পকেটে পর্যাপ্ত পরিমাণ মুদ্রা থাকলে হিসাবটা অত কঠিন নয়। বাড়িঘরের মায়া করলে পুড়ে কাবাব হয়ে যেতে হবে। খালি কোনো রকম জানটা নিয়ে নাফ নদী পর্যন্ত পৌঁছাও। অত ভয় করার কিছু নেই। ওরা মারছে কম, খেদাচ্ছে বেশি। কাজেই নাফ পর্যন্ত যেতে না পারলে সুসং পাহাড়ের কোনো ঢালে সন্ধ্যা অবধি সুনসান পড়ে থাকো। চিন্তা নেই, মংডুতে সন্ধ্যা আসে তাড়াতাড়ি। ওখান থেকে নাফ নদী পার হয়ে এই পাড়ে কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্প পর্যন্ত একটা প্যাকেজ। জনপ্রতি ৫ হাজার কিয়াত। শিশুদের হাফ।
অবশ্য আলালের কাছে একটা ফুটা পয়সাও নেই। জামাটা কোনো রকম গায়ে দিয়ে আসতে পেরেছে, ঘরে আগুন লাগানোর আগে আগে। বাপকে কুপিয়ে মেরেছে জমিতেই, আর প্রতিবন্ধী মা ঘর থেকে বের হতেই পারেনি। আগুনে পুড়ে মরেছে। আলাল তবু টানাহেঁচড়া করেছিল। কিন্তু ১২ বছরের একটা শিশুর পক্ষে বিছানাবন্দি এক মহিলাকে ঘর থেকে বের করা মুশকিল। ফলে বাইরের জংলায় লুকিয়ে মাকে ঘরের মধ্যে পুড়তে দেখেছে। তারপর একসময় চিন ডিন গ্রামের অন্য সব মানুষের সঙ্গে আলালও দৌড় দিয়েছে সুসং পাহাড়ের দিকে। সেখান থেকে পাহাড়ি ঝোপজংলার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঠিকই সে নদীর কিনারে পৌঁছে যায়। সঙ্গে আরো অনেক মানুষ। সবাই বাংলাদেশে যাবে। নৌকামালিকদের সঙ্গে দরাদরি চলে তাদের।
এখন আর আগের মতো রেট নেই। আগে জনপ্রতি ২০ হাজার, এমনকি ৩০ হাজারেও ওই পাড়ে যাওয়ার মতো রোহিঙ্গা পাওয়া যেত। এখন ৫ হাজারেও মেলে না। রোহিঙ্গা নিধন এখন প্রায় পুরনো ঘটনা। আর ওই পাড়ে বাংলাদেশেও নানা ক্যাম্পট্যাম্প হয়ে গেছে। কোনো রকম যেতে পারলেই হলো। শয়ে শয়ে এনজিও, সরকার, দূতাবাস। খাবার ছিটাচ্ছে, কাপড় বিলাচ্ছে, ঘর বানিয়ে দিচ্ছে, ল্যাট্রিন বসাচ্ছে, বিদ্যুতের লাইন টানা হচ্ছে, ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা। বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব। কেউ কেউ আবার ব্রেকিং নিউজের আশায় এই পাড়েও চলে আসছে। ক্যাম্প তো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, তবু কারো কারো জীবন কেটে যায়। লম্বা সময়ের এন্তেজাম। সাত থেকে ১০ দিন তো লেগে যায় রিফিউজি পরিচয়পত্র জোগাড় করতে করতেই। বিরাট লম্বা লাইন। সরকারি লোক। নামধাম জিগাচ্ছে। বায়োমেট্রিক হচ্ছে। এন্ট্রি হচ্ছে কম্পিউটারে। বিরাট দক্ষযজ্ঞ। জাতীয়তার জায়গায় লিখছে ‘বার্মিজ’। অদ্ভুত ব্যাপার। ওই পাড়ে আরাকানে তারা ছিল ‘বাঙালি’। নদীর ওই পাড়ে বার্মায় তুমি ‘বাঙালি’ আর এই পাড়ে বাংলায় তুমি ‘বার্মিজ’!
