ভারতীয় সাম্যবাদের জনক হিসেবে সুবিদিত মানবেন্দ্র নাথ রায় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পারিবারিক সূত্রে তার নাম রাখা হয়েছিল নরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য। খুব অল্প বয়সেই একজন সংগ্রামী জাতীয়তাবাদী হিসেবে রাজনৈতিক জীবনের পথে তিনি তার সুদীর্ঘ যাত্রা শুরু করেছিলেন। জাতীয়তাবাদী উত্তাপ, রাজনীতি, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ভারতবাসীর সংগ্রামগুলোর ব্যর্থতা প্রভৃতি বিষয় তার হূদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। রায় সবসময়ই মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া তৎকালীন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সামরিক বিদ্রোহকেই সে সময়ে ভারতকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় বলে তিনি মনে করতেন। ছদ্মনাম আর নকল পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি অস্ত্রের খোঁজে জাভা চলে যান। কিন্তু এরই মধ্যে রায় ব্রিটিশদের নজরে পড়ে গিয়েছিলেন, যার ফলে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তাকে ছদ্মবেশসহ বিভিন্ন ফাঁদের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
একজন পলাতক বিদ্রোহী হিসেবে রায় দেশ থেকে দেশে ঘুরে ফিরেছিলেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য অস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করতে তিনি পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় চষে বেড়িয়েছেন। ১৯১৬ সালের জুলাইয়ের দিকে রায় সান ফ্রান্সিসকোয় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তার আমেরিকা পৌঁছার খবরটি একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশ হলে তিনি পুনরায় আবারো ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর নজরসীমায় চলে আসেন। তার কাছে অস্ত্র সরবরাহে নিযুক্ত একটি গোপন জাহাজের জন্য অপেক্ষার পরবর্তীতে একপর্যায়ে রায় এটা মেনে নিলেন যে, অস্ত্র সংগ্রহের এ অভিযান তার সমাপ্ত করা প্রয়োজন। এভাবে পরাজিত বোধের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী পরিচয় থেকে এক রকম বিচ্ছিন্নতা বোধের দরুন তিনি নিজ মাতৃভূমির রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব অবস্থানের দিকে গভীর মনোযোগ দেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফি থেকে জানা যায়, আমেরিকায় তিনি লালা লাজপত রায়সহ অনেক আমেরিকান র্যাডিকাল নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বিভিন্ন জনসভায় তাদের সঙ্গে তিনি সময় কাটাতে শুরু করলেন। সংগ্রামী চেতনা বুকে নিয়ে তিনি নিউইয়র্ক লাইব্রেরিতে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। মূলত এখানেই রায় সত্যিকার অর্থে এম এন রায় হয়ে উঠলেন। তার তখনকার স্ত্রী এভলিনের সঙ্গে সাক্ষাৎও ঘটেছিল এই নিউইয়র্ক লাইব্রেরিতেই। সমাজতন্ত্র নিয়ে তিনি যতই পড়তে ও জানতে লাগলেন, ততই যেন ধীরে ধীরে তিনি এর মূল চেতনা ও আদর্শের সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা বোধ করতে লাগলেন। ফলে তখন থেকেই তার চিন্তাচেতনায় এক ধরনের পরিবর্তনের ছাপ সাবলীলভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
