ম্যালেরিয়ার কবলে না পড়লে চট্টগ্রামের ছেলে শরত্চন্দ্র দাস (১৮৪৯-১৯১৭) কি বিখ্যাত গুপ্তচর ও তিব্বতবিষয়ক পণ্ডিত হয়ে উঠতেন? নিশ্চিত করে জবাব দেয়াটা কঠিন। হয়তো সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পুরো জীবন কলকাতায় কাটিয়ে দিতেন। ১৮৭৪ সালে ম্যালেরিয়া থেকে সেরে উঠে ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার প্রস্তাব পেলেন। প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্বেল। পার্বত্য এলাকার আবহাওয়া শরীরের জন্য উপকারী হবে বিবেচনায় শরৎ রাজি হয়ে যান। স্কুলটি সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ের সন্তানদের ইংরেজি ও বিজ্ঞানশিক্ষা দেয়া। মূল উদ্দেশ্য ছিল মানচিত্র আঁকার কলাকৌশল শেখানো। ফলে মাত্র ২৫ বছর বয়সেই শরত্চন্দ্র স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হয়ে যান।

শরত্চন্দ্র দাশ ১৮৪৯ সালে চট্টগ্রামের আলমপুর গ্রামে এক বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

ইউরোপীয়দের কল্পনায় তিব্বত ও তার রাজধানী লাসা ছিল রূপকথার মতো। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন আধ্যাত্মিক এক নগর, স্বর্গীয় ভূমি, রূপকথার রাজ্য। আঠারো শতকের শেষ দিকে তিব্বত পশ্চিমাদের তাদের দেশে প্রবেশের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব দেখাতে শুরু করল। তিব্বতের সরকার এ বিষয়ে চীনের চাপে ছিল। তাই পশ্চিমাদের প্রবেশ করতে দিয়ে তারা ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হতে চাইছিল না। সে সময় তিব্বতের গাঘেঁষেই ছিল রুশ ও চীন সাম্রাজ্যের অবস্থান। ব্রিটিশরা বিশেষভাবে রুশদের আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে চিন্তিত ছিল। তাই এ এলাকার ভূগোল ও জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে ব্রিটিশরা একটু ভালোভাবে অবগত হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল, তিব্বত বাইরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। শুধু চীনারাই কিছুটা প্রবেশাধিকার পেত। এ সময় বিশেষত ভারতীয় বা কোনো ব্রিটিশের পক্ষে তিব্বতে প্রবেশ ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ। এটা ব্রিটেনের জন্য মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারে একটা বাধা হয়ে দাঁড়াল। অন্যদিকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা কিন্তু ঐতিহাসিক আমল থেকেই তিব্বতে প্রবেশাধিকার পেতেন। এদের বলা হতো পণ্ডিত। ব্রিটিশদের মাথায়ও এ সুযোগটি ব্যবহারের চিন্তা এল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্রিটিশরা পণ্ডিত তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা পণ্ডিতদের ছদ্মবেশে তারা তিব্বতে গুপ্তচর প্রেরণ শুরু করল। এ পণ্ডিতরা গোপন বাক্সে কম্পাস আর ১০৮ দানার প্রার্থনা তজবি নিয়ে ছদ্মবেশে তিব্বতে যাত্রা করেন। কিন্তু এ পণ্ডিতদের ভূগোল ও তিব্বতের স্থানীয় সমাজ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকায় আশানুরূপ কাজ হচ্ছিল না। পরিমল ভট্টাচার্য এ পরিস্থিতি নিয়ে লিখেছেন, “ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শরত্চন্দ্র দাশ ছিলেন এ কাজের জন্য একেবারে উপযুক্ত। এবং তিব্বত নিয়ে তার ‘জ্বলন্ত আগ্রহ’ ব্রিটিশ প্রশাসকদের শীর্ষমহলের চাহিদার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। এ দুটির মধ্যে কোনটি যে আগে ঘটেছিল, তা অবশ্য নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু দার্জিলিংয়ে স্থানীয় ছেলেদের জন্য বোর্ডিং স্কুল খোলা এবং একজন তরুণ বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারকে সেখানে নিয়োগ করাটা নিশ্চয়ই একটি বড় পরিকল্পনার অংশ ছিল। নতুন এ স্কুল সরকারের নজরদারিতে ছিল। স্কুলটির পৃষ্ঠাপোষক ছিলেন স্যার আলফ্রেড ক্রফট। ইনি ছিলেন পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের পরিচালক ও শরত্চন্দ্রের পৃষ্ঠপোষক। স্কুলটি এমনকি ভাইসরয়ও পরিদর্শন করেছিলেন।”

তাই এটা বলাই যায় যে, মূলত ভারত-তিব্বত সীমান্তে কাজ করার জন্য এখানে গুপ্তচরদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। শরত্চন্দ্র দাশ ছিলেন তাদেরই একজন। তিব্বত নিয়ে আগ্রহেই সম্ভবত তিনি সেখানে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন। যেন ব্লোফেল্ডকে ধরতে জাপানি ভাষা ভালোমতো শিখতে চাইছেন জেমস বন্ড!

