হারুকি মুরাকামি জাপানের সবচেয়ে বড় নিরীক্ষাধর্মী ঔপন্যাসিকই নন, তিনি জনপ্রিয়দের মধ্যেও অন্যতম একজন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় তার বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়। ১৯৪৯ সালের ১২ জানুয়ারি জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিওটোয় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মুরাকামি। তার বাবা ছিলেন জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ও দাদা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তার বয়স যখন দুই বছর, তখন তার পরিবার কোবে শহরে স্থানান্তরিত হয়। এ বাণিজ্যিক শহরে বিভিন্ন বিদেশীর (বিশেষ করে আমেরিকান নাবিকদের) আনাগোনা লেগেই থাকত। ‘ছোট শহরে পুরো বিশ্ব’ তার মনন গড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খুব অল্প বয়সেই মুরাকামি জাপানি সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীতকে ত্যাগ করেছিলেন এবং মজে গিয়েছিলেন জাপানের বাইরের দুনিয়ায়, বিশেষ করে জ্যাজ, হলিউডের চলচ্চিত্র ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে।

ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে টোকিওতে ছাত্রাবস্থায় উত্তরাধুনিক গল্প-উপন্যাসের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। ২৩ বছরে বিয়ে করা তরুণ মুরাকামি ‘পিটার ক্যাট’ নামে এক জ্যাজ ক্লাব খুলেছিলেন টোকিওতে। ‘বাতাসের গান শোনো’ (হিয়ার দ্য উইন্ড সিং) উপন্যাসটির মাধ্যমে লেখালেখির জগতে আগমন। ইংরেজিতে অনূদিত হলেও লেখকের অনুরোধের কারণে জাপানের বাইরে বইটি বিক্রি বন্ধ আছে। প্রথম বইটি দিয়েই তিনি জিতে নিয়েছিলেন ‘গানজু সাহিত্য পুরস্কার’। তারপর একেকটি বইয়ের মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতির পারদ কেবল ঊর্ধ্বমুখীই হতে থাকে। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত বাস্তববাদী উপন্যাস ‘নরওয়েজিয়ান ওড’-এর মাধ্যমে সাহিত্যজগতে এক মেগাস্টার হিসেবে আবির্ভূত হন মুরাকামি।

বইটি শুধু জাপানেই দুই মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। ‘কাফকা অন দ্য শোর’ তার আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি তার যুগের সবচেয়ে বেশি পঠিত জাপানি লেখক। জাপানের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার ‘ইউমিউরি সাহিত্য পুরস্কার’ থেকে শুরু করে সব বড় বড় পুরস্কার জিতেছেন মুরাকামি। তিনি একজন সুদক্ষ অনুবাদকও বটে। রেইমন্ড কার্বার, টিম ও’ ব্রায়েন থেকে শুরু করে এফ স্কট ফিটজেরাল্ডকে জাপানি পাঠকদের কাছে নিয়ে এসেছেন এবং বেশির ভাগই প্রথমবারের মতো। নিউইয়র্কে যেখানে তার অফিস, সেটি যেন এক মিনি টোকিও। নাম তার ‘সুহু’। একজন লেখকের স্টুডিও হিসেবে যা কল্পনা করা যায়, তা থেকে এটি একেবারে ভিন্ন। আবার তার গল্পের চরিত্র থেকে বেশি দূরবর্তীও নয়। তার গল্পের চরিত্ররা তো এ রকম অতি সাধারণ পরিবেশ থেকেই স্বপ্নের জগতে পা ফেলে।

নিচের সাক্ষাৎকারটি দুদিনে নেয়া হয়েছে। তিনি ‘অল্পভাষী’। কিন্তু আলোচনার গভীরে প্রবেশ করার পর দেখা গেল, তিনি যথেষ্ট স্বতঃস্ফূর্ত। তবে কথার ফাঁকে ফাঁকে অনেক লম্বা বিরতি নিয়েছেন এবং সবচেয়ে সঠিক উত্তরটি দেয়ার জন্য সবসময় অতি সতর্ক ছিলেন। কিন্তু যখন জ্যাজ বা ম্যারাথন দৌড় নিয়ে কথা শুরু হলো, মনে হলো যেন তার বয়স ২০ বছর কমে গেছে অথবা তাকে একজন

১৫ বছরের তরুণ মনে হচ্ছে। প্যারিস রিভিউ-এর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জন রে

প্রশ্ন: আপনি কি সচেতনভাবেই একটি সহজ বর্ণনা ভঙ্গি কিন্তু একটু জটিল প্লট বেছে নেন?

