রামো বেজতুল । অনুবাদ: শওকত হোসেন

পয়সাঅলারা একসঙ্গে হয়ে বািচৎ করছিল। একটা উকুন সেঁটে ছিল ওদের একজনের ঘাড়ে। আরেক পয়সাঅলা ওটা ফেলে দিতে চাইল, কিন্তু মেঝেয় পড়ে গেল ওটা। বন্ধুরা ঘাড়ের পেছনে একটা উকুন থাকার কথা বলল তাকে। ‘হতেই পারে না,’ বলল সে। উকুনের খোঁজে সৈন্যসামন্ত পাঠাল, কিন্তু ওটার খোঁজ পেল না ওরা। কয়েক দিন বাদে আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে পেল ওটাকে। ষাঁড়ের মতো শরীর হয়েছে উকুনটার। ধনী লোকটা সেটাকে জবাই করে ছাল খসিয়ে দরজায় পেরেক দিয়ে সেঁটে দিল। ‘এটা কী জিনিস?’ প্রশ্ন করল সে। ‘এটা কিসের চামড়া যে বলতে পারবে তার সঙ্গে আমি আমার একটা মেয়ের বিয়ে দেব।’ কিন্তু চামড়াটা কিসের ঠিকমতো বলতে পারল না কেউ।

একদিন হাজদ্রানো নামে একটা মানুষখেকো এসে বলল, ‘ওটা কিসের চামড়া আমি জানি।’ পয়সাঅলা আন্দাজ করতে বলল তাকে। ‘ওটা তোমার ঘাড়ে সেঁটে থাকা একটা উকুনের চামড়া ছিল,’ বলল সে। ধনী লোকটা তখন বলল, ‘এই যে, আমার মেয়েকে নিয়ে যাও।’ হাজদ্রানো তার মেয়েটিকে নিয়ে বিদায় হলো। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ে তার ডেরায় চলে গেল ওরা। ভেতরে হাজদ্রানোর খাবার মানুষের মাংসের ছড়াছড়ি। স্ত্রীকে সে বলল, ‘মাংস ঝলসাও, আমি খেতে চাই।’ তাই করল মেয়েটা। এক টুকরো মাংস কেটে দরজার নিচ দিয়ে ছুড়ে দিল ও। হাজদ্রানো ওর কাছে এসে বলল, ‘খেতে আসবে না তুমি?’ মেয়েটা উত্তর দিল, ‘আমি আর খেতে পারব না। অনেক খেয়েছি।’ হাজদ্রানো বলল, ‘মাংসের কাছেই জিজ্ঞেস করছি। তুমি না খেয়ে থাকলে পস্তাবে।’ খাওয়ার ফাঁকে মাংসকে জিজ্ঞেস করল সে, ‘মাংস, তুমি কোথায়?’ মাংসের টুকরো জবাব দিল, ‘আমি দরজার তলায়।’ সে বলল, ‘ঠিক আছে।’ রাত নামলে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। মেয়েটা যখন গভীর ঘুমে, ওর বুকে মাথা রেখে সমস্ত রক্ত শুষে নিল সে। সকালে দেখা গেল মারা গেছে মেয়েটা। অন্য পোশাক গায়ে চাপিয়ে মেয়েটার বাবা, ধনী লোকটার কাছে হাজির হলো সে। ওর বাবা আবার বলল, ‘এটা কিসের চামড়া যে বলতে পারবে তার হাতে আমার দ্বিতীয় মেয়েটিকে তুলে দেব।’ হাজদ্রানো বলল, ‘তোমার ঘাড়ে সেঁটে থাকা একটা উকুনের চামড়া ওটা।’ ধনী লোকটা তার দ্বিতীয় মেয়েটিকেও তুলে দিল ওর হাতে। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ের নিচে মেয়েটিকে নিয়ে এল সে। সর্বত্র মানুষের মাংসের ছড়াছড়ি। স্ত্রীকে মাংস ঝলসাতে বলল সে, কথামতো তাই করল মেয়েটি। মাংস নিয়ে আগুনে ঝলসানোর পর একটা টুকরো ছাইয়ের ভেতর ছুড়ে দিল। হাজদ্রানো ঘরে ফিরে শক্ত করে ধরল ওকে, যাতে ওর সঙ্গেই মাংস খায় সে। মেয়েটা বলল, ‘আমি আর খেতে পারব না, অনেক খেয়ে ফেলেছি।’ ওকে হুমকি দিল সে, ‘না খেয়ে থাকলে বোনের মতো একই দশা হবে তোমারও।’ মেয়েটা বলল, ‘আমি খেয়েছি।’ মাংস খাওয়ার সময় চেঁচিয়ে জানতে চাইল হাজদ্রানো, ‘মাংস, তুমি কোথায়?’ মাংস জবাব দিল, ‘আমি ছাইয়ের গাদায়।’ রাত নামলে ঘুমোতে গেল ওরা। মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়তেই ওর বুকে মাথা রেখে রক্ত শুষে নিল সে। সকালে ভিন্ন জামাকাপড় গায়ে ফের ধনী লোকটার বাড়ি গিয়ে হাজির হলো। আবারো ধনী মানুষটা সেই চামড়া দেয়ালে সেঁটে বলল, ‘কেউ এটা কিসের চামড়া বলতে পারলে তার হাতে আমার ছোট মেয়েটিকে তুলে দেব।’ হাজদ্রানো এই মেয়েটিকেও পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গেল।

