উইলিয়াম কেনেডি। অনুবাদ: লুনা রুশদী
(গত সংখ্যার পর)
রাবাসা গার্সিয়ার স্প্যানিশ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার ভাষা ধ্রুপদী। খুব স্বচ্ছ। তিনি শব্দবিন্যাস নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করেন না। লেখায় কিছু আঞ্চলিক শব্দও থাকে, বিশেষ করে সংলাপে, তবে সেটা ভাষা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে নয়। তিনি ঠিক শব্দটা ঠিক জায়গায় ব্যবহার করেন। আমি সেরভান্তেসের সঙ্গে গার্সিয়ার ভাষা ব্যবহারের মিল খুঁজে পাই।’
নিঃসন্দেহে রাবাসাই গার্সিয়ার পরের গুরুত্বপূর্ণ কাজটারও অনুবাদ করবেন। ভারগাস জানিয়েছেন, নতুন উপন্যাসের নাম হবে এল-অতনো-দেল-পাত্রিয়ার্কা (দি অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক)। এ বইটা তিনি লেখা শুরু করেছিলেন একশ বছরের নির্জনতা লিখতে শুরু করার আগে থেকে। ভেনিজুয়েলায় জিমেনেজ স্বৈরতন্ত্রের পরিচয় পেয়েই প্রথম বইটা লেখার কথা মাথায় আসে। পরে সে ভাবনা আরো শক্তিশালী হয়েছে কিউবায় থাকাকালে বাতিস্তা স্বৈরতন্ত্র ও কলোম্বিয়ার রোজাস স্বৈরতন্ত্রের কথা জেনে। বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে একজন লাতিন স্বৈরশাসক, যে ২৭০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
ডানপন্থী রাজনীতি থেকে গার্সিয়ার দূরে সরে যাওয়া মনে প্রশ্ন আনে, এখন কেন তিনি ফ্রাংকো স্বৈরতন্ত্রের অধীনে স্পেনে থাকছেন? জানতে চাইলাম স্পেনের রাজনীতি বিষয়ে তিনি কী মনে করেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি অস্ফুট গোঙানির শব্দ করে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন। এ প্রশ্নের প্রকাশ্য উত্তরে বার্সেলোনায় তার অরাজনৈতিক শান্তিপূর্ণ বসবাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শেষে বললেন, ‘যদি আমাকে এমন দেশ বেছে নিতে বলা হয়, যার রাজনীতি আমি পছন্দ করি, তাহলে আমি তো দুনিয়ার কোথাও থাকতে পারব না।’
‘খুব বুদ্ধিমান উত্তর’ বললাম আমি, ‘থাক এ নিয়ে আর কিছু না বলি।’
‘আপনি ভদ্রলোক’, তিনি বললেন।
আমরা বার্সেলোনা নিয়ে কথা বললাম, যেখানে তিনি থাকেন। আমার স্বল্পদিনের অভিজ্ঞতায় শহরটার বিস্তীর্ণতা ও জীবনমুখরতার তারিফ করলাম। একটা ট্রামের গল্পও বললাম, যখন পোর্ট বু পার হয়ে স্পেনে ঢুকলাম তখন টুরিস্ট জানালায় উঁকি দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম বার্সেলোনা সম্পর্কে কোনো তথ্য আছে কিনা। ওরা একটা প্যামফ্লেট দিয়েছিল, সেখানে অন্য আরো তথ্যের সঙ্গে শহরের ট্রাম লাইনগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আছে নম্বর ও গন্তব্যসহ। কলম্বাস প্লাজা থেকে ট্রাম ধরে আমরা যেতে চাইছিলাম আন্তোনিও গোদির সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া চার্চে, যা বার্সেলোনার বিস্ময়গুলোর একটা। প্লাজার এক ডাব বিক্রেতা জানালেন, বার্সেলোনায় ট্রাম চলে না প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে। তাহলে পর্যটকদের প্যামফ্লেটে এখনো কেন এত বিস্তারিতভাবে বলা ট্রামের কথা? এর উত্তর ডাব বিক্রেতা দিতে পারলেন না, আমরা শেষ পর্যন্ত বাস ধরে গেলাম গির্জা দেখতে। বাসের পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম বাইরে রাস্তার দুপাশে বিশাল অট্টালিকা আর ফ্ল্যাট বাড়ির মাঝখানে রাস্তাটা সুন্দর একটা খাদের মতো, হয়তো উনিশ শতকে তার সবচেয়ে সৌষ্ঠবপূর্ণ সময়ে ফিফথ অ্যাভিনিউ দেখতে এ রকম ছিল। তারপর ডানাকে বললাম, ওই দেখো একটা ট্রাম।
