বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন সরকারের নেয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত পরবর্তী বহু বছরের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ছিল তেমনই এক সন্ধিক্ষণে। স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দেশকে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার প্রশ্ন সামনে আসে। সে সময় অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে যে নামটি জড়িয়ে আছে, তিনি এম সাইফুর রহমান।
তিন দফায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সাইফুর রহমান শুধু নিয়মিত বাজেট প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনির্ভর কাঠামো থেকে বাজারমুখী করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১ সালে তার নেতৃত্বে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু, বাণিজ্য ও শুল্ক ব্যবস্থায় উদারীকরণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারমুখী করার মতো পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলে দেয়। অর্থনীতিবিদদের অনেকে এসব পদক্ষেপকে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবর মৌলভীবাজারের বাহারমর্দন গ্রামে জন্ম নেয়া সাইফুর রহমান পেশাগতভাবে ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর তিনি লন্ডনে উচ্চ শিক্ষা নেন এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস থেকে পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করেন। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং হিসাব ও অর্থ ব্যবস্থার ওপর তার পেশাগত দক্ষতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে অর্থনীতি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
জিয়াউর রহমানের সময় বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা শুরু হয়। তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯১ সালে। এরশাদ সরকার পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেয়। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ এবং বাজারভিত্তিক সংস্কারের প্রবণতা জোরালো হচ্ছিল। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকতে পারেনি।
সাইফুর রহমানের সামনে তখন মূল প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনীতি কীভাবে রাজস্বের শক্ত ভিত, কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা এবং বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণের দিকে যাবে? তিনি সংস্কারের পথ বেছে নেন।
সাইফুর রহমানের অর্থমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালু করা। ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে নতুন ধরনের কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এর মাধ্যমে প্রচলিত পরোক্ষ কর ব্যবস্থার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত ভিত্তির একটি রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।
ভ্যাট চালু করা তখন মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। নতুন কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করার জন্য এ ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল বলে সংস্কারপন্থীরা মনে করতেন।
আজকের বাংলাদেশে সরকারের রাজস্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভ্যাট। ফলে ১৯৯১ সালের সেই সিদ্ধান্তকে কেবল একটি কর আইন প্রবর্তন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি প্রচেষ্টা।
অর্থনৈতিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আধিপত্য, দুর্বল ঋণ আদায় ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে নানা কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অধিকতর বাজারমুখী করার উদ্যোগ নেয়া হয়। নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারের বৃহত্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুদের হার, ঋণ বিতরণ, ব্যাংক পরিচালনা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়।
দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সাইফুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমদানি শুল্ক কমানো, বাণিজ্য ব্যবস্থাকে উদার করা এবং বেসরকারি খাতের জন্য সুযোগ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ তার অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এর পেছনে ছিল একটি মৌলিক ধারণা—দেশীয় শিল্পকে শুধু সরকারি সুরক্ষা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
সাইফুর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর অবস্থান। তার সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০২ সালে আদমজী জুট মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। তার দ্বিতীয় মেয়াদের আরেকটি বড় সংস্কার ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ব্যবস্থাকে বাজারমুখী করা। ২০০৩ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্ধারিত বিনিময় হার ব্যবস্থা ছিল; জুন ২০০৩ থেকে বাংলাদেশ ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় যায়।
তিন দফায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এম সাইফুর রহমান। প্রথমবার আশির দশকের শুরুতে, দ্বিতীয়বার ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে এবং তৃতীয়বার ২০০১-০৬ মেয়াদে। জাতীয় সংসদে ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। তবে দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এম সাইফুর রহমান শুধু দীর্ঘদিনের একজন অর্থমন্ত্রী নন—অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।
নিজ জন্মস্থান মৌলভীবাজারের বাহারমর্দন থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়িয়ালা এলাকায় ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এম সাইফুর রহমান। তখন তার বয়স ৭৬ বছর।
*স্মৃতিচারণগুলো ২০২৪ সালে এম সাইফুর রহমানের সংবর্ধনা (মরণোত্তর) উপলক্ষে বণিক বার্তার বিশেষ প্রকাশনা ‘কৃতী মুখ’ থেকে নেয়া









