বাসা থেকে বেরোনোর আগ মুহূর্তে মাস্কটা মুখে বাঁধতে গেছি, বউ কোত্থেকে চিলের মতো উড়ে এসে ছোঁ মেরে তা ছিনিয়ে নিল। দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বিশ্রী ভঙ্গিতে খিস্তি করতে লাগল: ‘পুরুষত্ব তো হারিয়ে বসেছ, এখন শুধু মরাটা বাকি...!’
বকতে বকতে মাস্কটা আবর্জনার ঝুড়ি লক্ষ্য করে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গট গট করে হেঁটে গেল শোয়ার ঘরের দিকে। একটু পরেই বেরিয়ে এল নতুন একটা মাস্ক হাতে নিয়ে। ঠোঁট শক্ত করে লেফট রাইট করতে করতে আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল: ‘নাও।’
আমি ডান হাত বাড়িয়ে মাস্কটা নিলাম। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মুখে বাঁধলাম না। ওর মুখের দিকে আড়চোখে চেয়ে বললাম, ‘মেজাজটা মনে হচ্ছে আজ একটু বেশিই খারাপ?’
আমার কণ্ঠ তীর্যক শোনাল। বউ সঙ্গে সঙ্গে ধাঁ করে জ্বলে উঠল। ফুলে উঠল তার নাকের পাটা, সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, ‘আজ যদি টেস্ট করতে না দিয়ে বাসায় ফিরিস...’
দিনের শুরুতেই তুই-তোকারি! আর ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি! গত রাতে নিশ্চয়ই আবার বাচ্চার স্বপ্ন দেখেছে। এ রকম চলছে অনেক দিন ধরে। এই ভদ্রমহিলা বাচ্চা বাচ্চা করে আমার প্রাণটা একদম ঝালাপালা করে দিচ্ছে!
কিন্তু কোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কি এ রকম অসম্ভব আবদার করতে পারে? যারা এই ঢাকা মেগাসিটিতে জন্মেছে এবং জন্মের পর থেকে এখানেই যাদের পঁচিশ-তিরিশ বছর কেটে গেছে, তারা কি বিয়ের পরে দুই বছর না পেরোতেই সন্তানের মুখ দেখার প্রত্যাশা করে? তারা কি জানে না যে এই মেগাসিটিতে ৩৫ লাখ দম্পতি আট-দশ বছর ধরে দিন-রাত সন্তান উৎপাদনের জন্য গলদ্ঘর্ম কসরত করেও কোনো ফল পাচ্ছে না?
যারা বেকুব, শুধু তারাই বাস্তব সত্য মেনে নিতে না পেরে ঐশ্বরিক আশীর্বাদে গর্ভসঞ্চারের স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দিন-রাত চেষ্টা করেও যখন দেখতে পায় সেই স্বপ্ন কোনোভাবেই সত্য হচ্ছে না, তখন তাদের কাণ্ডজ্ঞান পুরোপুরি লোপ পেয়ে যায়।
আমার বউয়ের অবস্থা সম্ভবত সে রকমই হতে চলেছে।
কিন্তু কী করা যাবে? ঢাকার বাতাস আমাদের স্পার্ম মোটিলিটি শূন্য করে দিলে আমরা হতভাগা পুরুষের দঙ্গল কী করতে পারি? যেসব পুরুষ বহু বছর ধরে ঢাকা মেগাসিটিতেই বসবাস করছে, তাদের স্পার্ম মোটিলিটি বাড়ানোর কোনো রাস্তা নেই। ঢাকার বাইরে কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে নির্মল আলো-বাতাসে বছরখানেক বসবাস করলে কারো কারো উপকার হয় বটে, কিন্তু তা করতে গেলে তো অন্নের সংস্থান হয় না। ঢাকার বাইরে শিক্ষিত লোকজনের কোনো চাকরি নেই।
কিন্তু মেয়েদের বাচ্চা না হওয়ার দোষ তো শুধু পুরুষদের নয়; ওদের নিজেদেরও সমস্যার কী শেষ আছে? অধিকাংশ মেয়েরই ঋতুস্রাব নিয়মিত হয় না। জরায়ু-গর্ভাশয়ে সিস্ট আর টিউমারের ছড়াছড়ি। ক্যান্সারের প্রকোপ মেয়েদের মধ্যেই বেশি। ঢাকার মেয়েদের প্রজননস্বাস্থ্য পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। ওরা মরুভূমির মতো ঊষর হয়ে যাচ্ছে। ৮০ পার্সেন্ট পূর্ণবয়স্ক মেয়েই এরই মধ্যে বন্ধ্যা হয়ে গেছে।
কিন্তু এসব ওরা মানবে না, শুধু আমাদের পুরুষত্ব নিয়ে টানাহেঁচড়া করবে। দিন-রাত নপুংসক বলে খোঁটা দেবে।
‘কী হলো? ওটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলে যে? অফিসে যাবে না নাকি?’
‘যাই’ বলে মাস্ক মুখে না বেঁধেই বাইরের দরজার দিকে পা বাড়ালাম।
‘আরে! মাস্কটা মুখে বাঁধলে না কেন?’
আমি থেমে ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে চেয়ে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম, ‘কী লাভ? বিষের মধ্যে আপাদমস্তক ডুবে থেকে শুধু মুখে মাস্ক বেঁধে চলাফেরা করলেই কি বীর্যবান বীরপুঙ্গব হওয়া যায়?’
‘বাজে বকতে হবে না। মাস্কটা মুখে বেঁধে নাও।’ গম্ভীর কণ্ঠে এবার হুকুম।
কিন্তু আমি ওর হুকুম পালন করলাম না। চেয়ে রইলাম ওর মুখের দিকে। কেন যে চেয়ে রইলাম গড মালুম।
সম্ভবত আমার মুখটা করুণ দেখাচ্ছিল। এবার ওর ভাবান্তর ঘটল; চোখ-মুখের বিষ-বিষ ভাবটা মিলিয়ে গিয়ে ফুটে উঠল কোমল করুণা। কণ্ঠেও ঝরতে লাগল করুণ মিনতি: ‘প্লিজ, আজ আর অবহেলা করো না। অফিস থেকে ফেরার পথে অবশ্যই স্পার্ম টেস্ট করতে দিয়ে আসবে। গত মাসেও টেস্ট করাওনি।’
আমি মনে মনে বলি, তোমার তো শুধু একটাই চিন্তা। তোমার কাছে আমি বাচ্চা পয়দা করার একটা যন্ত্র ছাড়া তো কিছুই নই। কিন্তু ঢাকার বিষাক্ত বাতাস তোমার সেই যন্ত্রটার তেজ মেরে দিয়েছে। ওটা দিয়ে তোমার আর কোনো কাজ হবে না, মাসে মাসে যতই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাও..।
‘এই! কী বলছ বিড়বিড় করে?’ চোখ দুটি ছোট ছোট করে আমার মুখের দিকে চেয়ে সে বলল।
‘কই? কিছু বলছি না তো!’
‘কিছু বলছ না তো অমন করে ঠোঁট নড়ছে কেন?’
‘ও, বলছিলাম যে, আজ অফিস থেকে ফেরার পথে অবশ্যই স্পার্ম টেস্ট করতে দিয়ে আসব।’
‘আবার মিথ্যা কথা?’
‘মিথ্যা না, ডারলিং, সত্যিই আজ...’