সঙ্গত কারণেই সে দেখতে পেল না। আমাদের সমকোণে ছিল ট্রামটা, তিন স্টপ আগে আমাদের পার হয়ে গেছে, ডান থেকে বাঁয়ে। মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য সেটি দেখা গেছে, তারপর খাদের দেয়ালের পেছনে উধাও হয়েছে।
‘বার্সেলোনায় এখনো কোন ট্রামটা চলে?’ গার্সিয়াকে প্রশ্ন করলাম।
তিনি ও তার স্ত্রী দুজনেই বললেন, বার্সেলোনায় এখন কোনো ট্রাম চলে না। মারসেদিস একটা ফিউনিকুলারের কথা মনে করতে পারলেন।
‘আমি যেটা দেখেছি সেটার রঙ হলুদ,’ জানালাম আমি— ‘আর নকশাটাও পুরনো।’
মারসেদিস বললেন, ‘না, ফিউনিকুলার তো নীল।’
গার্সিয়া তার এজেন্ট কারমেন বালসেলসকে ফোন করে জানতে চাইলেন, ‘বার্সেলোনায় কি কোনো হলুদ ট্রাম আছে? আমি এখানে কেনেডির সঙ্গে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি আর তিনি হলুদ ট্রাম দেখেছেন।’
ফোনে কিছুক্ষণ কথা শুনলেন, তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘আগের দিনের সব ট্রামই হলুদ ছিল।’
তারপর নীল ট্রামের কথাও জানতে চাইলেন কিন্তু কারমেন জানালেন, সেটা শহরের বাইরের, আমরা যেখানে ছিলাম তার ধারেকাছেও নয়। কয়েক মিনিট পরে কারমেন ফোন করে জানালেন, দুই বছর আগে একটা সর্বজনীন অনুষ্ঠানে বার্সেলোনার সর্বশেষ ট্রামটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কবর দেয়া হয়েছে।
কী দেখেছিলাম তাহলে আমি? কিছুতেই বোঝা গেল না।
গার্সিয়া বললেন, ‘আমার কাছে এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা।’
তারপর আমাকে কিছুদিন আগের ঘটনা বললেন। বার্সেলোনাতেই একবার ট্যাক্সি ডাকার জন্য হাত তুললেন কিন্তু দেখলেন পেছনের সিটে কেউ বসে আছে। তিনি হাত নামিয়ে ফেললেন। ট্যাক্সিচালক তবু থামল। গার্সিয়া তাকিয়ে দেখেন আসলে কেউ নেই পেছনে। ব্যাপারটা চালককে বুঝিয়ে বলতেই চালক রাগে ফেটে পড়তে পড়তে গার্সিয়াকে বললেন, ‘মানুষ শুধু শুধু আমার ট্যাক্সির পেছনে কাউকে বসে থাকতে দেখে অথচ কেউ থাকে না।’
আমরা ৫ ঘণ্টা ঘরে সাবধানে স্কচ পান করছিলাম আলাপে মগ্ন হয়ে। সাক্ষাৎকারের শুরুতে খুব সাবধানতাবশত ঠিক করেছিলাম ডানা আমাদের হয়ে দোভাষীর কাজ করবে, যেহেতু আমার স্প্যানিশ ভাষাজ্ঞান সীমিত, ভাষার সূক্ষ্ম প্রকাশগুলো হয়তো বুঝতে পারব না। তবে রাত যত বাড়ছিল, ডানার মধ্যস্থতায় বিষয়টা এমন দাঁড়াল যে আমি ডানাকে স্প্যানিশে প্রশ্ন করছিলাম আর ও গার্সিয়ার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলছিল। গার্সিয়া স্প্যানিশ বলার মাঝে মাঝে বেশি করে ইংরেজি মিশিয়ে দিচ্ছিলেন। আর আমি আরো বেশি করে স্প্যানিশ বলছিলাম। কারোরই কোনো সমস্যা হচ্ছিল না বুঝতে। হুইস্কির জড়তা কাটিয়ে দিতে পারার এ গুণের তারিফ করলাম আমরা। বললাম, তবে লেখার সময় হয়তো হুইস্কি খুব একটা কাজের নয়। গার্সিয়াও একমত হলেন, তারপর খানিক ইতস্ততভাবে বললেন, ‘মাঝে মাঝে অবশ্য কাজ করে।’