যা-ই হোক, একটা নদী পার হলেই কীভাবে বাঙালি বার্মিজ কিংবা বার্মিজ বাঙালি হয়ে যেতে পারে, এগুলা গুরুতর দার্শনিক প্রশ্ন। আলাল সেসব নিয়ে মোটেও ভাবিত নয়। ১২ বছর বয়সেই ওর কাছে এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা। সে জানে, রাখাইন আর্মি পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বলতে হয় বাঙালি আর বাংলাদেশে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বলতে হয় রোহিঙ্গা।
নদীপাড়েই বসে ছিল সে, কাঁদছিল। পায়ে জুতা নেই, হাঁটু পর্যন্ত কাদায় সাদা হয়ে আছে। মুখে চোখের পানি, সর্দি আর ধুলোকাদা মিলেমিশে একাকার। মরে যাওয়া মা-বাবার প্রতি অভিমান হচ্ছিল ওর। এত বিশাল চরাচর, অচেনা সব মানুষ, কী করবে, কোথায় যাবে, কোনোই ধারণা নেই। শুধু গন্ধ শুঁকে চলা বাছুরের মতো মানুষের দঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে চলে। এভাবেই নদী পর্যন্ত আসা। তার পরের হিসাব তো ভিন্ন। অবশ্য আলালের কপাল ভালো। মিয়া শেখের পরিবার নদী পার হওয়ার সময় ওকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তাদের ফ্যামিলি প্যাকেজে, সঙ্গে আলাল ফ্রি। মিয়া শেখ বড়লোক মানুষ। তার জমিতে আলালের বাবা একসময় কামলা দিত। মিয়া শেখ কুতুপালং ক্যাম্পে থাকার জন্য বাংলাদেশে আসেনি। তার লক্ষ্য বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আরো গভীরে। দিন দশেকের মধ্যে কক্সবাজার টু ফরিদপুর বা যশোর আরেকটা প্যাকেজ। সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের বনগ্রাম অবধি আরেকটা। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাডার মোল্লা মাসুদের হাতে অগ্রিম টাকাও দেয়া হয়ে গেছে। যেকোনো দিন রাত ৮টার দিকে ভ্যান আসবে। সেই ভ্যানে করে মিয়া শেখের পরিবার গিয়ে উঠবে কোনো এক মালবাহী ট্রাকের ছাদে। কনকনে শীত আর বৃষ্টি হচ্ছে আজকাল। কাজেই ভালো করে ত্রিপল মুড়িয়ে বসতে হবে ট্রাকের ছাদে। বাচ্চাগুলোর জন্য এ জার্নি ভীষণ বিপদের। ঠাণ্ডায় আর নিউমোনিয়ায় টেঁশে যেতে পারে। তাদের বাচ্চা চারটা। আলালসহ পাঁচ। মিয়া শেখের দুই বিবি। সব মিলিয়ে সাতজনের বহর। সাতটা রিফিউজি কার্ড। পরিচয়পত্র। মোল্লা মাসুদ বলে দিয়েছে, সীতাকুণ্ড পার হয়ে যাতে কোনো নিরালা পাহাড়ের কিনারা দিয়ে যাওয়ার সময় জংলার মধ্যে সব কার্ড ফেলে দেয় তারা। মিয়া শেখও এটাই চেয়েছে। রোহিঙ্গা জীবনের ইতি। রিফিউজি জীবনের শেষ।
