কবুতর পালনের সূচনা হয় মোগলদের হাতে?
সুপ্রাচীনকাল থেকে কবুতর পালন ও প্রশিক্ষণ বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয় ছিল। মোগল সম্রাটরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। দূরবর্তী বিভিন্ন দেশ থেকে কবুতর সংগ্রহ করে দরবারে তাদের লালন-পালন করতেন। মধ্য এশিয়ায় মোগলদের জন্মভূমি ফারগানা থেকে উড়ন্তপরী (ফেইরি ফ্লাইং) নামের কবুতর গ্রহণের সময় সম্রাট আকবরের চেহারায় যে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল, আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’ গ্রন্থে তার মনোমুগ্ধ বিবরণ পাওয়া যায়।
আইন-ই-আকবরীতে (আকবরনামা) আবুল ফজল কবুতর বিষয়ে একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় প্রণয়ন করেছেন; যেখানে কবুতর পালন, প্রশিক্ষণ, কবুতর উড়িয়ে বিনোদন গ্রহণ (তাদের ভাষায় ঈশকবাজি) ও বিভিন্ন রঙের রাজকীয় কবুতরের বর্ণনা রয়েছে। জানা যায়, সম্রাট আকবরের দরবারে ২০ হাজারেরও বেশি কবুতরের সংগ্রহ ছিল, যার মধ্যে মাত্র ৫০০ কবুতর ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্যসূচক। যাদের ‘খাস’ বলে বিবেচনা করা হতো। সম্রাট যখন কোথাও যাত্রা করতেন, তখন বহনকারীরা খোপের ভেতর করে কবুতরগুলোকেও সেখানে নিয়ে যেত। কবুতরকে বিভিন্ন কূটকৌশল ও দেহ কসরতের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এই দেহ কসরতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি চাকা (চরকা) নামে পরিচিত ছিল। একটি চক্রের মধ্যে কবুতরগুলো নিজেদের তেজি ভঙ্গিমায় ছুড়ে দিয়ে শরীরী কসরত দেখাত আর উত্সুক জনতা তা দেখে চিত্তবিনোদন লাভ করত। কখনো বা তাদের দিয়ে নানা রকম খেলা ও ডিগবাজি দেখানো হতো। নির্বাচিত কবুতর একটি ধাপে ১৫টি চরকা ও ৭০টি ডিগবাজির খেলা দেখাত। আবুল ফজলের ভাষায়, সাধারণ মানুষ যদিও কবুতর উড্ডয়ন ও তাদের আরো সব গুণের সঙ্গে পরিচিত ছিল, তবে কিছু মানুষ কবুতরকে উপজীব্য করে তাদের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ণয়, সমস্যা সমাধান, সম্পর্ক দৃঢ়করণ ইত্যকার বুলি ছড়িয়ে সমাজে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করত।
যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রেও কবুতরের ভূমিকা বেশ অগ্রগণ্য। কবুতরের একটি প্রজাতিকে শুধু সংবাদ আদান-প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। আবুল ফজলের ভাষায়, ‘রাথ’ প্রজাতির কবুতর ছিল সংবাদ প্রদান বা আনয়নকাজের জন্য বেশ অভিজ্ঞ।
সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ মুসাভীর কবুতরনামা
মোগল আমলের পুস্তক সংগ্রহশালায় সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘কবুতরবিষয়ক গ্রন্থ’ (কবুতরনামা)। কবি সাইq্যেদ মুহাম্মাদ মুসাভী ছিলেন এ গ্রন্থের রচয়িতা। সাধারণের কাছে তিনি কাব্যিক নাম ‘ভালী’ নামে পরিচিত ছিলেন। রচনাটি দুই লাইনের শ্লোক দ্বারা ১৬৩টি অংশে তিনি রচনা করেন এবং কবিতার সন্নিবেশে ছোট ছোট গদ্য দ্বারা বিভিন্ন প্রকার কবুতরের সৌন্দর্য, বৈশিষ্ট্য ও ওড়ার ধরন সম্পর্কে বর্ণনা করেন। বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ মিয়া খুবান নামে জনৈক বন্ধুর উদ্দেশে এটা লিখেছিলেন তিনি।
কবি মুহম্মদ মুসাভী পারস্যের খুরসানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি হায়দরাবাদে অভিবাসী হন এবং আরো পরে আর্কোটে (তামিলনাড়ু) বসতি স্থাপন করেন এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার অন্যান্য রচনার মধ্যে কাব্যিক গল্প সুফি মাসনাভি (নাজিম-আল-হুদা) ও মোরগযুদ্ধ নিয়ে লেখা কবিতা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ডারউইনের কবুতরপ্রেম
