২ জুলাই ১৯৬১ হেমিংওয়ে নিজের প্রাণ নিজেই নেন। হেমিংওয়ে কখনো নারীসঙ্গ বঞ্চিত ছিলেন না; কিন্তু নারীও তাকে ধরে রাখতে পারেনি... ৫৫ বছর পর পুনঃসংস্করণ ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে সিড অলব্রাইটের লেখাটি অনূদিত হলো।
আর্নেস্ট (পাপা) হেমিংওয়ে সাহিত্য জগতের অতিকায় ব্যক্তিত্ব, জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন আইডাহোর কেচামে। তখনো তাঁর অনেক কিছু দেওয়ার ছিল, কিন্তু একটি শটগান দিয়ে তিনি নিজের জীবন নিঃশেষ করে দিলেন। বহুমুখী মেধা ছিল তাঁর, জীবনাচরণে ঘাটতিও ছিল অনেক। তাঁর প্রস্থান দুঃখজনক, তাঁর সৃষ্টি এখনো সপ্রাণ। পাপা হেমিংওয়ের জীবনে সুনির্দিষ্ট তাল ও লয় ছিল না। আর তা থাকলে তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন মনে করারও কোনো কারণ নেই। তাঁর চার স্ত্রীর কারোরই একঘেয়ে ও বিরক্তিকর জীবন ছিল না। প্রতিদিনের সূর্যোদয় তাঁর জন্য নিয়ে এসেছে নতুন অভিযানের আহ্বান।
‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-এ তিনি লিখেছেন, ‘বর্তমানের মতো এমন কিছু আর নেই। গতকালও এমন ছিল না, অবশ্যই আগামীকালও এমন হবে না। আর এটা বোঝার জন্য তোমাকে কত বছর বয়সী হতে হবে!’
‘এখন মানে যদি দুদিন হয়, তাহলে তোমার জীবন দুদিনের, এর মধ্যেই সবকিছুই আনুপাতিক হারে করে যেতে হবে। ... তুমি যা পাওনি, তার জন্য যদি অভিযোগ আর প্রশ্ন করা বন্ধ করে দাও, তাহলে তুমি একটা ভালো জীবন পাবে।’
হেমিংওয়ের বিরামহীন চঞ্চল আত্মা জীবনকে দেখেছে একটি ভোজের মতো, খেতে হবে ক্রমাগত বড় কামড় দিয়ে, ভোগ করে যেতে হবে, কিন্তু গিলে ফেলা যাবে না। তিনি বলেছেন, ‘জীবন সম্পর্কে লিখতে হলে আগে তো সেই জীবনটা যাপন করতে হবে।’ তিনি নিজে সে কাজটিই করেছেন। হেমিংওয়ের শৈশব তেমন শান্তিপ্রদ কিছু নয়। তাঁকে লালন করেছেন কঠোর প্রকৃতির একজন বাবা এবং কর্তৃত্বে আগ্রহী একজন মা।
তাঁর মা ফ্লোরেন্সকে নিয়ে জীবনীকার বার্নিস কার্ট ‘দ্য হেমিংওয়ে ওমেন’ নামে একটি চমত্কার বইতে লিখেছেন, ‘সৃষ্টিশীল নারী হয়ে সন্তানদের জীবন সমৃদ্ধ করতে এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে, লেখক হেমিংওয়ের ভাষায় তিনি হয়ে উঠছিলেন এমন একজন স্বার্থপর নারী যিনি তার স্বামীর জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছেন।’
তবে ভালো দিক হচ্ছে, হেমিংওয়েরা সবাই বড় মাপের অর্জনকারী হয়েছেন আর আর্নেস্ট চেয়েছেন সবকিছুতেই প্রথম হতে। ‘তার ছিল অপরিমেয় জীবনীশক্তি, স্বাধীন অস্তিত্ব হিসেবে টিকে থাকার প্রত্যয় এবং তিনি নিয়ে যান প্রথাগত বিধিনিষেধের বাইরে।’ কিন্তু যখন তার বয়স বাড়ল, প্রকাশিত হলো আরেকটা দিক— তিনি সহজেই একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হতেন আর এটা এতদূর গড়ায় যে, তিনি দুর্ব্যবহার করতেন এবং গালাগাল দিতেন। এটা সত্য যে, তাঁর শেষ তিনজন স্ত্রী হেমিংওয়েকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত সাংবাদিকতায় সক্রিয় ছিলেন, তারা কেউই তা সহজে মেনে নেননি। সাহিত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই তাঁর সাংসারিক প্রশান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
১৯১৯ সালে হেমিংওয়ে তাঁর প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসার নারীকে হারান। অ্যাগনেস ভন কুরোভস্কি, রেড ক্রসের নার্স, তার চেয়ে সাত বছরের বড়। তার সঙ্গে দেখা ইতালির এক হাসপাতালে, হেমিংওয়ে তখন গুরুতর জখম নিয়ে সে হাসপাতালে ভর্তি। সবকিছু ভালোই এগোচ্ছিল, তারা বিয়ের পরিকল্পনাও করেন, কিন্তু ততদিনে চিত্রপটে প্রবেশ করে একজন ইতালীয় অফিসার, তিনি জয় করে নেন অ্যাগনেসকে। ১৯ বছর বয়সী আর্নেস্ট ভীষণ মুষড়ে পড়েন। যুদ্ধের পর তিনি উত্তর আমেরিকায় ফিরে আসেন, কিছুকাল উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির পর টরন্টো ডেইলি স্টার পত্রিকার জন্য লিখতে শুরু করেন। উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের জন্য তার সার্বক্ষণিক তীব্র তৃষ্ণা, গল্পটা একটু বাড়িয়ে বলতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, তিনি চান যা কিছু করবেন, সব করবেন ইচ্ছেমতো।