হারুকি মুরাকামি: না, আসলে সে রকম না। আমি যখন লেখা শুরু করি, তখন কোনো পরিকল্পনা মাথায় রাখি না। আমি শুধু গল্পটির জন্য অপেক্ষা করি। গল্পটি কেমন হবে, কী ঘটতে যাচ্ছে, এটা আমি ঠিক করি না। আমি শুধু অপেক্ষা করি। ‘নরওয়েজিয়ান ওড’-এর কথা ভিন্ন। কারণ আমি সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম, ‘রিয়ালিস্টিক’ স্টাইলে লিখব। কিন্তু অন্য সবক্ষেত্রে আসলে আমি কিছুই বাছাই করি না।

প্রশ্ন: কিন্তু গল্পের বর্ণনাকারকে তো আপনি বাছাই করেন নিরাবেগ, শীতল ও সহজে অনুসরণ করা যায় এমন চরিত্র হিসেবে?

মুরাকামি: আমি কিছু চিত্রকল্প নিই এবং এগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা যোগ করে দিই। এভাবে গল্প শুরু করি। তারপর গল্পটা আমি পাঠকদের কাছে ব্যাখ্যা করি। কোনো কিছু ব্যাখ্যা করার সময় আপনার সহজ হওয়া উচিত। আমি সহজ শব্দ, ভালো উপমা, ভালো অলঙ্কার ব্যবহার করি। তারপর আমি যা করি তা হলো, খুব সতর্কভাবে ও স্পষ্টভাবে গল্পটা ব্যাখ্যা করে যাই।

প্রশ্ন: ওটা কি আপনার কাছে আপনাআপনিই আসে?

মুরাকামি: আমি বুদ্ধিমান না, উদ্ধত না। আমি আমার বইয়ের পাঠকদের মতোই। আমি জ্যাজ ক্লাব চালাতাম। ককটেল বানিয়েছি, স্যান্ডউইচ বানিয়েছি। আমি লেখক হতে চাইনি। কীভাবে যেন হয়ে গেলাম। এটা ঈশ্বরের উপহার। এজন্য আমি মনে করি, আমার বিনয়ী হওয়া উচিত। আমি সংগীতশিল্পী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাদ্যযন্ত্র ভালো করে বাজাতে পারতাম না। তাই আমি লেখক হয়েছি। বই লেখা অনেকটা সংগীতের মতোই একটা ব্যাপার। প্রথমে আমি থিমটা একটু ধরি, তারপর সেটাকে ইম্প্রোভাইজ করি। সবশেষে উপসংহার— এ রকম আর কি।

প্রশ্ন: কোন বয়সে আপনি লেখক হলেন? ওটা কি আকস্মিক ছিল?
মুরাকামি: যখন আমার বয়স ২৯। হ্যাঁ, অবশ্যই ওটা একটা আকস্মিক ব্যাপারই ছিল। কিন্তু শিগগিরই আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন: একেবারে সঙ্গে সঙ্গেই? প্রথম দিন থেকেই?

মুরাকামি: মধ্যরাতের পর রান্নাঘরে লেখা শুরু করেছিলাম। প্রথম বইটি শেষ করতে ১০ মাস লেগেছিল। কাজ শেষে এক প্রকাশকের কাছে পাঠালাম। শুরু হলো বিস্ময়ের পালা! বইয়ের কাজ ঠিকমতো এগিয়ে গেল। সবকিছু ছিল স্বপ্নের মতো। কিছু সময় গেল ব্যাপারটা হজম করতে। তারপর ভাবলাম, হ্যাঁ, ব্যাপারটা ঘটে গেছে। আমি একজন লেখক। কেন নয়? সহজ ব্যাপার, তাই না?

প্রশ্ন: লেখালেখির সিদ্ধান্তে আপনার স্ত্রীর মনোভাব কেমন ছিল?

মুরাকামি: সে কোনো কিছুই বলেনি। তাকে আমার লেখক হওয়ার বিষয়টি জানাতে সে বেশ অবাক হয়েছিল আবার একটু বিব্রতও হয়েছিল।

প্রশ্ন: বিব্রত হয়েছিল কেন? উনি কি মনে করেছিলেন, আপনি পারবেন না?

মুরাকামি: লেখক হওয়া মানে একটু চটকদার কিছু হওয়া। এমনটি আর কি!

প্রশ্ন: আপনার আদর্শ লেখক কারা ছিলেন? কোন জাপানি লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

মুরাকামি: শৈশবে এমনকি তরুণ বয়সেও আমি জাপানি লেখকদের লেখা বেশি পড়িনি। আমি এ সংস্কৃতি থেকে বের হতে চাচ্ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছিল, ওটা বিরক্তিকর ও কষ্টকর।

প্রশ্ন: আপনার বাবা জাপানি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন, তাই না?