বাড়ি পৌঁছে সে বলল, ‘বউ, আমাকে মাংস ঝলসে দাও। হলে খেতে আসব।’ মেয়েটা মাংস ঝলসানোর পর একটা টুকরো কেটে রাখল। পাশ দিয়ে একটা কুকুর যাচ্ছিল। চট করে মাংসের টুকরোটা ওটার সামনে রেখে দিল ও। টুকরোটা খেয়ে নিল কুকুরটা। হাজদ্রানো বাড়ি ফিরে ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার সঙ্গে খাবে তো?’ মেয়েটা জবাব দিল, ‘আমি খেতে পারব না। আগেই খেয়েছি।’ ওকে ভয় দেখাল সে। ‘মাংসকেই জিজ্ঞেস করছি আমি। যদি না খেয়ে থাকো, বোনদের মতো একই দশা হবে তোমারও।’ খেতে খেতে সে জিজ্ঞেস করল, ‘মাংস, তুমি কোথায়?’ মাংস জবাব দিল, ‘একটা উষ্ণ পেটে আছি আমি।’ হাজদ্রানো বলল, ‘এখন তুমি আমার স্ত্রী।’ কিন্তু জানতে পারল না যে মাংসটুকু আসলে একটা কুকুরের উষ্ণ পেটে রয়েছে। ওই মাংস মেয়েটার পেটে থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল সে। সকালে মুখ ধুলো মেয়েটা। নাইটিঙ্গেল পাখিদের সঙ্গে কথা বলতে পারত ও। কাগজ খুঁজে না পেয়ে গাছের পাতা ব্যবহার করল ও। আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে বাবার কাছে চিঠি লিখল। ‘তুমি আমাকে উদ্ধার না করলে আমি মারা পড়ব। আমার দুই বোনকে মেরে ফেলা হয়েছে।’ একটা নাইটিঙ্গেল পাখিকে ও বলল, ‘বাবা মুখ ধোয়ার সময় ওকে এই পাতাটা পৌঁছে দিতে হবে তোমাকে।’ পাতাটা ঠোঁটে নিয়ে সেই ধনী লোকের কাছে পৌঁছে দিল পাখিটা। চিঠিটা পড়ার পর হাজদ্রানোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বহু সৈন্য পাঠাল সে। ওরা তার সঙ্গে লড়াই করলেও সবাইকেই নিকেশ করল হাজদ্রানো।