১৯২০ সালে শিকাগোর এক অ্যাপার্টমেন্টে হইচই করা এক পার্টিতে হেমিংওয়ের দেখা হয় এলিজাবেথ হ্যাডলি রিচার্ডসনের সঙ্গে। তিনি হেমিংওয়ের চেয়ে আট বছরের বড়। ছোটবেলায় হ্যাডলি জানালা দিয়ে বাইরে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পান, তখন থেকেই মা-বাবার আশ্রয়ে ভয়ঙ্কর লাজুক জীবনযাপন শুরু করেন। তার বয়স যখন তের বছর, হ্যাডলির বাবা আত্মহত্যা করেন আর একটি মৃত শিশু প্রসব করে তার বোনের মৃত্যু ঘটে। আর্নেস্টের সঙ্গে সাক্ষাতের মাত্র ক’মাস আগে তার মা ব্রাইটস ডিজিজে (কিডনির রোগ, ক্রনিক নেফ্রাইটিস) আক্রান্ত হন। হ্যাডলি লাল চুলের মেয়ে, দেখতে তেমন সুন্দর নন, লাজুক। এমন কোনো উত্তেজনাময় আকর্ষণও তার নেই যে, হেমিংওয়ে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন। কিন্তু সে রাতে হেমিংওয়ে পূর্ণ মনোনিবেশ করলেন তারই ওপর। হ্যাডলি অবাক হলেন, দুজনের মধ্যে একটি সম্পর্ক সূচিত হলো। তিনি হেমিংওয়ের অসীম শক্তি ও প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করলেন— হেমিংওয়ে যা চান, তাই করতে পারেন। তিনি হ্যাডলিকে ভালোবাসতে শুরু করেন। হ্যাডলি যে হেমিংওয়ের অন্তঃসত্ত্বাকে বুঝতে পারেন। তিনি তাতে মুগ্ধ, তিনি তার খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তি ও রসবোধের প্রশংসা করেন। মনে হয় তারা দুজনই দুজনার। সাহিত্য সমালোচক এডমুড উইলসন লিখেছেন, হেমিংওয়ের পছন্দ ‘নারী-পাখি লাজুক, নিঃসঙ্গ যে, তার সাহসী সুন্দর ও অভিযানপ্রিয় পুরুষ-পাখিতে সম্পূর্ণভাবে মগ্ন।’
হ্যাডলি আর্নেস্টকে বলেছেন, ‘সত্যি বলছি, তুমিই প্রথম পুরুষ যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিকভাবে আমাকে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছে।’ ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২১ মিশিগানের হর্টন বে-তে তাঁদের বিয়ে হয় আর তাঁদের হানিমুন হয় উইলসন লেকে হেমিংওয়ে পরিবারের গ্রীষ্মকালীন কুঠিরে। তাঁর বয়স তখন ২২ বছর আর হ্যাডলির ৩০।
এই দম্পতি রোমে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, কিন্তু তাঁদের এক বন্ধু সাহিত্যিক জন ভস প্যাসোজ প্যারিস যাওয়ার পক্ষে তাদের উত্সাহিত করল। প্যারিসেই এলেন এবং সে যুগের বড় বড় সাহিত্য প্রতিভার সঙ্গে তাঁদের দেখা হলো, যাদের মধ্যে রয়েছেন এজরা পাউন্ড জেমস জয়েস, গ্রার্ট্রড স্টেইন এবং স্কট ও জেল্ডা ফিটজেরাল্ড। আর্নেস্ট প্যারিস খুব উপভোগ করলেন। নিজের নির্মেদ লেখার শৈলী আবিষ্কার করলেন এবং সাহিত্যের বড় অভিভাবক গ্রার্ট্রড স্টেইন তাঁর মধ্যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে এটা যে আবিষ্কার করতে পেরেছেন, তা জেনে খুশি হয়েছেন। একই সঙ্গে হ্যাডলিও তার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসছেন; আর্নেস্টের অন্ধকার দিকগুলো তাকে শঙ্কাগ্রস্ত করেনি— অসুখী আত্মমগ্নতা, বিষণ্ন্নতা, ক্ষমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত ওঠানামা, দীর্ঘ সময় নিজের লেখা নিয়ে পড়ে থাকা— এসব শেষ পর্যন্ত তাকে নিঃসঙ্গ ও উদ্বিগ্ন করে তোলে।
জেমস জয়েস হেমিংওয়ের আস্ফাালনকে তাঁর ভেতরের গভীরে প্রোথিত উদ্বেগ লুকানোর চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্য দিয়েও হ্যাডলি স্বামীর অনুগত নিঃস্বার্থ থাকতে চেয়েছেন, মনও চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করেছেন। আর্নেস্ট দ্রুত বন্ধু তৈরি করেছেন, হ্যাডলি চেয়েছেন নারীর চেয়ে ভালো পুরুষ বন্ধুর সংখ্যা বেশি হোক। এই সময়টা তাদের বেশ ভালো কেটেছে ইউরোপে বৈচিত্র্যময় সফর, প্যামপ্লোনাতে ষাঁড়ের লড়াই, পাপার জন্য পত্রিকার বৈদেশিক প্রতিনিধির কাজ— সবই তিনি আত্মস্থ করে নিয়েছেন, যা একসময় তার গল্পের বুননে উঠে আসবে।
তাঁর বিদেশী বন্ধুদের কাছে হ্যাডলি তেমন খুঁতেখুঁতে নয়, তারা তার গার্হস্থ্য প্রশাসনের প্রশংসা করেন— তার কারণে আর্নেস্ট লেখালেখিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন।
