অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা মানবিক সমস্যা সমাধানে প্রত্যক্ষ প্রভাবের কথা বাদ দিলে যতদূর দেখা যায় লর্ড কার্জন ভাইসরয় থাকাকালে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তার প্রধান আকর্ষণ ছিল ইতিহাস ও সাহিত্যের প্রতি। সংস্কৃতির একটি শাখা হিসেবে বিজ্ঞান কখনই তাকে টানেনি। এটা সত্য যে ভারতের ভাইসরয় হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চার বছর আগে অক্সাস নদীর উৎস-সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে তিনি পামির পর্বতে অনুসন্ধানকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তবে প্রাকৃতিক ভূগোলবিদ্যায় অবদান রাখা তার মূল উদ্দেশ্য ছিল না। মূলত ভূগোলবিদ্যা ও খেলাধুলার রাজনৈতিক দিকটি বোঝার জন্য তিনি সে অঞ্চলে ভ্রমণ করেছিলেন। তবুও রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক এ কর্মের স্বীকৃতি তার মনে ছাপ ফেলে। তিনি ধরে নেন যে, ভূগোলবিদ্যা অবশ্যই বিজ্ঞান। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে অন্যান্য শাখায় কার্যরত লোকদের তিনি খুব একটা কার্যকরী মনে করতেন না। এমনকি ভারতের অপ্রশংসিত প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষগুলোর মর্যাদা রক্ষার্থে তার অসাধারণ কর্মে কোনো যথাযথ সহায়তার আশাও তিনি করতেন না। সৌভাগ্যবশত, কোনো বিজ্ঞানকর্মী তার কাজকর্মের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করেনি। এক পর্যায়ে লর্ড কার্জন বুঝতে পারলেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞান অতি জরুরি। তখন গবেষণার প্রগাঢ় ভিত্তি নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তাকে তিনি স্বীকার করলেন। এক্ষেত্রে সৌভাগ্যবশত সরকার বিভাগে দুজন মন্ত্রী স্যার ডেনজিল ইবেৎসন ও স্যার জন হিওয়েটকে তিনি পেয়েছিলেন। তারা বুঝতেন যে বিজ্ঞানের প্রায়োগিক অগ্রযাত্রার জন্য বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের বিকাশ অপরিহার্য। লর্ড কার্জনের ইম্পেরিয়াল এগ্রিকালচারাল ডিপার্টমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ কর্মচারীদের নিয়োগ দেয়। তাদের মধ্যে রসায়নবিদ, উদ্ভিদবিদ, উদ্ভিদের রোগতত্ত্ববিদ, পতঙ্গবিদ এবং কৃষি সমস্যা সমাধানে বেশকিছু বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাদের বদৌলতে ভারতীয় চাষীরা অধিক ফসল ফলান। এতে মোট খরচের তুলনায় বেশি লাভ হয়।

১৮৯৮ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে বেশির ভাগ বিজ্ঞানকর্মী ভাইসরয়ের আগ্রহের বাহিরেই ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যকার প্রবীণরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের এসব পদ-পদবি এমনি এমনিই নয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বাসনাই তার এসব সংস্কার সাধনের পেছনে উদ্দীপনা জুগিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে অন্যান্য খাতেও বিশেষ কিছু সমস্যা তিনি ধরতে পেরেছিলেন। সেগুলোর সমাধানের জন্য তার অসীম কর্মশক্তি এবং অব্যর্থ কর্তব্যবোধ যথেষ্ট ছিল।

মার্চের ২২ তারিখে সানডে টাইমসে, নিউম্যান ফ্লাওয়ার তার অপারেশনের আগের রাতের কথা উল্লেখ করেন। লর্ড কার্জন তার আসন্ন প্রকাশিত বই ‘ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ইন ইন্ডিয়া’ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অনুবেদন লিখেন। এ ঘটনা আমাকে ছোট ছোট বিষয়ের প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রদর্শন করাকে মনে করিয়ে দেয়। ১৯০৫ সালে লর্ড কিচেনারকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তার পদত্যাগ নিয়ে চারদিকে আলাপ-আলোচনা একেবারে তুঙ্গে। লর্ড কার্জন তখন শিমলা থেকে আমাকে লম্বা চিঠিতে সরকারি হাউজের কিছু বিশেষ মার্বেলের বেদির কথা বলেন। যেগুলো সম্বন্ধে এর আগে কলকাতার অধিবেশনে তিনি আমাকে মনোযোগ দিতে বলেছিলেন। ওয়েলসের রাজপুত্র আসার আগেই সেগুলোকে স্থাপন করতে বলেছিলেন তিনি। ১৯১৬ সালের আগ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের ফলে একজনের ওপর বহু রকমের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছিল। যেগুলোর বেশির ভাগই তার বিশেষজ্ঞতার বাইরে, এমনকি পরিচিতিরও বাইরে। অথচ তার আগেই লর্ড কার্জনের বিস্ময়কর কাজকর্মের নজির দেখা গেছে। রেলপথ সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, নগর-পরিকল্পনা, কলকারখানার উন্নয়ন, সামরিক প্রশাসন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি খাত। তবে সবচেয়ে অসাধারণ দিক ছিল জমির রাজস্বে বেশকিছু জটিল সমস্যা নিয়ে কাজ করা। যেটা ওই সময়ের সিভিল সার্ভিসের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কাছেও বোধগম্য ছিল না। সুনিপুণ যৌক্তিক কাঠামোতে লিখিত তার মতামতগুলো বিবিধ বিষয়ে তার বিশেষত্বকে প্রতিফলিত করত। ভারত সরকারে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতাকালে তার সব কাজের রেকর্ড আমার মধ্যে দুটি অসামান্য অনুভূতি জাগিয়েছে। প্রথমত, তার কর্মশক্তি, পুঙ্খানুপুঙ্খতা এবং ভারতের প্রতি তার বিবেকনিষ্ঠ অনুরুক্তি। তার এসব গুণ অবর্ণনীয় প্রশংসার দাবি রাখে। দ্বিতীয়ত, ১৮৯৮ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে ভূতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ হওয়ায় কোনো সুযোগ তার ছিল না। এজন্য তার প্রতি আমি বিশেষ কৃতজ্ঞ।

টি এইচ হল্যান্ড

 

[নেচার জার্নালে ১৯২৫ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত।

অনুবাদ: মিনহাজুল ইসলাম]