জাঁ দিলিল্লে ও জুডিথ উডসওয়ার্থ
অনুবাদ: জি এইচ হাবীব
প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক
আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ
(তৃতীয় অধ্যায়)
“অনুবাদের মধ্যে দিয়ে স্কটিশ আত্মার সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন” (প্রথমার্ধ)
কুইবেকের নাট্যকার মিশেল ট্রেমব্লে রচিত La maison suspendue-এর স্কটস অনুবাদ The House Among The Stars সম্পর্কে লিখতে গিয়ে গ্লাসগোর হেরাল্ড পত্রিকার একজন রিভিউয়ার লিখছেন, ‘এটি এমন একটি নাটক, যা স্কটিশ আত্মার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে কথা বলে।’ কথাগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংক্ষেপে বিষয়টি তুলে এনেছে যে, কী করে বিশেষ একজন বিদেশী লেখকের একটি রচনা অনুবাদের মাধ্যমে ভিন্ন একটি সংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, সেটিকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
স্কটিশ সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রায় হাজার বছরের ইতিহাসে বহুভাষিকতা একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। ইংরেজি যখন আজ কর্তৃত্ব করছে, তখন গেলিক এবং স্কটস বাচন, গান ও সাহিত্যে নাছোড়ভাবে বেঁচে থাকতে চাইছে। আর এই বেঁচে থাকা ইংল্যান্ডের কাছ থেকে সেই সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণে অবদান রাখছে, যা যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে স্কটিশ জাতিসত্তার চলমান বোধটিকে সুরক্ষিত করতে সাহায্য করেছে।
{স্কটল্যান্ডের বর্তমান বিচ্ছিন্নতাপন্থী সরকার বর্তমানে (বইটি রচনাকালে— অনুবাদক) স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোট আয়োজন করার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে বিবর্তিত হবে, তা পরিষ্কার নয়।}
ইংরেজি ও গেলিক একেবারেই ভিন্ন দুটি ভাষা, কিন্তু ইতিহাসগতভাবে স্কটস ও ইংরেজি সমগোত্রীয় ভাষা। দ্বাদশ শতকে, প্রাচীন ইংরেজির উত্তরাঞ্চলীয় উপভাষা থেকে স্কটস ভাষার উদ্ভব, অন্যদিকে চতুর্দশ শতকে স্কটল্যান্ড তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার পর স্কটস ও ইংরেজি দূরে সরে যায়। ভাষা দুটোর মধ্যকার ফারাক এতই গুরুত্ববহ যে, ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে যখন একজন হিস্পানি রাষ্ট্রদূত স্কটিশ রাজদরবার সফর করেন, তখন তিনি ভাষা দুটোকে অ্যারাগনিজ ও ক্যাস্টিলীয়র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
১৪৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে স্কটস একটি ‘সকল কাজের কাজী’ ধরনের ভাষায় পরিণত হয়েছিল এবং পরবর্তী ১০০ বছরকে ‘একটি পরিপূর্ণ জাতীয় ভাষা হিসেবে স্কটস ভাষা বিকাশের ব্যাপক সমৃদ্ধির’ কাল হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। ভাষাটি অনুবাদের ভাষা হিসেবে যথেষ্ট পরিণত হয়ে উঠেছিল: ষোড়শ শতকে এ ভাষায় ভার্জিলের ঈনিড, লিভির রোমের ইতিহাস, পুরো ‘নিউ টেস্টামেন্ট’ ও ওল্ড টেস্টামেন্টের খানিকটা অনূদিত হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ফরাসি সাহিত্যে La Pléiade কবিদের অবদানে অনুপ্রাণিত হয়ে রনসার্ডের রচনার বিভিন্ন সংস্করণ ও La Pléiade কবিদের রচনা নিজেই অনুবাদ করেন এবং রাজদরবারের লেখকদের অনুবাদে উৎসাহিত করেন।