গল্পের আরো গভীরে প্রবেশের আগে এবার আরেকজন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন, যার নাম য়ুগেন সো। তিনি ছিলেন সিকিমে বসবাসকারী একজন তিব্বতি। সিকিমের শাসনকর্তাদের সঙ্গে তার জানাশোনা ছিল। য়ুগেনের জন্ম ১৮৫১ সালে ইয়াংয়াংয়ে। তিনি ১০ বছর বয়সে পেমা-ইয়াংেস মঠে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। এখানে তিনি ১২ বছরব্যাপী সন্ন্যাসজীবনের পাঠ নেন। ১৮৭৩ সালে য়ুগেন সিকিমের রাজার প্রতিনিধি হিসেবে দার্জিলিং আসেন। ডেপুটি কমিশনার এডগার তাকে দার্জিলিংয়ে প্রস্তাবিত ভুটিয়া স্কুলে শিক্ষকতা করতে অনুরোধ করেন। স্কুল তখনো নির্মিত হয়নি, তাই সে সময়ের জন্য তাকে ডেপুটি কমিশনারের দপ্তরে নিয়োগ দেয়া হয়। এডগারের সঙ্গে তার তিব্বত সফরের সুযোগ হয়। ১৮৭৪ সালে তিনি দার্জিলিংয়ের ভুটিয়া স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। চার বছর এ স্কুলে শিক্ষকতা করার পর তিব্বত সফরের জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। তিনিই শরত্চন্দ্রের জন্য পাসপোর্ট জোগাড় করে এনেছিলেন, যার সাহায্যে শরৎ দুবার তিব্বত ভ্রমণ করেন। প্রতিবারই শরতের সঙ্গী ছিলেন য়ুগেন। য়ুগেন শরেক এসব সফরে সব ধরনের সহায়তা করেছেন।

য়ুগেন ১৮৭৮ সালে শুভেচ্ছা সফরে তশিল-হুন-পো ও লাসা যান। এ সফরে তিনি শরত্চন্দ্রের তিব্বত সফরের জন্য অনুমতি আদায়ের চেষ্টা করেন। অনুমতি আদায়ে তিনি সফল হন। তশিল-হুন-পোর পাঞ্চেন রিনপোচের প্রধানমন্ত্রী শরত্চন্দ্রকে তিব্বত সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিব্বত সফরের সময় শরত চীনা ও তিব্বতি লামাদের সন্দেহ বা কৌতূহলের মুখে পড়তে পারতেন। সে সমস্যারও সমাধান করে দেন পাঞ্চেন রিনপোচের প্রধানমন্ত্রী। তিনি শরেক পাঞ্চেন রিনপোচের প্রধান মঠের ব্রহ্মবিদ্যা বিভাগের ছাত্র হিসেবে নিবন্ধন করে দেন। এছাড়া তার জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত একটি পাসপোর্টেরও ব্যবস্থা করা হয়।

দরকারি কাগজপত্র নিয়ে শরত্চন্দ্র ১৮৭৯ সালের জুনে দার্জিলিং থেকে তশিল-হুন-পোর উদ্দেশে রওনা হন। তার সফরসঙ্গী ছিলেন য়ুগেন। শরৎ সেখানে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিথি হিসেবে। সেখানকার প্রধান মঠে তিনি বেশকিছু দুর্লভ গ্রন্থ পাঠের সুযোগ পেয়েছিলেন। ভারতে ফেরার সময় তিনি গ্রন্থগুলো তার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। এ ভ্রমণে শরৎ একটি দুর্দান্ত আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কাঞ্চনজঙ্ঘার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে তিনি একটি ভূখণ্ড আবিষ্কার করেন, যা এর আগে মানুষের অজানা ছিল। শরত্চন্দ্র এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্ববাসীর কাছে তার নিখুঁত ভৌগোলিক বিবরণ তুলে ধরেন। অন্যদিকে শরত্চন্দ্র তশিল-হুন-পোর প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। তিব্বতের মতো এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে থেকে বাকি দুনিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট খবর পাওয়া সম্ভব ছিল না। শরেক কাছে পেয়ে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমা দুনিয়ার অগ্রগতির নানা খবরাখবর জেনে নিয়েছিলেন। ছয় মাস অবস্থান করে তশিল-হুন-পো ছেড়ে আসার সময় শরতকে আবারো সেখানে সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী। কারণ তখনো পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে জানতে প্রধানমন্ত্রীর বাকি রয়ে গেছে।

