স্ত্রী রত্নার হাতে বিয়ের মেহেদির রঙ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। বিয়ের মাত্র সাত মাস পেরিয়েছে। নতুন সংসারকে ঘিরে কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা। ছোট্ট সংসারটিকে একটু একটু করে সাজিয়ে তোলার কথা ছিল। নিজের ব্যবসাকে আরো বড় করার ইচ্ছাও ছিল তার। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে একদিন সমাজের মানুষের জন্য কিছু করবেন—এমন স্বপ্নও দেখতেন তরুণ আনিসুর রহমান। কিন্তু ডেঙ্গু জ্বরের কাছে হার মেনে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই থেমে গেল তার পথচলা। স্ত্রীকে রেখে, ছোট বোন ও বাবা-মায়ের বুক খালি করে, স্বপ্নগুলো অসমাপ্ত রেখেই গত ৭ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

গাজীপুর মহানগরীর বাঙ্গাল গাছ এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আনিসুর রহমানের মৃত্যুতে পরিবারটির ওপর যেন নেমে এসেছে অন্ধকার। যে ছেলেকে ঘিরে ছিল বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বেঁচে থাকার অবলম্বন, যে ছেলের আয়ে চলত সংসার, তার অনুপস্থিতিতে এখন কীভাবে দিন কাটবে—সেই প্রশ্নই তাড়া করে ফিরছে পরিবারের সদস্যদের। সাত মাসের সংসারে স্বামীকে হারিয়ে রত্নার সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আর সন্তান হারানোর শোকের সঙ্গে বৃদ্ধ বয়সে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়েছে বাবা-মায়ের জীবনে।

আনিসুরের চাচাতো ভাই কামাল হোসেনের বর্ণনায়, শুরুতে সাধারণ জ্বর ভেবে তেমন গুরুত্ব দেননি আনিসুর। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল, বাড়ছিল অসুস্থতা। একপর্যায়ে অবস্থা গুরুতর হলে তাকে দ্রুত গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে।

কামাল হোসেন বলেন, আনিসুরের রক্তচাপ অনেক কমে গেলে তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাকে উত্তরার শিনশিন হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ফেরানো যায়নি তাকে। তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান আনিসুর।

জয়দেবপুর বাজারে ‘আনিস প্রিন্ট পয়েন্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল আনিসুরের। খেলাধুলার বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জার্সিতে নাম, নম্বর ও নকশা প্রিন্ট করার কাজ করতেন তিনি। ব্যবসার পরিসর খুব বড় না হলেও নিজের চেষ্টায় কিছু একটা করার প্রত্যয় ছিল তার। চাকরি থেকে শুরু করে নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে সেই চেষ্টারই পরিচয় দিয়েছিলেন এ তরুণ।

বাবা আমজাদ হোসেন জানান, আনিসুর একসময় জয়দেবপুর বাজারের একটি স্পোর্টস আইটেমের দোকানে চাকরি করতেন। কয়েক বছর আগে নিজেই একটি দোকান দেন। এরপর ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। সাধারণ জীবনযাপন করতেন, চেষ্টা করতেন নিজের উপার্জনে পরিবারকে ভালো রাখতে।

আমজাদ হোসেনের কথায়, ছেলেটি ছিল পরিবারের ভরসা। সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে। বাবা-মা ও বোনকে নিয়ে একটি পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে যে পরিশ্রম দরকার, তা করার চেষ্টা করতেন আনিসুর। ব্যবসার আয় থেকে সংসার চালানোর পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিশ্চয়ই নানা পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সেই পরিকল্পনাগুলো আর বাস্তবায়নের সুযোগ পেলেন না।

আনিসুরের বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে। প্রায় ৬০ বছর বয়সী বাবা আগে ব্যবসা করলেও এখন আর সেভাবে কিছু করেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে ছিলেন আনিসুর। তাকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি এখন সংসার চালানোর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাবা-মা।

অন্যদিকে বিয়ের মাত্র সাত মাসের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন রত্না। একসঙ্গে সংসার সাজানো ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নগুলো অপূর্ণই রয়ে গেল। আনিসুরের বোনও হারিয়েছেন পরিবারের নির্ভরতার মানুষটিকে। স্বজন হারানো পরিবারটির সামনে এখন শোকের দীর্ঘ পথ, সঙ্গে জীবনের কঠিন হিসাব। আনিসুরের গল্প তাই শুধু ডেঙ্গুতে একজন তরুণের মৃত্যুর গল্প নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, নিরাপত্তাহীনতা আর আকস্মিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ার বেদনাময় আখ্যান।

এদিকে কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী ও জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা এবং মশক নিধনে ঘাটতিকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও অলিগলিতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। অনেক জায়গায় জমে থাকা পানি সময়মতো অপসারণ করা হচ্ছে না। পাশাপাশি নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না থাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর অনেক চাপ দেখা যায়। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে করিডোর বা মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কারো শরীরে জ্বর, কেউ দুর্বল হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ ডেঙ্গুর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতেও অনেক রোগীকে মশারি ছাড়াই রাত কাটাতে দেখা গেছে। অন্যান্য হাসপাতালেও রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।