বয়ে যেতে দিয়েছে।
কিন্তু এককালে ফতেহপুরি মসজিদে ইমামতি করা অন্ধ ইমাম জিয়াউদ্দীন বন্ধু হয়ে ওর কাছে আসা-যাওয়া শুরু করার পরই কেবল মহল্লাবাসী ওকে না ঘাঁটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অনেক দিন আগে ইংরেজি জানা এক লোক বলেছিল উল্টো করে লিখলে ওর নামের বানান (ইংরেজিতে) মজনু হবে। লায়লা-মজনু কাহিনীর ইংরেজি বয়ানে, বলেছিল সে, মজনু হলো রোমিও আর লায়লা জুলিয়েট। মজার লেগেছিল কথাটা। ‘বলতে চাও গল্পটার একটা খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছি আমি?’ জিজ্ঞেস করেছে ও। ‘লোকে যখন জানবে যে লায়লা হয়তো আসলে মজনু আর রোমি হলো জুলি, কি করবে ওরা?’ পরেরবার ওর সাথে দেখা হলে ইংরেজি জানা লোকটা বলেছিল ভুল হয়েছিল তার। উল্টো বানানে ওর নাম হবে মুজনা, যেটা আসলে কোনো নাম নয়, কোনো মানেও নেই। এ কথা শুনে ও বলেছিল, ‘কিছু এসে যায় না। আমি ওদের সবাই। আমিই রোমি আর জুলি, আমিই লায়লা আর মজনু। আর মুজনা, নয় কেন? কে বলেছে আমার নাম আনজুম? আনজুম না, আমি আনজুমান। আমি একটা মাহফিল, সমাবেশ। আমি সবার আবার কারও না, আমি সবকিছুর আবার কিছুরই না। দাওয়াত চাওয়ার মতো বাকি আছে কেউ? সবাই দাওয়াতি।’
ইংরেজি জানা লোকটা বলেছিল, বেশ চালাকি করে অমন একটা কথা বানিয়েছে ও। তার মাথায় কোনোদিনই আসত না কথাটা, বলেছিল সে। ও বলেছে, ‘তোমার উর্দুর যা হাল, কীভাবে আসবে? কী ভাবো তুমি? ইংরেজি আপসেই চতুর বানায় তোমাকে?’
লোকটা হেসেছে। তার হাসি দেখে হেসেছে ও-ও। একটা ফিল্টারঅলা সিগারেট ভাগাভাগি করেছে ওরা। উইলস নেভি কাট সিগারেট বেঁটে-খাটো, মোটেই পয়সা উশুল না হওয়ার নালিশ করেছিল সে। ফোর স্কয়ার কিংবা রেড অ্যান্ড হোয়াইটের চেয়ে বরং ওগুলোই বেশি ভালো লাগার কথা বলেছে ও।
এখন আর লোকটার নাম মনে নেই ওর। হয়তো কোনোদিনই জানত না। অনেক আগেই যেখানে যাওয়ার চলে গেছে ইংরেজি জানা লোকটা। সরকারি হাসপাতালের পেছনে কবরস্থানে থাকছে ও। সঙ্গী হিসেবে আছে ওর গোদরেজ ইস্পাতের আলমিরা, ওটায় নিজের গানগুলো— দাগ পড়া রেকর্ড আর টেপ— রাখে ও, একটা পুরনো হারমোনিয়াম, নিজের কাপড়চোপড়, বাবার কবিতার বইগুলো, ফটো অ্যালবাম আর খোয়াবগাহর আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েকটা পত্রিকার ক্লিপিং। একটা কালো সুতোয় বাঁকা রুপোর খিলালের সঙ্গে চাবিটা গলায় ঝুলিয়ে রাখে ও। রাতে একটা জরাজীর্ণ পারসি গালিচায় ঘুমোয়। দিনে তালা মেরে রাখে ওটা, রাতে দুটো কবরের মাঝখানে বিছিয়ে নেয় (একান্ত রসিকতা হিসেবে পর পর দুই রাত একই কবরের মাঝখানে নয়)। এখনো সিগারেট খায়, সেই নেভি কাটই।
একদিন সকালে জোরে জোরে খবর কাগজ পড়ে শোনানোর পর স্পষ্টই কিছু না শুনলেও বুড়ো ইমাম স্বাভাবিক একটা ভাব ধরে বললেন, ‘এমনকি তোমাদের ভেতর হিন্দুদেরও নাকি না পুড়িয়ে কবর দেয়া হয়, কথাটা সত্যি?’
ঝামেলা আঁচ করে কথা ঘোরাল ও। ‘সত্যি? সত্যি কি জিনিস? সত্য কাকে বলে?’