১৯২২ সালে হ্যাডলি স্বামীর সঙ্গে জেনেভা এলেন। হেমিংওয়ে একটি শান্তি সম্মেলনের সংবাদ পাঠাতে এসেছেন। প্যারিসে ট্রেনের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলেন, হেমিংওয়ের পাণ্ডুলিপিভর্তি একটি স্যুটকেস তার কাছ থেকে খোয়া যায়। হেমিংওয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন, এই বিষয়টি টগবগ করে ফুটতে থাকে, তিনি এতটাই কর্কশ ব্যবহার করেন, যা তাদের সম্পর্কের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়।
এর মধ্যেও হ্যাডলি যখন বুঝতে পারলেন তিনি সন্তান ধারণ করছেন, উল্লসিত হয়ে উঠলেন কিন্তু পাপা দেখলেন তার লালিত স্বাধীনতা ও কাজ করার সামর্থ্য অপসারণ করে সেখানে সমাসীন হচ্ছে গার্হস্থ্য শৃঙ্খল। ১০ অক্টোবর ১৯২৩ জন হ্যাডলি নিকানোর টরন্টোয় জন্মগ্রহণ করেন। তারা বাবা আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তখন কাছে ছিলেন না, তিনি সাপ্তাহিক ডেইলি স্টারের একটি দায়িত্ব নিয়ে কানাডা সফররত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জের কর্মসূচির ওপর প্রতিবেদন পাঠাচ্ছিলেন।
১৯২৪-এ এই দম্পতি আবার প্যারিস ফিরে আসেন, হ্যাডলির বন্ধু জর্জ বেকার তার বেশকিছু টাকা সরিয়ে ফেলেন; লিখে পাপা যা পাচ্ছিলেন, তা বিভিন্ন বিল পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নয়। সস্তায় নিত্যকার মুদি সামগ্রী কিনতে হ্যাডলিকে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে, বাড়তি কিছু ফ্রাংক কামাই করতে পাপাকে পেশাগত মুষ্টিযুদ্ধের মহড়া দিতে হচ্ছে। অর্থ সংকট পরিসরেও সংকট ডেকে আনে।
হ্যাডলির সংসারের জন্য শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠে ১৯২৫-এ প্যারিসে ফাইফার বোনদের সঙ্গে হেমিংওয়ের সাক্ষাত্। এ সময় তিনি ষাঁড়ের লড়াইভিত্তিক উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ লিখছিলেন, এটিই হেমিংওয়ের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে স্বীকৃত। ততদিন হেমিংওয়ে এক ধরনের শুদ্ধতাবাদী জীবনযাপন করছিলেন, স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তাঁর বিদেশী বন্ধুরা যেমন সুখবাদী লোভে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন, তিনি সে লোভ প্রতিহত করেছেন। কিন্তু যখন তাদের সামাজিক বৃত্তটি বড় হলো, তখন বৃত্তে সম্পৃক্ত কিংবা তার বাইরের আরো নারী এসে দৃশ্যপটে যোগ দিলেন। পৃষ্ঠদেশের একটু নিচে যে আগুন ধিকিধিকি ঝলছে, হ্যাডলি খেলাচ্ছলে সে পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে চললেন।
পলিন ফাইফারের বয়স তিরিশ বছর, আর্নেস্টের চেয়ে চার বছরের বড়। তিনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ব্যাপারে উত্সাহী, সমালোচকরা যেখানে তাকে মাঝারি মানের লেখক বিবেচনা করে তার কাজের আলোচনা করছেন, তিনি সেখানে সৌত্সাহে উদারভাবে তার লেখার প্রশংসা করছেন। তাছাড়া তার বাবার টাকাও আছে অঢেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিনের প্রধান পাঠ্য বিষয় ছিল সাংবাদিকতা। সম্পাদকের সহকারী হিসেবে প্যারিসে ভোগ ম্যাগাজিনে যোগদানের আগেও তিনি অনেক সংবাদপত্রের জন্য কাজ করেছেন। অস্ট্রিয়া সফরে হেমিংওয়ের সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য তাকে যখন আমন্ত্রণ জানানো হলো, তখন যে চিকেন চিকেন স্যুপের ভেতরেই শেয়াল! অস্ট্রিয়ায় থাকা অবস্থায়ই আর্নেস্ট সিদ্ধান্ত নিলেন, নিউইয়র্কে প্রকাশক স্ক্রিবনার্সে সাক্ষাত্ করতে যাবেন, স্ত্রী ও পুত্র থেকে যাবে অস্ট্রিয়ায়। ভোগ ম্যাগাজিনের একটি অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করতে পলিন তার সঙ্গে প্যারিস ফিরে আসেন। কঠোর ক্যাথলিক অনুশাসনে পলিন বেড়ে উঠেছে আর আর্নেস্ট তো বিশুদ্ধতাবাদী-পিউরিটান, কিন্তু মাংসের তাড়নার কাছে এসব তুচ্ছ।
হ্যাডলি সন্দিহান হয়ে উঠলেন এবং পলিনের বোন ভার্জিনিয়াকে (জিনি) জিজ্ঞেস করলেন, ‘পলিন কি আর্নেস্টের প্রেমে পড়েছে?’