‘অভিনয় শুরু করেছিস? দ্যাখ, এবার কিন্তু সত্যি সত্যিই তোকে ছেড়ে চলে যাব আমি!’
আমার ভেতরটা একদম গুলিয়ে উঠল। কথায় কথায় ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি আর কত সহ্য করা যায়? মনে হলো, এবার আমিই ওকে ছেড়ে চলে যাই। ওর সঙ্গে এ রকম তিক্ত জীবন বয়ে নিয়ে চলা আকাট বোকামি; এইভাবে জীবনযাপন করার কোনো মানে হয় না।
তবে সেজন্য আমি কখনো ওর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে পারি না। কখনো এমন কথা বলতে পারি না, যাতে ওর মনে আঘাত লাগে। ও কখনো ব্যথা পেলে আমার নিজেকেই আহত মনে হয়।
হাসি হাসি ভাব নিয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘তুমি যে কথায় কথায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দাও, একবারও কি ভেবে দেখেছ, তুমি চলে গেলে আমি বাঁচব কী করে?’
‘ইহ্! ঢঙের কথা!’
আমি মাস্কটা মুখে বাঁধার আগে ঠোঁট সরু করে ওর মুখের দিকে এগিয়ে গেলাম। ওর মুখটাও চুম্বকের মতো ছুটে এল আমার ঠোঁটের দিকে। আমি অবাক হলাম না; আমাদের ব্যাপারটাই এ রকম।
তার পর আমাদের চুমুর শব্দ পাশের বাসার লোকেরাও শুনতে পেল। তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া হলো কিনা আমি জানি না, কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়া হলো মারাত্মক। ওর অবস্থা হলো আমার দ্বিগুণ— নাকের পাটা ফুলে উঠল, ছিদ্র দুটো ছোট-বড় হতে লাগল। আমার মুখের ওপর ফোঁস ফোঁস শব্দে গরম নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ও আমাকে তীব্র আলিঙ্গনে চেপে ধরে লিভিং রুমের মেঝেতেই ধরাশায়ী করে ফেলল। আমি আমার বাম হাতের কবজি ওর চোখের সামনে তুলে ধরে হাতঘড়িতে সময় দেখালাম, হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, ‘চাকরি চলে যাবে! একসঙ্গে দুজনই বেকার হয়ে পড়লে না খেয়ে মরতে হবে।’
কিন্তু আমার এসব কথায় ও ভ্রুক্ষেপই করল না। আমাকে মেঝেতে চিৎ করে ফেলে পট পট শব্দে আমার জামার বোতামগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে লাগল।
প্রায় কুড়ি মিনিট পরে মেঝেতে লুটানো বোতাম-ছেঁড়া শার্টখানা পায়ে দলে শোয়ার ঘরে গিয়ে অন্য একটা শার্ট পরে বেরিয়ে এলাম। তারপর মাস্কটা মুখে বেঁধে যখন অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন পেছন থেকে বউয়ের চিঁ চিঁ চিৎকার ভেসে এল: ‘এই, ইনহেলারটা সঙ্গে নিয়েছ তো?’
‘নিয়েছি ডারলিং, নিয়েছি! থ্যাংকিউ!’
‘আচ্ছা এসো। দেখে-শুনে যেও!’
২
বড় রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। বেলা ১১টায় খালি থ্রি হুইলার পাওয়া পুরোপুরি ভাগ্যের ব্যাপার। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বোঝা গেল, আজ আমার ভাগ্য খারাপ। কোনো খালি যানবাহন নেই। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে ব্যথা ধরে গেল। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা দেখলাম: ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
মেগাসিটি ঢাকা এখন একটা তাতানো ফ্রাইপ্যান। রোদ তো নয়, চারদিকে যেন আগুনের ঢেউ বইছে। পট পট শব্দ তুলে সব ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছে।
এমন রোদে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। হাঁটতে শুরু করলাম গ্রিন রোড ও পান্থপথের ক্রসিংয়ের দিকে। ওইখানে গিয়ে দাঁড়ালে একটা খালি থ্রি হুইলার পাওয়া যেতে পারে। থ্রি হুইলার না পেলে অন্তত একটা ট্যাক্সির আশা করা যায়। যদিও ট্যাক্সিওয়ালারা এত স্বল্প দূরত্বে যেতে চান না, তবু কিছু টাকা বেশি দিয়ে কাউকে রাজি করানো একেবারে অসম্ভব নয়। আমার অবশ্য ট্যাক্সিতে চড়ে অফিসে যাওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই, বাড়তি ভাড়া দিয়ে ট্যাক্সি চড়া তো আরো বড় বিলাসিতা।
কিন্তু রোদে পুড়ে প্রাণশক্তি ক্ষয় করার চেয়ে একদিন না হয় কিছু টাকা বেশি দিয়ে ট্যাক্সিই নেয়া যাবে। হাঁটতে থাকলাম।
কয়েক কদম হাঁটার পর বুক চেপে দম বন্ধ হয়ে এল। চোখ জ্বালা করছে, যেন কেউ আমার দুই চোখে শুকনা মরিচের গুঁড়ো মেখে দিয়েছে।
ইনহেলারের জন্য পকেটে হাত ঢোকাতেই পেছন থেকে এক লোক হুমড়ি খেয়ে পড়ল; আমার পিঠের উপরে পড়ে সে আমাকেই ধমকাতে শুরু করল, ‘ওই মিয়া, রাস্তার মধ্যে হুট করে খাড়ায়া গেলেন যে? রাস্তা কি আপনার বাসার লিভিং স্পেস?’
লোকটা মারমুখী; জামার হাতা গোটাতে শুরু করল।
ঘাড়ে-গর্দানে দশাসই লোক। আমি দেখলাম, তার এমন অসভ্যতার প্রতিবাদ করতে গেলে মার খেতে হবে। তাই এক হাতে বুক চেপে ধরে, অন্য হাতে ইনহেলারটা তাকে দেখিয়ে নিজের আকস্মিক অসুস্থতার খবর জানান দিতে চাইলাম।
লোকটা জামার হাতা গোটানো থামাল। ভাবলাম, আমার দুর্দশা দেখে সহানুভূতি জানাতে কিছু বলবে। কিন্তু না, সে এমন দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে তাকাল, যেন বলছে, যাও, অসুস্থ বলে মাফ করে দিলাম।
তারপর পাশ কেটে হন হন করে চলে গেল।
আমি ইনহেলার মুখে পুরে একটা পাফ নিয়ে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আবার একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল পিঠের ওপর। হোপ শব্দে আমার দম ছুটে বেরিয়ে গেল। এবার আমিই ঘুষি বাগিয়ে লোকটাকে মারতে গেলাম। লোকটা ভয় পেয়ে চোখ বড় বড় করে একবার আমার মুখের দিকে তাকাল, তারপর ঝট করে ঘুরে পড়িমরি করে ছুটে পালাল।
না, আর হাঁটা নয়। পথের ধাক্কাধাক্কিতেই যদি সব প্রাণশক্তি ফুরিয়ে যায়, তাহলে অফিসে গিয়ে কাজ করব কীভাবে? এমনিতেই মেজাজটা বিগড়ে গেছে।
হঠাৎ একটা সবুজ গাড়ি এসে ঘ্যাচ শব্দ করে দাঁড়িয়ে পড়ল আমার ঠিক পাশেই। চমকে উঠে দুই কদম পিছিয়ে এসে তাকালাম গাড়িটার দিকে, গালি দেয়ার জন্য মনে মনে তৈরি হচ্ছি, তখন গাড়ির একটা জানালার ঘন অনচ্ছ কাচ সরে গেল। বেরিয়ে এল এক অপরূপ সুন্দর মুখ।
‘হাই বব!’