প্রথমবার তিব্বত সফর থেকে ফিরে শরত্চন্দ্র তার ভ্রমণ ইতিবৃত্ত প্রকাশ করেন। তখনকার বাংলার প্রাদেশিক সরকার শরতের সেই বৃত্তান্ত প্রকাশ করেছিলেন এবং গ্রন্থের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন শরতের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক স্যার আলফ্রেড ক্রফট। এ বৃত্তান্তে তিনি যে পথের বর্ণনা দিয়েছেন, ১৮৮১-৮২ সালের তিব্বত ভ্রমণেও তিনি একই পথ ব্যবহার করেছিলেন।

১৮৮০ সালটা দার্জিলিংয়ে নিজের বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন শরৎ। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আরো কার্যকর তিব্বত অভিযানের। নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন তিব্বতের ইতিহাস, ধর্ম, জাতিগত বিন্যাস, লোকসংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি এ সময় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনা করেন, যেগুলো বেঙ্গল এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নাল ও বুড্ডিস্ট টেক্সট সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার মুখপত্রে প্রকাশিত হয়। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, বুড্ডিস্ট টেক্সট সোসাইটি অব ইন্ডিয়া শরৎ নিজেই গড়ে তুলেছিলেন। শরৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ে গবেষণা চালানো এ সংস্থার সম্পাদক ছিলেন।

পাঞ্চেন রিনপোচের প্রধানমন্ত্রীর সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করতে ১৮৮১ সালের নভেম্বরে শরত্চন্দ্র আবার তিব্বতে যান। যথারীতি সঙ্গে ছিলেন য়ুগেন গােসা। য়ুগেন এ সফরে শরতের একান্ত সচিব, সংগ্রাহক ও সমীক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তবে সব কাজেই শরৎ নিজে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। দুবার সফরেই তশিল-হুন-পো ছিল শরত্চন্দ্রের প্রধান শিবির। এখান থেকেই তিনি বিভিন্ন দিকে তার অভিযাত্রা পরিচালনা করেন। দ্বিতীয়বারের সফরে শরত্চন্দ্র লাসা সফরের দুর্লভ সুযোগ পেয়ে যান। শরতের আগে লাসা সফর করতে পেরেছিলেন মাত্র দুজন ভারতীয়। তারা হলেন নয়ন সিং ও কিষেণ সিং। এদের মধ্যে নয়ন গিয়েছিলেন ১৮৬৬ সালে ও কিষেণ ১৮৮০ সালে। কিষেণ তার লাসা সফরকে সফল করে তুলেছিলেন। তিনি লাসার ভূগোল ও তার পরিবেশের বৈশিষ্ট্যসহ একটি মানচিত্র তৈরি করেন। লাসায় অবস্থানকালে শরৎ লামাদের বেশ কয়েকটি সমাবেশে যোগ দেন। শহরের অনেক প্রধান স্থাপনা ও সৌধ পরিদর্শন করেন। তবে এক রহস্যময় কারণে লাসা শহর ও আশপাশে অনেক দর্শনীয় স্থানে তাকে যেতে দেয়া হয়নি। তার পরও শরতের ভ্রমণবৃত্তান্ত লাসাকে জানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। লাসা ভ্রমণের বৃত্তান্তকে শরৎ লিখেছেন, ‘লাসা, আমার স্বপ্নের লাসা’। লাসা ভ্রমণের বৃত্তান্তে লাসার ধর্মীয় জীবন ও একটি বিশেষ বুদ্ধমূর্তির বিবরণ পাওয়া যায়। শরত্চন্দ্র লিখেছেন, “১ জুন। আজ বছরের পবিত্রতম দিন। এই দিনেই ভগবান বুদ্ধ মহানির্বাণ লাভ করেছিলেন। তিব্বতি চতুর্থ মাসের পনেরতম দিনটা বুদ্ধদেবের মৃত্যুদিন। এই দিনটা এবার এই তারিখে পড়েছে। আজ লাসা ও তার আশেপাশের প্রত্যেক পর্বত শীর্ষে, মন্দিরে, ভজনালয়ে, মঠে ও গৃহস্থ বাড়িতে ধূপকাঠি ও প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে। পুরুষ-মহিলা-শিশু নির্বিশেষে সকলেই জো-খাং এর পবিত্র ভজন মন্দিরে উপস্থিত হয়ে ভগবান বুদ্ধের পূজায় মগ্ন হয়েছে। ‘বুদ্ধের অশেষ করুণা আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়ুক সকল মানব জীবনে’— এই প্রার্থনাই জানাচ্ছেন সকলে। প্রত্যেকের হাতে ধূপকাঠি, মাখনের খণ্ড, খাতাগসহ নানা উপাচার। আমরাও একসময় মানুষের ভিড়ে মিশে গেলাম।”