মুরাকামি: হ্যাঁ, আসলে এটা বাপ-বেটার সম্পর্কের ব্যাপারও ছিল। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিই আমাকে টেনেছে, বিশেষ করে জ্যাজ সংগীত, দস্তয়ভস্কি, কাফকা ও রেমন্ড চ্যান্ডলার। ওটা ছিল আমার নিজের জগৎ, কল্পনার দুনিয়া। বইয়ের মাধ্যমে আমি সেন্ট পিটার্সবার্গ কিংবা ওয়েস্ট হলিউডে যেতে পারতাম। আসলে এটা হচ্ছে উপন্যাসের ক্ষমতা। আপনি যেকোনো জায়গায় যেতে পারেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রে আসা খুব সহজ এবং যে কেউ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় চলে যেতে পারে। কিন্তু ১৯৬০-এর দিকে এটা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই শুধু বই পড়তাম, গান শুনতাম এবং ওগুলোর মাধ্যমেই ওই জায়গাগুলোয় যেতে পারতাম। এটা ছিল একটা কল্পনার জগৎ, স্বপ্নের দুনিয়া।

প্রশ্ন: এবং এটাই আপনাকে লেখালেখির জগতে নিয়ে এসেছে?

মুরাকামি: ঠিক ধরেছেন। যখন আমার বয়স ২৯, তখন হঠাৎ করেই একটা উপন্যাস লেখার কথা মাথায় এল। আমি কিছু একটা লিখতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু জানতাম না কীভাবে? আমি জানতাম না, কীভাবে জাপানি লিখতে হয়। জাপানি লেখকদের প্রায় কোনো কিছুই পড়িনি। তাই আমেরিকান বই বা পাশ্চাত্যের বই থেকে আমি আমার স্টাইল, রীতি, কাঠামো ধার করেছি। এতে আমার একটা মৌলিক স্টাইল দাঁড়িয়েছে। ব্যস্, এভাবেই শুরু হয়ে গেল!

প্রশ্ন: আপনার প্রথম বই প্রকাশ হলো, পুরস্কার জিতলেন— যাত্রা শুরু হলো। অন্য লেখকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো?

মুরাকামি: না, একদমই না।

প্রশ্ন: ওই সময় কি আপনার কোনো লেখক বন্ধু ছিল না?

মুরাকামি: না, একজনও না।

প্রশ্ন: কাজ করতে করতে আপনার কোনো বন্ধু বা সহকর্মী হয়নি?

মুরাকামি: না, একেবারেই না।

প্রশ্ন: আজ পর্যন্ত আপনার কোনো লেখক বন্ধু নেই?

মুরাকামি: না, নেই।

প্রশ্ন: এমন কেউ কি আছে, যাকে আপনার খসড়া দেখান?

মুরাকামি: না। নেই।

প্রশ্ন: আপনার স্ত্রী?

মুরাকামি: আমি ওকে আমার প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখিয়েছিলাম। কিন্তু পরে ও আমাকে বলেছে, ওটা নাকি ও পড়েইনি!

প্রশ্ন: ওনার ভালো লাগেনি?

মুরাকামি: সত্যি কথা বলতে কি, ওটা ছিল প্রথম খসড়া এবং এত ভয়ানক রকম খারাপ ছিল যে, অনেক কাটাকুটি করেছি।

প্রশ্ন: এখন নতুন কোনো বই লেখার সময় আপনার স্ত্রী কি পড়তে আগ্রহী হয়?

মুরাকামি: আমার প্রতিটা বইয়েরই সে প্রথম পাঠক। আমি তার ওপর নির্ভরশীল। সে আমার একটা অংশ। স্কট ফিটজেরাল্ডের বেলায় যেমন জেল্ডা ছিল প্রথম পাঠক, আমার বেলায় আমার স্ত্রীও তেমনি।

প্রশ্ন: তাহলে লেখালেখির জীবনে কখনো কোনো লেখকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হননি?

মুরাকামি: না, আমি নিঃসঙ্গ। আমি কোনো দল, স্কুল, সাহিত্য চক্র পছন্দ করি না। একবার প্রিন্সটনের এক মধ্যাহ্নভোজে আমাকে দাওয়াত করা হয়েছিল। আমি তো ভয়ে কাঠ! কারণ ওখানে ছিল জয়সে ক্যারল ওয়টস ও টনি মরিসন। আমি এতই ভয় পেয়েছিলাম যে, আমি কোনো কিছুই খেতে পারিনি। ম্যারি মরিস (আমেরিকান লেখিকা) ছিল ওখানে। সে খুব মজার মানুষ এবং আমার বয়সী। আমরা বন্ধু হলাম। কিন্তু জাপানে আমার কোনো লেখক বন্ধু নেই। কারণ আমি একটু ‘দূরত্ব’ রাখতে চাই।

প্রশ্ন: জাপানে এমন কোনো লেখক আছে, যার বই আপনি পড়েন বা পড়তে ভালো লাগে?