জিনি জবাব দিলেন, তারা পরস্পরকে পছন্দ করেন। হ্যাডলি আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। তিনি আশা করছিলেন, এই সম্পর্কটি শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে। তিনি একটি চিরকুট লিখে আর্নেস্টের হাতে দিলেন— পলিন এবং আর্নেস্টকে ১০০ দিন পরস্পরের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে, তারপর যদি তারা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার টান অনুভব করেন, তিনি নিজে থেকেই তাকে তালাক দেবেন। ১৯২৬-এর শেষ ভাগে এসে তাদের বিয়েটি নড়বড়ে হয়ে যায়। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’-এর রয়্যালটি হ্যাডলির জন্য রেখে গেলেন। হ্যাডলিও আর্নেস্টকে বললেন, যখন ইচ্ছে তিনি ছেলেকে দেখতে আসতে পারেন।
এবার পলিন অধ্যায়।
(২)
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে তার একান্ত নিবেদিত স্ত্রী এলিজাবেথ হ্যাডলি রিচার্ডসন বিবাদ-বিসম্বাদে না জড়িয়ে তাঁর জীবন থেকে বেরিয়ে এলেন। পলিন ফাইফারের সঙ্গে সম্পর্কটি চুকিয়ে ফেলার জন্য তিনি তার স্বামীকে শেষ সুযোগ দিলেন, তিনি সে সুযোগ কাজে লাগালেন না। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখেছেন, এই অভিযোগে ১৯২৭-এর জানুয়ারিতে হ্যাডলি তাকে কাগজে-কলমে তালাক দেন। হ্যাডলি নিলেন পুত্র জনকে (বাম্বি) আর তার স্বামী নিলেন আরকানসাসের সুন্দরী, বিত্তশালী, প্রাণবন্ত সোসাইটি গার্ল পলিন ফাইফারকে।
পাপা হেমিংওয়ে তখন আমেরিকান সাহিত্যে বিশাল মানব হওয়ার পথে, সে বছর মে মাসে পলিন ও পাপা প্যারিসে বিয়ে করলেন। পলিন ফাইফারের জন্ম ২২ জুলাই ১৮৯৫ আয়ওয়ার পার্কার্সবার্গ শহরে। দেশজুড়ে তার বাবার চেইন ড্রাগস্টোর ছিল, তিনি ওষুধ শিল্প থেকে বেরিয়ে এসে কৃষি ও ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিলেন, এখানে তার আর্থিক সমৃদ্ধি আগের চেয়ে বেড়ে গেল। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় পলিন মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুখ্যাত প্রতিষ্ঠান স্কুল অব জার্নালিজমে অধ্যয়ন করেন। বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে কাজ করার পর ভ্যানিটি ফেয়ার ও ভোগ ম্যাগাজিনের সম্পাদকের সহকারী হিসেবে প্যারিসে স্থিত হন। প্যারিসে পা রাখার কয়েকদিনের মধ্যেই প্যারিসে যারা প্রবাসী, তাদের সঙ্গে দেখা করেন, তখনই তার ওপর হেমিংওয়ের চোখ পড়ে। পলিন বরং একে স্বাগত জানালেন। হেমিংওয়ের ‘দ্য টরন্টোস অব স্প্রিঙ্গ’ বইটিকে অন্যান্য সমালোচক নিম্নমানের বলে ধসিয়ে দিলে পলিন এর প্রশংসা করে আলোচনা লিখেন। অল্পদিনের মধ্যেই এই জোড় ফ্যাশন হাউজে, চিত্র প্রদর্শনীর গ্যালারিতে কফিশপে অন্যদের ভ্রু কোঁচকানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাম্বিকে নিয়ে হ্যাডলি বাড়িতে, যদিও সন্দেহ করছেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে, পলিনকে তিনি বন্ধুই মনে করেছেন। এটা বন্ধ করার জন্য তিনি কিছুই করেননি, তত দিনে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
এভাবেই পলিন ফাইফার তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে পেয়ে গেলেন। ফরাসি ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল লে গ্রাদ্য রো-তে তারা হানিমুন করলেন। পলিনের পরিবার ক্যাথলিক, তাকে পাওয়ার জন্য হেমিংওয়ে নিজেও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাথলিক হলেন। পলিন আমেরিকায় ফিরে যেতে চাইলেন, আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও চিত্রশিল্পী জন ডোস প্যাসোস পরামর্শ দিলেন কি ওয়েস্টে থাকার।
পলিনের টাকায় সেখানে সব কেনা হলো— বাড়ি, আসবাব, খাবার পানীয়, গাড়ি, নিয়োগ করা হলো কর্মচারী। ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর জন্য যে আগাম সম্মানী নিয়েছেন, তা পলিনের ব্যয়ের তুলনায় সামান্য।
