একসময় বান্দরবান জেলায় ঘন চিরসবুজ অরণ্যের বৈচিত্র্যময় বুনো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর ছিল। সে সময় দেশের একমাত্র কুমারী বনখ্যাত বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনসহ নদীর শাখা-প্রশাখা, খাল-ঝিরিগুলোতেও বছরজুড়ে প্রবহমান ছিল প্রাকৃতিক পানির স্রোতধারা। এসব বন ও পানির উৎস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। তবে জোত পারমিটের আড়ালে কাঠ সংগ্রহ ও পাচারের কারণে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে এ বনাঞ্চল। এ বনের ভেতরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও অবাধে চলাফেরা করছে স্থানীয়রা। কাঠ পরিবহনে নৌপথ, পাহাড় কেটে তৈরি সড়ক ও সরকারি সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হলেও পাচার বন্ধ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, একসময় চাঁপা, চাপালিশ, গর্জন, বৈলাম, তেলসুর, শিউরি, সিভিট, সেগুন, গামার, কড়ইসহ নানা প্রজাতির কাঠের জোত পারমিট (সৃজিত ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগানের গাছ কাটার অনুমতিপত্র) দেয়া হতো। এর ফলে মূল্যবান কাঠের বড় মাতৃবৃক্ষগুলো নির্বিচারে কাটা পড়ত। কালক্রমে গাছগুলোর পরিমাণ শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে, যা দুর্লভ বৃক্ষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বর্তমানে গাছগুলো কর্তন নিষিদ্ধের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ বাস্তবতায় বর্তমানে সেগুন, গামার ও কড়াই গাছ ছাড়া অন্য গাছগুলোর জোত পারমিট দেয়া হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, গত চার দশকে সংরক্ষিত, প্রাকৃতিক ও বন বিভাগের সৃজিত-রক্ষিত বন ধ্বংস হতে হতে শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী বনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি ধ্বংস হয়েছে মাতামুহুরী। বৃক্ষশূন্যতার কারণে জেলাজুড়ে বেড়েছে ন্যাড়া পাহাড়ের সংখ্যা। বর্ষাকালে এসব পাহাড়ের মাটি বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদী-খালে এসে জমে নাব্যতা কমাচ্ছে। ফলে স্বকীয়তা হারানো প্রাকৃতিক পানির উৎসের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা মূলত বাগান ছাড়াই ব্যক্তি মালিকানাধীন তৃতীয় শ্রেণীর ভূমির কাগজ ব্যবহার করে শত শত গাছের হাজার হাজার ঘনফুট কাঠের জোত পারমিট অনুমোদনকে এর জন্য দায়ী করছেন। কাগজে বাগান দেখানো হলেও বাস্তবে তা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গত ১৫-২০ বছরে গাছ নিধন হতে হতে কুরুকপাতা ইউনিয়নের গহিনে ইয়াংরিংপাড়া থেকে পাহাড়ের শিরা বরাবর আনুমানিক ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনের বাংলাদেশ অংশ এখন মাতৃবৃক্ষশূন্য।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১০০ ইঞ্চি বেড়ের গর্জন, রঙ গাছসহ বড় গাছ কেটে টুকরা করে রাতের অন্ধকারে পরিবহন করা হয়। ক্রাইক্ষ্যং মৌজার হেডম্যান ও তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্যচন্দ্র ত্রিপুরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি বজংপাড়া ও রেমনপাড়ার শতাব্দী প্রাচীন পাড়াবন, যা সাকাহাফং পর্বতমালার অংশ।’
বিধি অনুযায়ী, জোত পারমিটের জন্য আবেদনের শুরুতে সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেন। পরবর্তী সময়ে হেডম্যানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত বাগান ও ভূমি-সংক্রান্ত সত্যতা যাচাই করে অনুমোদন দেয় জেলা প্রশাসন। তাই এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস জানান, জোত পারমিটের নেপথ্যে অনিয়ম-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্টভাবে করা কারো কোনো অভিযোগ পাননি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে সঠিক তদন্ত করা সম্ভব হয় না। তারপরও অনিয়ম-সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব। এসব অনিয়মে কোনো ফরেস্ট রেঞ্জার জড়িত থাকা-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা জানালে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’