মুরাকামি: হ্যাঁ, কয়েকজনের। রিও মুরাকামি একজন। লেখিকা ব্যানানা ইয়োশিমোতোর কিছু বই আমি পছন্দ করি। কিন্তু আমি কোনো রিভিউ বা সমালোচনা করি না। ওই কাজে যুক্ত হতে চাই না।

প্রশ্ন: কেন?

মুরাকামি: আমি মনে করি, আমার কাজ হচ্ছে মানুষকে দেখা, তাদের বিচার করা নয়। আমি নিজেকে ওই তথাকথিত উপসংহার থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি। আমি পৃথিবীকে যেকোনো সম্ভাবনার কাছে উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছি। সমালোচনার চেয়ে অনুবাদ আমার কাছে খুব প্রিয়। অনুবাদ করার সময় আপনাকে কোনো কিছু বিচার করতে হয় না। শুধু শরীর-মন দিয়ে আপনার পছন্দের জিনিস লাইন বাই লাইন অনুবাদ করে যান। পৃথিবীতে আমাদের সমালোচক দরকার, কিন্তু আমি মনে করি, ওটা আমার কাজ না।

প্রশ্ন: আপনার পড়া প্রথম ইংরেজি উপন্যাস কোনটি?

মুরাকামি: রস ম্যাকডোনাল্ডের ‘দ্য নেম ইজ আর্চার’। বইটা একবার শুরু করার পর আর থামতে পারিনি। তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি পড়তেও ভালো লাগত। আমার কাছে দস্তয়ভস্কি ও রেমন্ড চ্যান্ডলার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখনো আমি লেখার সময় এ দুজনকে মেশাতে চাই আমার লেখায়।

প্রশ্ন: কাফকাকে পড়লেন কোন বয়সে?

মুরাকামি: ১৫ বছর বয়সে। ‘দ্য ক্যাসল’ পড়েছিলাম। ওটা ছিল অসাধারণ বই। তারপর ‘দ্য ট্রায়াল’।

প্রশ্ন: কাফকার ওই দুটো উপন্যাসই অসমাপ্ত ছিল। তার মানে ওগুলোয় কোনো উপসংহারে পৌঁছা যায় না। আপনার উপন্যাসগুলোও তেমনি, বিশেষ করে ‘দ্য ওয়াইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল’ উপন্যাসেও পাঠক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। এক্ষেত্রে কাফকার কি কোনো প্রভাব রয়েছে?

মুরাকামি: পুরোপুরি না। রেমন্ড চ্যান্ডলারের বইগুলোও কিন্তু কোনো উপসংহার দেয় না। আমি যখন কোনো গল্প লেখা শুরু করি, তার শেষ কী হবে, আমি একেবারেই জানি না। যদি কোনো খুনের ঘটনা ঘটে, আমি জানি না, কে খুন করেছে। আমি বইটি লিখি, কারণ কে খুন করেছে এটা জানতে চাই। কে খুন করেছে এটা যদি জানি, তাহলে তো গল্প লেখার কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে না।

প্রশ্ন: আপনি কয়বার খসড়া করেন?

মুরাকামি: চার-পাঁচবার। ছয় মাসে আমি প্রথম খসড়া লিখি। তারপর সাত-আট মাস যায় সম্পাদনা করে।

প্রশ্ন: তাড়াতাড়িই বলা যায়।

মুরাকামি: আমি যথেষ্ট পরিশ্রমী এবং আমার কাজের প্রতি খুব মনোযোগী। এ কারণে এটা আমার জন্য দ্রুত লেখা সহজ। আমি যখন কোনো উপন্যাস লেখা শুরু করি, তখন ওই উপন্যাস ছাড়া অন্য কোনো লেখার কাজ করি না।

প্রশ্ন: আপনার একটা সাধারণ কাজের দিন কীভাবে কাটে?
মুরাকামি: কোনো উপন্যাস লেখার চিন্তা যখন মাথায় আসে, তখন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠি। তারপর টানা ৫-৬ ঘণ্টা কাজ করি। বিকালের দিকে ১০ কিলোমিটার দৌড়াই অথবা দেড় হাজার মিটার সাঁতার কাটি কিংবা দুটোই করি। তারপর কিছুক্ষণ পড়ি অথবা গান শুনি। রাত ৯টায় ঘুমাতে যাই। আমি এ রুটিনটাই অনুসরণ করি কোনোরূপ বৈচিত্র্য না এনে। ছয় মাস থেকে এক বছর এভাবে চলার জন্য যথেষ্ট শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রয়োজন।

প্রশ্ন: আপনার চরিত্রগুলো নিয়ে কথা বলা যাক। আপনার লেখার সময় তাদের কতটুকু বাস্তব মনে হয়?