সানগ্লাস পরা মেয়েটি সুন্দর দীর্ঘ গ্রীবা বাড়িয়ে কাচভাঙা শব্দে কথা বলে উঠতেই ওকে চিনে ফেললাম।
এটা নাবিলা, ইউনিভার্সিটিতে আমার ক্লাসমেট ছিল। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ছিল না, ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে কেউ কারোর খোঁজ রাখিনি। আসলে, অধিকাংশ ক্লাসমেটের বেলায়ই এ কথা সত্য— কে কার খোঁজ রেখেছে? অনেকের কথা তো ভুলেই গেছি, আমাকেও ভুলে গেছে অনেকে। আজ দেখা হলে অনেক ক্লাসমেটকেই হয়তো চিনতে পারব না, অনেকেই চিনতে পারবে না আমাকে।
নাবিলার বেলায়ও তা-ই হওয়ার কথা। কিন্তু আমি ওকে চিনতে পারার আগেই ও আমাকে চিনেছে, এটা বড়ই অবাক করা ব্যাপার। আমরা দুজন ঘটনাক্রমে ক্লাসমেট ছিলাম— সম্পর্ক বলতে আমাদের মধ্যে মাত্র এটুকুই। তবু এতগুলো বছর পর ১০ হাত দূর দিয়ে ছুটন্ত গাড়ির জানালা থেকে দেখতে পেয়েই ও আমাকে চিনে ফেলেছে— এই বিস্ময়ে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। কী বলব ভেবে পেলাম না; আমার গলা থেকে পুলকিত বিস্ময়ের সঙ্গে শুধু ওর নামটাই বেরিয়ে এল।
‘আরে নাবিলা!’
‘যাক,’ হেসে বলল সে, ‘শেষমেশ তাহলে চিনতে পারলে!’
‘আরে কী বলো? চিনতে না পারার কী আছে?’
‘কিন্তু পারছিলে না তো। কেমন বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে ছিলে!’ বলতে বলতে হেসে ফেলল নাবিলা।
আমিও হাসতে হাসতে বললাম, ‘শুধু বোকা না, চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। আমার চেনাজানা মেয়েদের মধ্যে এ রকম সুন্দরী কেউ নেই তো!’
নাবিলা খিল খিল শব্দে হেসে উঠে বলল, ‘কিন্তু তুমি এই অসময়ে রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’
‘ট্রান্সপোর্ট খুঁজছি,’ আমি হাসিমুখে বললাম, ‘কিন্তু কিচ্ছু পাচ্ছি না।’
‘যাবে কোথায়?’ নাবিলা জানতে চাইল।
আমার মনে আশা জেগে উঠল যে ও হয়তো আমাকে লিফট দেবে।
‘অফিসে। এই তো কাছেই, বাংলা মোটরে আমার অফিস।’
নাবিলা ওর বাম পাশের দরজাটা খুলে ধরে বলল, ‘উঠে এসো।’
অতিশয় কৃতজ্ঞ সুরে ‘থ্যাংকিউ ভেরি মাচ’ বলতে বলতে আমি ওর গাড়িতে উঠে পড়লাম। সিটে বসে ডানে ঘাড় ঘুরিয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি ফুটিয়ে আবার বললাম, ‘কোটি কোটি ধন্যবাদ!’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’ নাবিলা হেসে আমার ডান হাঁটুতে ওর বাম হাতে মৃদু থাবড়ে দিল। তার পর গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘অফিসটা কিসের?’
‘এই ছোটখাটো একটা পোর্টাল।’
‘কী ধরনের?’
‘ভিউজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস পোর্টাল।’
‘রিয়েলি?’ সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল নাবিলা। ওর মুখে সুন্দর প্রীতিভরা হাসিটা লেগেই রইল।
ওর গাড়ি চালানো পাকা চালকের মতোই সাবলীল। এত যানবাহনের ভিড়, কেউ কোনো লেইন মানছে না, প্রত্যেকে প্রত্যেককে টেক্কা দিয়ে আগে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে, ফলে জট পাকিয়ে যাচ্ছে, ঘন ঘন ব্রেক চাপতে হচ্ছে। নাবিলা নির্বিকার মুখে নিপুণভাবে সবকিছু সামলে এগিয়ে চলেছে। আমার মনে হলো, ও ড্রাইভার রাখেনি, গাড়িটা সবসময় নিজেই চালায়।
‘সো, ইউ আর ডুয়িং জার্নালিজম?’ একটু পর বলল নাবিলা। ওর দৃষ্টি আগের মতোই সামনের দিকে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ওর ফর্সা দীর্ঘ আঙুলগুলো কচি বেতের মতো সতেজ। কিন্তু আমি চেয়ে রইলাম ওর সুন্দর গ্রীবার দিকে। ওর প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ‘জার্নালিজম, ইয়েস, সর্ট অফ। কিন্তু আমরা তো রিপোর্টার পুষতে পারি না। দ্যাট্স ভেরি এক্সপেনসিভ। আমরা আসলে যা করি, ইউ মে কল ইট ভিউজ বিজনেস।’
‘ভিউজ বিজনেস? অ্যান্ড ইজ ইট প্রফিটেবল?’
‘নট দ্যাট মাচ।’
গাড়ির ভেতরটা বেহেশতের মতো ঠাণ্ডা। নাবিলা আমাকে মাস্ক খুলতে বলল। আমি খুলে ফেললাম। সে আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকাল, পরখ করে দেখতে থাকল।
আমি হেসে বললাম, ‘কী দেখছ?’
নাবিলা যতটা ভালোভাবে আমার মুখমণ্ডলটা পরখ করে দেখতে চাইছিল, ততটা পারছিল না, কারণ গাড়ি চালাতে চালাতে সেটা করা সম্ভব নয়। ওকে বারবার আমার মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে তাকাতে হচ্ছিল সামনে রাস্তার দিকে, অথবা গাড়ির ভেতরের ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে।
সামনের দিকে চেয়ে ও বলল, ‘অনেক দিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো।’
আসলে কতদিন, তা আমি মনে মনে হিসাব করতে লাগলাম।
নাবিলা বলল, ‘চুলে রঙ করেছ?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘হুঁ।’
‘কেন? সব সাদা হয়ে গেছে?’
‘আরেন্না! মাত্র পাকতে শুরু করেছে।’
‘তাহলে রঙ না দিয়ে পাকাটা স্টপ করার চেষ্টা করো না কেন?’
‘করি তো। কিন্তু এই ঢাকা মেগাসিটিতে...।’
‘মুখে দেখছি ভাঁজটাজ পড়েনি। রেগুলার ওয়ার্ক আউট করো নিশ্চয়ই?’
‘তা করি।’
‘কী করো? জগিং?’
‘অ্ অ্, ইয়োগা।’
‘বিয়ে করেছ?’
‘হুঁ।’
‘বাচ্চা-কাচ্চা হয়েছে?’