জো-খাং মন্দিরের একটু দূরে শরৎ একটি বিরাট আকারের পপলার গাছ দেখেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, স্থানীয়দের বিশ্বাস, বুদ্ধের চুল থেকেই এ গাছের জন্ম। কাছেই একটা বিশাল মন্দির শরতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এ মন্দির ও মন্দিরের একটি বিশেষ বুদ্ধমূর্তির বিবরণী দিতে গিয়ে শরত্চন্দ্র লিখেছেন, ‘ভারী কাঠের স্তম্ভের ওপর মন্দিরের মূল কাঠামোটা বসানো হয়েছে। ওপর তলায় বিশাল প্রার্থনা কক্ষ। সেখানে প্রায় একশো সন্ন্যাসী বুদ্ধমূর্তির সামনে বসে আরাধনা করছেন। এই মূর্তি নাকি বুদ্ধদেব জীবিত থাকার সময়েই মগধে তৈরি করা হয়েছিল। তাই এই মূর্তিটি ভুবনবিখ্যাত। জনশ্রুতি আছে যে, সোনা, রূপা, লোহা, তামা ও দস্তা ধাতুর সমন্বয়ে এই মূর্তিটি নাকি ভগবান ইন্দ্রের তত্ত্বাবধানে তৈরি করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা।’ এ বুদ্ধমূর্তি নিয়ে একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঐতিহাসিক তথ্য দিয়েছেন শরৎ। তিনি জানিয়েছেন, ‘এই মূর্তিটি প্রথমে ভারত থেকে চীনের রাজধানীতে পাঠানো হয়েছিল। পশ্চিমের যবনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মগধ রাজাকে সাহায্য করার পুরস্কার স্বরূপ চীন সম্রাটের হাতে এটি তুলে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সম্রাট তাই-ত্সাং এর কন্যা রাজকুমারী কোঞ্জোরর সঙ্গে তিব্বতের রাজার বিয়ে হয়। যৌতুক হিসেবে রাজকুমারী এই মূর্তিটি লাসায় নিয়ে আসেন।’ শরত্চন্দ্র লাসায় অবস্থানকালে সেখানে জল বসন্তের আক্রমণ হয়েছিল, যদিও তিনি নিরাপদেই ছিলেন।

৪ জুন জো-খাং মঠে গিয়ে অদ্ভুত এক দেবী মূর্তি দেখতে পান, যার নাম পালদান ইয়ামোর। ‘এই দেবীর মুখ ভয়ংকর ও ভীতিপ্রদ। তাই বেশির ভাগ সময় মূর্তিটা মখমলের কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এই ভয়ংকর দেবীকে দালাই লামা ও তাশি লামার অভিভাবক হিসেবে মানা হয়। বাদামি রঙের ছোট ঘোড়ার পিঠে দেবী বসে আছেন। হিংস্র পশুর চামড়ায় সর্বাঙ্গ ঢাকা। চোখ দুটো যেন অতল গহ্বর। হাতে মরা পশুর কঙ্কাল। এ এক বীভৎস দেবী মূর্তি। যে ভজন মন্দিরে মূর্তিটা রাখা হয়েছে, সেখানে অসংখ্য ইঁদুর। তবে ইঁদুরগুলো খুবই নিরীহ ও নিস্তেজ। বলা হয়, এরা নাকি শাপভ্রষ্ট লামা। এ জন্মে ইঁদুর হয়ে পাপ স্খলন করছে। মন্দিরের দেয়ালে একাধিক চিত্রাঙ্কন। তার মধ্যে একটা রাজা সোরোং-বাৎসানের ছবি। সেটা নাকি রক্ত দিয়ে আঁকা।’