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ইংরেজি স্কটসের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। প্রটেস্ট্যান্ট রিফরমেশন এতে একটি বিশেষ অবদান রেখেছিল: স্কটস ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ না থাকায় স্কটল্যান্ডে একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রচলিত হওয়ার মাধ্যমে ভাষাটি আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভ করে। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে ‘ইউনিয়ন অব দ্য ক্রাউনস’-এর ফলে ইংরেজি সামাজিক মর্যাদাও লাভ করে: ষষ্ঠ জেমস ইংরেজ সিংহাসনের উত্তরাধিকার লাভ করেন, প্রথম জেমস নামে দুই রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডন থেকে রাজকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। এ ঘটনাগুলো যে কেবল রাষ্ট্রভাষা বা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবেই স্কটসের অবস্থান দুর্বল করে ফেলে তা নয়, সেই সঙ্গে স্কটসের প্রমিত সাহিত্যিক রেজিস্টারের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের দুই পার্লামেন্ট ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে একত্র হলে এবং ইংরেজি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষিত হলে তা স্কটস ভাষার জন্য আরেকটি মারাত্মক আঘাত হিসেবে দেখা দেয়।
একটি জাতীয় কথ্য ভাষা হিসেবে স্কটস সমাজের সব শ্রেণীর মধ্যেই (কেবল গেলিকভাষী অঞ্চলগুলো ছাড়া) রয়ে যায় এবং রবার্ট বার্নসের কবিতা ও স্যার ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাসের বদৌলতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ও ঊনিবংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এমনকি খানিকটা আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক মর্যাদাও লাভ করে। তবে কালক্রমে স্কটসভাষী হওয়াটা জঘন্য রকমের একটা সামাজিক কালিমালিপ্ত হয়ে পড়ে। অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী যতই ভাষাটি পরিত্যাগ করতে থাকে, ততই সেটি আরো নিচু শ্রেণীর ভাষা বলে পরিচিত হতে থাকে। বিশ শতকের মধ্যে স্কটস ক্রমেই গ্রামীণ ও শহুরে শ্রমিকশ্রেণীর ভাষার সঙ্গে বেশি করে সংশ্লিষ্ট হতে থাকে এবং সেটির সহযোগী ভাষা ইংরেজির অবশ্যম্ভাবী সীমা লঙ্ঘন বা আগ্রাসন এ ধারণা তৈরিতে রসদ জুগিয়েছে যে, স্কটস ইংরেজির একটি বিকৃত উপভাষা মাত্র, প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কোনো স্বতন্ত্র ভাষা নয়।
কিন্তু তার পরও স্কটস সাহিত্যের একটি মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে। সত্যি বলতে কি, বিশ শতকে জাতীয়তাবাদী লেখক হিউ ম্যাকডায়ারমিডের (১৮৯২-১৯৭৮) অনুপ্রেরণাদায়ী উদাহরণ এবং ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে তার নেতৃত্বে ঘটা স্কটিশ সাহিত্যিক রেনেসাঁ, এ দুইয়ের কারণে স্কটস ভাষায় লেখালেখি একটি নতুন প্রেরণা লাভ করে। ম্যাকডায়ারমিড মনে করতেন, স্কটস ভাষায় অনুবাদ একটি পুনরভিযোজন (reorientation) তৈরি করবে, যা হবে ইউরোপ অভিমুখী এবং অনুমোদনের জন্য ইংল্যান্ডের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কারণে স্কটস ভাষার ওপর যে আঞ্চলিকতা ভর করেছিল, সেটার বিপরীতমুখী। তিনি ও তার শিষ্যরা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কবিতা স্কটস ভাষায় অনুবাদ করেন। এসব অনুবাদ আর সেই সঙ্গে ম্যাকডায়ারমিড ও অন্যদের লেখা ‘মৌলিক’ কবিতাগুলোয় একটি ‘সাহিত্যিক স্কটস’ ব্যবহূত হয়েছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকারদের একটি তরুণতর প্রজন্মের লেখায় সমসাময়িক, শহুরে শ্রমিকশ্রেণীর স্কটস ভাষার ব্যাপকতর ব্যবহার হতে থাকে।