‘একটা।’
কিছু না ভেবেই ঝট করে বলে দিলাম। কিন্তু বলার সঙ্গে সঙ্গে বুকটা কাঁপতে শুরু করল। মনে হলো, কেন এই মিথ্যা কথাটা বলতে গেলাম? আবার পরের মুহূর্তেই মনে হলো, বলেই যখন ফেলেছি, কথাটা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না। আর, এইটুকু মিথ্যায় কী এমন এসে যায়? কার কী ক্ষতি হয়? নাবিলার সঙ্গে তো আমার শিগগিরই আর দেখা হচ্ছে না। যদি অনেক দিন পরে আবার কখনো হয়, ততদিনে আমি নিশ্চয়ই বাবা হয়ে যাব।
‘ছেলে না মেয়ে?’ নাবিলা জিজ্ঞাসা করল।
আমি চমকে উঠে আবার ঝট করে বলে ফেললাম, ‘ছেলে।’
আমি যে এ রকম একটা অটোমেটিক লায়ার, তা আমার নিজেরই জানা ছিল না। বুঝতে পারলাম, এর পর থেকে নাবিলার প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরে আমার মুখ থেকে ঠাস ঠাস করে বেরিয়ে আসবে একটার পর একটা মিথ্যা।
কিন্তু সেজন্য আমার ভেতরে বিবেকের খচখচানি শুরু হলো না, বরং মজা পেতে শুরু করলাম। নিজেকে নিয়ে কৌতূহল জেগে উঠল: এইভাবে অবলীলায় একটার পর একটা মিথ্যা বলা আমার পক্ষে আরো কতক্ষণ সম্ভব হতে পারে?
‘হাউ ওল্ড ইজ হি নাউ?’ নাবিলা আমার ছেলের বয়স জানতে চাইল, যে ছেলের আসলে জন্মই হয়নি।
তবু আমি অবলীলায় বলে দিলাম ‘ফোর।’
এই মিথ্যাটা আমার নিজের জন্য একটা ফাঁদ রচনা করল বলে আমার মনে হলো। কারণ, নাবিলা যদি এর পরে জানতে চায় আমি কত দিন আগে বিয়ে করেছি, তাহলে আমি ঝট করে সত্য কথাটা বলে ফেলতে পারি। কারণ, আমি বিয়ে করার পর দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু আমার বউয়ের গর্ভসঞ্চার ঘটেনি- এই নিদারুণ সত্য আমার জন্য একটা অবসেশনে পরিণত হয়েছে। এই অবসেশনের কথা খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার মুখে চলে আসতে পারে।
সুতরাং আমাকে খুব সতর্ক হতে হবে। বিয়ের বয়স যদি দুই বছর হয়, তাহলে ছেলের বয়স চার বছর হতে পারে না। এই সত্য আমাকে মনে রাখতে হবে। নাবিলার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমাকে হিসাব করে দেখতে হবে কত বছর আগে বিয়ে করেছি বললে ও আমার মিথ্যাটা ধরে ফেলতে পারবে না।
ঠিক আছে। আমি বলব বিয়ে করেছি ছয় বছর আগে। তার মানে দাঁড়াবে, বিয়ের দুই বছর পর আমার ছেলের জন্ম হয়েছে। দুই বছর যথেষ্ট সময়, যদি কেউ খাঁটি বীর্যবান পুুরুষ হয়।
কিন্তু নাবিলা জানতে চাইল না আমি কত বছর আগে বিয়ে করেছি কিংবা বিয়ের কত বছর পরে বাবা হয়েছি। সে বলল, ‘তোমার বাবা হওয়ার পর তো অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাচ্চা মাত্র একটা কেন?’
আমি মনে মনে বলি, একটাই কে পায়!
‘আর হয়নি?’ আবার বলল সে। অর্থাৎ একটা বাচ্চার জন্ম দেয়ার পরই আমি আমার প্রজননক্ষমতা খুইয়ে বসে আছি কিনা- এই হলো নাবিলার জিজ্ঞাসা।
আমি ওর সন্দেহটা নাকচ করে দিয়ে বললাম, ‘আর নিইনি।’
‘ও মা, কেন?’
‘একটাকেই কীভাবে সুস্থ-সবল রাখা যায়, সেই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সবসময় ছটফট করি। আজ সর্দিজ্বর, গলাব্যথা, কাল কানব্যথা, পরশু পেটব্যথা, এসব তো লেগেই আছে। এই মেগাসিটিতে কি বাচ্চা সুস্থ রাখা যায়, তুমিই বলো?’
নাবিলা কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর হঠাৎ আমার মুখের দিকে চেয়ে বলে, ‘কিন্তু এখন তুমি ফিট তো?’
‘নিশ্চয়ই।’
নাবিলা সামনে রাস্তার দিকে চেয়ে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে সিরিয়াস কেজো ভঙ্গিতে বলে, ‘হোয়াট অ্যাবাউট ইয়োর রিপ্রডাক্টিভ হেলথ রাইট নাউ?’
আমি ঝট করে বলি, ‘যথেষ্ট ভালো।’
নাবিলা রাস্তার দিকে চেয়েই বলল, ‘তার মানে কী? তোমার স্পার্ম মোটিলিটি কত?’
‘তা তো আমি জানি না।’
‘জানো না? কেন?’
‘আমার সেটা জেনে কী হবে?’
এবার ওর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু ও আমার দিকে তাকাল না, আগের মতোই সামনের দিকে চেয়ে নিচু স্বরে স্বগতোক্তির মতো বলল, ‘হবে।’
‘হবে’ বলার সময়ও ঠোঁটে হাসির রেখাটা লেগেই রইল। এমন দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওর চোখের সামনে সেই দৃশ্যটা ঘটে চলেছে, যেটা বোঝাতে ও হবে বলল।
‘কী হবে?’ হেসে বললাম।
ও কিছু বলল না, কল্পনায় ওর চোখের সামনে যে দৃশ্যটা ঘটে চলেছিল, সেদিকেই চেয়ে রইল কৌতুকভরা হাসি মুখে নিয়ে।
‘হোয়াট অ্যাবাউট ইয়োর ম্যান?’ আমি বললাম।
সঙ্গে সঙ্গে ওর ঠোঁটের হাসি মুছে গিয়ে কপালে ভাঁজের ঢেউ খেলে গেল।
আমার বুঝতে একমুহূর্ত দেরি হলো না যে ওর স্বামীরও ঠিক আমার মতোই দশা: ইনফারটাইল। হয়তো স্পার্ম ডিএনএ ড্যামেজ হয়েছে, হয়তো স্পার্ম মোটিলিটি এত কম যে তা দিয়ে কিছুতেই নাবিলার গর্ভসঞ্চার ঘটে না।
কিন্তু নিজের এই অনুমানকে নিশ্চিত সত্য বলে ধরে নিয়ে চুপ করে থেকে আমার তৃপ্তি হলো না। মন চাইল এ নিয়ে নাবিলাকে সামান্য পীড়ন করি। অন্যকে পীড়ন করায় যে সুখ, তা থেকে আমি নিজেকে বঞ্চিত করব কেন?
বললাম, ‘ইমপোটেন্ট? অর ইনফারটাইল?’