মুরাকামি: আমি যখন আমার বইয়ের জন্য চরিত্র বাছাই করি, তখন আমার আশপাশের বাস্তব মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি। বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। বিভিন্ন মানুষের গল্প শুনতে পছন্দ করি। তারা কোন ধরনের মানুষ, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যাই না। আমি শুধু তারা কী অনুভব করছে, কোথায় কোথায় যাচ্ছে, এটা ভাবার চেষ্টা করি। এর থেকে কিছু নিই, ওর থেকে কিছু নিই। আমি আসলে জানি না, এটা বাস্তব কিংবা অবাস্তব। কিন্তু আমার কাছে আমার চরিত্রগুলো বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব। লেখালেখির ওই ছয়-সাত মাস চরিত্রগুলো আমার ভেতরে থাকে, আশপাশে থাকে। এটা এক নিজস্ব মহাজগৎ।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম দুটো বই জাপানের বাইরে প্রকাশ হয়নি, কেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। আমার প্রথম দুটি বই জাপানের বাইরে কোথাও প্রকাশ হয়নি। আমি চাইনি। আমার মনে হয়েছে, ওগুলো আমার অপরিপক্ব ও স্থূল কাজ। হালকা কাজ।

প্রশ্ন: ঠিক কী ওগুলোর দুর্বলতা?

মুরাকামি: প্রথম দুটো কাজে ট্র্যাডিশনাল জাপানি উপন্যাসের ধারাটাকে ভাঙতে চেয়েছিলাম। সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি সফল হয়েছি তৃতীয় বইয়ে গিয়ে। প্রথম দুটো বই আমাকে শিখতে সাহায্য করেছে, এর বেশি কিছু না। ‘আ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ থেকে আমার সত্যিকারের স্টাইল শুরু হয়েছে। তার পর থেকে আমার বইগুলো বড় থেকে বড় হচ্ছে, কাঠামো জটিল হচ্ছে। আমি যখনই নতুন কোনো বই লিখি, পুরনো কাঠামোকে ভেঙে ফেলি এবং নতুন কাঠামো তৈরি করি। আমি যদি কাঠামো পরিবর্তন করি, তখন আমার গদ্য, চরিত্রও পরিবর্তন করতে হয়। কারণ আমি যদি একই কাজ বারবার করি, তাহলে আমি ক্লান্ত হয়ে যাব, বিরক্ত হয়ে যাব।

প্রশ্ন: আপনার বইয়ের অনুবাদ প্রসঙ্গে আসি। আপনি নিজেও একজন অনুবাদক। কাজেই অনুবাদের ঝামেলা কেমন জানেন। আপনি আপনার বইয়ের অনুবাদক কীভাবে বাছাই করেছেন?

মুরাকামি: আমার তিনজন অনুবাদক রয়েছে— আলফ্রেড বার্নবম, ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল ও জ্যা রুবিন। ‘আগে আসলে আগে পাবে’ ভিত্তিতে বই দেয়া হয়। ওরা আমরা ভালো বন্ধু এবং ওরা খুব সত্যবাদী। বই পড়ার পর তাদের কেউ এসে বলে, ‘এ বইটা অসাধারণ! আমি এটা করতে চাই।’ ওকে ওটা দিয়ে দিই। একজন অনুবাদক হিসেবে আমি জানি, এতে আগ্রহটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ভালো অনুবাদক হলেও বইটাকে পছন্দ না করলে অনুবাদের সময় গল্পটা মেরে ফেলবে। অনুবাদ অনেক কঠিন কাজ এবং এ কাজে অনেক সময় লাগে।

প্রশ্ন: কে কোনটা নেবে, এটা নিয়ে কি আপনার অনুবাদকদের মাঝে কখনো কাড়াকাড়ি বাধে না?

মুরাকামি: না, সে রকম হয় না। কারণ একেকজন একেক ধরনের কাজ পছন্দ করে। ‘কাফকা অন দ্য শোর’ ফিলিপ পছন্দ করেছে, কিন্তু জ্যা রুবিনের ভালো লাগেনি। ফিলিপ একজন বিনয়ী ও ভদ্রলোক। জ্যা একজন খুঁতখুঁতে অনুবাদক। আর এদিকে আলফ্রেড হচ্ছে বোহেমিয়ান ধরনের। আমি জানি না, এখন সে কোথায় আছে। সে মিয়ানমারের এক সমাজকর্মীকে বিয়ে করেছে। সরকারের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। সে এমনই এক চরিত্র! অনুবাদের ক্ষেত্রে সে একটু স্বাধীনতা নিয়ে থাকে, মাঝে মধ্যে গদ্য পরিবর্তন করে ফেলে। এটা ওর স্টাইল।

প্রশ্ন: অনুবাদকদের সঙ্গে সমন্বয় করেন কীভাবে? কাজ এগোয় কীভাবে?