আমেরিকা আর ব্রিটিশ গোয়েন্দা বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি পালিয়ে এসে কৌশলে মেক্সিকোর সীমানায় ঢুকে পড়েন। রায় মনে করতেন যে, মেক্সিকোয় থাকাকালে তার রাজনৈতিক সত্তার পুনর্জন্ম হয়েছিল। রায়ের জীবনধারা সেখানে আমূল বদলে গিয়েছিল। সর্বদা পালিয়ে বেড়ানো, কৃশকায় জীবনকে পেছনে ফেলে এখানে এসে তিনি যেন নতুন করে এক টুকরো আপন ভূমি খুঁজে পেলেন। তার বিগত পলায়নপর রাজনৈতিক জীবনের কর্মের সুবাদে তিনি তখন এরই মধ্যে ব্রিটিশ আর আমেরিকান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কুখ্যাতি লাভ করেছিলেন। মেক্সিকোয় এসে তিনি বুদ্ধিজীবী মহলের সান্নিধ্য লাভ করলেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। রায় তাদের সংগ্রামের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং তিনি নিজেও মেক্সিকান বিদ্রোহ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। মেক্সিকোয় তখন একটু একটু করে রাশিয়ার কমিউনিজম প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল। বহুরূপী এ নতুন জীবনে রায় যেন নিজেকে গিরগিটির মতোই দ্রুত খাপ খাইয়ে নিলেন। সেখানকার যেকোনো অধিবাসীদের চেয়ে তিনি অধিকতর ভালো স্প্যানিশ লিখতে ও বলতে পারতেন। মেক্সিকোয় তিনি একজন ভোকাল আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু মিখায়েল বোরোদিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাটা সত্যিকার অর্থেই মেক্সিকোয় তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বোরোদিন ছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিনটার্নের একজন প্রসিদ্ধ গুপ্তচর। আমেরিকা থেকে পালিয়ে মেক্সিকোয় আশ্রয় নিতে আসা অন্য সোভিয়েত কমিউনিস্টদের সঙ্গে রায়ের খুব দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।
কমিউনিজমের রাজনীতি বিষয়ে রায়ের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বোরোদিনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরোদিন ছিলেন শিক্ষিত ও অত্যন্ত সংস্কৃতিমান একজন মেধাবী মানুষ। আর শেখা ও জানার ক্ষেত্রে রায়ও ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী একজন ব্যক্তিত্ব। শুধু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের জটিল বিষয়গুলোই নয়, বরং ইউরোপের সংস্কৃতির গুরুত্ব বা বিশালতা সম্পর্কেও রায় তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলেন। বোরোদিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মাক্সবাদের মূল বিষয়গুলোকে বুঝতে তিনি আমাকে হেগেলিয়ান সংশয়বাদের জটিল বিষয়গুলো ও এর বস্তুবাদী ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন (মেময়ারস, ১৯৫ পৃষ্ঠা)’ এবং এতে মার্ক্সবাদী চিন্তাচেতনার প্রতি তার যে বিরোধী মনোভাব ছিল, সেটুকু দূর হয়ে যায়। চিন্তাগত দর্শনের দিক থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বস্তুবাদী। রায়কে তার সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতা ভেঙে বেরিয়ে আসতেও বোরোদিন অনেক সাহায্য করেছেন। আমরণ জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে পুরোদস্তুর কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা— রায়ের জন্য এটা ছিল একটা আকস্মিক পরিবর্তন।
‘বোরোদিনের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ পর্যন্তও রায় সশস্ত্র বিদ্রোহে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু বোরোদিনের কাছ থেকে তিনি বিপ্লবের চেতনাকে অনুধাবন বা উপলব্ধি করার গুরুত্বের ওপর জোর দিতে শিখলেন। জ্ঞান বা চিন্তার চর্চা করা একটি সমাজ, জাতি বা দেশের মানুষের জন্য অস্ত্রের চেয়ে আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
বোরোদিনের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া অন্য কমিউনিস্টদের সঙ্গে মেলামেশা ও সমাজতান্ত্রিক দলের সান্নিধ্যে আসার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক দর্শনে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। এ নতুন রাজনৈতিক সমাজে এসে তিনি নিজে অনেকখানি সমৃদ্ধ হয়েছিলেন এবং তার সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী চেতনা ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে ব্রিটিশদের শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে সমালোচনার জন্য তিনি সমাদৃত হয়েছিলেন। রাশিয়ার জনগণের সফল সংগ্রাম হিসেবে রায় বলশেভিক বিদ্রোহের প্রশংসা করেছিলেন। বিশ্বযুদ্ধের শেষে বৈশ্বিক অনেক পরিবর্তন দেখা দেয়। ভ্লাদিমির লেনিন ক্ষমতায় এসেছিলেন। মেক্সিকো থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে কমিনটার্ন শিগগিরই কাজ শুরু করেছিল আর পরিবর্তনের এ জোয়ারে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন রায় নিজে।