ঘড়িতে তখন রাত পৌনে ১১টা, বার্সেলোনায় থিয়েটার শুরু হওয়ার সময় গার্সিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের রাতের খাবার খাওয়া দরকার। তিনিই গাড়ি চালালেন, সংযমের সঙ্গে। পুরনো রাস্তা ধরে চালিয়ে একটা গলির কাছে পার্ক করলেন। আমাদের নিয়ে গেলেন তার ভাষায় ‘বার্সেলোনার সবচেয়ে ভালো গোপন রেস্তোরাঁ’য়। আমি আমার স্টিল ফ্রেমের চশমা চোখে দিয়ে মেনু পড়ছিলাম কিন্তু গার্সিয়া বললেন, ‘আমার চশমা আপনারটার চেয়ে ভালো।’ তার স্টিলের অর্ধবৃত্তাকার চশমা বের করে চোখে দিলেন।
‘চশমা ছাড়া অন্ধ আপনি?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘এখনো হইনি’, জানান তিনি মেনুটা চোখ থেকে যত দূরে সম্ভব খুলে ধরতে ধরতে— ‘আমার হাত বেশ লম্বা’।
আমি নিলাম রসুনের সসের ভেতর ছোট স্কুইড আর গার্সিয়ার পছন্দ করা ‘পারদিস’ও নিলাম। পরে বুঝলাম সেটা হলো তিতিরের মাংস। ফ্রেঞ্চ ওয়াইন বললেন সঙ্গে, ঝাপসা আর বাঁকানো গলার বোতলে। প্রথমে একটু রুটি চিবিয়ে নিলেন, যাতে বাড়িতে খাওয়া স্কচের স্বাদটা চলে যায়। তারপর ওয়াইনের স্বাদ নিলেন।
খেতে খেতে আরেকটা সাহিত্যিক আলাপ হলো। কিছুক্ষণ আগে রাজনীতি ও সাহিত্য বিষয়ে কথা হচ্ছিল আমাদের, তখন একজন লেখকের কথা বলেছিলেন, যিনি গার্সিয়ার মতে রাজনীতির উপরে বেশি জোর দিতে গিয়ে নিজের ক্ষতি করেছেন। ফলে সেই লেখকের কাজের মান বদলে গেছে। গার্সিয়ার মনে এটা আফসোসের বিষয়। আমি জানতে চাইলাম, তাহলে সাহিত্যে রাজনীতির জায়গা কোথায় বলে তিনি মনে করেন। তিনি আমার কলমটা চেয়ে নিয়ে আমার খাতায় কিছু লম্বালম্বি আর পাশাপাশি দাগ কেটে ১২টা ঘর কাটলেন। সেগুলোর নিচে লিখলেন ‘গল্প’। লম্বালম্বি বর্ডারগুলোর ডান আর বাঁ-পাশে তীর চিহ্ন আঁকলেন। বাঁদিক থেকে মাঝখানের চৌখুপির মধ্যে লিখলেন ‘রাজনীতি’। একটু থামলেন। শূন্য চৌখুপিগুলো আরো কিছু বলার তাড়না দিল তাকে, তখন দুই ভাষায় প্রতিটা ঘরেই লিখতে থাকলেন— শোক, ভালোবাসা, হাসি, টাকা, নাম, মৃত্যু, নস্টালজিয়া, জীবন আর তিনটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
আরেকজন গার্সিয়া আমার বইয়ে ছবি আঁকছেন। ছবিতে একটা টবে দুই পাতাওয়ালা চারাগাছে ফুল ফুটছে, একটা মাছ হা করে টোপ গিলতে যাচ্ছে ঝুলন্ত ছিপ থেকে আর একচোখা সূর্য উঠছে, অথবা অস্ত যাচ্ছে ঢেউ খেলানো দিগন্তে। আমার প্রতি সম্মানার্থে ছবিতে একটা দুই চাকার ট্রামও আঁকলেন ট্রামলাইনের উপরে, বাম দিকে। নাম দিলেন ‘পুরনো হলুদ’। দুই জায়গায় সই করলেন, আমার নাম লিখলেন আর সঙ্গে সে বছরটাও— ১৯৭২।
আমরা শেষমেশ রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়েছিলাম রাত দেড়টার দিকে। বুঝতে পারলাম ভুল করে ভারগাসের লেখা গার্সিয়ার জীবনীর কপিটা গার্সিয়ার বাড়িতে ফেলে এসেছি। তিনি বললেন, সমস্যা নেই, লা-রাম্বলাসে বইয়ের দোকান খোলা থাকবে, সেখান থেকে আরেকটা কপি কিনে নিলেই হবে। একটা বইয়ের দোকানে ড্রাইভ করে গেলেন গার্সিয়া কিন্তু মারসেদিস লাফিয়ে নেমে বই কিনে আনলেন আমার জন্য। কারণ গার্সিয়া বললেন, এখন রাত দেড়টার সময় আমি যদি নিজের জীবনী কিনতে যাই, লোকে কী বলবে!