১৯৩৯ পর্যন্ত এই দম্পতি সেখানে বসবাস করেন, কিন্তু পাপা সারা জীবনের জন্য বাড়ির মালিক হয়ে যান। সেখানে তিনি লিখেন ‘দ্য স্নো অব কিলিমাঞ্জারো’ এবং আরো অনেক রচনা (এই বাড়ি এখন জাদুঘর), ছয় আঙুলে বিড়ালের বংশধররাও এখানে বসবাস করে। তাদের বিয়ে টিকেছে তের বছর। তাদের দুটি পুত্র প্যাট্রিক ও গ্রেগরি; পাপার মেজাজ-মর্জির সঙ্গে মানিয়ে চলতে তাঁর প্রয়োজন মেটাতে পলিন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। সে সময়ই হেমিংওয়ের মাথায় অশুভ মৃত্যুর প্রবেশ ঘটে— তিনি ভাবেন, তিনি নিজেই নিজের জীবন নিয়ে নিচ্ছেন।
১৯৩৬-এর শেষদিকে একদিন কি ওয়েস্টে স্লোপি জোর পানশালায় তিনজনের একটি দল প্রবেশ করে, তাদের একজন ‘যুবতী, তামাটে-সোনালি রঙের সুন্দর চুল তার কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে।’ জীবনীকার বার্নিস কাঠ লিখছেন, এই যুবতীই মার্থা গেলহর্ন, বয়স তখন আঠাশ।
হেমিংওয়ে নিজের পরিচয় দিলেন, দুজনের মধ্যে প্রাণবন্ত কথোপকথন চলল। মার্থা যখন হেমিংওয়েদের বাড়িতে এলেন, পলিন শুয়ে পড়ার পর তিনি তাকে তাঁর ‘ডেথ ইন দ্য আফটার নুন’ উপন্যাসের একটি কপি দিলেন। তাতে লিখলেন, ‘আমি যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি সে নারীর জন্য। আর্নেস্ট, কি ওয়েস্ট ১৯৩৭।’ জানুয়ারির শেষদিকে মার্থা কি ওয়েস্ট ত্যাগ করলেন। এর অল্পদিনের মধ্যে পাপাও কি ওয়েস্ট থেকে চলে এলেন। দুজনের সংযোগ ঘটল নিউইয়র্কে, পাপা তাকে বারবার একই কথা বলে যাচ্ছেন, তিনি ‘ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ’।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। স্প্যানিশ গণযুদ্ধের সংবাদ পাঠাতে দুজনেরই আবার দেখা হলো স্পেনে। হেমিংওয়ে আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। কলিয়ার্স উইকলির অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে মার্থা গেলহর্ন এলেন, পিঠে কাপড়ের থলে, হাতে পঞ্চাশ ডলার আর চোখে কেবলই পাপা হেমিংওয়ে। স্পেনের গণযুদ্ধ হেমিংওয়েকে দিল তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’-এর প্রেক্ষাপট; বইটি তিনি উত্সর্গ করলেন মার্থাকে।
মার্থার জন্ম ১৯০৮ সালে সেন্টলুইতে। তার বাবা ছিলেন ডাক্তার আর মা নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের কর্মী। মার্থা ব্রিন মাওয়ার কলেজে পড়াশোনা করেন, তার পর নিউ রিপাবলিক সাময়িকীর জন্য লেখালেখি করতে থাকেন। তিনি একটি উপন্যাসও লিখলেন, ‘হোয়াট ম্যাড পারাস্যুট’— এটি ফার্স্টলেডি এলিনর রুজভেল্ট এবং প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্টের সহকারী হ্যারি হপকিন্সের নজরে আসে। গ্রেট ডিপ্রেশন— মহামন্দা নিয়ে লেখার জন্য হপকিন্স তার ঘোরাঘুরির খরচ মেটাতে ভ্রমণ ভাতা মঞ্জুর করেন। তার সেই বইয়ের নাম ‘দ্য ট্রাবল আই হ্যাভ সিন’। তার লেখালেখির জীবন ততদিনে নিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফরাসি লেখক বার্ট্রান্ড দ্যু জোভেনিলের সঙ্গে তার প্রথম বিয়েটা কাজ করেনি। মার্ক ভিনগার্টেন ওয়াশিংটন পোস্টে লিখলেন, মার্থা একজন অসাধারণ সাংবাদিক, ‘তার স্বাভাবিক ও নিঃশঙ্ক চিত্ত পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং সহজাত করুণ রস’ হেমিংওয়েকে বেশ ছাড়িয়ে যায়। ৪ নভেম্বর ১৯৪০ পলিন ফাইফারের সঙ্গে হেমিংওয়ের বিয়েটা শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক তালাকে গড়ায়। সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী তিনি ছেলেদের কাছে আসার অনুমতি পান আর পলিন পায় আর্থিক নিরাপত্তা।
ঠিক ১৬ দিন পর আর্নেস্ট ও মার্থা ওয়াইওমিংয়ের চেনিতে বিয়ের পর্বটা সেরে নেন। কিউবায় হাভানার কাছাকাছি ১৫ একর জমিসহ একটি বাড়ি কেনেন।
চীন-জাপান যুদ্ধের সংবাদ পাঠাতে কলিয়ার্স পত্রিকা মার্থাকে হংকং পাঠায়। পাপাও সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মার্থা ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ফিনল্যান্ড আক্রমণ এবং লন্ডনে জার্মানির আকাশপথে আক্রমণের প্রতিবেদন দেন। অন্য কোনো স্থানের যুদ্ধ প্রতিবেদন তৈরি করতে হলে মার্থা সাধারণত স্বামীকে রেখেই যেতেন কিন্তু ১৯৪৪-এর জুনে নরম্যান্ডি আগমনের সময় দুজনই সেখানে ছিলেন। দুজনের সম্পর্কটা কণ্টকাকীর্ণ, দুজনের নিজস্ব মেজাজ রয়েছে, ফলে তিনি পাপার কথায় নাচার মতো মানুষ নন। পাপা যে রকম অনুগত স্ত্রী চেয়েছিলেন, তিনি তাও নন। দুজনেই রণাঙ্গনের পেশাজীবী সাংবাদিক, কিছু ঈর্ষা কাজ করতে থাকে। মার্থা তার স্বামীকে মনে করেন জোর খাটানো বুলি, আর আর্নেস্ট তাকে মনে করতেন ‘ভাসা ভাসা এবং ভানপ্রবণ’। পারিবারিক শান্তির কোনো ফর্মুলা তাদের নেই।