নাবিলা কিছু বলল না। শুধু ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার মনে হলো দীর্ঘশ্বাসটা করুণ।
ওর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার নিজের বউকে মনে পড়ে গেল। কেন মনে পড়ল, তা বলতে পারি না, কিন্তু ভীষণভাবেই মনে পড়ে গেল। মনটা গভীর হতাশা ও বিষণ্নতায় ডুবে গেল।
বাম পাশের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। মনে হতে লাগল, আমরা শুধু ফিজিক্যালিই ইমপোটেন্ট নই, আমাদের পুরো জীবনটাই একটা ইমপোটেন্ট অ্যাফেয়ার; অক্ষম, অসহায় একটা ব্যাপার। কোনো আশা নেই, কোনো স্বপ্ন নেই। আমরা যে এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, তার কোনো চিহ্নই থাকবে না। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎই আসলে নেই।
নাবিলা সম্ভবত লক্ষ করল যে আমি ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছি। ওর একটা হাত আমার ডান হাঁটু স্পর্শ করল। আমি ঘাড় ফিরিয়ে ওর দিকে তাকালাম।
‘এনিথিং রং?’ ও জিজ্ঞাসা করল।
‘না, কিছু না।’
‘লুকিও না, বব। তুমি কিছু ভাবছিলে।’
‘সত্যিই কিছু না।’
‘তুমি কি অসুখী? মিথ্যা বলবা না।’
‘নাহ! মিথ্যা বলার কী আছে?’
‘যার অন্তত একটা বাচ্চা আছে, সে কী করে অসুখী হতে পারে? ইউ মাস্ট বি হ্যাপি। বব, তোমার ওয়াইফকে ভীষণ ঈর্ষা হচ্ছে আমার।’
মনের মধ্যে গভীর দুঃখ নিয়ে আমি মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম।
‘বাই দা ওয়ে, সিন্স ইউ আর এইব্ল, ইউ ক্যান মেক আদার উইমেন হ্যাপি ঠু, ক্যান্ট ইউ?’
‘দ্যাট উড নট বি এথিক্যাল।’
‘এথিক্যাল, নট এথিক্যাল, বব, অ্যানিমেল লাইফের সঙ্গে এথিকসের কোনো সম্পর্ক আছে?’
‘মানুষ তো অ্যানিমেল না।’
‘সিলি! হু টোল্ড ইউ মানুষ অ্যানিমেল না?’
‘অ্যানিমেল, কিন্তু জঙ্গলের প্রাণী না। আমরা সমাজ গড়েছি, সভ্যতা গড়েছি, কালচার গড়ে তুলেছি...।’
‘স্টপ স্টপ!’
‘হোয়াই? আমরা বিয়ে করি না? কেন করি? হাজবেন্ড-ওয়াইফ পরস্পরকে ট্রাস্ট করি না? কেন করি?’
‘লায়ার! তুমি তোমার ওয়াইফকে ট্রাস্ট করো?’ নাবিলা হাসতে লাগল।
‘গালি দিচ্ছ কেন?’ আমিও হাসতে হাসতেই বললাম।
‘ডোন্ট ওয়ারি, আমি লায়ারদের পছন্দই করি। স্পেশালি লায়ার পুরুষদের।’ নাবিলা হেসে চলল। ওর দৃষ্টি সামনের দিকে।
ফুটপাতে দুটো লোক মারপিট করছে। একজন ভীষণ হ্যাংলা-পাতলা, তার মুখ থেকে মাস্ক টেনে খুলে ফেলেছে অন্য লোকটা, যার শরীর কমপক্ষে ১০০ কিলোগ্রাম মেদ ও মাংসের একটা পাহাড়। হ্যাংলা-পাতলা লোকটা মাস্ক খুইয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘোড়ার মতো লাফিয়ে তার প্রতিপক্ষের ঘাড়ের ওপর উঠে বসার চেষ্টা করছে, আর প্রতিপক্ষ লোকটা, মানে মেদ-মাংসের পাহাড়টা, তালপাতার সেপাইয়ের মতো ওই হ্যাংলা-পাতলা লোকটার পেটে গদাম গদাম করে কিল বসাচ্ছে। আশপাশের লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। তাদের ভিড়ে একজন ট্রাফিক পুলিশকেও দেখা যাচ্ছে।
‘‘হি’জ ডায়িং, পুওর ক্রিয়েচার!’’ বলতে বলতে নাবিলা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।
৩
সোনারগাঁও হোটেলের পাশের চৌরাস্তায় পৌঁছে নাবিলা বাম দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে ফার্মগেটের দিকে ছুটতে শুরু করল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এদিকে কোথায় চললে? আমার অফিস তো বাংলা মোটরে!’
কিন্তু নাবিলা এমন ভাব করল যেন আমার কথা শুনতেই পায়নি।
আমি এবার বললাম, ‘তুমি না বললে আমাকে আমার অফিসে নামিয়ে দেবে?’
ও আমার দিকে না তাকিয়ে, আমাকে সম্বোধন না করে, সামনে রাস্তার দিকে চেয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, ‘অফিসে পৌঁছতে একটু দেরি হলে কি খুব সমস্যা হবে?’
‘মানে? তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?’
নাবিলা উত্তর দিল না। আবারো না শোনার ভান করল।
আমি বললাম, ‘একটু দেরি মানে কী? কত দেরি হতে পারে?’
নাবিলা উত্তর না দিয়ে উল্টো আমাকেই জিজ্ঞাসা করল: ‘তোমার এক দিনের বেতন কত?’
‘কী?’ আমার কণ্ঠে বিরক্তি বেজে উঠল।
আমার বিচ্ছিরি লাগা শুরু হলো। বুঝতে পারলাম নাবিলা অনেক ধনী হয়েছে। আমার এক দিনের কিংবা এক মাসের বেতন কত, তা জিজ্ঞাসা করার মতো অভব্যতা দেখানোর সাহস সে পেয়েছে নিশ্চয়ই এ কারণে যে, এখন সে অনেক টাকার মালিক। কিন্তু তাতে আমার কী এসে যায়?
আমার কণ্ঠের বিরক্তি নাবিলা সম্ভবত টের পেল। আমি তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করার ফলে সে বড়লোকি দেখানোর রাস্তা থেকে সরে গিয়ে চুপ করে রইল।
আমি বললাম, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
আমার কথা শেষ হতে না হাতেই নাবিলা বলে উঠল, ‘ডোন্ট হারি।’
আমার মেজাজ বিগড়ে গেল, কিন্তু তা প্রকাশ না করে প্রাণপণ সংযমের সঙ্গে বললাম, ‘বাট আয়্যাম গোয়িং টু লুজ মাই জব।’
নাবিলা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘হু ইজ ইয়োর এমপ্লয়ার?’
আমার মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। ওকে বলতে ইচ্ছা করল, হু আর ইউ টু আস্ক দ্যাট? হোয়াট আর ইউ গোয়িং টু শো মি? ইয়োর ওয়েলথ? ইয়োর পাওয়ার টু ইনফ্লুয়েন্স দ্য পাওয়ারফুল? গো ফাক ইয়োরসেলফ।
কিন্তু আমি এসবের কিছুই বললাম না। কারণ, আমি বিশ্বাস করি যে জনসমাজে আমি একজন ভদ্রলোক বলে স্বীকৃত। নাবিলার ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা গায়ে মেখে নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা আমার মতো ভদ্রলোকের সাজে না।
চুপ করে থেকে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলাম। আমার নীরবতা দেখে নাবিলাও চুপ মেরে গেল।
মহাখালীর কাছে একটা বড় বিলবোর্ডে হাস্যোজ্জ্বল এক শিশুর মুখ দেখে নাবিলা বলল, ‘তুমি তাহলে এখনো হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফিট?’
