পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ সৃষ্টির পর ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা এই প্রদেশের রাজধানী ঘোষিত হয়। এ ঘটনা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫-১৯১১) নামে পরিচিত। অবশ্য বঙ্গভঙ্গের পেছনে ঔপনিবেশিক শাসকদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তবে এ ঘটনার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের দিকেও চোখ রেখেছিলেন বড় লাট জর্জ নাথানিয়েল কার্জন (১৮৯৯-১৯০৫)। তিনি চাচ্ছিলেন পূর্ব বাংলায় মুসলিমদের স্বায়ত্তশাসন পশ্চিম বাংলায় ক্রমবর্ধমান হিন্দু আধিপত্যের বিপরীতে রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে আসবে। অনেক হিন্দু বঙ্গভঙ্গকে ঔপনিবেশিক শাসনের চিরাচরিত নীতি ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। বিপরীতে পূর্ব বাংলার মুসলমানরা একে স্বাগত জানান সুযোগ হিসেবে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিম বাংলার হিন্দু আধিপত্যে বসবাস করার ফলে ঢের অভিযোগ ছিল তাদের। কলকাতা তখন ব্যবসা, শিক্ষা ও অ্যাংলো-ভারতীয় বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত জীবনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বড় মেট্রোপলিসে পরিণত হয়েছিল পূর্ববঙ্গের মানুষের শ্রমে-ঘামে।

মুসলিম জাগরণের কর্মী নবাব সৈয়দ শামসুল হুদা লিখেছেন, ‘বঙ্গভঙ্গের আগে কলকাতা ও আশপাশের জেলাগুলোয় প্রচুর টাকা ব্যয় করা হতো। ভালো কলেজ, হাসপাতাল ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপিত হয় সেখানেই। দীর্ঘদিন ধরে আমরা বহন করছিলাম কেবল অবহেলার ঐতিহ্য।’ তার এ মত তখনকার পূর্ব বাংলার মুসলিমদের মনের কথা। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে জার্নাল অব মুসলিম ইনস্টিটিউটে লেখেন, ‘কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, দেশভাগ পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগরণ নিয়ে এসেছে। অনেক দরিদ্র মুসলিম তরুণ পড়াশোনা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছিল না। তারা এখন যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যাশিত পদে যোগ দিতে পারছে।’

ঢাকায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে নতুন প্রদেশের রাজধানী হিসেবে। আর সেটা দৃশ্যমান হয়েছে সরকারি স্থাপনা ও নাগরিক কাঠামোয়। প্রাদেশিক রাজধানীকে প্রস্তুত করতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন উত্তর ঢাকার বাইরে রমনার বিস্তৃত সবুজ জমি অধিগ্রহণ করে। তৎকালীন রেললাইন দিয়ে চিহ্নিত হয় সীমানা। রমনার স্থাপত্য ও নগর কাঠামোর বিস্তৃতি যেন ঢাকার ললাট থেকে ‘পশ্চাত্পদ’ তকমা ঘুচিয়ে দেয়। ১৯০৯ সালে লন্ডন টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ছিল পশ্চাত্পদ, সুবিধাবর্জিত ও নিরানন্দ এক স্থান। এখানকার দূরত্বের কারণে জায়গাটি ইংরেজরা ভীষণ অপছন্দ করতেন।’ ক্রমে শহরের অবকাঠামোয় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হয়। বিশেষ করে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা করা, পানি সরবরাহ, বৈদ্যুতিক বাতির স্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ও রাস্তা মেরামত করা হয়। রমনা অঞ্চলে অফিস, শিক্ষা ও আবাসনের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসবের মধ্যে স্থাপত্যগত নান্দনিকতার উদাহরণ হিসেবে নির্মিত একটি ভবন কার্জন হল। হাল আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের কার্যক্রম চলছে সেখানে। নামটি দেয়া হয় বড় লাট কার্জনের নামানুসারে। তিনিই ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৪ সালে ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এমন আরেকটি ভবন গভর্নমেন্ট হাউজ, বর্তমানে যা ঢাকা হাইকোর্ট হিসেবে পরিচিত।

ঢাকার গড়ে ওঠা নিয়ে আহমদ হাসান দানি লিখেছেন ‘ঢাকা: আ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুন’। তার দাবি, ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল মূলত টাউন হল হিসেবে। কিন্তু ঐতিহাসিক শরীফ উদ্দিন আহমেদ দাবিটি মানতে নারাজ। তার ভাষ্যমতে, একে তৈরি করা হয়েছিল ঢাকা কলেজের লাইব্রেরি হিসেবে। উদ্দেশ্য আদতে কী ছিল, তা নিয়ে এখনো মতবিরোধ রয়েছে।