আরেকটা আলাপ হয়েছিল তার সঙ্গে। কোথায় যে ঠিকঠাক মনে করতে পারছি না। হয়তো সেই মার্কিন বারে অথবা তার বাড়িতে কিংবা বার্সেলোনার সবচেয়ে ভালো গোপন রেস্তোরাঁয়। আলাপটা ছিল গার্সিয়া যে প্রতি দু-তিন বছরে একবার কলোম্বিয়া সফরে যান আর আরাকাতাকায় ফেরেন সে বিষয়ে।
‘প্রতি বছর একটু কম’, বলে তার আদি শহরের কথা বলেন তিনি। অর্থাৎ প্রতি বছর যে পৃথিবীটা তিনি চিনতেন, একটু একটু করে তা উধাও হচ্ছে। কিন্তু নতুনভাবে জন্মও নিচ্ছে। প্রতি বছর একশ বছরের নির্জনতা যত বিখ্যাত হতে থাকে, আরাকাতাকাও পর্যটকদের কাছে এমন এক শহর হতে থাকে, যার বাস্তবতা তারা তাদের বইয়ে পড়া বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারে। তারা সেই বাদাম গাছটা দেখতে চায়, যেখানে মাকোন্দোর প্রতিষ্ঠাতা হোসে আরকাদিও বুয়েন্দিয়া গভীর আনন্দময় পাগলামির ঘোরে মারা গিয়েছিল, সেই গাছের গুঁড়ির সঙ্গেই বাঁধা ছিল সে বছরের পর বছর, তার অতীতের ভূতদের তার সঙ্গে বুড়ো হতে দেখত সে। তারা বুয়েন্দিয়াদের পুরনো বাড়িটা দেখতে চায়, তারা সেই বাজার দেখতে চায়, যেখানে কলাবাগানের হাজার হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করেছিলেন আর সশস্ত্র বাহিনী তাদের হত্যা করে মরদেহগুলো তুলে দিয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা ট্রেনে সমুদ্রের কাছে নির্জন কোনো জায়গায় নিয়ে ফেলে আসার জন্য, যাতে এ হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রমাণ না থাকে।
বহু বছর পরে সে হত্যাকাণ্ডও এক কিংবদন্তি হয়ে উঠবে। এর বাস্তবতা মেনে নেয়া হবে। তখনো ট্রোজান ঘোড়ার মতো প্রমাণ অসাধ্য অথবা আমার দেখা হলুদ ট্রামগাড়ির মতো। হত্যাকাণ্ডের কিংবদন্তি গার্সিয়া শুনেছিলেন তার ছোটবেলায়, বইয়ে সেটাই আবার গড়েছেন, যেভাবে মাকোন্দোকে গড়ে তুলেছিলেন আরাকাতাকার ছোটখাটো অংশ দিয়ে, তার অতীত স্মৃতি অথবা কল্পিত অতীত থেকে। যে মাকোন্দো তিনি তৈরি করেছেন, এখন আরাকাতাকায় সে রকম কিছু নেই কিন্তু তাতে এখনকার কল্পনাপ্রবণ ও উদ্যমী ছোট ছেলেদের সমস্যা হয় না। তারা তাদের কল্পনা মিশিয়ে এমন কিছু গড়ে তোলে, যা পর্যটকরা দেখতে চায়। কয়েক পয়সার বদলে তারা হোসে-আরকাদিও-বুয়েন্দিয়ার গাছ খুঁজে দেবে, সে জায়গাটা খুঁজে দেবে যেখানে বুয়েন্দিয়াদের নতুন শিশুটিকে পিঁপড়া খেয়ে ফেলেছিল, সে জন্মেছিল অজাচারে, একটা শুয়োরের লেজ সঙ্গে করে। কল্পনার বৃত্ত এমন কোনো বাস্তবের ওপর নির্ভরশীল নয় যে বাস্তব লোহালক্কড়ের দোকানে ৭৮ সেন্টের স্ক্রু-ড্রাইভারের মতো কিনে ফেলা যায়।