‘নিশ্চয়ই।’ আমি জোর দিয়ে বলতে চাইলাম, কিন্তু গলায় জোর এল না। নিজের কানেই আমার কথাটা মিনমিনে শোনাল।
‘তাহলে তুমি আমাকে একটা বাচ্চা দাও না কেন?’ ডিমান্ডিং কণ্ঠে বলল নাবিলা, আমার দিকে না তাকিয়ে। এবং আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আরো বলল, ‘আইল পে ইউ, অফ কোর্স!’
আমার পুলক জাগল, কিন্তু গম্ভীর হয়ে পড়ার ভান করে একটুখানি রাগী স্বরে বললাম ‘তুমি কি আমাকে স্পার্ম সেলার ভেবেছ?’
এবার নাবিলা আমার মুখের দিকে তাকাতে বাধ্য হলো: ‘আরে না না! কী বলো এসব? আমি তোমাকে এমনিই...’
‘এমনিই টাকা দেবে..?’
‘হ্যাঁ, দেব! টাকা তো আমার কম নেই! আর, আর...!’
‘আর কী?’
‘আর তুমি যদি আমাকে সত্যি সত্যিই একটা বাচ্চা দাও’, বলতে বলতে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘যদি একটা বাচ্চা দাও, সেটা হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে বড়... দ্য গ্রেইটেস্ট গিফট ইন মাই লাইফ! তার বিনিময়ে কি আমি আমার এই বন্ধুটাকে.., কাম অন, বব, ইউ লাইক্ড মি, ওয়ান্স আপ্ন আ টাইম, ডিড্নট ইউ?’
ওয়ান্স আপ্ন আ টাইম, মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নাবিলা এত রূপসী ছিল যে, ওর পক্ষে এ রকম ভাবাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ও মনে করত, জগৎ-সংসারে হেন পুরুষ নেই যে ওকে পছন্দ করে না।
‘কাম অন, টেল মি, তুমি আমাকে পছন্দ করতে না?’ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার জিজ্ঞাসা করে।
আমি হেসে বলি, ‘তোমাকে পছন্দ করত না, এমন কোনো পুরুষ কি আদৌ ছিল?’
‘সেটা আমি জানি। তুমি তোমার কথা বলো।’
‘আমি কি পুরুষ জাতির বাইরে?’
‘অ্যান্ড ডিড ইউ ওয়ান্ট মি?’
‘আই ডিড্নট ডেয়ার টু।’
‘বাট হোয়াই?’
‘তুমি ছিলে দূর আকাশের তারার মতো আন-অ্যাপ্রোচেবল!’
‘ওহ্ কাম অন, বব!’
খুশিতে ঝলমল করে উঠল নাবিলার মুখ। গুনগুন করে গান বেরিয়ে এল ওর গলা থেকে। তার পর ঘাড় ফিরিয়ে সুন্দর লম্বা গ্রীবাটি হেলিয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে দুষ্টু দুষ্টু হেসে বলল, ‘দেখো, কেমন ভালো লাগে তোমার!’
আমার দুই ঊরু শির শির করে উঠল।
৪
আশুলিয়া মডেল ভিলেজে সবুজ রঙের একটা ডুপলেক্স বাড়ির সামনে পৌঁছে নাবিলা গাড়ি থামাল। সঙ্গে সঙ্গে লাল রঙের লোহার গেটের অর্ধেকটা গড়গড়িয়ে সরে গেল বাম দিকে। নাবিলা গাড়ি নিয়ে গেটের ভেতরে ঢুকে পড়ল, ইঞ্জিন বন্ধ করল এবং পাশ ফিরে আমার মুখের দিকে চেয়ে মিষ্টি হেসে বলল, ‘এসো।’
আমার প্রাণে একটা শিহরণ বয়ে গেল।
আমার বাম পাশের দরজাটা প্রায় নিঃশব্দে খুলে গেল। আমি চেয়ে দেখলাম, বেশ লম্বা ও ছিপছিপে এক তরুণী দরজার পাশে সোজা টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিকোল নাক, বড় বড় চোখ, দীর্ঘ গ্রীবা, মেদহীন চিবুক, সরু থুতনি, তার মাঝখানে সামান্য খাঁজ। অসাধারণ কালো তার ত্বকের রঙ; যেন কষ্টিপাথরের এক নিখুঁত প্রতিমা ঝলমলে রোদে চকচক করছে। পরনে কচি কলাপাতা রঙের ইউনিফর্ম, তার কলার টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টকটকে লাল।
‘কাম অন, বব!’ গাড়ির ওপাশ থেকে আমার নাম ধরে ডেকে উঠল নাবিলা।
আমি সংবিৎ ফিরে পেয়ে নড়েচড়ে উঠলাম, হঠাৎ ওই তরুণীর চোখে আমার চোখ পড়ল, তার চোখেমুখে বিদ্যুৎ-ঝলকের মতো একটা হাসির ঝিলিক দেখা দিয়ে নিমেষেই মিলিয়ে গেল। নির্বিকার পাথুরে অভিব্যক্তিটা ফিরে এল।
আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম। তরুণী সসম্ভ্রমে এক পাশে সরে গেল। আমি আর তার দিকে না তাকিয়ে নাবিলার দিকে পা বাড়ালাম; দেখতে পেলাম নাবিলা উদগ্রীব হয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি ওর কাছে পৌঁছতেই ও হাসিমুখে সাদরে একটা হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। আমি সায় দিয়ে ওর দিকে আমার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলে ও আমার আঙুলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে নিজের বাম হাতের সব আঙুল ঢুকিয়ে দিয়ে নিবিড় উষ্ণ চাপে আমাকে অধিকার করে নিল।
এই সময় বিশাল এক অ্যালসেশিয়ান কুকুর লেজ নাচাতে নাচাতে ছুটে এল। নাবিলা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে কুকুরটার গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ‘উমম্মহ্’ শব্দ করে একটা চুমো দিল, সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিল তার মাথায়, ঘাড়ে ও গলায়। কুকুরটা ফোঁস ফোঁস কুঁই কুঁই আনন্দধ্বনি করতে করতে আরো জোরে জোরে লেজ নাড়াতে লাগল। ওর লালায় ভেজা বিশাল জিভটা লম্বা হয়ে বেরিয়ে এসে লকপক করে ঝুলছিল, এবার নাবিলার ঘাড় চেটে দিল।
নাবিলা কুকুরটাকে আর একবার আদর করে কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়াল; আমার মুখের দিকে চেয়ে উজ্জ্বল হেসে বাম হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। ওর বাম স্তনের এক পাশ আমার বুকের ডান পাশে চেপে বসল। আমার সারা শরীরে শিহরণ শুরু হলো।
আমার কোমর বেষ্টন করে নাবিলা আমাকে নিয়ে তার প্রশস্ত লিভিং রুমে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে মিহি ঝিঝিম শব্দে চালু হলো এয়ার কন্ডিশনার। সারা ঘরে শীতল বাতাসের ঢেউ খেলতে শুরু করল। নাবিলা আমাকে মখমলের সোফায় বসিয়ে দিল, আমি প্রায় ডুবে গেলাম। সে সামনে ঝুঁকে আমার দুই হাঁটুতে দুই হাত রেখে আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল, ‘কী খাবে, সোনা?’
