চিত্রাঙ্গ ছুটতে ছুটতে এসে মন্থরকদের সঙ্গে মিলিত হলো। তার ছোটার পেছনে ভয়ের কোনো কারণ আছে কিনা, এটা ভেবে মন্থরক জলে প্রবেশ করল। হিরণ্যকও গর্তে প্রবেশ করল। লঘুপতনক উড়ে গাছের মাথায় গিয়ে বসল। লঘুপতনক অনেক দূর পর্যন্ত তাকিয়ে দেখল, ভয়ের কোনো কারণ নেই। তাই তার কথায় সবাই আবার এসে মিলিত হলো। মন্থরক চিত্রাঙ্গর উদ্দেশে বলল, বন্ধু, তোমাকে স্বাগত। এখানে কচি কচি ঘাস আছে, জলাশয়ে নির্মল জল আছে। তুমি ইচ্ছেমতো খাওদাও আর আরামে থাকো।

চিত্রাঙ্গ বলল, আমি তোমাদের শরণাগত। তোমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কামনা করি।

হিরণ্যক বলল, তুমি তো আমাদের বন্ধু হয়েই গেছ। দেখো, রক্তের সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক, বংশানুক্রম ও বিপদ থেকে রক্ষা করা— এ চার প্রকারে বন্ধুলাভ হয়। কাজেই তুমি আমাদের বন্ধু ভেবে নিশ্চিন্তে এখানে থাকতে পারো।

চিত্রাঙ্গ এ কথা শুনে আহার ও জলপান করে একটা গাছের ছায়ায় বসল। এমন সময় মন্থরক তাকে বলল, বন্ধু, তুমি যে ছুটতে ছুটতে এদিকে এলে, এর কারণ কী? তোমাকে কি কেউ ভয় দেখিয়েছে?

চিত্রাঙ্গ বলল, কলিঙ্গরাজ্যে রুক্মাঙ্গদ নামে এক রাজা আছেন। তিনি দিগ্বিজয় করতে করতে চন্দ্রভাগা নদীর তীরে শিবির গেড়েছেন। কাল ভোরেই তিনি এ কর্পূর সরোবরের তীরে এসে পড়বেন। ব্যাধদের কথাবার্তা থেকে এ কথা জানতে পারলাম। তাই এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। সময় থাকতেই যা করণীয় তা করো।

চিত্রাঙ্গর কথা শুনে মন্থরক ভয় পেয়ে বলল, আমি অন্য জলাশয়ে যাব।

লঘুপতনক ও চিত্রাঙ্গ বলল, আমরাও অন্যত্র চলে যাব।

এদের কথা শুনে হিরণ্যক হেসে বলল, অন্য জলাশয়ে যেতে পারলে মন্থরকের জন্য মঙ্গল। কিন্তু স্থলপথে যাওয়ার সময় তাকে রক্ষা করবে কীভাবে? দেখো, যারা জলে বাস করে, জলই তাদের পরম বল (অর্থাৎ জলেই তাদের শক্তি); যারা দুর্গে বাস করে, দুর্গই তাদের পরম বল; পশু ও অন্যান্য প্রাণীর নিজের নিজের জায়গাই পরম বল। অর্থাৎ যার যার আবাসভূমিই তার তার নিরাপদ জায়গা। বন্ধু লঘুপতনক, তোমাদের এরূপ সিদ্ধান্তের ফল হবে সেই বণিকপুত্র চারুদত্তের মতো, যে অন্য কর্তৃক নিজের স্ত্রীর স্তন মর্দিত হতে দেখে দুঃখ পেয়েছিল।

লঘুপতনকরা বলল, সে কী রকম?

হিরণ্যক বলল, শোনো, বলছি...