মুরাকামি: অনুবাদের সময় ওরা আমাকে অনেক প্রশ্ন করে। প্রথম খসড়া শেষ হলে আমি ওটা পড়ি। কোথাও পরামর্শ থাকলে দিই।

প্রশ্ন: আপনি নিজে অনুবাদ করেছেন কার্ভার, ফিটজেরাল্ড ও আরভিংয়ের মতো ‘রিয়ালিস্ট’ লেখকদের বই। আপনার নিজের লেখায় এ লেখকদের প্রভাব কতটুকু?

মুরাকামি: আমি তাদের বই অনুবাদ করেছি, যাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারব মনে হয়েছে। তাদের বই অনুবাদ করার এটাই মূল কারণ। আমি ‘রিয়ালিস্ট’ লেখকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাদের অনুবাদ করার সময় সূক্ষ্ম পাঠের প্রয়োজন পড়ে। এ কারণে আমি তাদের লেখার গোপন রহস্যগুলো ধরতে পেরেছি।

প্রশ্ন: আপনাকে বলা হয় আমেরিকান পাঠকদের কাছে সবচেয়ে সহজবোধ্য জাপানি লেখক। কিন্তু লেখায় জাপানি সংস্কৃতির উপস্থিতি কতখানি?

মুরাকামি: আমি ভিনদেশী মানুষ নিয়ে লিখতে চাই না। আমি আমাদের নিয়ে লিখতে চাই। জাপান নিয়ে, এখানকার জীবন নিয়ে লিখতে চাই। এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই বলে, পাশ্চাত্যের কাছে আমার স্টাইলটা সহজ মনে হয়। এটা সত্য হতে পারে, কিন্তু আমার গল্পগুলো আমার নিজের, পাশ্চাত্যের নয়।

প্রশ্ন: আপনার লেখায় বিভিন্ন প্রসঙ্গ বা কিছু জিনিসের বারবার উপস্থিতি আছে, যা আমেরিকানদের কাছে পাশ্চাত্যের বলে মনে হয়, যেমন বিটলস। কিন্তু বিটলস জাপানি সংস্কৃতিরও অনিবার্য অংশ।

মুরাকামি: হ্যাঁ, আমি যখন আমার কোনো চরিত্রের ম্যাকডোনাল্ডসে হ্যামবার্গার খাওয়া নিয়ে লিখি, তখন আমেরিকানরা অবাক হয়ে যায়। কেন তারা তফু (এক ধরনের জাপানি খাবার) না খেয়ে হ্যামবার্গার খাচ্ছে? কিন্তু হ্যামবার্গার খাওয়া তো আমাদের কাছে অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার, নিয়মিত ঘটনা!

প্রশ্ন: আপনার উপন্যাসে কি সমসাময়িক জাপানি জীবনের যথাযথ প্রতিফলন ঘটে বলে মনে করেন?

মুরাকামি: তারা কীভাবে কাজ করে, কথা বলে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, কীভাবে চিন্তা করে— এ সবকিছুই জাপানিজ। আজ পর্যন্ত কোনো জাপানিজ পাঠকই আমাকে এ অভিযোগ করেনি যে, আমার গল্পগুলো তাদের জীবন থেকে ভিন্ন। আমি জাপানিদের নিয়েই লিখতে চেয়েছি সবসময়। আমরা কী, আমরা কোথায় যাচ্ছি, আমরা এখানে কেন— এসব নিয়েই আমি লিখতে চাই।

প্রশ্ন: সিনেমা দেখেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ! নিয়মিত। আমার প্রিয় পরিচালক ফিনল্যান্ডের আকি কুরোসমাকি। তার প্রতিটি ছবি আমার প্রিয়। তিনি সাধারণের একটু বাইরে।

প্রশ্ন: এবং খুব মজারও।

মুরাকামি: হ্যাঁ, খুবই মজার।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, লেখায় হাস্যরস থাকা দরকার?