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলল, ‘দুপুরে আমি জিন খাই। খুব ভালো জিন আছে।’
তার পর উঠে দাঁড়িয়ে আমার সম্মতি বা বিকল্প মতের অপেক্ষা না করে বাম দিকের একটা ঘরের দিকে হেঁটে গেল। আমি আমার হাঁটুতে তবলা বাজাতে বাজাতে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলাম।
নাবিলা একটু পরেই ফিরে এল। হাতে একটা ট্রে, তাতে দুটো কাচের গ্লাস, একটা বিফইটার জিনের বোতল, দুটো টনিক ওয়াটারের ক্যান, একটা পিরিচে ফালি ফালি করে কাটা পনির। একটা বাটিতে অনেকগুলো ব্ল্যাক অলিভ, আরেক বাটি ভর্তি টোস্টেড কাঠবাদাম।
টেবিলে ট্রে রেখে সে আমার গায়ে গায়ে ঘেঁষে বসল, তার পর জিনের বোতলটা খুলতে খুলতে আমার মুখের দিকে হাসিমুখে তাকাল: ‘চিজ পছন্দ করো না তুমি?’
‘করি না মানে?’
‘তাহলে নিচ্ছ না কেন?’
আমি এক ফালি চিজ তুলে নিয়ে আস্তে কামড় দিলাম। বোঁটকা গন্ধ।
আমার মুখভঙ্গি দেখে নাবিলা বলল, ‘গোট চিজ। পছন্দ করো না বুঝি?’
‘কিসের গোট? এটা তো সাক্ষাৎ পাঁঠার গন্ধ!’
‘এই গাধা, পাঁঠা কি দুধ দেয় যে, তা দিয়ে চিজ তৈরি হবে?’ নাবিলা হাসতে হাসতে বলল।
‘তা তুমি যা-ই বলো না কেন, এটা পাঁঠারই গন্ধ।’
‘এখন তো আমার একটা পাঁঠাই দরকার!’
‘নাবিলা, আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি!’
‘দেখি, কোথায় তোমার ভয়,’ নাবিলা আমার প্যান্টের জিপারের দিকে হাত বাড়াল।
আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম: ‘কী করো? কী করো?’
নাবিলা খিল খিল শব্দে হেসে উঠল। পাঁঠার গন্ধমাখা পনিরই আমার ভালো লাগতে শুরু করল। হাউমাউ করে খেতে শুরু করলাম।
নাবিলা আমার কাছে সরে এসে মুখ বাড়িয়ে হাঁ মেলে বলল, ‘আ’।
আমি পিরিচ থেকে এক ফালি চিজ তুলে নিয়ে ওর মুখের সামনে মুলা ঝোলানোর মতো করে ধরলাম। ও শিং মাছের বড়শিতে ঠোকর মারার ভঙ্গিতে আমার হাতের আঙুলসুদ্ধ চিজের ফালিটা কামড়ে ধরল। তার পর বাম হাতে চিজটা সরিয়ে নিয়ে ডান হাতে আমার কবজি চেপে ধরে তর্জনি চুষতে চুষতে আমার চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখে দুষ্টুমিভরা হাসি।
‘সুড়সুড়ি লাগছে!’ বলে আমি আমার তর্জনি টেনে নিলাম।
নাবিলা দুই গ্লাসে জিন ঢেলে টনিক ওয়াটার মিশিয়ে একটা গ্লাস আমার হাতে তুলে দিল, অন্য গ্লাসটা ডান হাতে তুলে ধরে আমার গ্লাসটার পাশে ধরে টোস্ট বলল: ‘আমাদের অনাগত সন্তানের জন্য।’
আমি বললাম, ‘তুমি ওকে বলবে ওর বাবা কে?’
নাবিলা অবাক হয়ে কিংবা অবাক হওয়ার ভান করে বলল, ‘কেন বলব না?’
‘বলবে? তোমার হাজবেন্ড কী বলবে তাহলে?’
‘হাজবেন্ড থাকলে তো বলবে?’
‘হাজবেন্ড নেই? বিয়ে করোনি?’
‘করেছিলাম, কিন্তু লাভ তো হয়নি। গুডবাই বলে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
‘আঁ? তুমি এত নিষ্ঠুর?’
‘নিশ্চয়ই! তুমি যদি আমাকে একটা বেবি দিতে না পারো, তাহলে তোমাকেও জাহান্নামে পাঠিয়ে দেব।’ নাবিলা খিল খিল করে হেসে উঠল।
আমি ভয় খেয়ে গেলাম: ‘তুমি তো সাংঘাতিক!’
এ রকম কথা বলতে চাইনি, কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। সম্ভবত জিনের প্রভাবে।
নাবিলা হেসে বলল, ‘খুব সাংঘাতিক। তৈরি হও, ফেল করেছ তো মরেছ!’
গ্লাস খালি হয়ে গেল। নাবিলা আবার মদ ঢালল, টনিক ওয়াটার মেশাল, আবার টোস্ট বলল: ‘আমাদের সোনামণির জন্য।’
আমরা গলায় মদ ঢেলে দিলাম। পনিরের পিরিচটা শূন্য হয়ে গেল। আমি বললাম, ‘খিদে পেয়েছে।’
নাবিলা বলল, ‘দাঁড়াও, বিফ স্টেক আছে। কিন্তু ঠাণ্ডা। ওয়েট, গরম করে আনি।’
নাবিলা উঠে দাঁড়াল। তারপর আবার কী মনে করে বসে পড়ল। গ্লাসে মদ এবং টনিক ওয়াটার ঢালল, এবার টোস্ট বলল: ‘ববের জন্য!’
গ্লাসের পুরোটা মদ গলায় চালান করে দিয়ে নাবিলা ভেতরের ঘরে চলে গেল। আমি আমার গ্লাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পরে নাবিলা দুটো প্লেটে বড় বড় দুটো গরম বিফ স্টেক, চার ফালি ব্রাউন ব্রেড আর কিছু সবুজ লতাপাতা নিয়ে হাসিমুখে ফিরে এল। এর মধ্যে চুলের বাঁধন খুলে দিয়েছে, মিশমিশে কালো চুলের রাশি ওর ফর্সা মুখমণ্ডলকে আরো উজ্জ্বল, আরো লাস্যময় করে তুলেছে।
বিফ স্টেকের দিকে তাকিয়ে আমার খিদে চাগিয়ে উঠল। হাউ মাউ করে খেতে শুরু করলাম। নাবিলারও একই দশা। মুহূর্তের মধ্যে বিফ স্টেক, ব্রাউন ব্রেড, সব সবুজ লতাপাতা আমাদের পেটের মধ্যে চালান হয়ে গেল।
নাবিলা আবার গ্লাসে জিন ঢালল। কিন্তু আমার পেটে ক্ষুধা। যা খেলাম, তা যেন স্টাটার ছিল। এখন চাই মূল ডিশ। কিন্তু নাবিলা কি আমাকে লাঞ্চ খাওয়াবে?
নাবিলা একটা গ্লাস আমার হাতে তুলে দিয়ে অন্যটা নিজে নিল। কিন্তু আমি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বললাম, ‘রাক্ষস হয়ে গেছি, খাবার আনো।’
নাবিলাও নিজের গ্লাসটা রেখে দিল। তারপর সামনে এগিয়ে এসে দুই হাতে আমার মাথাটা টেনে নিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলল, ‘এই যে তোমার খাবার, ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাও!’