শরত্চন্দ্র লাসায় দালাই লামার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। কোনো সন্দেহ নেই, তিনি দালাই লামাকে একবার সামনাসামনি দেখতে উদগ্রীব ছিলেন। ‘তিব্বতে এসে দালাই লামাকে চোখের দেখা দেখতে পাব না, এ কথা ভাবতেই তীব্র এক হতাশা মনে জাগছিল।’ যা হোক, শেষমেশ শরেক ব্যর্থ হতে হয়নি। তিনি স্থানীয় এক লামার সহযোগিতায় দালাই লামার দেখা পেয়েছিলেন। সে সাক্ষাতের বিবরণে শরত্চন্দ্র লিখেছেন, ‘সিংহাসন থেকে দশ ফুট দূরত্বে আসন নিলাম। প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দালাই লামা অভ্যর্থনা কক্ষে ঢুকলেন। আট বছরের এক শিশু। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল গায়ের রঙ, গোলাপী কপোল। বড় বড় দুটো উজ্জ্বল চোখ! মুখের গঠন আর্যদের মতো। এই মুহূর্তে তাঁর মুখ কিছুটা শীর্ণ দেখাচ্ছে, ধর্মীয় উপাসনার ধকলেই হয়তো কিছুটা কাহিল হয়ে পড়েছেন।’

শরত্চন্দ্র লাসা ও দালাই লামার ইতিহাস নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বিবরণ দিয়েছেন: “তিব্বতের দালাই লামা ও খ্রিস্টান দুনিয়ার পোপের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের বৌদ্ধদের বিশ্বাস, দালাই লামা বুদ্ধেরই এক অংশ। তিব্বত তথা সমগ্র বিশ্বে আধ্যাত্মিক ভাবধারা অক্ষুণ্ন রাখার জন্যই মানবদেহে আবির্ভূত হয়েছেন। খ্রিস্টানদেরও পোপ সম্পর্কে এমনই বিশ্বাস। দালাই লামার আরেক নাম ‘তুজ-জে চেনপো শেনরেজিগ’ বা ‘পরম দয়াময় অবলোতিতেশ্বর’।... তিব্বতের প্রাচীন ইতিহাস জানাচ্ছে, বুদ্ধের মহানির্বাণ লাভের অনেক পরে, পনেরো শতকের শুরু থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত দালাই লামা মোট ১৪ বার মর্ত্যভূমিতে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৪৭৪ সালে আবির্ভূত হন গেদান-গিয়ােসা। তিনি শেন-রেজিগের অংশ হিসেবে পরিচিত ‘পেদানডাব’-এর দেহ ধরে জন্ম নেন। তশিল-হুন-পোর সুবিখ্যাত বৌদ্ধবিহারের প্রতিষ্ঠাতা এই গেদান-গিয়ােসা। ১৫১২ সালে তিনি তশিল-হুন-পোর প্রধান লামা নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে লামার প্রধান বৌদ্ধমঠ ডাবাংয়ের প্রধান পদে অভিষিক্ত হন। তিনি সেখানে গোদান ফোডাং অর্থাৎ বৌদ্ধদর্শনের সর্বোচ্চ পদ সৃষ্টি করেন। তিনিই প্রথম দালাই লামা।” ‘দালাই লামা’ নামকরণের কৌতূহলোদ্দীপক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন শরৎ: ‘গেদান-গিয়ােসার উত্তরাধিকারী হন সোনাম-গিয়ােসা। সুবিখ্যাত যোদ্ধা ও বিজয়ী বীর আলতান খানের আমন্ত্রণে তিনি মঙ্গোলিয়া যান। সেখানে পৌঁছবার পরে খান তাঁকে মঙ্গোল ভাষায় দালাই লামা বলে সম্বোধন করেন। তিব্বতি ভাষায় ‘গিয়ােসা’ অর্থ সমুদ্র। মঙ্গোলীয় ভাষায় দালাই। আর আলতান যখন শুনলেন যে লামার উত্তরাধিকারীর নামের সঙ্গে গিয়ােসা শব্দটি জড়িয়ে আছে, তখন সেটাকে পারিবারিক নাম হিসেবে গ্রহণ করলেন। এই ভুল-ভ্রান্তিই দালাই লামা নামের উৎস। প্রধান লামার সকল উত্তরসূরিকে এই নামই দেয়া হয়।’