চার্লস ডারউইন (১৮০৯-৮২) ছিলেন একজন একনিষ্ঠ কবুতরপ্রেমিক। অত্যধিক পাখিপ্রীতির নেশায় তিনি তার গ্রামের বাড়ি কেন্টের ডোইনে পাখির জন্য প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন।
পাখি নিয়ে গবেষণার একপর্যায়ে তিনি মাদ্রাজ সিভিল সার্ভিসে কর্মরত প্রকৃতিবিদ ও নৃতাত্ত্বিক স্যার ওয়াল্টার এলিয়টের (১৮০৩-৮৭) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ডারউইন আবুল ফজলের কবুতরবিষয়ক গ্রন্থের কথা জানতেন। তিনি লেখেন, ‘আমি শুনেছি যে, ফার্সি ভাষায় আইন-ই-আকবরীতে এর বর্ণনা রয়েছে। ভারত হাউজের (ইন্ডিয়া হাউজ) সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে আমি এর অনুবাদকাজ করতে পারি (ভারত গ্রন্থাগার, বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরি সংগ্রহশালার অংশ)।’ ১৮৫৬ সালে এলিয়ট ভারত ও বার্মা থেকে বিভিন্ন পাখি ও পাখির চামড়া সংগ্রহ করে ডারউইনের জন্য পাঠান। সঙ্গে সংযুক্ত করেন সাইq্যেদ মুহাম্মাদ মুসাভীর লেখা কবুতরনামার একটি ইংরেজি অনুবাদ। প্রসঙ্গক্রমে ডারউইন এ গ্রন্থের উল্লেখ করেন তার পশু-পাখিবিষয়ক প্রবন্ধ ‘দ্য ভেরিয়েশন অব অ্যানিমেলস অ্যান্ড প্লান্টস আন্ডার ডমেস্টিকেশন’-এ।
কবুতর পালন বিষয়ে আরো বর্ণনা পাওয়া যায় জেমস সি. লিয়ালের (১৭৯৭-১৮৭৫) ‘ফেন্সি পিজিয়ন’ গ্রন্থে। কবুতরের প্রজনন, জাত নির্ণয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত লিখেছেন তিনি ফেন্সি পিজিয়নে। লিয়াল ডারউইনকে এলিয়টের দেয়া কবুতরবিষয়ক বইটি সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি লেখেন। প্রত্যুত্তরে তিনি (ডারউইন) বইটি লাইব্রেরিতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান। বইটি হারিয়ে গেছে ভেবে ডারউইন বেশ উদগ্রীব হয়ে পড়েন। তারপর লিয়াল, স্যার ওয়াল্টার এলিয়টকে চিঠির মাধ্যমে ফার্সিতে লেখা কবুতরবিষয়ক বইটির মূল সংকলনটি আছে কিনা জানতে চান! তিনি জানান, সেটি তার লাইব্রেরি থেকে হারিয়ে গেছে। সৌভাগ্যক্রমে এলিয়ট পরবর্তীতে তার অনুবাদটি আবিষ্কার করেন এবং লিয়ালকে সরবরাহ করেন।
ডারউইন তার সংগ্রহ করা কবুতরের কঙ্কাল ও পালকগুলো ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দান করে দেন এবং বর্তমানে সেগুলো ‘মিউজিয়াম ট্রেজারসে’ সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
টীকা:
* ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার আবুল ফজল ছিলেন সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভাসদদের একজন।
* আকবরনামা হলো সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কার্যবিবরণীর লিখিত দলিল, যা পারস্য ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল।
* খুরসান তত্কালীন পারস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। বর্তমান ইরানের উত্তর-পূর্ব অংশে এর অবস্থান।
* চার্লস ডারউইন (১৮০৯-৮২) ছিলেন ব্রিটেনের প্রসিদ্ধ জীববিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিদ ও ভূতাত্ত্বিক।
* জেমস সি. লিয়াল ছিলেন একজন স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ। ভূতত্ত্বের লেখক হিসেবে সুপরিচিত।
* ‘মিউজিয়াম ট্রেজারস’ হলো ব্রিটেনের প্রসিদ্ধ জাদুঘর, যেখানে অতীত ও বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রাণীর চিহ্ন ও নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।