***
ট্রাক ছুটছে আরিচা পার হয়ে ফরিদপুরের দিকে। ইতিহাসের করিডোর দিয়ে। ছেলেটাকে ওরা নামিয়ে দিল ফতেহাবাদ পরগনার জালালপুর গ্রামে। জায়গাটা খুব চেনা লাগছে? লাগবেই তো! এটাই যে তোমার বাড়ি, ভুলে গেছ? তোমার বাবাই ছিলেন ফতেহাবাদ পরগনার অধিপতি মজলিশি কুতুবের প্রধান অমাত্য। এই তো সেদিন, মাত্র ৩০০ বছর আগে, তাকে পর্তুগিজ ডাকাতের দল নৌকার মধ্যে খুন করেছে, আরাকান যাওয়ার পথে। মরার আগে তিনি অনেকক্ষণ ধরে লড়াই করেছিলেন। কিন্তু গঞ্জালেসের মতো হার্মাদের সঙ্গে লড়াই করে পারা কি চাট্টিখানি কথা? বুঝতে পেরেছিলেন, বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না। তোমার দিকে ফিরে বলেছিলেন, বাবা আলাল, নাফের বুকেই কবর হবে আমার। ধরতে পারলে ওরা তোরে আরাকানের দাসবাজারে বেচে দেবে। জীবনে আর দেশের মুখ দেখতে পাবি না। এখনো সময় আছে, তুই আর রহীম শাহ এই ডিঙিটা নিয়ে পেছন থেকে পলিয়ে যা। মুলুক ফতেহাবাদ, খালি এটুকু খেয়াল রাখিস।
***
মিয়া শেখ ও তার পরিবারকে পুলিশ যশোর পার হয়ে যাওয়ার সময় পাকড়াও করে। সম্ভবত তারা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিল। অন্য প্যাকেজে। সেই প্যাকেজের আওতায় আলালকে সঙ্গে রাখা যাচ্ছিল না। ফলে মাঝরাতের দিকে দালালরা ওকে টেনেহিঁচড়ে ফরিদপুরের কোনো একটি জায়গায় নামিয়ে দেয়। মিয়া শেখের কিছু করার ছিল না। শুধু গলা উঁচিয়ে বলতে পেরেছিল, আলাল, জল’র মইদ্যে বই থাক, ন ডরাইস। বেইল ফুডিলে মাইনষে তরে তুয়াই বাইর গরিব।
ট্রাকের পেছন পেছন তবু দৌড়াচ্ছিল আলাল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে।
তিনদিন হাজতে রাখার পর পুলিশ প্রহরায় মিয়া শেখকে আবার পরিবারসমেত কক্সবাজার ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু আলালের কথা কেউ আর তোলেনি। না মিয়া শেখ, না পুলিশ। পুলিশের খাতায় আলালের নাম থাকার কথা নয় অবশ্য। মিয়ার এক বিবি স্বামীকে একটু খোঁচা দিয়েছিল, কিন্তু স্বামী ওকে ইঙ্গিতে চেপে যেতে বলল। ফরিদপুরে গভীর রাতে একটা ১২ বছরের শিশুকে ফেলে দিয়ে এসেছে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে কে জানে! মরেটরে গিয়ে থাকলে তখন বাড়তি ঝামেলায় পড়বে। এমনিতে ঝামেলার শেষ নেই।
***
তিন মাস পর।
- ও তো বলেছিল ওর নাম আলাওল।
- আলাওল নাম তো কারো থাকতেই পারে।
- এটা অনেক পুরনো নাম কিনা। বেশ আশ্চর্য লাগল।
- হয়তো ওর নাম আলাল। উচ্চারণের দোষে এ রকম শুনিয়েছে।
- হয়তো। কিন্তু এখন কী করব? বাসা থেকে কাউকে কিচ্ছু না বলে চলে গেছে। নাকি কোথাও
যেতে গিয়ে হারিয়ে গেছে? কী করব বুঝতে পারছি না। একটা জিডি করব নাকি?
-রোহিঙ্গা শিশুকে বাড়িতে এনে রেখেছ বললে পুলিশ উল্টো তোমাদের সঙ্গেই ঝামেলা করতে পারে।
অন্যায় কী করলাম? রাত্রিবেলায় ট্রাক থেকে ফেলে দিল রাস্তায়। সকালে লোকজন তুলে এনে হাসপাতালে দিয়ে গেছে। আমার ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হলো। ভালো হয়ে যাওয়ার পর যাওয়ার জায়গা নেই। তো বাসায় নিয়ে এলাম। এর মধ্যে অন্যায়টা কী হলো?
জানি না। আমি আইনের কথা বললাম। তাছাড়া তুমি কী করবে, তুমিই তো ভালো বোঝো। আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?
