অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রয়োজন সুদক্ষ রাইটার্স। এই রাইটার্সদের জন্যই রাইটার্স বিল্ডিং— হালে সচিবালয়। রাইটারের বুৎপত্তিগত অর্থ যা-ই হোক, কাগজে-কলমে চিঠিপত্র লিখে, আদেশ জারি করে যারা প্রশাসন চালান, তারাই রাইটার্স— তারাই প্রশাসক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এটি স্পষ্টভাবেই বুঝল— প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাইটার্স তৈরি করতে হলে কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ১৮০৫ সালে হার্টফোর্ড ক্যাসলে ক্লাস শুরু হলেও কোম্পানি ঠিক বুঝল— দুর্গ আর কলেজ এক কথা নয়। কোম্পানি ১৮০৫ সালেই ৫ হাজার ৯৩০ পাউন্ড স্টার্লিং খরচ করে হার্টফোর্ড হিথে বিশাল একটি এলাকা কিনে আরো ৯২ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং খরচ করে কলেজ প্রতিষ্ঠা করল। সে কলেজে খোলা হলো— ভাষা, আইন, রাজনৈতিক অর্থনীতি, গণিত ও দর্শন, ধ্রুপদ ও সাধারণ সাহিত্য। অবাক হওয়ার কারণ নেই, ভাষা বিভাগে বাংলাও শেখানো হতো— ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা তো বাংলাতেই— গোবিন্দপুর, সুতানটি ও কলকাতায়। অন্যান্য ভাষার মধ্যে ছিল আরবি, উর্দু (হিন্দুস্তানি) মারাঠি, সংস্কৃত, তেলেগু ও পার্শিয়ান।

কোম্পানি সর্বোচ্চ সম্মানী দিয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ দিল। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের শ্রেষ্ঠতম হিসেবেই অচিরে পৃথিবীতে খ্যাত হয়ে উঠলেন রেভারেন্ড টমাস রবার্ট ম্যালথাস। তিনি ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রফেসর। তার পাঠের অন্যতম ফোকাস পপুলেশন। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রশ্নেই হোক কি উন্নয়নের প্রশ্নে জনসংখ্যাকে হিসাবে না এনে বাস্তবচিত্র পাওয়ার কোনো উপায় নেই।

তাঁর প্রিয় ছাত্ররা ঠাট্টা করে নয়, শ্রদ্ধাভরেই তাঁকে বলতেন পপ ম্যালথাস, কেউ কেউ আরেকটু বিস্তৃত করে পপুলেশন ম্যালথাস। ২০১৬তে পপ ম্যালথাসের আড়াইশতম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যমে কেউ তাকে স্মরণ করেছেন বলে মনে পড়ছে না। হতেই পারে তিনি একালের অর্থনীতিবিদদের প্রিয় কোনো ব্যক্তিত্ব নন। প্রিয় তিনি সেকালেও ছিলেন না। তাঁর কারণেই অর্থনীতিকে কেউ কেউ আখ্যা দিয়েছেন ডিসমাল সায়েন্স— বিমর্ষ বিজ্ঞান।

ম্যালথাসের বিশ্বস্ত জীবনীকার হ্যারিয়েট মার্টিনু (১৮০২-৭৬) লিখেছেন, সামাজিক কল্যাণ ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে ম্যালথাস অন্য যে কারোর চেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন, অথচ তিনিই সবচেয়ে বেশি গালি খেয়েছেন।

হ্যারিয়েট মার্টিনুর ম্যালথাসের প্রতি আনুগত্য সেখানের অর্থনীতির পণ্ডিতরা পছন্দ করলেন, তারা তাঁকে ডাকতে শুরু করলেন, ‘ম্যালথাসিয়ান বৃদ্ধ বুয়া’।

আর শুরু থেকে বিভিন্ন সময় তাঁকে চিত্রায়িত করা হলো— দানব ম্যালথাস, শয়তান ম্যালথাস, পাশবিক ম্যালথাস, আওলা মাথার ম্যালথাস, জঘন্য ম্যালথাস, শিশুবিদ্বেষী ম্যালথাস।

ম্যালথাস কি শীতল-রক্ত দানব ছিলেন? 