শরত্চন্দ্র দাস যখন তিব্বত সফর করেন, তখন তা আদতেই চীনের মুঠোয় বন্দি। “তিব্বতের সেনাবাহিনীর প্রধান হলেন সে দেশে নিযুক্ত চীনা রাজদূত। এ রাজদূতকে বলা হয় আম্বান।... আম্বানের মাধ্যমেই তিব্বত সরকার ও চীনের মধ্যে যাবতীয় যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। তিব্বতের বিভিন্ন রাজ্য ও লাসা সরকারের মধ্যে সব ধরনের বিবাদের মীমাংসা করার দায়িত্বও আম্বানের।... সে সময় তিব্বত ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড়। সেই সুযোগে লাসায় ঘাঁটি গেড়ে থাকা চীনা রাজদূতকে কাজে লাগিয়ে চীন সরকার তিব্বতকে ‘চীনের ওপর নির্ভরশীল’ একটি রাষ্ট্রে পরিণত করে। দেশের সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়া হয় দুজন আম্বান কমান্ডারের হাতে। তারা নিজেদের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বলে জাহির করত। আম্বানরা বরাবরই তিব্বতি জনতার কাছে ছিল আতঙ্কের প্রতীক। তাই সাধারণ তিব্বতিরা এদের ঘৃণাসহকারে এড়িয়ে চলত।” চীনা সৈন্যরা পিকিং থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিব্বতে প্রবেশ করত। এরা ছিল সাধারণ তিব্বতিদের কাছে আরেক আতঙ্ক। পিকিংয়ের ছাড়পত্রের কারণে এদের যাবতীয় খরচ তিব্বতের স্থানীয়দের বহন করতে হতো। এরা স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছ থেকে নানা অন্যায় সুবিধা জোর করে আদায় করত। এমনকি তাদের চাবুকও মারত। চীনা সেনা এবং কর্মকর্তাদের পেছনে তিব্বতের সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হতো। এ অর্থের সংস্থান করতে তিব্বতের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠত। আর চীনাদের এ সেবার ঘোষিত কারণ তিব্বতের লামাদের নেপাল, কাশ্মীরের কিংবা ব্রিটিশদের হাত থেকে রক্ষা করা। এ জায়গায় শরত্চন্দ্র তিব্বতিদের এক অদ্ভুত বিশ্বাসের বিবরণ দিয়েছেন, “তিব্বতিদের সর্বব্যাপী বিশ্বাস যে, দু’শো বছর পরে প্রধান লামা বা তাশি লামা অবসর নিয়ে বৌদ্ধদের স্বপ্নরাষ্ট্র বা কাল্পনিক ভূখণ্ড সাম্বালায় চলে যাবেন। তিব্বতে আর ফিরে আসবেন না। আর তারই মধ্যে সমগ্র পৃথিবী রুশ ও ইংরেজ শক্তির বশীভূত হয়ে উঠবে। চীনের সম্রাট কিংবা ঈশ্বরের দূতও ওই শক্তির অস্ত্রশস্ত্র ও তীক্ষ বুদ্ধিমত্তাকে প্রতিহত করতে পারবেন না। তাই তিব্বতের নীতি এদের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষা করে চলা। প্রকাশ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ নয়, বরং কূটনীতির সাহায্যে এদের দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। তিব্বতিরা মূলত শান্তিপ্রিয়। এদের বিশ্বাস যে বাইরের শক্তি তিব্বতের ক্ষতি করবে না।”