৫
ফিরে আসার আগে নাবিলা পরিতৃপ্ত হাসিমুখে একটা লম্বা খাম আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি খামটা নিলাম। দেখলাম, খামের গায়ে সুন্দর হাতের লেখায় বড় বড় ইংরেজি হরফ: উইথ আ মিলিয়ন থ্যাংকস। আড় চোখে দেখলাম, নাবিলা কৃতজ্ঞ ও প্রীতিভরা দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে।
‘থ্যাংক ইউ।’ আমি হেসে বললাম।
‘নো, আই শুড থ্যাংক ইউ।’ বলতে বলতে নাবিলা আমার কাছে ঘেঁষে এল। আমি নিজের হাতঘড়িতে দেখলাম সাড়ে ৩টা বেজে গেছে। ‘চাকরিটা আজ গেছে,’ বলে ঝট করে উঠে দাঁড়াতেই আমার পকেট থেকে ইনহেলারটা পড়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে নাবিলার চোখ-মুখের সব অভিব্যক্তি ভীষণভাবে উল্টেপাল্টে গেল। ভুরু কুঁচকে এল, চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। বড় বড় চোখে ইনহেলারটার দিকে নিষ্পলক চেয়ে রইল। তার পর সামনে ঝুঁকে মেঝে থেকে জিনিসটা ডান হাতে তুলে নিল, একবার ওটার দিকে তাকাল, তারপর আমার মুখের দিকে তাকাল। আমার চোখে চোখ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর দুই চোখে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল; ফোঁস ফোঁস করতে করতে ইনহেলারটা একদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল এবং ক্রোধে ফুঁসতে লাগল।
আমি কৈফিয়ত দিতে শুরু করলাম, ‘আরে সিরিয়াস কিছু না। একদম সামান্য ব্যাপার। সিরিয়াস কিছু হলে কি আমাকে এ রকম হেলদি দেখাত, বলো? নাবিলা, আমার ডাস্ট অ্যালার্জি, জাস্ট অ্যালার্জি। আর কিচ্ছু না...।
‘স্টপ! কোনো কথা নয়। একদম চুপ!’
‘না, শোনো নাবিলা, প্লিজ!’
‘শাট আপ্!’ নাবিলা এত জোরে চিৎকার করে উঠল যে আমি চমকে উঠলাম এবং আমার খুব অপমান বোধ হলো।
‘হোয়াই আর ইউ শাউটিং লাইক দিস?’
‘আগে বলোনি কেন? তুমি যে অ্যাজমার পেশেন্ট, এটা কেন আগে বললে না আমাকে?’
‘কে বলল অ্যাজমার পেশেন্ট?’
‘তুমি তো নিজেই বললে ডাস্ট থেকে তোমার অ্যাজমা হয়।’
‘আহ্ হা, আমি বললাম ডাস্ট থেকে আমার অ্যালার্জি হয়। অ্যালার্জির কারণে ব্রেদিং ডিফিকাল্টি হয়, সবসময় না, কখনো কখনো।’
‘এটাই অ্যাজমা। অ্যান্ড আই নো, অ্যাজমা ইজ হেরিডিট্যারি। দ্যাট মিনস জেনেটিক। হ্যাঁ, অ্যাজমা জেনেটিক্যালি ট্রান্সফর্মড হয়। বব, তোমার বাচ্চারাও তোমার মতোই শ্বাসকষ্টে ভুগবে।’
‘ইজ ইট মাই ক্রাইম, নাবিলা?’
‘ইয়েস, ইউ জাস্ট ডিড আ ক্রাইম উইথ মি। ইউ আর আ চিট!’
‘নাবিলা, ঢাকা সিটিতে নাইনটি পার্সেন্ট মানুষ ইনহেলার ইউজ করে।’
‘বাট নান অব দেম লাইড উইথ মি।
‘আই ডিডনট লাই ইদার। তুমি আমার রিপ্রক্টাটিভ হেলথ সম্পর্কে জানতে চেয়েছ। আমি তোমাকে তা জানিয়েছি। তুমি জানতে চাওনি আমার শ্বাসকষ্ট আছে কিনা, হাইপারটেনশন আছে কিনা, ডায়াবেটিস আছে কিনা, আমার কিডনি, লিভার, প্রস্টেট আর সব নাটবল্টু সব ঠিকঠাক আছে কিনা। তুমি শুধু... তোমার শুধু দরকার ছিল আমার স্পার্ম...।’
‘থামো থামো, যথেষ্ট বকেছ!...’
‘না, আমার বকা শেষ হয়নি। তুমি আমার সঙ্গে খেলতে চেয়েছ, আমি খেলেছি, মরদের মতোই খেলেছি..।’
‘প্লিজ, স্টপ নাউ! আমি একটা হেলদি বেবি চেয়েছিলাম। সম্পূর্ণ নিরোগ একটা শিশু। কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ।’
‘না, এটা তুমি বলতে পারো না। আমি তোমার মাতৃত্বের সাধ পূরণ করার চেষ্টা করেছি। সেজন্য আমার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আচ্ছা, চলি।’
‘ওকে, বাই।’
‘কিন্তু কথা ছিল তুমি আমাকে আমার অফিসে পৌঁছে দেবে।’
‘সরি, এই অবস্থায় আমার পক্ষে গাড়ি ড্রাইভ করা সম্ভব না।’
‘ফাক ইউ!’
আমি হন হন করে বেরিয়ে এলাম।
বাড়ির সামনের রাস্তার এক পাশে এক সুদর্শন যুবক ট্যাক্সিচালক তার গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মাস্ক নেই, কেমন একটা অদ্ভুত হাসি হাসি ভাব। আমি ভাবি, আশুলিয়ায় তাহলে মাস্ক ছাড়াও চলা যায়!
পাশ ফিরে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করেছি, যুবকটা শব্দ করে হেসে উঠল। থেমে দাঁড়িয়ে তাকালাম তার দিকে। তার মুখে এখনো হাসি। ভাবলাম, আমাকে লক্ষ করেই কি সে অট্টহাসিটা দিয়েছে?
এবার সে সবগুলো দাঁত বের করে একটা ভেংচি দিল, ‘কী, টাকা দেয়নি?’
আমি এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম। কোনো প্রশ্ন উচ্চারণ করার আগেই সে আবার বলে উঠল, ‘উনি কাউরেই টাকা দেয় না, স্যার!’
‘আপনি কীভাবে জানেন?’
যুবক আবার হাসে, ‘আমারেও ডাইক্যা লইছিল একদিন।’
আমার গা ঘিন ঘিন করে উঠল।
যুবকটি বলল, ‘মহিলা ঠিকই জানে, অফলা জমিনে শস্য ফলে না। তাও চেষ্টা ছাড়ে না। নারী জাতি বড়ই বিচিত্র, স্যার।’
‘ঢাকা যাবেন?’ আমি বললাম।
‘ঢাকার কোনখানে?’ ট্যাক্সিচালক জানতে চাইল।
এই সময় পেছন থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল। আমার নাম ধরে ডাকছে। পেছন ফিরে দেখতে পেলাম, বাড়ির বিশাল ধাতব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নাবিলা এক হাতে আমার ইনহেলারটা নাড়াচ্ছে:
‘নিয়ে যাও, নইলে পথে কষ্ট পাবে।’
ঢাকা, ১৯৯৭




