নারীমঙ্গল
কুলীন সমাজে ঠাঁই হয় না অচ্ছুত ডোম্বিনীর
বনেদি নগর থেকে বহু দূরে তার কুঁড়েঘর
আকাশ ভাইঙ্গা পড়ে, দেওয়ায় সয়লাব মেঝে
শরীরে কাঁপন লাগে, জীর্ণ বস্ত্র শীত যে মানে না।
পোড়ালে জারুল কাঠ জারের প্রকোপ কমে যায়
কী করে কমবে ক্ষুধা, সে ফিকির তার জানা নাই
মাঝরাতে নিভে যায় মাটির পিদিম; সাথে আশা।
রাতের নাগর জানি মস্ত লোক; ভয়ে কাঁপে মাটি
ভীষণ দেমাগি, অন্ধকারে একা আসে চুপিসারে
যেন কেউ দেখতে না পায়। নিঃসম্বল ডোম্বি নারী
দেহ ছাড়া কোনো দৌলত যে নাই; রাতের অতিথি
যেভাবে চায় সেভাবে সাজে গরিব শবরীবালা
গলায় গুঞ্জার মালা; ময়ূর-পুচ্ছ বাহারি খোঁপায়
জানে সে, রাতের সঙ্গী চিনবে না দিনের আলোয়।
২.
আমি রাধা, আইয়ান গোয়ালার বউ; হররোজ
যমুনা পেরিয়ে মথুরার হাটে দুধ বেচে খাই
এই ভাবে দিন যায় রাত যায় বর্ষ যায় চলে।
বাঁশি বাজানোর ছলে কৃষ্ণ আমারে করিল বশ
কত ছলাকলা তার সে হিসেব রাখিনি কখনো
উত্তাল ঢেউয়ে ভরা যমুনায় ডুবাইল নাও
তাহার বাঁশরি শুনে মন আউলা-বাউলা হয়।
যখন ছেড়েছি ঘর ফেরার উপায় নাই কোনো;
আমারে দিওয়ানা করে শ্যাম বেপাত্তা হয়েছে
অন্তর সাজিয়ে কতকাল তার লাগি বসে আছি
আমার চোখের জলে লোনা আজ যমুনার পানি
শ্রীকৃষ্ণ বিহনে গীত নাই; তার জন্য জাত-কুল
ধর্ম ত্যাগিয়াছি। অথচ শ্রীমান কংশ বধে গেল
প্রেমের চাইতে নাকি ধর্মরক্ষা অধিক জরুরি।
৩.
এক চক্ষু নাই বলে মনসা দেবীর পূজা দিতে
বাধ সাধে চাঁদ সদাগর; কত অপ-দেবতার
পায়ে তারা পূজা দেয়, ভক্তি-জল ঢালে সে হিসাব
লয় নাই তারা? অবলা রমণী কাকে মন দেবে
কাকে পূজা দেবে, তাও ঠিক করে পুরুত ঠাকুর।
মনসার পূজা ডালি ছিন্নভিন্ন হয় পদাঘাতে
মেনকার স্বামী চলে গেছে; তাতেও রেহাই নাই
রাতের আঁধারে চুপেচাপে আসে লম্পট বোনাই।
দক্ষ ব্যাধ কালকেতু নিত্য বনে যায় পশু-বধে
দুঃখিনী ফুল্লরা সেই মাংস ঘরে ঘরে বিলি করে
সোয়ামির জন্য রাঁধে বিবিধ ব্যঞ্জন; তবু তার
মন পায় না; কী করে পাবে? পরনারী আসক্ত সে
ফুল্লরার দুঃখ বাড়ে। পুরুষ ক্ষমতা বোঝে, অর্থ
বোঝে, রাজ্য জয়ে মত্ত থাকে; বোঝে না হূদয়।
৪.