কি জানি? তোমার কথা মনে পড়ল, তাই ফোন করলাম।
বাসা থেকে হারিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা বালক আলাল মাঝবয়সী নিঃসন্তান ডাক্তার শাহানাকে বহুদিন পর ওয়ালিউল মুক্তাদিরের কথা মনে করিয়ে দিল। তাদের যখন পরিচয়, তখন শাহানা মেডিকেল ফার্স্ট ইয়ারে আর ওয়ালিউল বা অলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে মাস্টার্স ফাইনাল ইয়ারে। থিসিস লিখছে আলাওল ও আরাকানি বাংলা সাহিত্য নিয়ে। সে সময় ‘রোসাঙ্গের ঘোড়সওয়ার’ নামে একখানা নাটকও লিখেছিল সে। প্রতীকী পথনাটক। শাহানা সে নাটকে ছোট একটা রোলে অভিনয় করত। কিন্তু দুটো শোর পর নির্দেশক অসিতদা ওকে বাদ দিয়ে কাজরীকে নেন। সেই ক্ষোভেই সম্ভবত শাহানা অলিদের ড্রামা সার্কেল ছেড়ে দেয়।
তখন অলি আর শাহানার মাঝে একটা পূর্বরাগ দানা বেঁধে উঠছিল। আলাওলকে কেন্দ্র করে। তারা প্রতিদিন আলাওল নিয়ে কথা বলত, টিএসসি থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত যেতে যেতে। বেলা ৩টায় রাস্তাঘাট বেশ সুনসান ঐতিহাসিক হয়ে উঠত সেসব দিনে। যেন সপ্তদশ শতকের কোনো এক ভাগ্যবিড়ম্বিত কবির জীবন মঞ্চস্থ হচ্ছে এই পথে। আর তারা যেন তাদের প্রণয়পূর্ব পূর্বরাগের ছলে সেই বিয়োগান্ত নাটকের সূত্রধরের ভূমিকায় নামছে! অলির আবৃত্তির গলা মন্দ ছিল না।
মুলুক ফতেহাবাদ গৌড়েত প্রধান
তথাত জালালপুর পুণ্যবৎ স্থান
কার্যগতি যাইতে পন্থে বিধির গঠন
হার্মাদের নৌকা সঙ্গে হৈল দরশন
বহুযুদ্ধ আছিল শহীদ হৈল তাত
রণক্ষতে ভোগযোগে আইলুং এথাত
শাহানা চুপ করে শুনত। মাঝেমধ্যে এটাসেটা জিজ্ঞেস করত। যেমন আলাওলের আদি নিবাস কোথায় ইত্যাদি।
- ফতেহাবাদ, চব্বিশ পরগনা। বর্তমান ফরিদপুর জেলার মধ্যে পড়েছে।
- কোথায় ফরিদপুর আর কোথায় সুদূর আরাকান! তাই না?
- ওর বাবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। পথে নৌকায় ডাকাতি হলো। গঞ্জালেস নামে এক ভয়ঙ্কর জলদস্যু ছিল। ওর বাবাকে ওখানেই মেরে ফেলে। আলাওলকে আরাকানে নিয়ে যায়।
- তোমার কেমন লাগে?
- এ তো বহুযুগ আগের কথা। কেমন লাগবে আবার?
- না সেটা না। এই যে তোমার নাম ওয়ালিউল, তোমার সাবজেক্ট আলাওল।
শাহানার মশকরায় অলির সাহিত্যবোধ দমে যায় না।
- আমার সাবজেক্ট মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য। আলাওল এর অংশমাত্র। আমি আলাওলের খুব যে ভক্ত, এমন না। আমার বিচারে দৌলত কাজী আলাওলের চেয়ে শক্তিমান কবি।
- তাও আলাওল নিয়ে পড়ে আছ যে?