মুরাকামি: আমি চাই, আমার পাঠকরা মাঝে মধ্যে হাসুক। জাপানে অনেক পাঠকই ট্রেনে চলাচল করার সময় আমার বই পড়ে। একজন সাধারণ চাকুরে প্রতিদিন গড়পড়তা ২ ঘণ্টা কাটায় ট্রেনে এবং এ সময়টা সে বই পড়ে। এজন্য আমার বড় বইগুলো দুই ভলিউমে ছাপা হয়। একসঙ্গে থাকলে অনেক ভারী হয়ে যেত। অনেকে আমার কাছে চিঠি লিখে এ অভিযোগ করে যে, তারা আমার বই পড়তে পড়তে ট্রেনেই হেসে ওঠে! এটা তাদের লজ্জায় ফেলে দেয়। ওই চিঠিগুলোই আমি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। আমি জানি, আমার বই পড়ে তারা হাসছে। ১০ পৃষ্ঠা অন্তর অন্তর পাঠককে হাসাতে চাই।

প্রশ্ন: একবার আপনি গার্সিয়া মার্কেস ও কাফকাকে সত্যিকার সাহিত্যের লেখক হিসেবে বলেছেন। আপনার লেখালেখি আমলে নিলে আপনি কি নিজেকে সত্যিকারের সাহিত্যের লেখক মনে করেন?

মুরাকামি: আমি সমসাময়িক সাহিত্যের লেখক, যেটা একেবারে আলাদা। কাফকা যখন লিখত, তখন ছিল শুধু গান, বই ও থিয়েটার। কিন্তু এখন আমাদের আছে ইন্টারনেট, ফিল্ম, ভিডিও আরো কত কি! আমাদের এখন অনেক প্রতিযোগিতা। আসল সমস্যা হলো সময়। উনিশ শতকের মানুষের দিকে দেখুন, যাদের প্রচুর অলস সময় ছিল। সময় কাটানোর জন্য তারা বড় বড় বই পড়ত। তারা অপেরা দেখতে গিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা বসে থাকত। এখন প্রত্যেকেই এত ব্যস্ত যে, এখন ও রকম কোনো অলস শ্রেণী পাওয়া যাবে না। ‘মবিডিক’ বা দস্তয়ভস্কি পড়া খুব ভালো, কিন্তু মানুষের এত সময় কই! এ কারণে উপন্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন আমাদের পাঠকদের ঘাড় ধরে এনে বই ধরিয়ে দিতে হয়। সমসাময়িক লেখকরা অন্যান্য ক্ষেত্র থেকেও যেমন— জ্যাজ সংগীত, ভিডিও গেমস এসব কিছু থেকেও কৌশল ধার করে থাকে। আমি মনে করি, অন্য সবকিছু থেকে ভিডিও গেমস উপন্যাসের অনেক নিকটে।

প্রশ্ন: ভিডিও গেমস?

মুরাকামি: হ্যাঁ। আমি নিজে ভিডিও গেমস খেলতে পছন্দ করি না, কিন্তু তাদের মিলটা অনুভব করি। কখনো কখনো লেখালেখির সময় আমার এমন মনে হয়, আমি একজন ভিডিও গেমসের ডিজাইনার আবার একজন খেলোয়াড়ও।

প্রশ্ন: আর জ্যাজ সংগীত? আপনার লেখালেখিতে এ সংগীত কী কাজে দিয়েছে?

মুরাকামি: ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে আমি জ্যাজ শুনছি। সংগীতের গভীর প্রভাব রয়েছে। আমি একজন সংগীতশিল্পী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি বাদ্যযন্ত্রগুলো ভালো বাজাতে পারতাম না, তাই লেখক হয়েছি। একটা বই লেখা ও একটা গান বাজানো একই কথা: প্রথমে থিমটা ধরি, ওটাকে ইম্প্রোভাইজ করি, তারপর শেষ করি— আমার কাছে ব্যাপারটা এ রকম আর কি।

প্রশ্ন: প্রথাগত জ্যাজ সংগীতে শেষের দিকে আবার প্রথম থিমটাতে ফিরে আসে। আপনি কি ফিরে আসেন?

মুরাকামি: মাঝে মধ্যে। জ্যাজ আমার কাছে একটা ভ্রমণের মতো, আত্মিক ভ্রমণ। লেখালেখির সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য নেই।

প্রশ্ন: প্রিয় জ্যাজ সংগীতশিল্পীরা কে?

মুরাকামি: অনেক! আমি স্টান গেজ ও গেরি মুলিগানকে পছন্দ করি। আমার টিনএজ বয়সে তারা ছিল আমার কাছে পৃথিবীর সেরা সংগীতশিল্পী। অবশ্য মাইলস ডেভিস ও চার্লি পার্কারকেও পছন্দ করি। আমাকে যদি বলেন, কাকে আমি সবার ওপরে রাখব, তাহলে আমার উত্তর হবে, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে মাইলস। মাইলস সবসময় ছিল সৃষ্টিশীল। তাকে আমি অনেক পছন্দ করি।

প্রশ্ন: ‘কাফকা অন দ্য শোর’ নিয়ে কিছু বলুন?