১৯৪৫ সালে তাদের বিয়েটা ভেঙে গেল। তখন তারা লন্ডনে ডরচেস্টার হোটেলে অবস্থান করছিলেন। মার্থা লিখেছেন, ‘তার সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই আমি লেখক ছিলাম। ৪৫ বছর ধরে আমি লেখালেখি করছি। শিকাগো ট্রিবিউনের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সবসময়ই তাকে হেমিংওয়ের সাবেক স্ত্রী হিসেবে সাক্ষাত্কার দিতে হয়। আমি কেন অন্য কারো জীবনের ফুটনোট হতে যাব?’
পাপা হেমিংওয়ের পরবর্তী স্ত্রী ম্যারি ওয়েলশ বার্ধক্যে উপনীত লেখকের জন্য আদর্শ স্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এই বিখ্যাত মানুষটির সেবাযত্ন করেই সন্তুষ্ট ছিলেন— মার্থার মতো নন, মার্থা নিজের নক্ষত্রকে অনুসরণ করেছেন। ম্যারির আগেও দুবার বিয়ে হয়েছে, বিয়ের বিষয়টি তার ভালোই জানা। হেমিংওয়ের বাকি জীবন তিনিই পাশে থাকবেন।
তাদের দেখা ১৯৪৪-এর লন্ডনে। ম্যারি আগে থেকেই হেমিংওয়ের ফ্যান। গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হেমিংওয়ে যখন লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, ম্যারি তার সঙ্গে দেখা করতে যান। ব্যাপারটা তখনই ঘটে যায়। হাসপাতাল থেকে অব্যাহতি পেলে ম্যারি যেন তাকে হাসপাতালে দেখতে যান সে নিমন্ত্রণ জানান। ম্যারি কবুল করলেন।
মিনোসোটার ওয়াকার এ ম্যারি ওয়েলশের জন্ম ১৯০৮ সালে। তার বাবা ছিলেন করাতি, একসময় তার একটি পায়ে চালানো স্টিমার ছিল। ম্যারির ছোট ধারালো মুখমণ্ডল, সুন্দর দেহকাঠামো, ছোট কোঁকড়ানো সোনালি চুল। যদিও সুন্দর এমনকি সুশ্রী ছিলেন এটা যেমন বলা যায় না, কিন্তু এ কথা বলতেই হবে তিনি তীক্ষ ধীসম্পন্ন এবং আকর্ষণীয় ছিলেন। পাপার ছয় ফুট বিশাল দেহের বিপরীতে ম্যারির মতো পাঁচ ফুট দুই শরীর নারী— দেখতে যেমনই লাগুক ম্যারির জন্য তিনিই ছিলেন সঠিক পুরুষ। ম্যারি মনোযোগ দিয়ে শ্রদ্ধাভরে তার কথা শুনতেন এবং তাকে সবকিছুতেই নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতেন।
ম্যারি মহাযুদ্ধের আগে থেকেই লন্ডন এক্সপ্রেসের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের ইউরোপ-বিষয়ক ডেস্কে যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে লিখতেন। কেমন করে জিআই জোট্রুপ ডি-ভের পর নিজেদের খাপ খাওয়াবে, সেসবও তার লেখায় উঠে এসেছে। মার্থার সঙ্গে তালাকের তিন মাস পর হেমিংওয়ে ও ম্যারি নিউবায় বিয়ে করেন। পরের ১৭ বছর ম্যারি ওয়েলশ কাছে থেকে লেখক হিসেবে তার উত্থান ও পতন পর্যবেক্ষণ করেন।
১৯৫০ দশক পাপার জন্য গৌরব নিয়ে এল। ১৯৫২ সালে ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের জন্য পুলিত্জার পুরস্কার পেলেন, দুই বছর পর পেলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। ম্যারি ও হেমিংওয়ে একসঙ্গে অনেক অভিযানে অংশ নিলেন— কিউবার সমুদ্রে মাছ ধরা ও নৌকা বাওয়া, স্পেনে ষাড়ের লড়াই, বেলজিয়ান কঙ্গোর রুয়ান্ডা ও কেনিয়ার জঙ্গলে শিকার, আফ্রিকায় ভূপতিত বিমান থেকে বেঁচে গেলেন দুজন। কিন্তু শেষের বছরগুলোয় পাপা নিজেকে ধ্বংস করে চলছিলেন, যন্ত্রণাদায়ক অনেক দুর্ঘটনার ক্ষত তার দুঃসাহসী আচরণ পাল্টে দিয়েছে, পরিবারের সদস্য বন্ধুদের সঙ্গে ক্রমাগত দুর্ব্যবহার করেছেন, স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে, আত্মহত্যার চিন্তা মাথা এসেছে। যে শৈলী ও দক্ষতা আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে আলাদাভাবে আমেরিকার শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে সম্পৃক্ত করত, তা ক্ষয়ে যেতে থাকে।