লাসায় ভ্রমণ শেষ করে শরৎ যান ইয়েলুিং উপত্যকায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উপত্যকায়ই তিব্বতি সভ্যতার প্রাথমিক বিকাশ হয়েছিল। পুরো উপত্যকা চষে ফেলেন শরৎ। সংগ্রহ করেন বিপুল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যাবলি। এবার ১৪ মাসের তিব্বত ভ্রমণ শেষ করে ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে শরৎ ভারতে ফিরে আসেন। এরপর আবার শরতের সামনে তিব্বত সফরের একটি সম্ভাবনা দেখা দেয়। ১৮৮৫ সালে ভারত সরকার তিব্বতে একটি মৈত্রী দল প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তখন তিব্বতে প্রবেশের জন্য চীন সরকারের অনুমতি প্রয়োজন হতো। এ অনুমতি আদায়ের জন্য ভারত সরকারের তরফ থেকে কোলম্যান ম্যাকলেকে চীনে প্রেরণ করা হলো। তার সহযোগী হিসেবে নির্বাচন করা হয় শরত্চন্দ্রকে। তারা দুজন বেশ কয়েক মাস চীনে অবস্থান করেন। যদিও শেষমেশ তারা ভারতীয় মৈত্রী দলের সফরের জন্য অনুমতি আদায় করতে পারেননি। চীনে শরৎ থেকেছিলেন আন-তিঙ গেটের কাছে এক লামা মঠে। তিব্বত সম্পর্কে শরত্চন্দ্রের জ্ঞান, কৌতূহল ও অনুসন্ধান দেখে চীনা লামারা অবাক হয়েছিলেন। চীনে অবস্থানকালে শরৎ চীনা লামাদের অনুকরণে পোশাক পরতেন। সব মিলিয়ে তিনি চীনা লামাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলেন। তাকে লামারা ‘কা-চেন লামা’ বা ‘কাশ্মীরের লামা’ নামে ডাকতেন। অনেক লামাই শরতের বন্ধু হয়ে ওঠেন, যার মধ্যে ছিলেন চীনের সবচেয়ে বড় লামা মঠের অধ্যক্ষ চাং-চিয়া-হুতুকেতু। চীন সরকার অনুমতি না দেয়ায় শরতের তৃতীয় তিব্বত সফর আর সম্ভব হলো না। ব্যর্থ মনোরথে তারা ভারতে ফিরে এলেন। ভারতে ফিরে শরৎ আবার তিব্বত ও বৌদ্ধধর্ম বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে মন দিলেন। তাকে বাংলার প্রাদেশিক সরকারের তিব্বতি অনুবাদক পদে নিযুক্ত করা হয়।

চীনে ম্যাকলের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ব্রিটিশ সরকার শরত্চন্দ্রকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি দেন। আর ভূগোলবিদ্যায় অসামান্য অবদান রাখায় ‘রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি’ ১৮৮৭ সালে তাকে ‘ব্যাক প্রিমিয়াম’ পুরস্কারে সম্মানিত করে।

শেষবার তিব্বত থেকে ফেরার সময় তিনি প্রায় ২০০ বই ও পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। এসবের মধ্যে ছিল বেশকিছু সংস্কৃত গ্রন্থ, যেগুলো কয়েক শতক আগে ভারত থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। পেয়েছিলেন চান্দ্র ব্যাকরণের প্রাচীন পুঁথি। তিনি এসব গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করে অসংখ্য মূল্যবান রচনা প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি অনেকগুলো তিব্বতি গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। এর ফলে পাঠকরা তিব্বতি জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন। কাশ্মীরের কবি ক্ষেমেন্দ্রেরঅবদন কল্পলতা কাব্যগ্রন্থটি তিনি সম্পাদনা করেছিলেন। গ্রন্থটি তিব্বতের লাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রাক-বৌদ্ধ যুগের ঐতিহাসিক বিবরণীর জন্য গ্রন্থটি বিখ্যাত।

শরত্চন্দ্রের তিব্বত ভ্রমণ দুটি খণ্ডে পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়— ন্যারেটিভ অব জার্নি টু লাসা ও ন্যারেটিভ অব আ জার্নি রাউন্ড লেক পালতি অ্যান্ড ইন লোখা ইয়ারলুং অ্যান্ড শাক্য। ভারতের ব্রিটিশ সরকার বই দুটোকে গোপন দলিল আখ্যা দিয়ে ১৮৯০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশ হতে দেয়নি। এখানে আবার একটু য়ুগেনের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৮৮২ সালে তিব্বত সফরে শরত্চন্দ্র লেক পালতির যে বিবরণী সংগ্রহ করেছিলেন, তা যাচাই করে নিশ্চিত হতে স্যার আলফ্রেড ক্রফট ১৮৮৩ সালে য়ুগেন লামাকে তিব্বতে প্রেরণ করেন। য়ুগেন সফলভাবে কাজটি সম্পন্ন করেন। এ যাত্রায় তিনি মানসসরোবর ও লাসা ঘুরে আসেন। একই বছর তাংলা ও চুম্বি উপত্যকা হয়ে ভারতে ফিরে আসেন। তার এ ভ্রমণবৃত্তান্ত ১৮৮৯ সালে ট্রিগোনেমেট্রিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত রিপোর্ট অব দ্য এক্সপ্লোরেশন ইন সিকিম, ভুটান অ্যান্ড টিবেট ফ্রম ১৮৫৬ টু ১৮৮৬ শীর্ষক গ্রন্থে জায়গা করে নেয়। এ গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। সরকার তাকেও মুখ্য তিব্বতি অনুবাদক হিসেবে নিয়োগ করেছিল।

