পিতা এবং রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদ সাইফুর রহমান একরকম নন। পারিবারিকভাবে তিনি খুব একটা সামাজিক ছিলেন না। তাই তার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার স্মৃতি আমাদের বেশ কম। ২০০৮ সালে সম্ভবত আমার ছোট ভাইকে আমি বলেছিলাম, ‘বাবাকে নিয়ে চলো আমরা ঘুরতে যাই, সম্ভবত এটাই বাবাকে নিয়ে শেষ ঘুরতে যাওয়া হবে।’

আমার এ কথাই সত্যি হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য তিনি কুয়ালালামপুরে ছিলেন তখন, আমরা দুই ভাই ও আমাদের পরিবার মিলে দুইদিনের জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। এটাই বাবার সঙ্গে আমার একমাত্র ছুটি কাটানোর স্মৃতি। ছোটবেলায় আমাদের নিয়ে বাবার ছুটি কাটানোর বিষয়টা ছিল একেবারেই সিলেট ও চট্টগ্রামনির্ভর। আমরা মায়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় গিয়েছি, কিন্তু বাবার সঙ্গে যাওয়া হয়নি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন বাবা মনে করতেন আমরা কলেজে পড়ি। তার ঠিক জানা ছিল না, আমরা কে কোথায় পড়ছি।

অনেকেই মনে করতেন, তিনি একগুঁয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি আসলে সবার কথা শুনতেন। তার অনেক সমালোচক তার প্রিয়ভাজন ছিলেন। তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন। যেটা মনে আসত সেটাই বলতেন।

ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতি করতেন না, কিন্তু একটা সংগঠনের সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নিজের অংশগ্রহণকে তিনি কোনোদিন অতিরঞ্জিত করেননি। তিনি মনে করতেন, এটা সব ছাত্রের দায়িত্ব ছিল।

আমাদের পেশাগত জীবনে তিনি কখনই কোনো মত দেননি। তিনি কখনই আমাদের বলেননি—কী করতে হবে। বাবা বইয়ের পড়াশোনার বাইরেও আমাদের ভাবতে বলতেন। কারণ এতে অনেক কিছু শেখার আছে। এছাড়া কখনই তিনি আমাদের বলেননি যে এটা করো, ওটা করো। তিনি বলতেন, ‘যেটা তোমরা ভালো মনে করো, সেটাই করো।’

বাবা খুব নজরুলভক্ত ছিলেন। তিনি বলতেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবি নন, উনি যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষকে অনুপ্রাণিত করবেন।

কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি মহাকবি হিসেবে বিবেচনা করতেন। আমরা আগে-পরে নজরুলকে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এটা নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল। তিনি বলতেন, গুণীজনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সমাজের উন্নতি হয় না।

*স্মৃতিচারণগুলো ২০২৪ সালে এম সাইফুর রহমানের সংবর্ধনা (মরণোত্তর) উপলক্ষে বণিক বার্তার বিশেষ প্রকাশনা ‘কৃতী মুখ’ থেকে নেয়া