যান্ত্রিক উত্তর দিলেন প্রশ্নের ধারা থেকে সরে যেতে অনিচ্ছুক ইমাম। ‘সাচ খুদা হ্যায়। খুদা হি সাচ হ্যায়।’ খোদাই সত্যি। সত্যিই খোদা। মহাসড়ক ধরে সাঁ সাঁ করে ছুটে যাওয়া রঙচঙে ট্রাকের পেছনে মেলা ধাঁচের জ্ঞান। এবার অন্ধ চোখ কুঁচকে ফিসফিস করে চাতুরি মেশানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন: ‘বলো তো, তোমরা মারা গেলে কোথায় কবর দেয়? লাশ ধোয়ায় কে? কে দোয়া পড়ে?’
অনেকক্ষণ কিছুই বলল না আনজুম। তার পর সামনে ঝুঁকে অগাছসুলভ ভঙ্গিতে পাল্টা ফিসফিস করে বলল, ‘ইমাম সাহেব, লোকে যখন রঙের কথা বলে— লাল, নীল, কমলা— যখন সূর্য ডোবার সময় আকাশের বর্ণনা দেয়, কিংবা রমজান মাসে চাঁদ ওঠার কথা বলে— তখন আপনার কী মনে হয়?’
এভাবে পরস্পরকে গভীর, বলতে গেলে মারাত্মক আঘাত হেনে কষ্ট নিয়েই কারও রৌদ্রোজ্জ্বল কবরের ওপর পাশাপাশি বসে রইল ওরা। শেষতক আনজুমই নীরবতা ভাঙল।
‘আপনি বলুন,’ বলল ও। ‘আপনিই ইমাম সাহেব, আমি নই। বুড়ো পাখিরা কোথায় গিয়ে মরে? পাথরের মতো আকাশ থেকে আমাদের গায়ে ঝরে পড়ে ওরা? আমরা কি পথেঘাটে ওদের লাশে হোঁচট খাই? আপনার কি আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠানো সর্বদ্রষ্টা, সর্বশক্তিমান তুলে নেয়ারও জুত্সই ব্যবস্থা রেখেছেন বলে মনে হয় না?’
সেদিন স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই শেষ হলো ইমামের সফর। কবরের মাঝ দিয়ে ঠকঠক শব্দ তুলে যাওয়ার সময় তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল আনজুম। তার দেখার-চোখ ছড়িটা পথে ছড়ানো ছিটানো খালি মদের বোতল বা ফেলে দেয়া সিরিঞ্জে টক্কর খেয়ে সুর তুলছে। তাকে বাধা দিল না ও। জানে আবার আসবেন তিনি। যতই ভান থাকুক, দেখামাত্র নিঃসঙ্গতাকে চিনতে পারে ও। ওর ধারণা কোনো বিচিত্র সম্পর্কিত কারণে ওর যেমন তাকে দরকার, তেমনি তারও ওর ছায়া প্রয়োজন। এবং অভিজ্ঞতা থেকে ও শিখেছে, চাহিদা এক ধরনের গুদামঘর যেখানে যথেষ্ট পরিমাণ নিষ্ঠুরতা মওজুদ রাখা যায়।
খোয়াবগাহ থেকে আনুজমের বিদায় যদিও মোটেই আন্তরিক ছিল না, কিন্তু ও জানত এর স্বপ্ন এবং গোপন কথাগুলো প্রতারণার বেলায় কেবল ওর একার ছিল না। 
২. খোয়াবগাহ
দিল্লির প্রাচীর ঘেরা শহর শাহজাহানাবাদে এক হিমশীতল জানুয়ারি রাতে লণ্ঠনের (বিদ্যুিবভ্রাট) আলোয় জন্ম নেয়া পাঁচ ভাইবোনের ভেতর চার নম্বর ছিল ও। ওর দাই-মা আহলাম বাজি জোড়া শালে জড়িয়ে ওকে মায়ের কোলে তুলে দেয়ার সময় বলেছিল, ‘ছেলে এটা।’ অবস্থার বিচারে বোধগম্য ছিল তার এই ভুল।
প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার মাসখানেক বাদে জাহানারা বেগম এবং তার স্বামী ওদের প্রথম সন্তান ছেলে হলে তার নাম আফতাব রাখবে বলে ঠিক করেছিল। ওদের প্রথম তিনটি বাচ্চাই ছিল মেয়ে। ছয় বছর ধরে ওদের আফতাবের অপেক্ষায় ছিল ওরা। ওর জন্মের রাতটা জাহানারার জীবনে সবচেয়ে আনন্দের রাত ছিল।