শরত্চন্দ্র দাশের সফরের উপসংহারটা বেশ কঠিন। তার সফরের পেছনের উদ্দেশ্য যে ছিল গুপ্তচরবৃত্তি, সেটা প্রকাশ হওয়ার পরই বিপর্যয় নেমে আসে অনেকের ওপর। তিব্বতে শরত্চন্দ্র দাশকে সহযোগিতা করেছিল, এমন সবাইকে চীন শাস্তি দেয়। তশিল-হুন-পোর প্রধানমন্ত্রী খুন হয়ে যান। তার মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়া হয়। ১৯০৩-০৪ সালে শেষমেশ একটি ব্রিটিশ বাহিনী লাসায় প্রবেশ করে। সেখানে তারা এক কর্মকর্তাকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে, যাকে ২০ বছর ধরে কারাগারে রাখা হয়েছিল শরত্চন্দ্র দাসকে সহায়তা করার অপরাধে। দ্য নর্থ চায়না হেরাল্ড লিখেছিল, ‘বৃদ্ধ মানুষটি আলোর দিকে তাকিয়ে একজন অন্ধ মানুষের মতো চোখ ঝাপটাচ্ছিলেন। অনেকটা অলৌকিকভাবে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছিল।’ ঘটনাটি প্রতীকীও। এবার চীনের লৌহকঠিন মুঠো থেকে তিব্বত মুক্ত হলো। তবে এ মুক্তি ছিল ক্ষণকালের। অর্ধশতাব্দী পর চীন পুনরায় তিব্বতকে ছিনিয়ে নিয়েছিল। দালাই লামাকে তিব্বত ছেড়ে পালাতে হয়।

শরত্চন্দ্র তিব্বত ছেড়ে এলেও তা তার মন থেকে মুছে যায়নি। দার্জিলিংয়ে নিজের বাড়ির নাম রাখেন লাসা ভিলা। আর বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিব্বতি সাহিত্য অনুবাদ করে। গ্রন্থনা করেছেন একটা তিব্বতি-ইংরেজি ডিকশনারির।

জ্ঞানচর্চায় শরত্চন্দ্র দাসের আগ্রহ ও পরিশ্রম অবিস্মরণী। তার কথায়ও সে ছাপ মেলে। কলকাতায় ছাত্রদের এক সম্মিলনীতে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের ভাষায় ছাত্রকে বলা হয় ‘বিদ্যার্থী’, বিদ্যা ও আর্থী, যার অর্থ জ্ঞানের অন্বেষক। তাই বিদ্যার্থী বলতে তাকেই বোঝায়, যার আদর্শ হচ্ছে ‘জ্ঞান’। তাই আমি বিশ্বাস করি, ছাত্র শব্দটির চেয়ে বিদ্যার্থী শব্দটি অনেক বেশি বিস্তৃত ও গুরুত্ববহ। আমার একান্ত আশা, আপনারা বেশির ভাগ আক্ষরিক অর্থে বিদ্যার্থী হয়ে উঠবেন। আপনারা জ্ঞান উৎপাদন করবেন। একজন সভ্য মানুষ হিসেবে আশীর্বাদময় জীবনে অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তুলতে আপনাদের এ জ্ঞান উৎপাদনের সাধনা করা উচিত। সম্পদের চেয়ে জ্ঞানকেই শরৎ বেশি দামি মনে করতেন, ‘জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ আহরণ নয়। সম্পদশালী হলেই জ্ঞানচর্চা বন্ধ করা উচিত নয়।’

শরত্চন্দ্র দাসের জ্ঞানচর্চা, অনুসন্ধিৎসা তাকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অমর করে রাখবে। গত বছর গেল তার মৃত্যুশতবার্ষিকী। শরতের জন্মভিটায় তাকে কেউ স্মরণ করেছিল কিনা আমাদের জানা নেই। অন্তত সংবাদমাধ্যমে তেমন কোনো স্মরণের খবর পাওয়া যায়নি।

 

সূত্র: তিব্বতে দু’বার ‘আ জার্নি টু লাসা অ্যান্ড সেন্ট্রাল টিবেট’ থেকে; অনুবাদ: দেবাংশু দাশগুপ্ত

মিট শরত্চন্দ্র দাশ: দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম দ্য কোল্ড অব টিবেট অ্যান্ড রোট আ বুক অ্যাবাউট ইট, পরিমল ভট্টাচার্য, স্ক্রলইন

দি ইন্ডিয়ান স্পাই হু ফেল ফর টিবেট, সামান্থ সুব্রামানিয়ম, নিউইয়র্ক টাইমস