- দৌলত কাজী নিয়ে বেশকিছু গবেষণা আছে। তাছাড়া আলাওলের জীবন খুব ইন্টারেস্টিং।
- আমার কিন্তু মনে হয়, এ আলাওল আর ওয়ালিউলের মধ্যে কোনো কার্যকারণ সূত্র আছে।
অদ্ভুত ব্যাপার। তখন অলি একেবারেই বুঝতে পারত না এ মশকরার কী হেতু। শাহানা তাকে আলাওল থেকে বাইরে আনতে চাইছে। বিশ শতকের ঢাকায়, একটা তরুণ ও একটা তরুণীর অতি জরুরি কিছু বোঝাপড়ার মধ্যে। কিন্তু সে আরাকানেই পড়ে থাকত। শাহানা একসময় ক্লান্ত হয়ে যেত।
শাহানা অলির জীবন থেকে সরে যাওয়ার বহুদিন পর ধীরে ধীরে সেটি সে বুঝেছে। ওরা ওদের পূর্বরাগের পুরোটা সময়ই সপ্তদশ শতাব্দীর আরাকানে কাটিয়ে দিয়েছিল। আলাওলের জীবনীর মধ্যে। পদ্মাবতী আর লোরচন্দ্রানীর রূপঝলকের মধ্যে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ শতকের বোঝাপড়াটুকু আর হয়ে ওঠেনি।
শাহানা ও অলির সম্পর্ক বেশ সহজ। প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকাদের সম্পর্কের মধ্যে যে একটা নস্টালজিক হ্যাংওভার থাকে, ওদের সেটা নেই। শাহানা নবজাতক ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ, আর স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। অলি বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক, অবিবাহিত, ১৫ বছর ধরে মধ্যযুগের রোমান্টিক বাংলা সাহিত্য পড়াচ্ছে।
***
আলালের কথা ভাবছিল অলি। কোথায় যেতে পারে ছেলেটি? পাচারকারীর খপ্পরে পড়েছে? সেক্ষেত্রে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। কিংবা হতে পারে, পুলিশের হাতে পড়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ওকে। সেক্ষেত্রেও আর খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কোনোদিন জানাও যাবে নাম কী হয়েছিল ওই বাপ-কোপানো মা-পোড়ানো এতিম রোহিঙ্গা বালকের।
বহুদিন পর অলি ভাবছিল শাহানার কথাও। অলি আর শাহানার যে যৎসামান্য পূর্বরাগ, তা কেবল অব্যক্ত স্মৃতিরূপেই ধরাধামে অবশিষ্ট আছে। ইতিহাসের করিডোরে একটা মৃত সম্ভাবনা আকারে। কোটি মন্বন্তরেও তাতে আর আলো জ্বলবে না। অলি জানে সেটা, শাহানাও জানে। ফলে শাহানার স্বামীর আর সেটা আলাদা করে জানার প্রয়োজনও পড়ে না।
কত কিছুই না অজানা থাকে, অলি ভাবে। আলাওলের কাহিনীও যেমন। বাবার সঙ্গে আরাকান যাচ্ছিল। পথে জলদস্যু গঞ্জালেসের হামলা। বাবার মৃত্যু। নৌকা লুট হলো। আলাওলকে বন্দি করে আরাকানের দাসবাজারে বেচে দেয়া হলো। মাত্র এটুকুই জানা গিয়েছিল তার বইয়ের কাব্যভণিতা থেকে। ফলে ফতেহাবাদে যে নারী স্বামী আর সন্তানহারা, তার বেদনাও ইতিহাসের করিডোরে হারানো একটি সম্ভাবনা হয়ে থেকে গেল। অজানা থাকল এটাও যে, সেই নারী হারিয়ে যাওয়া শিশু আলাওলের পথ চেয়ে ভাগীরথীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকতেন কিনা!
পরিণত বয়সের আলাওল কি কোনোদিন ওর মায়ের খোঁজে ফতেহাবাদ ফিরে গিয়েছিল? আরাকান রাজ্যসভায় সাহিত্যের রোশনাই জ্বালানোর কোনো ফাঁকে?
ইতিহাসের এ ফাঁকফোকরগুলোও একদিন নিশ্চয়ই কোনো অতিকল্পনা দিয়ে ভরাট হয়ে যাবে। হাজার বছরের কাছে ৩০০ বছরের ব্যবধান বালখিল্য তো বটেই। ফলে আলাল আর আলাওলের ব্যবধানও হয়তো ঘুচে যাবে তখন। মানচিত্র আর নদীগুলোর পথরেখাও বদলে যাবে নিশ্চয়ই। অলি আর শাহানার মাঝখানে নাফ নদী একদিন নিশ্চয়ই আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে বইবে। হাজার বছর পর। অলি ভাবে।
হারিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা বালক আলালকেই একদিন ঘরে ফেরা আলাওলরূপে জানবে সুদূর ভবিষ্যৎ। হয়তো ইতিহাস আকারে নয়, হয়তো কোনো উপকথা আকারে।