চারুদত্তকথা

কান্যকুব্জ নগরে বীরসেন নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি রাজপুত্র তুঙ্গবলকে বীরপুর নগরে শাসক নিযুক্ত করেন। তুঙ্গবল একদিন নগরীতে ভ্রমণ করতে করতে চারুদত্ত নামে এক বণিকপুত্রের স্ত্রী অতি যৌবনবতী লাবণ্যবতীকে দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে সে কামাবিষ্ট হয় এবং প্রাসাদে ফিরে গিয়ে তার কাছে দূতীকে পাঠায়। দূতী গিয়ে লাবণ্যবতীকে রাজপুত্রের কথা বললে সে উত্তরে বলে, আমি পতিব্রতা নারী। স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মতো কাজ আমি কীভাবে করব? দেখো, পণ্ডিতেরা বলেন, সে-ই প্রকৃত স্ত্রী, যে গৃহকর্মে নিপুণা, সন্তানবতী ও পতিপ্রাণা। যার প্রতি স্বামী সন্তুষ্ট নন, তাকে স্ত্রী বলা উচিত নয়। নারীদের স্বামী তুষ্ট হলে সব দেবতা তুষ্ট হন। কাজেই আমার স্বামী আমাকে যা যা আদেশ করেন, আমি তা তা বিনাবিচারে করি।

দূতী বলল: তাহলে এই তোমার সিদ্ধান্ত?

লাবণ্যবতী। অবশ্যই।

তারপর দূতী তুঙ্গবলের কাছে গিয়ে সব জানাল। তুঙ্গবল বলল, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে নিজ থেকে অন্যের হাতে তুলে দেবে, এটা কি কখনো হয়?

 

দূতী। রাজকুমার, একটা উপায় বের করুন। শাস্ত্রে আছে না— জোর করে যা না হয়, কৌশলে তা সহজেই হয়। তাই তো সামান্য একটা শেয়াল কাদায় ফেলে একটা হাতিকে মেরেছিল।

তুঙ্গবল সাগ্রহে বলল: কী রকম?

দূতী। শুনুন তাহলে...

 

কর্পূরতিলক কাহিনী

ব্রহ্মারণ্যে কর্পূরতিলক নামে এক হাতি ছিল। তাকে দেখে শেয়ালরা ভাবল, একে যদি কোনোভাবে মারা যায়, তাহলে এর মাংসে আমাদের চার মাস দিব্যি চলে যাবে। তখন এক বৃদ্ধ শেয়াল বলল, বুদ্ধিবলে আমি একে মারব। তোমরা আমার সঙ্গে থেকো।

শেয়ালরা তার কথায় সায় দিল। তারপর একদিন সেই বৃদ্ধ শেয়াল কর্পূরতিলকের কাছে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলল, মহাশয়, অনুগ্রহ করে আমার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করুন।

কর্পূরতিলক বলল, কে তুমি? কোত্থেকে এসেছ?

শেয়াল বিনয়ের সঙ্গে বলল, আমি শেয়াল। বনের সব পশু মিলে আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। কারণ আমাদের কোনো রাজা নেই। রাজা ছাড়া রাজ্য চলে না। রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রজারা বাঁচতে পারে না। তাই এ বনরাজ্যে আমাদের একজন রাজা চাই। রাজা হওয়ার সব গুণ আপনার মধ্যে আছে। শাস্ত্রে আছে, যিনি বংশ, আভিজাত্য ও আচার-ব্যবহারে অতি শুদ্ধ, প্রতাপশালী, ধার্মিক ও নীতিবিদ্যায় পারদর্শী, একমাত্র তিনিই রাজা হওয়ার যোগ্য। অতএব, দয়া করে আপনি আমাদের রাজা হোন।

শেয়ালের প্রস্তাবে কর্পূরতিলক মনে মনে খুশি হলো। সে ভাবল, মন্দ কি? রাজা হলে সবাই আমাকে সমীহ করবে। আমার কথায় উঠবে-বসবে। তাই সানন্দচিত্তে সে বলল, তোমরা সবাই যখন চাচ্ছ, তখন তা-ই হোক।

শেয়াল মনে মনে খুশি হয়ে বলল, তাহলে আর বিলম্ব কেন? শুভলগ্ন যাতে অতিক্রান্ত না হয়, সেজন্য তাড়াতাড়ি চলুন।