কিছুদিন পর, এক গরিব, বয়স্কা মহিলা ধনী লোকটার কাছে ভিক্ষা চাইতে এল। বুড়িকে সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কোনো ছেলেপুলে নেই?’ মহিলা বলল, ‘আমার সাত ছেলে।’ বেঁচে আছে ওরা? জানতে চাইল সে। হ্যাঁ! বলল মহিলা। লোকটা বলল, ‘বুড়ি, তোমার ছেলেদের গিয়ে ওদের কার কী গুণ আছে জিজ্ঞেস করো! মহিলা বলল, ‘ইয়ে, দশ মিটার লম্বা একটা দড়ি পেলে ছেলেদের জিজ্ঞেস করতে পারি।’ ধনী লোকটা দড়ি দিল তাকে। বাড়ি ফিরে গেল মহিলা। একটা শার্ট সেলাই করতে বসল সে। বড় ছেলে এসে ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘শার্টটা কার জন্য সেলাই করছ?’ মা উত্তর দিল, ‘তোমার জন্য, একটু দাঁড়াও!’ তাকে জিজ্ঞেস করল সে, ‘তোমার কী গুণ আছে?’ ছেলেটা বলল, ‘একবার হাতের ইশারা করেছিলাম, অমনি একটা দশতলা টাওয়ার খাড়া হয়ে গিয়েছিল।’ মহিলা বলল, ‘তোমার জন্যই শার্টটা বানাচ্ছি আমি।’ দ্বিতীয় ছেলে এল। সে কী জানে জানতে চাইল মহিলা। ছেলেটা জবাব দিল, ‘জমিনে কান পেতেই কোথায় কী ঘটছে বুঝতে পারি।’ তিন নম্বর ছেলেটি এসে বলল, ‘সবচেয়ে উঁচু জায়গা থেকে তীর ছুড়ে সাপ মারতে পারি। বিষাক্তগুলোকেই মারি আমি। কখনই ভালো সাপ মারি না।’ চার নম্বর ছেলেটা সবচেয়ে উঁচু জায়গা থেকে হাত বাড়িয়ে মানুষ লুফে নিতে পারে। পঞ্চম জন বলল, ‘আমি এত জোরে ছুটতে পারি যে, স্রেফ দুই মিনিটেই সারা দুনিয়া চক্কর মেরে আসি।’ ষষ্ঠজন বলল, ‘চুরির কায়দা জানি আমি। আমি দরজা খুললেও কেউ টের পায় না।’ সাত নম্বর বলল, ‘এই কাজটা কীভাবে করতে হয় জানি আমি: কেউ মানুষ খেয়ে থাকলে আমি আবার তাদের মুখ দিয়ে বের করে আনতে পারি। কিন্তু ওরা বুঝতেই পারে না।’ বয়স্কা মহিলা এবং ওর ছেলেরা ধনী লোকটার কাছে গেল। লোকটা বলল, ‘হাজদ্রানোর হাত থেকে আমার মেয়েকে উদ্ধার করো। আমার ওজনের সমান স্বর্ণ দেব তোমাদের।’ সবচেয়ে ছোট ছেলেটি বলল, ‘আমরা এখন ওকে বের করতে পারব না, কারণ সে আমাদের পারনাভো, রক্তের ভাই। তবে অল্প দিনের মধ্যেই ওকে বের করে আনব আমরা।’ তারপর বিদায় হয়ে গেল ওরা।

তারপর পথে নামল ওরা। বড় ভাইটি আরেক ভাইকে বলল, ‘জমিনে কান পাতো।’ ভাইটি জবাব দিল, ‘চলো, জোরসে ছুটি। হাজদ্রানো রক্ত শুষে খাবে বলে ওর বুকে মাথা রেখেছে। ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখার সময় বেহুঁশ হয়ে আছে সে।’ পাহাড়ের কাছাকাছি আসার পর বড় ভাইটি বলল, ‘কাউকে বুঝতে না দিয়ে যে দরজা খুলতে পারে সে কোথায়?’ ভাইটি দরজা খুলল। ওরা ভেতরে ঢোকার পর আরেক ভাই হাজদ্রানোর মুখ থেকে মেয়েটিকে বের করে এনে তার মুখের ভেতর একটা পিপে ঠেসে দিল। অন্যরা পালানোর সময় পানি খেতে লাগল হাজদ্রানো। ঘুম থেকে উঠে ওদের ধাওয়া করল সে। শ্রবণশক্তির মালিক জমিনে কান পেতে বলল, ‘কাছে এসে পড়েছে সে!’ আরেক ভাই হাতের ইশারা করল। একটা টাওয়ার দেখা দিল। ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা। পৌঁছে গেল হাজদ্রানো, কিন্তু নিরেট কাদায় তৈরি হওয়ায় টাওয়ারটা ভাঙতে পারল না। পাথরের হলে পারত। বাইরে থেকে চিৎকার করে উঠল হাজদ্রানো, ‘পারনাভো, রক্তের ভাই, সুইয়ের মতো সরু একটা ফুটো বানাও, যাতে আরো একবার মেয়েটিকে দেখতে পাই।’ এক ভাই দরজাটা সামান্য ফাঁক করল। মেয়েটিকে নিয়েই আকাশে উড়াল দিল হাজদ্রানো। তীরন্দাজ তীর ছুড়তে চাইল। ওদের একজন বলল, ‘এবার মারো!’ নিশানা স্থির করল সে। লুটিয়ে পড়ল হাজদ্রানো। এক ভাই মেয়েটিকে লুফে নিল।

ভাইয়েরা ধনী লোকটার কাছে ফিরিয়ে দিল মেয়েটিকে। বাবা ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে তোমার পছন্দ, মেয়ে?’ মেয়েটা বলল, ‘আমাকে যে লুফে নিয়েছিল।’ ওকেই পছন্দ করল ও। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল ওদের।