আমারে কহর এনে দাও, দাও বিষমাখা ছুরি
আমূল বসিয়ে বুকে এ জীবন শেষ করে দিই
চক্ষু অন্ধ করে দাও, যদি তারে দেখতে না পাই
আমার তৃষিত ঠোঁট বহুদিন আছে স্পর্শহীন
বিরহে বিষাদে কাটে বারো মাস, দিবস-রজনী।
চাইয়া পন্থের পানে আমার সময় কেটে যায়
তবু সে আসে না ফিরে, দহলিজে ঘু ঘু চড়ে
আমারে যাতনা দিয়া কী আনন্দ পায় বেরহম?
বাসররাত্রিতে সে আমারে পয়লা প্রেমের কথা
জিগায় যে বারবার? যত আমি কিরা কেটে বলি
তারে ছাড়া কারো সঙ্গে মন লেন-দেন করি নাই
সন্দেহের তীর তবু আমাকে নিয়ত বিদ্ধ করে।
যত দোষ, যত নিন্দা, অপমান অবলা নারীর
সাধু বটে পুরুষ মানুষ, তার সাত খুন মাফ!
৫.
আদি মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিল ভেদাভেদহীন
‘আমার আমার’ বলে কেউ চিত্কার করে নাই
কারো বেসাত কেউ জোর করে লয় নাই কেড়ে
তখনো প্রণয় ছিল, প্রেম ছিল প্রগাঢ় নিবিড়
প্রকৃতি সবারে কাছে টেনে নিত, একান্ত আপন।
সবারে আগলে রাখে নারী সুগভীর মমতায়
বন থেকে ফলমূল এনে সে সবারে সমভাবে
ভাগ করে দেয়; জেনো পৃথিবীতে প্রথম ফসল
ফলিয়েছে নারী; তার শুশ্রূষায় সজীব হয়েছে
শস্যক্ষেত, বনরাজি। নারী প্রথম বেঁধেছে ঘর
ভালোবাসা কিংবা প্রেমে সেও চায় খানিক আড়াল
নিজেকে উজাড় করে প্রেমাস্পদে দেয় সবকিছু
নারী চায় তিলে তিলে গড়া সংসার নিজের হোক
গর্ভে তার জন্ম নিক কুসুমিত আলোর সন্তান।
৬.
একসঙ্গে হাঁটিয়াছি বহু দূর, হাতে হাত রেখে
চলেছি অনেক পথ; একসঙ্গে খোয়াব দেখেছি
আমরা দুজন আনন্দে উড়েছি আকাশের নীলে
একসঙ্গে হূদয়ের লেনদেন করিয়াছি ঢের।
পুরুষ সেসব ভুলে গেছে, যেন আমি কেউ নই
আমারে পিঞ্জরে রেখে একা সে যে ডালে ডালে ঘোরে
পদে পদে আমার পরীক্ষা লয়; হায় সীতাকেও
সতীর পরীক্ষা দিতে হয়; রামের নিকট প্রেম
থেকে ধর্মাচার বড়। পণ্যের অধিক মূল্য তারা
দেয়নি নারীকে; ধনুকবিদ্যায় জয়ী পাণ্ডবেরা
দ্রৌপদীকে ভাগ করে লয়; তার মত লয় নাই!
শ্রীকান্তকে ভালোবেসে রাজলক্ষ্মী হলো ঘরছাড়া
ক্ষমতা বোঝে না নারী, বোঝে প্রেম, নিখাদ প্রণয়।
৭.
তেলেঙ্গানা, তেভাগায় নাচোলে কি দেখোনি আমাকে?
নিঃস্ব, রিক্ত কিষানের পাশে দুহাতে ধনুক-তীর
কানু ও সিঁদুর পাশে কালো রঙ মেয়েটিকে মনে
পড়ে? ফুলমনি নাম; তার হাতের ধারালো কাস্তে
নিকেষ করেছে কত লাঠিয়াল। কিষানের পাশে
থেকে শহীদের রক্ত ছুঁয়ে আমিও বলেছি উচ্চনাদে
‘জীবন থাকতে হামার এ জমি কাউকে দেবে না।’
হাজং বিদ্রোহে আমি মণিদার পাশে পাশে হাঁটি
দ্যাখো নাই তুমি জমিনদার বাড়ির ছাওয়াল
কী করে ভূমিপুত্র হয়! রানীর আসন ছেড়ে
একজন ইলা মিত্র কিষানের মিছিলে নামেন
প্রীতিলতা নিজেকে উৎসর্গ করেন মুক্তির আহবে
পুরুষের পাশে থেকে মাতঙ্গিনী মাতে যে সমরে;
জমিদার বধূ মনোরমা হন আশার দীপিতা।
৮.