একমাত্র ম্যারি এ ঝড়ের মোকাবেলা করেছেন। তিনি হেমিংওয়েকে ভালোবাসতেন। তিনিও তার নিজস্ব অদ্ভুত উপায়ে তাকে ভালোবাসতেন। তিনি পাপাকে বুঝতেন এবং তিনি যেমন সেভাবেই তাকে গ্রহণ করেছেন কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, তার জীবন ও মেধা অন্ধকারে দ্রবীভূত হয়ে যায়। ২ জুলাই আইডাহোর কেচামে ১৯৬১-এর ভোরবেলায় হেমিংওয়ে নিজের খাতাটি বন্ধ করলেন। পাপার ইচ্ছে অনুযায়ী, এক মাস পর ম্যারি কিউবায় তার সেই বাড়িটি কিউবার জনগণকে দান করে দিয়ে এলেন।
তিনি লিখেছেন, আত্মহত্যার সত্যিকার কারণ— আপনি তো জানেনই এই নারকীয় ব্যাপার থেকে উত্তোলনের পর জীবন সমৃদ্ধই হয়। তিনি তার নিজের উপদেশ শোনেননি— পৃথিবী তাকে হারিয়েছে।
টিকা :
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে:
আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে (জন্ম: ২১ জুলাই ১৮৯৯, ওক পার্ক মৃত্যু: ২ জুলাই ১৯৬১, কেচাম, আইডাহো) স্কুল পাস করেই সাংবাদিকতা শুরু করেন। অভিযানপ্রিয় ও সাহসী মানুষটি রণাঙ্গনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালাভের জন্য সেনাবাহিনীর অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে যোগ দিয়ে চলে যান ইতালির রণক্ষেত্রে। যুদ্ধে আহত হন, কারো কারো মতে, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। যুদ্ধ শেষে চলে আসেন সৃজন ও মননশীলতায় বিশ্বরাজধানী প্যারিসে। ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন সেকালের সেরা মানুষদের। তার আগ্রহ গভীর সমুদ্র, পর্বত অরণ্য, ষাঁড়ের লড়াই। বহুবার মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে ফিরে এসেছেন। এমনকি প্লেন-ক্রাশে মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পরও দেখা গেল লেংচাতে লেংচাতে বেরিয়ে এসেছেন উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে। একে একে প্রকাশিত হয়েছে: ইন আওয়ার টাইম (১৯২৫) দ্য সান অলসো রাইজেস (১৯২৬), এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯), টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নটস (১৯৩৭), ফর হোম দ্য বেল টোলস (১৯৪০), মেন উইদাউট উমেন (১৯২৭), উইনার টেইক নাথিং (১৯৩৩), দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি (১৯৫২) এবং আরো কিছু বই। ১৯৫২-তে দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি পুলিত্জার পুরস্কার পেল, ১৯৫৪-তে তিনি পেলেন নোবেল পুরস্কার। মৃত্যু তাকে বহুবার হাতছানি দিয়েও নিতে পারেনি, ২ জুলাই ১৯৬১ তিনি নিজেই শটগানের গুলিতে মস্তিষ্কের এক পাশ উড়িয়ে দিয়ে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন।
অ্যাগনেস ভন কুরোভস্কি
আমেরিকান নার্স অ্যাগনেসের জন্ম ৫ জানুয়ারি ১৮৯২। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় মিলানের আমেরিকান রেড ক্রস হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন, হেমিংওয়ে ইতালির রণাঙ্গনে এসে তার চেয়ে সাত বছরের বড় এই নার্সের প্রেমে পড়েন। এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস উপন্যাসের ক্যাথরিন বার্কলে চরিত্রটি অ্যাগনেসকে ঘিরেই নির্মিত। ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার, দ্য স্লোজ ইন কিলিমানজারো এবং এ ভেরি শর্ট স্টোরিতেও অ্যাগনেস হেমিংওয়ের হাতে পুনর্নির্মিত হয়েছেন। জ্যেষ্ঠতার কারণেই হোক, কি ভালোবাসার কারণে অ্যাগনেস হেমিংওয়েকে মনে করতেন ‘বেবি’। শেষ পর্যন্ত তিনি হেমিংওয়েকে সুন্দরভাবেই প্রত্যাখ্যান করেন এবং হাইতি রেড ক্রসে চাকরিকালীন হাওয়ার্ড প্রেস্টন গার্নারকে বিয়ে করেন, বিয়ে শেষ পর্যন্ত টেকেনি। হাইতি থেকে আমেরিকায় ফেরার আগে তাকে তালাক দেন। নিউইয়র্কে ফিরে এসে ১৯৩৪ সালে নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা উইলিয়াম স্ট্যানফিল্ডকে বিয়ে করেন। ১৯৮৪ সালে ৯২ বছর বয়সে অ্যাগনেস মৃত্যুবরণ করেন।
এলিজাবেথ হ্যাডলি রিচার্ডসন
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের প্রথম স্ত্রী এলিজাবেথ হ্যাডলি রিচার্ডসন (জন্ম ৯ নভেম্বর ১৮৯১, মৃত্যু ২২ জানুয়ারি ১৯৭৯) তার চেয়ে প্রায় আট বছরের বড়।