মুরাকামি: এটি আমার লেখা সবচেয়ে জটিল বই। এমনকি ‘দ্য ওয়াইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল’-এর চেয়েও অনেক জটিল। আসলে এটি ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব। এখানে দুটো গল্প পাশাপাশি চলছে। প্রধান চরিত্রটি ১৫ বছরের এক ছেলে। তার নামের প্রথম অংশ কাফকা। পাশাপাশি চলা অন্য গল্পটির প্রধান চরিত্রের বয়স ৬০ বছর। সে অশিক্ষিত; লিখতেও জানে না, পড়তেও জানে না। কিন্তু সে বিড়ালের সঙ্গে কথা বলতে পারে। এদিকে কাফকাকে তার বাবা অভিশাপ দেয়। অভিশাপের ধরন ইদিপাসের মতো। সে তার বাবাকে খুন করবে। মায়ের সঙ্গে প্রেম করবে। অভিশাপ থেকে বাঁচার জন্য সে তার বাবার কাছ থেকে পালিয়ে যায়। সে অনেক দূরে চলে যায়, কিন্তু ওখানে সে অদ্ভুত এক পৃথিবীর দেখা পায়। সে চলে আসে এক অবাস্তব ও স্বপ্নময় জগতে।

প্রশ্ন: ‘হার্ড বয়েলড ওয়ান্ডারল্যান্ড’ আপনার লেখা আমার প্রিয় বইয়ের একটি।

মুরাকামি: এটা আমারও প্রিয়। অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বই; একেবারে নতুন ধরনের। আমার বইগুলোয় প্রধান চরিত্র সাধারণত ২০-৩০ বছরের মধ্যে থাকে। কিন্তু এ বইটিতে প্রধান চরিত্র ১৫ বছর বয়সী।

ওই গল্পটা লিখতে অনেক মজা পেয়েছি। ছেলেটাকে নিয়ে যখন লিখছিলাম, তখন আমার নিজের ১৫ বছর বয়সের কথাগুলো মনে পড়ে যেত। আমি মনে করি, মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার স্মৃতি। এটা অনেকটা জ্বালানির মতো। এটা জ্বলে এবং আপনাকে উষ্ণ রাখে। বলা যায়, আমার স্মৃতিগুলো জমা রেখেছি একটা সিন্দুকে; যার অনেকগুলো ড্রয়ার। যখন আমি ১৫ বছরের ছেলে হতে চাই, তখন একটা নির্দিষ্ট ড্রয়ার খুলি। তখন আমার সামনে ভেসে ওঠে কোবে শহরে কাটানো ছেলেবেলার দিনগুলো। আমি সেই সময়ের বাতাসকে শুঁকতে পারি, মাটিকে ছুঁতে পারি এবং গাছের সবুজকে দেখতে পারি। এ কারণেই আমি একটা বই লিখতে চাই।

প্রশ্ন: ওই ১৫ বছরের উপলব্ধিতে ফিরে যাওয়ার জন্য?

মুরাকামি: হ্যাঁ। অনেকটা তাই।

প্রশ্ন: আপনি একবার আরেক জাপানি লেখক রিও মুরাকামির কথা বলেছিলেন। লেখক হিসেবে তাকে আপনার কেমন মনে হয়?

মুরাকামি: আমার লেখার ধরন উত্তরাধুনিক; ওরটা মূলধারার। কিন্তু আমি যখন তার ‘কয়েন লকার বেবিজ’ পড়েছিলাম, তখন অবাক হয়েছিলাম। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এ রকম একটা শক্তিশালী উপন্যাস লিখব। তার পরই আমি ‘এ ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ লেখা শুরু করেছিলাম। তাই বলা যায়, এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা।

প্রশ্ন: আপনারা কি বন্ধু?

মুরাকামি: আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। পরস্পরের শত্রু নই। তার মেধা অনেকটা স্বতঃস্ফূর্ত ও শক্তিশালী। মনে করুন, তার একটা তেলের খনি আছে; যেটা স্থলভাগের একটু নিচে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমার তেল অনেক গভীরে এবং আমাকে খননের পর খনন করে বের করে নিয়ে আসতে হয়। এবং ওখানে পৌঁছতে আমার অনেক সময় লাগে। কিন্তু একবার আমি ওখানে পৌঁছলে খুব দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হই। আমার জীবন অনেক নিয়মতান্ত্রিক। খননকাজ আমি উপভোগ করি।

অনুবাদ: সাবিদিন ইব্রাহিম