২.
রেভারেন্ড টমাস রবার্ট ম্যালথাসের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৬, ইংল্যান্ডের সারের ওয়েস্টকোটে। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল ম্যালথাস একজন চমত্কার স্বনির্ভর ভদ্রলোক। তাঁর দুজন বিশ্বখ্যাত বন্ধুর একজন জ্যাঁ জ্যাক রুশো এবং অন্যজন ডেভিড হিউম। তাঁর মা হ্যানরিয়েটা ক্যাথরিন। ডেভিড ম্যালথাস মা-বাবার সপ্তম সন্তান। তিনি নটিংহামশায়ারের একটি স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন; তার পর ওয়ারিংটন একাডেমিতে। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গিলবার্ট ওয়েকফিল্ডের কাছে কিছুকাল পাঠ নেন। মেধাবী রবার্ট ক্যামব্রিজের জিসাস কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান। ১৭৯১-তে এমএ ডিগ্রি নেন এবং দু’বছর পর জিসাস কলেজে ফেলোশিপ পান। তার পর চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রত্যয়ন গ্রহণ করে ওকউড চ্যাপেলের ধর্মযাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

১৭৯৮ সালে তিনি বহুল বিতর্কিত ‘অ্যান এসে অন দ্য প্রিন্সিপল অব পপুলেশন’ প্রকাশ করার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। গ্রন্থের সঙ্গে লেখকের নাম ছাপা হয়নি, কিন্তু কাজটি যে রবার্ট ম্যালথাসের, তা ফাঁস হতে সময় লাগেনি।

এতে ভয়ানক বিষণ্ন এক ভবিষ্যতের চিত্র উঠে এসেছে। রবার্ট ম্যালথাস বললেন, মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে (২, ৪, ৮, ১৬, ৩২...) আর খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে (২, ৩, ৪, ৫, ৬...) আর প্রতি ২৫ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়।

যেহেতু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়বে, নষ্ট হবে ভারসাম্য, এনে দেবে দুর্ভিক্ষ। খাবার না পেয়ে বাড়তি জনসংখ্যা বিলীন হয়ে যাবে।

তিনি লক্ষ করেছেন, সব মনুষ্য সমাজে এমনকি কলুষিত সমাজেও প্রধান প্রবণতা জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটানো। এ সার্বক্ষণিক প্রবণতা মানুষকে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে।

এ অবস্থা মোকাবেলার জন্য তিনি দুই ধরনের প্রতিরোধকের কথা বলেছেন, প্রথমটি পজেটিভ; এর আওতায় পড়ে দুর্ভিক্ষ, অসুখ-বিসুখ ও মহামারী এবং যুদ্ধ। আর দ্বিতীয়টি প্রিভেন্টিভ বা নিরোধক; এর মধ্যে রয়েছে— গর্ভপাত, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পতিতাবৃত্তির সম্প্রসারণ, কৌমার্য ধরে রাখা, বিয়ে পিছিয়ে দেয়া।

ম্যালথাসের সময় পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১ বিলিয়ন (রচনাটির প্রকাশকাল ১৭৯৮), ২৫ বছর পর তা ২ বিলিয়নে পৌঁছবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সর্বনাশা পরিণতির সমাধানের জন্য যদি দুর্ভিক্ষ, অসুখ এবং যুদ্ধের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে অর্থনীতির চক্র ভেঙে যাবে। তিনি বলেছেন, খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় যদি শ্রমিকের সরবরাহ বেড়ে যায়, তাহলে প্রকৃত মজুরি কমে যাবে, জীবনধারণ ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে সংসার প্রতিপালন দুরূহ হয়ে উঠবে আর তা জনসংখা বৃদ্ধি প্রতিহত করতে সাহায্য করবে।

খাদ্য উৎপাদন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির অসামঞ্জস্যপূর্ণ খতিয়ান শেষ পর্যন্ত ডেকে আনবে ‘ম্যালথাসিয়ান ক্যাটাস্ট্রোফ’— ম্যালথাসীয় ধ্বংসযজ্ঞ। এ রকম অনিবার্য ধ্বংসযজ্ঞের কথা রবার্ট ম্যালথাস না লিখলেও অর্থনীতিবিদ জুলিয়ান সাইমন এ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ম্যালথাস বরং জনসংখ্যার গতিশীলতার একটি অভিব্যক্তিবাদী সামাজিক সমাধান দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর ১৭৯৮ সালের রচনায় আটটি বিষয় উঠে এসেছে:

১. ‘নিতান্ত প্রাণ ধারণ স্তরের’ অর্থনীতি জনসংখ্যা বৃদ্ধি সীমিত করে আনে।

২. নিতান্ত প্রাণ ধারণ স্তরের উন্নতি ঘটলে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।

৩. জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ অন্যান্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রণোদনা প্রদান করে।

৪. উৎপাদন বৃদ্ধি আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উত্সাহিত করে।

৫. যেহেতু উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পৃথিবীর ধারণক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্য কঠোরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হবে।

৬. যৌনতা, কাজকর্ম এবং সন্তানসন্ততির ব্যাপারে ব্যক্তিগত লাভক্ষতির হিসাবই সংসার বড় হবে না সংকুচিত হবে, তা নির্ধারণ করে।

৭. জনসংখ্যার চাপ নিতান্ত প্রাণ ধারণ স্তর পেরিয়ে গেলেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের স্বয়ংক্রিয় বিষয়গুলো কাজ করতে শুরু করে।

৮. এই নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রভাব পড়বে বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পদ্ধতির ওপর। (ম্যালথাস সামাজিক অনাচার, বিপন্নতা ও দারিদ্র্যের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।) 

৩.
ম্যালথাসের তত্ত্বকে তার সময় ও পরিসরে বিবেচনা না করে সরলীকৃত সর্বকালীন তত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করায় অধিকতর গালমন্দের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারণে যে ম্যালথাসীয় ধ্বংসযজ্ঞের চিত্রকল্প আমাদের সামনে উঠে এসেছে, তাতে এ অর্থনীতিবিদ-দার্শনিককে ‘প্রোফেট অব গ্লুম’ বলা যেতেই পারে।

ক. খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ধরা যাক দ্বিগুণ আর মানুষের সংখ্যা বেড়েছে চৌষট্টি গুণ— এক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষ তো অনিবার্য, খাবারের জন্য যুদ্ধ এড়ানোরও কোনো উপায় নেই, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যের কারণে মহামারীর প্রকোপে বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ থাকার কথা নয়। পৃথিবী সসীম, ধারণক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।

কিন্তু বিষণ্নতার নবীর ভবিষ্যদ্বাণী তার নিজ দেশে ফলেনি, ফলেনি এমনকি পশ্চিম ইউরোপে। বরং পশ্চিমের দেশগুলোর শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি ম্যালথাসকে ভ্রান্ত প্রমাণ করিয়ে ছেড়েছে। ম্যালথাস যে দ্রুততায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বাস্তবে তা ছিল আরো শ্লথ (আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু দেশ বাদে)। অন্যদিকে ম্যালথাসের গাণিতিক হারকে টেক্কা দিয়ে খাবারের উৎপাদন বেড়েছে অবিশ্বাস্য রকম অধিক হারে। কাজেই যে নারকীয় যজ্ঞ দেখার সম্ভাবনা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত ঘটেনি। বরং ম্যালথাসের আমলের তুলনায় মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক বেড়ে যায়।

খ. প্রযুক্তির শক্তি ও প্রভাব এবং মানুষের উদ্ভাবন শক্তি তিনি অবমূল্যায়ন করেছেন।

কৃষি উৎপাদনের ক্রমহ্রাসমান ফসলপ্রাপ্তির তত্ত্বের ঘোর হয়তো ম্যালথাসকে পেয়ে বসেছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, খাদ্যশস্য উৎপাদনের হার কোনোভাবেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু বড় পুঁজির বিনিয়োগ এবং দ্রুত অগ্রগামী প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমহ্রাসমান উৎপাদন তত্ত্বকে নাকচ করে দেয়। সার, কীটনাশক, উন্নত বীজ ও সেচ কৃষিতে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। অধিকাংশ উন্নত দেশের বেলায় এটিই সত্য। গত শতকের ষাটের দশকে বিজ্ঞানী নরম্যান বোরলাগের তত্ত্বাবধানে যে সবুজ বিপ্লব ঘটে গেল, তাতে পপুলেশন বুম কিংবা গ্লুম মোকাবেলা সহজ হয়ে উঠল। কাজেই রবার্ট ম্যালথাস আবার হেরে গেলেন।