রায়ের সক্রিয় ভূমিকা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের সমাজতান্ত্রিক দলগুলোয় এক রকম ভাঙন ধরেছিল। যার ফলে রায়, বোরোদিন, চার্লস ফ্রান্সিস ফিলিপসসহ আরো অন্য সক্রিয় কমিনটার্ন গুপ্তচর যেমন— লুইস ফ্রেইনা ও সেন কাত্যামা বিভিন্নজনের সহযোগিতায় ১৯১৭ সালে মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। রাশিয়ার বাইরে এটাই ছিল প্রথম প্রতিষ্ঠিত বৈধ কমিউনিস্ট পার্টি। ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট প্রচার-প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এবং রায়ের নামটুকু উভয়ে পরস্পরের সমার্থক হয়ে উঠল। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মস্কোয় আয়োজিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় মহাসম্মেলনে যোগদানের জন্য লেনিন রায়কে ও মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখনকার প্রেসিডেন্ট কারাঞ্জার সহযোগিতায় রায় ও তার স্ত্রীকে গুপ্তচর হিসেবে রাশিয়ায় ভ্রমণের জন্য বিশেষ কূটনীতিক পাসপোর্ট দেয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট কারাঞ্জার সঙ্গে রায়ের প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তখনো রায়কে মিথ্যা নাম ব্যবহার করতে হয়েছিল। রায় তার দ্বিতীয় মাতৃভূমিকে চিরবিদায় জানালেন। তিনি জানতেন যে, কমিনটার্নই ছিল এখন তার সঠিক জায়গা।
সম্মেলন শুরুর আগে লেনিনের সঙ্গে রায় অসংখ্যবার সাক্ষাৎ করেছিলেন। যেহেতু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণীর ভূমিকা নিয়ে তাদের উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাগুলো পরস্পর থেকে ভিন্ন ছিল, সুতরাং লেনিনের অনুরোধে এ বিষয়ের ওপর রায় একটি সম্পূরক প্রবন্ধ পেশ করেছিলেন, যা এ দ্বিতীয় মহাসম্মেলনে লেনিনের প্রস্তাবনার পাশাপাশি গৃহীত হয়েছিল। ১৯২৬ সালের শেষের দিকে কমিনটার্নের কার্যকরী নীতি-সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চারটির সব পরিষদের সদস্য হিসেবে রায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফির বিবৃতি অনুসারে তিনি একাধারে কেন্দ্রীয় পরিষদ, রাজনৈতিক সম্পাদনা পরিষদ, কার্যকরী পরিষদ এবং বিশ্বসভা— এ চারটি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
লেনিন, বোরোদিন, ট্রটস্কি, এমনকি হো চি মিন আর সান ইয়াত সেনের মতো লোকদের সাহচর্য রায়কে একজন বিশ্বচিন্তকের ছাঁচে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু জোসেফ স্তালিনের কর্তৃত্ব অনুসরণ করতে গিয়ে এবং চীনে দ্রুত কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থতার ফলে সংগঠনে রায়ের অবস্থান নিচে নামতে শুরু করেছিল। স্তালিনের গৃহীত নীতিগুলোয় মাথা গলানোর ফলে একপর্যায়ে তাকে কমিনটার্ন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