আমার পোশাক তুমি, আমি হব তোমার পোশাক
দুই দেহ এক দেহে লীন হবে, রবে না ফারাক
বসতি গড়িব গাঙ পাড়ে; কোলাহল থেকে দূরে
উদাসী বাঁশির সুরে ঘর ছেড়ে পালাব দুজন।
নয়ন মেলিয়া দেখো প্রকৃতিও আমাদের কথা
শুনে থির হয়ে আছে; পাখি গাইতে ভুলে গেছে
সবাই মিলেছে আজ বসন্তের আনন্দ বিহারে।
নদীর ওপারে বালুচরে খেলা করে চখাচখি
এমন বসত চাই, যেখানে মানব-ঈর্ষা নাই
বিদ্বেষ-বৈরিতা নাই। দ্যাখো, আকাশ ভাইঙ্গা পড়ে
জোছনার অপরূপ ধারা, ভালোবাসা-ঘরে কোনো
দেয়াল থাকে না, চারদিকে ঝরে আলোর ফোয়ারা।
বাতাস ছুঁইয়া বলো, ওয়াদার বরখেলাপ হবে না
মৃত্তিকা ছুঁইয়া বলো, চিরদিন রবে আমার পাশেই।
৯.
আমি যদি বেভুল বেহুলা হই তুমি লক্ষ্মীন্দর
সাপে কাটা মরা লাশ নিয়ে আমি ভেলায় ভেসেছি
কতকাল; আশেপাশে কেহ নাই, অকূল দরিয়া-
কোথাও যে আলো নাই, ডুবে গেছে দিনের সুরুয
নদীর উত্তাল ঢেউ ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই;
নিরাশ দরিয়া মাঝে কেউ জ্বালে না আশার দীপ
জলেই সংসার তার জলেই জীবন; ঘরে ফিরে
যাওয়ার কোনো পথ জানা নাই; গন্তব্য অজানা
নারীর সাধনা-প্রেম, নিরন্তর গাঢ় তপস্যায়
অতঃপর একদিন মৃতদেহে জেগে ওঠে প্রাণ।
মৃতকে বাঁচাতে পারে নারী; ভালোবাসা মমতায়
নিজ দেহে ফোটাতে পারে সে প্রিয় সন্তান-কুসুম
একটি প্রাণের মাঝে যে আরেক প্রাণের স্পন্দন
জাগে, যে স্বর্গীয় অনুভূতি নিত্য পরশ বোলায়
একান্ত নারীই বোঝে অস্থি-মাংসে নিত্য অনুভবে।
১০.
মরদ পুরুষ বলে মাথা ঢাকো, চোখ-মুখ ঢাকো
ঢাকো কান-গ্রীবা-চুল, এমনকি পায়ের পাতাও
যাবে না বেআব্রু রাখা; তাতে নাকি মুনি-ঋষি
পুরুষের ধ্যান নষ্ট হয়, ইবাদত যায় টুঁটে!
এতই ঠুনকো যদি ইমানের জোর, কী করে সে
ভাবে অনায়াসে পেয়ে যাবে অনিন্দ্য স্বর্গের চাবি?
আগে ইমানডা ঠিক করো; বোরকা-হিজাব পরো
বেরহম দিলে, দ্যাখবা সবই ঠিক হয়ে গেছে।
কী করে নিজের দোষ সে অন্যের ওপর চাপায়?
হে মিয়া কী করে মহ্বতের চেয়ে শাস্ত্রের বিধান
কিংবা সামাজিক রীতি বড় করে দেখে? জানে না সে
দয়িতার মন ভেঙে দিলে খোদার আরশ কাঁপে।
মনে কি পড়ে না তার কত ছলে, কত লহমায়
একদা আমাকে বাঁধতে চেয়েছে পরান-বন্ধনে।