গ. ম্যালথাস খাদ্য ও জনসংখ্যাকে যে নিক্তিতে মেপেছেন, তার হিসাব যদি সত্যি হতো, তবে তাঁর নিজ দেশ গ্রেট ব্রিটেন দুর্ভিক্ষে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

তিনি কেবল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে বিবেচনায় নিয়েছেন। সব ধরনের উৎপাদন হিসাবে আনলে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিষয়টি মাথায় রাখলে ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব হয়তো ভিন্নরূপে আবির্ভূত হতো।

গ্রেট ব্রিটেনে যে পরিমাণ কৃষিজমি, তার উৎপাদন ব্রিটিশদের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এমনকি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে ঘরে যে ফসল তুলত, তাও অপর্যাপ্তই হতো। কিন্তু ব্রিটেন শিল্প ও খনিজ সম্পদে এতটাই এগিয়ে যায় যে, এর উদ্বৃত্ত দিয়ে অন্য দেশ থেকে জাহাজ বোঝাই খাবার এনে অনায়াসে নাগরিকদের ভরপেট খাইয়ে রাখতে পারে। গত ২৫০ বছরে (ম্যালথাসের জন্মের পর থেকে) ব্রিটেনে বড় ধরনের খাদ্য সংকটের কথা শোনা যায়নি, অথচ বাস্তবে ব্রিটেন খাদ্য ঘাটতিরই দেশ। সীমিত কৃষিজমি আর কৃষিপণ্য উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর দেশের জন্য আশঙ্কার কারণ, কিন্তু শিল্পোন্নত দেশের জন্য নয়।

ঘ. ‘নিতান্ত প্রাণ ধারণ স্তরের’ অর্থনীতি থেকে উত্তরণ ঘটলে ম্যালথাসের মতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরো বেড়ে যাবে। ফলে আবারো তারা কেবল প্রাণ ধারণ অর্থনীতির স্তরে নেমে আসবে। সোজা কথা, জনসংখ্যা বেড়ে গেলে মানুষ কোনোভাবেই নিতান্ত প্রাণ ধারণ স্তরের মানের উপরে উঠতে পারবে না।

কার্যত ঠিক উল্টোটি ঘটেছে। জীবনমান বৃদ্ধি পেলে জন্মহার বেড়ে যাবে— এ রকম নজির বলতে গেলে নেই-ই। অবশ্য গ্রামের মোড়ল মোড়লিপনা করে, কাজের বিনিময়ে খাদ্যের গম আত্মসাত্ করে, থানার দালালি করে বাড়তি টাকার মালিক হয়ে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করে অধিক সন্তানের জনক হতে পারেন— ব্যষ্টিক পর্যায়ে এ রকম বিচ্ছিন্ন উদাহরণ মিলবে, তবে সামষ্টিকভাবে এটিকে সত্য বলা যাবে না।

বরং অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হলে, জীবনমান উন্নত হলে জন্মহার দ্রুত কমে যেতেই দেখা যায়। আর্থিক সমৃদ্ধি শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়। ইউরোপ-আমেরিকায় সন্তান জন্ম দিয়ে নিজেদের জন্য ভোগান্তি ডেকে আনতে অনেকেই রাজি নন। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা ম্যালথাসের জনসংখ্যা জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করে।

ঙ. জনসংখ্যা বৃদ্ধির জ্যামিতিক এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির গাণিতিক পরিসংখ্যান ম্যালথাস তথ্য দিয়ে সমর্থন করাতে পারেননি। এই দুই বৃদ্ধির কোনোটাই কোনো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক বা গাণিতিক প্যাটার্নকে অনুসরণ করে না।

