সাইফুর রহমান সাহেব ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তি। তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। প্রথমত, দেশের বাণিজ্য উদারীকরণে তিনি ভূমিকা রেখেছেন, যেটাকে আমরা সংস্কার বলছি সেটার কিন্তু তিনি উদ্যোক্তা।

আমার মনে আছে, তিনি ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি বলে ট্যারিফ কমিশনে একটা বিষয় গঠন করেছিলেন। সেখানে অনেক বিজ্ঞজন বাংলাদেশের বাণিজ্য উদারীকরণ, এক্সপোর্ট, ইমপোর্ট, বিভিন্ন রেগুলেশনস নিয়ে কাজ করেন। এগুলো সহজ করার ব্যাপারে যে সংস্কারগুলো তিনি করেছেন, এখনো সেগুলো বিদ্যমান আছে, যা অর্থনীতিতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো অনেক দিন থেকেই আমাদের এদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এবং অন্যান্য দেশে বাণিজ্য উদারীকরণের ব্যাপারে বিভিন্ন দিক থেকে অনেক রকম অনুরোধ এসেছিল। তার হাত ধরেই সাইফুর রহমান সাহেব বাংলাদেশে প্রথম সংস্কার করেন। ভারতে এটা শুরু করেন মনমোহন সিং। তবে আমার মনে হয়, সাইফুর রহমান তার কার্যক্রম মনমোহন সিংয়ের আগে শুরু করেছিলেন। সেদিক থেকে আমি বলব, বাংলাদেশের এ সংস্কার কার্যক্রমটা উদাহরণস্বরূপ হয়তো অন্য দেশ নিয়েছে। সাইফুর রহমান অর্থনীতি, রাজস্ব নীতি, ভ্যাট, ট্যাক্স সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতেন।

নতুন একটা ট্যাক্স ইমপোজ করতে হলে, কাস্টমস ডিউটি ইনিশিয়েট করতে হলে তিনি কিন্তু মতামত দিতেন। আমি তার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি, এমনকি রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে আমাদের আলাপ হতো। তার জ্ঞানের গভীরতা ছিল। অল্পস্বল্প জ্ঞান নিয়ে তিনি কথা বলতেন না। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেসব অর্থমন্ত্রী এসেছেন, তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের নাম ও অবদান সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

অনেক সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ে কাজ করলে বাহ্যিকভাবে অনেক চাপ থাকে—রাজনৈতিক চাপ থাকে, দলের চাপ থাকে, কিন্তু আমরা কোনোদিন সাইফুর রহমানকে এ ব্যাপারে আপস করতে দেখিনি। তিনি রাজনীতির কথা বলে কোনো ব্যাংকও দেননি। সেদিক থেকে আমি বলতে পারি, সাইফুর রহমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিলেন। তিনি তার দায়িত্ব পেশাদারত্বের সঙ্গে পালন করেছেন।

*স্মৃতিচারণগুলো ২০২৪ সালে এম সাইফুর রহমানের সংবর্ধনা (মরণোত্তর) উপলক্ষে বণিক বার্তার বিশেষ প্রকাশনা ‘কৃতী মুখ’ থেকে নেয়া