মায়ের অকাল মৃত্যুর পর হ্যাডলি তার স্কুলজীবনের রুমমেট কেটি স্মিথের শিকাগোর বাড়িতে যান। কেটির ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন হেমিংওয়ে এবং কোঅপারেটিভ কমনওয়েলথ পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন। কেটির মাধ্যমেই হ্যাডলির সঙ্গে তার দেখা। হেমিংওয়ে এতটাই মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি লিখেই ফেললেন ‘আমি জানি এই সে মেয়ে আমি যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি’। কেটি পরে মার্কিন ঔপন্যাসিক জন ডস প্যাসোসকে বিয়ে করেন। ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২১ তাদের বিয়ে হয়। প্যারিসের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে তাদের দাম্পত্য জীবন কাটতে থাকে। ১৯২৭-এর জানুয়ারিতে মূলত তাদের দাম্পত্য জীবনে পলিন ফাইফারের অনুপ্রবেশের কারণে বিয়েটা ভেঙে যায়। মেধাবী হেডলি এর মধ্যে পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক পল মাওয়ার প্রেমে পড়েন এবং ৩ জুলাই ১৯৩৩ বিয়ে করেন। হেমিংওয়ে দ্য সান অলসো রাইজেস উপন্যাসের স্বত্ব ও রয়্যালটি তাকে দিয়ে যান এবং পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রায়িত দ্য সান অলসো রাইজেসের রয়্যালটিও তিনি পান। ২২ জানুয়ারি ১৯২৭ ফ্লোরিডায় তার মৃত্যু হয়। বিচ্ছেদের পর হেমিংওয়ের সঙ্গে তার একবারই সাক্ষাত্ হয়, তবে হেমিংওয়ে জীবদ্দশায় তার খোঁজখবর রেখেছেন।
পলিন ফাইফার:
পলিন ম্যারি ফাইফারের জন্ম ২২ জুলাই ১৮৯৫ আইওয়ার পার্কার্সবার্গে, মৃত্যু ১ অক্টোবর ১৯৫১ ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডে। তিনিও হেমিংওয়ের চেয়ে চার বছরের বড়। ভ্যানিটি ফেয়ার ও ভোগ ম্যাগাজিনের হয়ে পলিন যখন প্যারিসে কাজ করতে এলেন, শুরুতেই তিনি হেমিংওয়ের রোমান্টিক পার্টনার হয়ে উঠলেন। ১৯২৭-এর মে মাসে তাদের বিয়ে হয়। তিনি হেমিংওয়ের দুই পুত্র প্যাট্রিক ও গ্রেগরির জননী। মার্থা গেলহর্নের অনুপ্রবেশ পলিনের সঙ্গে হেমিংওয়ের তালাক ত্বরান্বিত করে। ১ অক্টোবর ১৯৫১ ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মার্থা গেলহর্ন
মার্থা এলিস গেলহর্ন বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রণাঙ্গন প্রতিনিধি হিসেবে সমাদৃত। তার জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯০৮, মৃত্যু ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮। তার জরায়ুর ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে তিনি সায়ানাইড ক্যাপসুল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
১৯৪০-এর ডিসেম্বরে বিয়ের আগে পলিন ফাইফারের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে প্রায় চার বছর হেমিংওয়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন। বিয়ের পর হেমিংওয়ে ব্যস্ত সাংবাদিক মার্থাকে লেখেন: তুমি কি কেবলই রণাঙ্গন প্রতিনিধি না আমার বিছানার স্ত্রী?
১৯৪৫-এ তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। মার্থা টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক ম্যানেজিং এডিটর টিএম ম্যাথুসকে বিয়ে করেন। মার্থাকে নিয়ে সিনেমা হয়েছে। ১৯০৮ সালে তাকে নিয়ে ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয়েছে।
ম্যারি ওয়েলশ হেমিংওয়ে
ম্যারিও সাংবাদিক এবং লেখক। তার জন্ম ৫ এপ্রিল ১৯০৮ মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ওয়াকার শহরে। তিনি প্রথমে নাট্যকলার ছাত্র লরেন্স কুককে বিয়ে করেন। তার পর সাংবাদিক নোয়েল মঙ্ককে। ডেইলি এক্সপ্রেসের হয়ে প্যারিসে কাজ করতে থাকেন, কিন্তু ১৯৪০ সালে ফ্রান্সের পতনের পর লন্ডন চলে আসেন। ১৯৪৪-এ হেমিংওয়ের দেখা পান এবং ১৯৪৬-এর মার্চে কিউবায় তারা বিয়ে করেন। হেমিংওয়ের শেষ দিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন স্ত্রী। হেমিংওয়ের হেরিটেজ ধরে রাখতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন, শেষ দিকে নিঃসঙ্গ জীবনে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬, ৭৮ বছর বয়সে সেইন্ট লিউক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ‘হাউ ইট ওয়াজ’ নামে তার একটি আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে।
অনুবাদ ও টিকা: আন্দালিব রাশদী