ম্যালথাসের জীবদ্দশায় তাঁর এ মৌলিক রচনার ছয়টি সংস্করণ হয়েছে। তিনি পরবর্তী কোনো সংস্করণে এ সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের সমর্থনে নতুন কিছু বলেননি বরং বলেছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার স্বভাবতই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়।

ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্ব পাঠ এবং তার ভয়ার্ত ভবিষ্যদ্বাণী টমাস কার্লাইলকে ভাবিয়েছে; তাঁর কারণেই তিনি অর্থনীতির নাম দিয়েছেন বিমর্ষ বিজ্ঞান। আবার ১৮২৬-এ প্রকাশিত ম্যালথাসের এ গ্রন্থের ষষ্ঠ সংস্করণ এককভাবে চার্লস ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে প্রভাবিত করেছে তাঁদের প্রাকৃতিক নির্বাচনতত্ত্ব প্রণয়নে।

১৮৩০ সালে ম্যালথাস তাঁর মূল গ্রন্থের প্রকাশনার ৩২ বছর পর এর সারসংক্ষেপ বের করেছেন: আ সামারি ভিউ অব দ্য প্রিন্সিপল অব পপুলেশন। 

৪.
উইলিয়াম গুডউইন, রবার্ট ওয়েন ও মননশীল প্রবন্ধকার উইলিয়াম হ্যাজলিট রবার্ট ম্যালথাসের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্দো ও আলফ্রেড মার্শাল তাঁর পক্ষাবলম্বন করেছেন। দুজন অর্থনীতিবিদই ম্যালথাস দ্বারা প্রভাবিত। ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ গ্রন্থে তাঁকে জোরালো সমর্থন দিয়েছেন জন স্টুয়ার্ট মিল। কিন্তু আমেরিকান অর্থনীতিবিদ হেনরি চার্লস ক্যারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্সিপলস অব সোস্যাল সায়েন্স’-এ ম্যালথাসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রবল বিরোধিতা করেছেন ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তাঁর ‘আউটলাইন অব আ ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি’ (১৮৪৪) গ্রন্থে; কার্ল মার্ক্সেরও একই সুর; ১৮৬৭তে প্রকাশিত ‘ক্যাপিটাল’-এ তিনি ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্বকে নাকচ করে দিয়েছেন।

এঙ্গেলস এতটাই চটেছিলেন যে, তাকে লিখতে হয়েছে— পৃথিবীতে বিদ্যমান সব তত্ত্বের মধ্যে এটিই ‘দ্য ক্রুডেস্ট অ্যান্ড দ্য মোস্ট বার্বারাস’। প্রতিবেশীকে ভালোবাসার যে শিক্ষা ধর্ম দিয়েছে, ম্যালথাস তা উপড়ে ফেলেছেন। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের কাছে জনসংখ্যার চাপের সমস্যাটি আসলে ‘প্রেশার অব দ্য মিনস অব প্রডাকশন অন পপুলেশন’। পরবর্তীকালে লেনিন একে বলেছেন ‘প্রতিক্রিয়াশীল ডকট্রিন’।

ম্যালথাসের ডকট্রিনের বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছে, তার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হলো:

ক. তত্ত্বের গাণিতিক হিসাবটি ভুল।

খ. তিনি তার তত্ত্বে এতটাই বন্দি যে, নতুনের আগমনও আগ্রাহ্য করছেন।

গ. একটি অনড় অর্থনৈতিক আইনের অভিব্যক্তি ঘটিয়েছেন।

ঘ. জনগণের ভেতর যে ‘ম্যানপাওয়ার’ আছে, তা উপেক্ষা করেছেন।

ঙ. বুঝতে পারেননি যে, জনসংখ্যা কেবল খাদ্যের সঙ্গে জড়িত কোনো বিষয় নয়।

চ. মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়া যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ, তা বিবেচনায় আনেননি।

ছ. অভিজ্ঞতালব্ধ সাক্ষ্য ম্যালথাসের তত্ত্বকে সমর্থন করে না। জনমিতি বিশারদরা দেখিয়েছেন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত; আয় বাড়লে জন্মহার কমে যায়।

জ. ম্যালথাস চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতির সম্ভাবনা তখন অনুধাবন করতে পারেননি।