পরাজিত হয়ে নয়, বরং পরিপূর্ণ একজন নতুন ব্যক্তিমানস রূপে রায় এরপর ভারতে ফিরে এসেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তার এ ফিরে আসা সে সময়ে শাসনরত ব্রিটিশদের যেন আরো চাঙ্গা করে তুলেছিল। ভারতে ফিরে আসার অনতিবিলম্বেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলায় লিপ্ত থাকার ফলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল। রায়কে এভাবে সশরীরে গ্রেফতার বা তার ছয় বছরের কারাসাজা প্রাপ্তি ব্রিটিশদের হয়তো তৃপ্ততা দিয়েছিল, কিন্তু চিন্তার জগতে রায়ের চেতনা ও মননশীলতা সবসময়ই ছিল মুক্ত ও স্বাধীন। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি নিজের বিশ্বাস ও আদর্শ, সত্যিকার দর্শনের ওপর তার নিজস্ব চিন্তার গভীর প্রতিফলন ও পুনর্মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন। অধিকাংশ লেখাই রায় এ সময়টায় লিখেছিলেন। জেলে থাকাকালে তিনি গভীর পড়াশোনা ও লেখায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তার নব্য চিন্তাচেতনার ওপর ভিত্তি করে এ সময়েই তিনি দ্য প্রিজন ম্যানুস্ক্রিপ্টস লিখেছিলেন। ‘পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির আলোকে রায় বস্তুবাদকে পুনর্গঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, বস্তুবাদী এবং যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ও অগ্রগতি ছাড়া ভারতে কোনো ধরনের পুনর্জাগরণ বা গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব নয়। তার জেলে থাকাকালীন লেখাগুলোয় নব্য মানবতাবাদী দর্শনের বীজ (যা রায়ের দ্বারাই পরবর্তীতে পূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছিল) স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়ে উঠেছিল।’
ডক্টর এস ললিথা লিখেছেন, ‘এম এন রায়ের উদ্যোগে ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ শহরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছিল (যদিও বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্ক রয়েছে)।
১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ভারতের নবগঠিত সাহসী নেতাদের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে (আইএনসি) যোগদান করেন। বিশ্বযুদ্ধের তীব্রতার পর পরই তার দলের অনুসারীগণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা এবং তাদের সদস্যদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আইএনসির সঙ্গে লিগ অব কংগ্রেসম্যানের অধীনে সংগঠিত হয়েছিল।
রায় মৌলিক গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং ১৯৪৭ সালে তার লেখা নিউ হিউম্যানিজম— আ ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছিল। রায়ের গঠিত দলটি তার গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও আদর্শ ধরে রাখতে না পারলেও নব্য মানবতাবাদের ওপর তার গৃহীত কর্মসূচি ‘বিজ্ঞাননির্ভর, বস্তুবাদী মানবিক দর্শন’-এর প্রস্তাবনার আলোকে যেন ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথে এক নতুন দিক সূচিত করেছিল।
পুরোপুরি জৈবতাত্ত্বিক আদি ভিত্তি থেকে তিনি নৈতিকতাকে অনুসরণ করেছিলেন। তিনি বলতেন যে, মানুষের অগ্রগতি মূলত নির্ভর করে স্বাধীনতা ও সত্যের অগ্রগতির ওপর। ১৯৪৮ সালে তিনি ভারতে মৌলিক মানবিক আন্দোলনের আরম্ভ করেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানবিক ও নৈতিক ঐক্য লাভের প্রত্যাশায় ১৯৫২ সালে ইউরোপ ও আমেরিকার অন্যান্য মানবতাবাদী দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল।
এম এন রায় ছিলেন জটিল চরিত্রের অধিকারী। জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা থেকে নিরঙ্কুশ সন্ত্রাসবাদের দিকে ধাবিত হয়ে একসময় যিনি অস্ত্রের সন্ধানে সমগ্র বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন, পরিশেষে এসে তিনি উদারচেতা ও মেধাবী একজন বৈশ্বিক চিন্তক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। রায়ের আদর্শগুলো তার নিজ আঞ্চলিক সীমারেখাকে অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি ৬৭ বছর বয়সে দেরাদুনে মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের একজন প্রসিদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তক, কর্মী, তাত্ত্বিক ও দার্শনিক হিসেবে আজো বিশ্বে তার প্রভাব অনুভূত হয়।
সূত্র: স্ক্রল ম্যাগাজিন