কার্জন হল নির্মাণে অর্থের জোগান দিয়েছিল কারা? ভাওয়ালের জমিদারপুত্ররা দেড় লাখ টাকা দেন রমনায় লাল ইটের দালান প্রস্তুত করার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দুটি। নতুন রাজধানী তৈরিতে লর্ড কার্জনের সঙ্গে শরিক হওয়া এবং এর মাধ্যমে সমাজে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব বৃদ্ধি করা।

দ্বিতল ভবনটি ভারতীয় ও ইউরোপীয় স্থাপত্যকলার মিশ্রণ বলা যেতে পারে। সাধারণভাবে একে ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-সারাসিন ঘরানার অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হয়। ঔপনিবেশিক ভারতে শতবর্ষ ধরেই এ রীতি পরিচিত। সমসাময়িক ভারতের অন্য স্থাপনাগুলোতেও তার নজির মেলে। ১৯০৪ সালে নির্মিত মুম্বাইয়ের তাজমহল হোটেল (স্থপতি: ডব্লিউ এ চেম্বারস) ও ১৯০০-১৯০৮ সালে নির্মিত হাওড়া স্টেশনে (স্থপতি: হাসলে রিকার্ডো) স্থাপত্যকলার একই মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির ভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোগল মোটিফ। ঔপনিবেশিক প্রশাসন যে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সংবেদনশীল, সেটা প্রকাশের জন্য তার স্থানীয় স্থাপত্যরীতিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কার্জন হল এমনই এক স্থাপত্যের প্রতীক। তারা ভেবেছিল এর মাধ্যমে স্থানীদের মধ্যে শক্তিশালী হতে থাকা জাতীয়তাবাদী প্রবণতাকে মোকাবেলা করা যাবে।

কার্জন হলের নকশা দেখলে ইউরোপীয় আমলের স্থাপত্যের সংবেদনশীলতা অনুভব করা যায়। কিন্তু এর বহু চূড়াবিশিষ্ট খিলানসহ লাল ইটের বহির্ভাগ, কার্নিশ, উন্মুক্ত ছাদবিশিষ্ট বারান্দা, কোণে কোণে ছোট গম্বুজ এবং ছোট কেবিনগুলো মোগল স্থাপত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেমনটা দেখা যায় মোগল সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিতে এবং দিল্লির লাল কেল্লায়; আগ্রার তাজমহল, ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি এবং ফতেহপুর সিক্রির দিওয়ান-ই-খাসেও। কার্জন হলের সিড়ি ও বারান্দাগুলো ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধির মতো জাফরি কাঠ দ্বারা সুশোভিত। পুরো দালানের চতুর্দিকে বারান্দা রয়েছে, যা বর্ষাকালের বৃষ্টি থেকে ভেতরের ঘরগুলোকে সুরক্ষিত রাখে।

উত্তরমুখী ভবনটির গঠন প্রতিসম। অভ্যন্তরে একটি বড় হল সরলরৈখিকভাবে উভয় দিকেই বিস্তৃত। তিনতলা মূল দালানটিতে সবদিক থেকেই প্রবেশ করা যায়। রঙিন বর্গাকৃতির প্যানেল দ্বারা এর সিলিং সজ্জিত। একটি গম্বুজের অভাব মিটিয়েছে প্রবেশপথে থাকা একটি লম্বা প্রসারিত মিনার। মিনারটিতে তিনটি অশ্বখুরাকৃতির জানালা রয়েছে। ঝুলন্ত কেবিনগুলো দিয়ে মিনারের চারটি কোনাই সুশোভিত।

কার্জন হল শুধু একটি অসাধারণ স্থাপনাই নয়, বরং এর উচ্চতা, আয়তাকার স্তম্ভের বিচিত্রতা, কবাটগুলো, জানালা, প্রলম্বিত ছাদ এবং ছোট কেবিনগুলো এক মনোমুগ্ধকর ছাপ সৃষ্টি করে দর্শনার্থীর চোখে। সব মিলিয়ে স্থাপত্যকর্মটি বাংলায় বিশ শতকের গোড়ার দিককার এক তীব্র গ্লানিকর রাজনৈতিক ঘটনাকে প্রতিফলিত করে।

 

[লেখাটি দ্য ডেইলি স্টারে ২০১৮ সালে প্রকাশিত লেখকের একটি নিবন্ধের অনুবাদ। লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রকাশিত।

অনুবাদ: আহমেদ দীন রুমি]

 

ড. আদনান জিল্লুর মোরশেদ: স্থপতি, স্থাপত্য ইতিহাসবিদ, নগরবিদ ও গবেষক। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকার অধ্যাপক; ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আর্বানিজমের নির্বাহী পরিচালক। প্রকাশিত গ্রন্থ: ঢাকা ইন টোয়েন্টিফাইভ বিল্ডিংস (২০১৭), রিভার র‍্যাপসোডি: আ মিউজিয়াম ফর রিভারস অ্যান্ড ক্যানালস (২০১৮)।