ঝ. মূলত ধার্মিক ও ধর্মযাজক হওয়ায় জোর দিয়েছেন নৈতিক সংযমের ওপর। জন্ম নিরোধকের ব্যাপক ব্যবহার তিনি কল্পনা করতে পারেননি। তার চিন্তায় যৌনতার সঙ্গে অনিবার্যভাবে শিশুজন্ম জড়িয়ে ছিল।

ঞ. ঐশ্বরিক নিয়ন্ত্রণের বিষয় সর্বত্র প্রযোজ্য হয়নি। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে পৃথিবীর বোঝা হিসেবে মনে করেছেন এবং ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনসংখ্যা হ্রাস করে ভারসাম্য আনবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। কিন্তু জনসংখ্যা যেখানে পড়তির দিকে; সেই জাপান, জার্মান ও ফ্লান্সেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে।

ট. ম্যালথাসের কালের তুলনায় জনসংখ্যা অন্তত সাত গুণ বেড়েছে; একই সঙ্গে অনাহার-মৃত্যুর সংখ্যাও তখনকার তুলনায় কমে এসেছে। সুতরাং ম্যালথাস ভুয়া ভবিষ্যত্ বক্তা— ফলস প্রোফেট।

সুতরাং ম্যালথাস এবং তার তত্ত্বকে উড়িয়ে দেয়া যাবে?

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলেজ হেইলব্যারির ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থনীতির শিক্ষক টমাস রবার্ট ম্যালথাসের ছাত্ররাই প্রথমে কোম্পানির হয়ে, পরে রানীমা ও রাজার হয়ে ভারত শাসন করেছেন। তারা বিলেতের আবহাওয়া যে ‘ম্যালথাসিয়ান সিচুয়েশন’ তাদের প্রিয় অধ্যাপকের ক্লাসে কল্পনা করেছেন, ভারতবর্ষে এসে তা-ই দেখেছেন এবং ম্যালথাসের চোখে তার সমাধান খুঁজেছেন।

১৯৬৮ সালে পল এরলিখ যখন ‘দ্য পপুলেশন বম্ব’ প্রকাশ করলেন, তা ম্যালথাসীয়  বোমার মতোই বিস্ফোরিত হলো। পল এবং অ্যান এরলিখের ‘দ্য এন্ড অব অ্যাফ্লুয়েন্স’ (১৯৭৪) কিংবা রোম ক্লাব প্রকাশিত ‘দ্য লিমিটস টু গ্রোথ’ মূলত ম্যালথাসেরই প্রতিধ্বনি। নয়া ম্যালথাসবাদীরা জনসংখ্যা ও অর্থনীতির সঙ্গে তৃতীয় একটি পরিবর্তনশীল উপাদান যোগ করেছেন— রাজনীতি। এতে কখনো কখনো রাজনীতি অন্যতম নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠে।

বলা বাহুল্য, জনসংখ্যাতত্ত্ব ম্যালথাসের অনেকগুলো কাজের একটি মাত্র।

প্রবল বিরোধিতার মুখে যারা তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছেন, তাদের অন্যতম রবার্ট রিকার্দোর মৃত্যু হলে নতুন অর্থনীতিবিদরা তাঁকে উপেক্ষা করতে থাকেন, এমনকি বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারও চালান।

যে রেভারেন্ড ম্যালথাস কৌমার্য ধরে রাখার মন্ত্র জপেছেন, তিনি ১১টি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে পৃথিবীকে আরো ভারাক্রান্ত করে তুলেছেন।

প্রকৃতপক্ষে তিনি দুই কন্যা ও এক পুত্রের জনক।

বেচারা ম্যালথাস! পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানী অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় নাড়া দিয়ে ২৯ ডিসেম্বর ১৮৩৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর জনসংখ্যাতত্ত্বে অনেক দুর্বলতা থাকার পরও প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর অর্থনীতিবিদদের মেনে নিতে হয়েছে— ম্যালথাসই ছিলেন সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ। একালের অর্থনীতিবিদরাও তা-ই মনে করেন।

তাঁর তত্ত্বের যথার্থতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

লেখক: অর্থনীতিতে পিএইচডি, চাকুরে ও লেখক