পরদিন সকালে সূর্য ওঠার পর কামরা আলোকিত ও উজ্জ্বল হয়ে উঠলে ছোট্ট আফতাবের নেংটি খুলেছে সে। তৃপ্ত ধীরস্থির খুশির সাথে ওর ছোট্ট দেহ পরখ করেছে— চোখ, নাক, মাথা, গলা, বগলতলা, হাত-পায়ের আঙুল। তখনই ওর পুরুষাঙ্গের ঠিক নিচেই লুকানো একটা ছোট, অপরিণত কিন্তু সন্দেহাতীতভাবেই নারী অঙ্গ আবিষ্কার করে সে।
কোনো মায়ের পক্ষে কি নিজের বাচ্চাকে দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠা সম্ভব? জাহানারা বেগম ভয় পেয়েছিল। তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল হূিপণ্ডের কুঁকড়ে যাওয়া আর হাড়গোড় ছাই হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া ছিল ভুল হয়নি নিশ্চিত হতে ফের পরখ করা। তৃতীয় প্রতিক্রিয়া ছিল নিজের সৃষ্টি থেকে ছিটকে সরে আসা। তখন পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি খিঁচুনি দিয়ে দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে মলের ক্ষীণ ধারা নেমে আসতে শুরু করেছিল। ওর চার নম্বর প্রতিক্রিয়া ছিল বাচ্চাকে মেরে আত্মহত্যা করার কথা ভাবা। পাঁচ নম্বর প্রতিক্রিয়া ছিল বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরে পরিচিত আর অস্তিত্ব থাকার কথা জানা ছিল না এমন এক জগতের মাঝখানের ফোকর গলে লুটিয়ে পড়া। সেই গহ্বরে অন্ধকারে পাক খেতে খেতে ওই মুহূর্ত পর্যন্ত যা কিছু সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল, সমস্ত কিছু, ছোট থেকে বড় অর্থ খুইয়েছিল। ওর জানা একমাত্র ভাষা উর্দুতে, সবকিছু, স্রেফ জীবিত নয়, বরং বাকি সমস্ত কিছুর— গালিচা, কাপড়চোপড়, বইপত্র, কলম, গানের সরঞ্জাম— লিঙ্গ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সবকিছু হয় পুরুষ কিংবা নারীলিঙ্গ— পুরুষ বা নারী। ওর বাচ্চাটা বাদে সবকিছুর। হ্যাঁ, ওর মতো যারা তাদের একটা নাম থাকার কথা জানত ও— হিজড়া। আসলে দুটি শব্দ, হিজড়া আর কিন্নর। কিন্তু দুটি শব্দ তো আর ভাষা তৈরি করে না।
ভাষার সীমানার বাইরে কি থাকা যায়? স্বভাবতই এই প্রশ্নটা শব্দে কিংবা একটিমাত্র সাবলীল বাক্যে তার কাছে উত্তর তুলে ধরেনি। শব্দহীন, আদিম চিত্কারে নিজেকে তুলে ধরেছে।
***
ওর ষষ্ঠ প্রতিক্রিয়া ছিল নিজেকে সাফসুতরো করে আপাতত কাউকেই কিছু না জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া। এমনকি স্বামীকেও না। সাত নম্বর প্রতিক্রিয়া ছিল আফতাবের পাশে শুয়ে পড়ে বিশ্রাম নেয়া। স্বর্গ আর মর্ত্য সৃষ্টির পর ক্রিশ্চানদের ঈশ্বর যেমন করেছিলেন। পার্থক্য হলো সৃষ্টি করা দুনিয়ার একটা অর্থ তৈরি করেই বিশ্রাম নিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জাহানারা বেগম বিশ্রাম নিয়েছে নিজের সৃষ্টি দুনিয়ার সমস্ত অর্থ তোলপাড় করে দেয়ার পর।
সত্যিকারের যোনি নয় ওটা, আপনমনে বলেছে সে। ওটার নালিগুলো খোলা নয় (পরখ করে দেখেছে ও)। স্রেফ বাড়তি একটা জিনিস, ছোট্ট। হয়তো বুজে যাবে, কিংবা সেরে উঠবে, কিংবা কোনোভাবে বিদায় নেবে। চেনাজানা প্রতিটি উপাসনালয়ে প্রার্থনা করে সর্বশক্তিমানের দয়া চাইবে ও। তিনি নিশ্চয়ই দয়া করবেন। জানত সে, তিনি করবেন। এবং হয়তো বা তার বোধের অতীত কোনো উপায়ে দয়াই করেছেন তিনি।