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বিল ফিন্ডলে (১৯৪৭-২০০৫) ও মার্টিন বাউম্যান তাদের প্রথম স্কটস অনুবাদের কাজ শুরু করেন: এজন্য যে রচনাটিকে তারা বেছে নিয়েছিলেন, সেটা হচ্ছে মিশেল ট্রেম্বলে রচিত একটি নাটক Les Belles-Soeurs, যেটাকে তারা The Guid Sisters নামে অনুবাদ ও প্রকাশ করেন।
{মিশেল ট্রেম্বলে (জন্ম ১৯৪২) ১৯৬৫ সালে Les Belles-Soeurs রচনা করেন। মন্ট্রিয়লে ১৯৬৮ সালে Théâtre du Rideau Vert নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করে। মনে করা হয়, এ নাটকেই প্রথমবারের মতো joual (কুইবেক ফরাসির একটি রূপ, যাতে সে সময় শ্রমিকশ্রেণী কথা বলত) ব্যবহার করা হয়েছিল। এখানে québécois কথাটা ট্রেম্বলের ভাষা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ সেটা joual-এর চেয়ে পরিচিত শব্দ এবং খুব সুনির্দিষ্ট করে বললে, মন্ট্রিয়লে ব্যবহূত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ভাষা; কিছু কিছু পরিমণ্ডলে সেটার নেতিবাচক অনুষঙ্গ রয়েছে।}
ফিন্ডলে ও বাউম্যানের জন্য স্কটস ভাষায় অনুবাদ ছিল ‘পরিবার ও শ্রেণী শেকড়’ এ দুইয়ের ওপরই ‘বিশ্বাস রাখা’ এবং সেই সঙ্গে সমাজবাদী ও জাতীয়তাবাদী সহানুভূতির একটি অভিব্যক্তি। কুইবেকেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাউম্যানের, যদিও তিনি ছিলেন স্কটিশ অভিবাসী পরিবারের সন্তান; অন্যদিকে ফিন্ডলে ছিলেন শ্রমিকশ্রেণী থেকে উঠে আসা। স্কটিশ সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়ার সময় দুজনের সাক্ষাৎ ঘটে। ম্যাকডায়ারমিডের উদাহরণ অনুসরণ করে তারা বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদকে স্কটস সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অবদান রাখার একটি উপায় বলে মনে করতেন।
স্কটস ভাষায় রচিত কবিতার এবং ফিকশনে স্কটস ব্যবহারের (যদিও মূলত সংলাপে) দীর্ঘ ও বিশিষ্ট ঐতিহ্যের বিপরীতে বিশ শতকের আগ পর্যন্ত নাটকের নিরবচ্ছিন্ন তেমন কিছু কাজ ছিল না। এ রকম একটি বিলম্বে বিকশমান নাট্য ঐতিহ্যে অনুবাদ একটি জাতীয় নাট্যভাণ্ডার বা রেপার্টোয়ার তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। তার পরেও The Guid Sisters-এর আগ পর্যন্ত স্কটস ভাষায় অনূদিত বিদেশী নাটকের সংখ্যা ছিল করগণ্য ও যথেষ্ট গণ্ডিবদ্ধ একটা পরিসরের একটা ইতিহাসভিত্তিক রেপার্টোয়ার থেকে নেয়া: মলিয়েরের তিনটি, অ্যারিস্টেফেনিসের দুটি এবং গলদোনি, ক্লিস্ট ও হোলবার্গের একটি করে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, বিদেশী ভাষার কোনো সমসাময়িক নাটক সেখানে ছিল না।
The Guid Sisters সে সময়ের ভাষাতাত্ত্বিক ছাঁচও ভেঙে দিয়েছিল। উল্লিখিত ঐতিহাসিক নাটকগুলোয় প্রাচীনতর শব্দ ও রূপ (ফর্ম) সমৃদ্ধ কথ্য গ্রামীণ স্কটস ভাষা ব্যবহূত হয়েছিল, যা ম্যাকডায়ারমিডের মতো কবিদের ব্যবহূত ‘সাহিত্যিক স্কটস’-এর অনুরূপ। ১৯৭০-এর দশকে স্কটিশ থিয়েটারের বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে নাট্যকাররা সমসাময়িক শহুরে স্কটস ভাষার মাধ্যমটি ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন।