আমার এক বন্ধু বলেছিলেন, আজকাল গল্প লেখার গুরুত্ব এক দান ব্রিজ খেলার সমান। ‘বিড়ালের পুরিষ’ নগরের অধিবাসীদের ক্ষেত্রে এ কথা সত্যি হলেও হতে পারে। হয়তো তারা পরিবর্তে আর কিছু পেয়েছে। তবে মাকোন্দো সৃষ্টির মতো আদি ঘটনার মুখে এ তর্কের দাম নেই। সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, এখনো এমন লোক আছে, যারা কিছুটা সময় মাকোন্দোতে কাটাতে, যে হলুদ ট্রামটা বাস্তবে থাকতেও পারে আবার না-ও থাকতে পারে তাতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে, একটা এক চোখের সূর্যের উষ্ণতায় সতেজ হয়ে উঠতে এবং একটা বইয়ের বৈচিত্র্য ও প্রশ্নবোধক চিহ্নগুলো থেকে পুষ্টি টেনে নিতে আগ্রহী। যাদের এ রকম মনে হয়, তাদের নিজেদের পছন্দের পক্ষে কোনো যুক্তি দেয়ার দরকার হয় না।
১৯৬৯-এ বোগোতার এক সাংবাদিক আরাকাতাকায় গার্সিয়ার পূর্বপুরুষের বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলেন, ধুলা আর পিঁপড়ায় সে বাড়ি ছেয়ে গেছে, যেমন করে গার্সিয়া ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এক ধূলিঝড়ের তলায় একদিন বুয়েন্দিয়াদের বাড়ি আর সমগ্র শহরটা তলিয়ে যাবে। সাংবাদিক সে শহরে ধ্বংসাবশেষ এবং নির্জনতা পেয়েছিলেন, সন্দেহাতীতভাবে তার খোঁজেই বেরিয়েছিলেন তিনি, আর খুব খেয়াল করে দেখলে যেকোনো জায়গাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে এসব। তাই সেই অভিশপ্ত অবশ্যম্ভাবী পূর্বাভাসের কারণেই আরাকাতাকার বিলীন হয়ে যাচ্ছে না। এ পরিণতি গার্সিয়া মার্কেস একজন ঔপন্যাসিকের ঐশ্বরিক ক্ষমতার বলে বেছে নেননি, বরং এখানে তাকে তার উপন্যাস একশ বছরের নির্জনতার যাযাবর মেলকিয়াদিসের মতো মনে হয়। মেলকিয়াদিস পার্চমেন্টে সাংকেতিক ভাষায় লিখে রেখেছিল— ‘প্রথম বাক্যটা গাছের সঙ্গে ঝুলছে আর শেষটাকে পিঁপড়া কাটছে’— সে ইতিহাসের চাবি খুঁজে পেয়েছিল। জানত ঘটনাগুলো ঘটে কারণ তাদের ঘটতে হয়, সে জানত সময়ের ঘূর্ণন বৃত্তাকার আর জীবনের এ অত্যাবশ্যক রক্ত-মাংসের উষ্ণতা তার নিজের ভেতরে ধূলিমলিন পরিণামের সঙ্গে সঙ্গেই নবায়নের বীজও ধারণ করে।
গার্সিয়ার ডাকনাম গাবো। আদর করে বললে গাবিতো। আরাকাতাকার এক শুঁড়িখানায় বোগোতার সেই সাংবাদিক শুনেছিলেন একটা গান গাওয়া হচ্ছে। গানটা আসলে ঔপন্যাসিক গার্সিয়ার নবজন্ম, মানুষ গার্সিয়া
মাকোন্দো রাজ্যে জন্মেছিল
ছোট্ট গ্যাব্রিয়েল
দুনিয়ার লোকে তাকে
চিনত গাবিতো নামে...