এই বলে শেয়াল উঠে চলতে লাগল। আর কর্পূরতিলকও রাজ্যের লোভে তার পেছন পেছন ছুটতে লাগল। শেয়ালের শরীর হালকা। তাই সে সহজেই কাদার ওপর দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু কর্পূরতিলক তার ভারী দেহ নিয়ে কাদায় আটকে গেল। সে শেয়ালকে ডেকে বলল, বন্ধু, আমি যে কাদায় আটকে গেলাম! আমায় বাঁচাও।

শেয়াল হাসতে হাসতে দূর থেকে তার লেজটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা ধরে উঠে আসুন।

কর্পূরতিলক বিপন্ন কণ্ঠে বলল, তা কী করে হয়? তুমি তো অতি ক্ষুদ্র।

শেয়াল মুচকি হেসে বলল, লোভ অতিশয় খারাপ। রাজা হওয়ার লোভে যে আমার মতো প্রাণীর কথায় বিশ্বাস করে, তার মরণ এভাবেই হয়। তাই তো শাস্ত্রে বলা হয়েছে: সৎসঙ্গে জীবন, অসৎসঙ্গে মরণ।

এভাবে কাদায় পড়ে কর্পূরতিলকের মৃত্যু হলে শেয়ালরা তাকে খেয়ে ফেলল।

কর্পূরতিলকের কাহিনী বলে দূতী তুঙ্গবলকে বলল, রাজকুমার, লাবণ্যবতীকে পেতে হলে আপনিও একটু বুদ্ধি খাটান। একটা কৌশল বের করুন।

তারপর দূতীর পরামর্শে তুঙ্গবল বণিকপুত্র চারুদত্তকে তার সেবক নিযুক্ত করল এবং তাকে তার সমস্ত গোপন কাজে ব্যবহার করতে লাগল।

একদিন তুঙ্গবল স্নান করে প্রসাধন মেখে এবং সোনার অলঙ্কার পরে চারুদত্তকে বলল, আজ থেকে এক মাস আমি গৌরীব্রত পালন করব। সুতরাং প্রতি রাতে একজন করে কুলীন যুবতী মেয়েকে এনে আমার হাতে দেবে। তাকে আমি সসম্মানে পূজা করব।

সেদিন থেকে চারুদত্ত একজন করে যুবতীকে এনে তুঙ্গবলকে দেয় এবং তুঙ্গবল কী করে, তা গোপনে দেখতে থাকে। সে দেখে, তুঙ্গবল যুবতীদের না ছুঁয়ে দূর থেকে বস্ত্র, অলঙ্কার, গন্ধদ্রব্য, চন্দন প্রভৃতি দিয়ে তাদের পূজা করে এবং রক্ষীদের দিয়ে যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এসব দেখে তুঙ্গবলের প্রতি চারুদত্তের বিশ্বাস জন্মে। তাই সে লোভে পড়ে একদিন নিজের স্ত্রী লাবণ্যবতীকে এনে তুঙ্গবলের হাতে তুলে দেয়। তুঙ্গবল লাবণ্যবতীকে চিনতে পেরে দ্রুত উঠে গিয়ে তাকে গাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে। তারপর তাকে পালঙ্কে নিয়ে তার সঙ্গে বিলাসে মগ্ন হয়। চারুদত্ত এসব দেখে হতবাক হয়ে যায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। নিজের হাতে সে তার স্ত্রীর সর্বনাশ করেছে। সে মনে মনে খুব দুঃখ পায়।

এসব বলে হিরণ্যক সবার উদ্দেশে বলল, এজন্যই আমি বলেছিলাম, আমাদেরও না বন্ধু মন্থরকের বিপদ এ রকম তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হয়।

কিন্তু হিরণ্যকের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে মন্থরক ভয়ে ভয়ে সেই জলাশয় ছেড়ে চলল। অগত্যা হিরণ্যক প্রভৃতিও শঙ্কিতচিত্তে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। কিছু দূর যাওয়ার পর হিরণ্যকের কথাই সত্য প্রমাণ হলো। মন্থরক এক ব্যাধের হাতে ধরা পড়ল। ব্যাধ তাকে কাঁধে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। চিত্রাঙ্গ, লঘুপতনক ও হিরণ্যক ব্যথিতচিত্তে তার পেছন পেছন চলল। হিরণ্যক বিলাপ করে বলতে লাগল, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দুঃখ একটার পর একটা আসতেই থাকে; দুর্বলতার সুযোগে অনর্থ বহুগুণ হয়।

এভাবে বহুক্ষণ বিলাপ করে হিরণ্যক চিত্রাঙ্গ ও লঘুপতনককে বলল, এই ব্যাধ বন থেকে বের হওয়ার আগেই মন্থরককে আমাদের মুক্ত করতে হবে।

চিত্রাঙ্গ ও লঘুপতনক বলল, কীভাবে, তা তাড়াতাড়ি বলো।

হিরণ্যক বলল, চিত্রাঙ্গ একটা জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে মড়ার মতো পড়ে থাকবে। আর লঘুপতনক তোমার ওপর বসে তোমাকে ঠোকরাতে থাকবে। তা দেখে ব্যাধ নিশ্চয়ই মন্থরককে ফেলে চিত্রাঙ্গকে ধরতে যাবে। আমি তখন মন্থরকের বাঁধন কেটে দেব। সে জলাশয়ে ঢুকে পড়বে। আর ব্যাধ কাছে যাওয়ার আগেই তোমরা পালাবে।

হিরণ্যকের কথামতো চিত্রাঙ্গ ও লঘুপতনক জলাশয়ের পাড়ে চলে গেল। এদিকে ব্যাধ পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে সেই জলাশয় থেকে জল পান করে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসল। হঠাৎ চিত্রাঙ্গকে দেখতে পেয়ে একটা ছুরি হাতে সেদিকে ছুটল। এদিকে হিরণ্যক দ্রুত মন্থরকের বাঁধন কেটে দিল। মন্থরক জলাশয়ে প্রবেশ করল। ওদিকে ব্যাধ কাছে যাওয়ার আগেই চিত্রাঙ্গ ও লঘুপতনক পালিয়ে গেল। ব্যাধ ফিরে এসে দেখল, কচ্ছপটি নেই। তখন সে দুঃখের সঙ্গে বলল, নিশ্চিতকে ফেলে যে অনিশ্চিতকে পেতে যায়, তার সবই হারায়। আমি একজন মূর্খ। তাই হরিণটাকে পেতে গিয়ে হাতের কচ্ছপটিও হারালাম।

এই বলে ব্যাধ হতাশ হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো। এদিকে হিরণ্যক, চিত্রাঙ্গ, লঘুপতনক ও মন্থরক— চার বন্ধু সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

রাজপুত্ররা মিত্রলাভের গল্পগুলো শুনে সানন্দে বলল, গুরুদেব, খুব ভালো লাগল। আমরা খুব খুশি। আমাদের সব ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। জীবনে একজন সৎ বন্ধুর যে কত প্রয়োজন, তা আমরা বুঝতে পেরেছি। একজন সৎ বন্ধুই পারে বিপদে বন্ধুকে উদ্ধার করতে।

বিষ্ণুশর্মা বললেন, তোমাদের ভালো লেগেছে শুনে আমারও ভালো লাগছে। আমি প্রার্থনা করছি, সজ্জনেরা সৎ মিত্রলাভ করুন। দেশ ধন-সম্পদে ভরে উঠুক। রাজারা পুত্রবৎ তাঁদের প্রজাদের পালন করুন। তোমাদের মনের তুষ্টি বিধানের জন্য আমার রচিত এ নীতিশাস্ত্র নববধূর মতো সর্বদা তোমাদের অন্তরে বিরাজ করুক। চন্দ্রচূড় মহাদেব সবার মঙ্গল করুন।

মিত্রলাভ সমাপ্ত