শ্রীলংকায় কফি চাষ হতো। উনিশ শতকে (আনুমানিক ১৮৬০-এর দশক) শ্রীলংকায় কফি পাতার রাস্ট রোগে ২০০ বাগান ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর ব্রিটিশ প্লান্টাররা চা চাষে আরো বেশি মনোযোগ দেন। বাংলাদেশেও চা-বাগান তৈরি হচ্ছিল। সিলেটে একের পর এক নতুন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। উনিশ শতকে এখানে রাস্তাঘাট ছিল না, স্থানীয় শ্রমিকও পর্যাপ্ত ছিল না। তাই বিহার, ওড়িশা ও বর্তমান ঝাড়খণ্ড অঞ্চল থেকে শ্রমিক আনা হয়েছিল। লেবার কন্ট্রাক্টররা পরিবারসহ শ্রমিক এনে এখানে বসতি গড়ে দেন, ঘরবাড়ি তৈরি করে দেন এবং বাগানে কাজের ব্যবস্থা করেন।

এ শ্রমিকদের বংশধরেরাই আজও চা-বাগানে কাজ করছেন। কেউ কেউ পড়াশোনা করে ডাক্তার, প্রকৌশলী হয়েছেন। কেউ বিদেশেও গেছেন।

চা-বাগান প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ইউরোপীয় ম্যানেজাররাও কম কষ্ট করেননি। শুরুতে তাদের থাকার জায়গা, বাংলো, রাস্তা কিছুই ছিল না। ধীরে ধীরে বাংলো তৈরি হয়েছে। আজ যেগুলোকে বিলাসবহুল মনে হয়, শুরুতে সেগুলোও ছিল সংগ্রামের ফল। অনেক ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শিয়ালের কামড়ে, সাপের কামড়ে, এমনকি বন্যপ্রাণীর আক্রমণেও মারা গেছেন।

অন্যদিকে শীতপ্রধান দেশ থেকে এসে তারা সিলেটের এ গরমের মধ্যে কাজ করেছেন। এটা তাদের জন্য মোটেই আরামদায়ক ছিল না। তারা অনেক কষ্ট করেছেন।

একজন ইউরোপীয় (ব্রিটিশ) অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের গল্প বলি। বাগানে এসেছেন ছয় মাস হলো। একদিন ডাকযোগে একটি চিঠি পেলেন। চিঠিটি ছিল তার প্রেমিকার। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমি তোমার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছি, কিন্তু আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আমি অন্য একজনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সে সময় জাহাজে করে চিঠি আসতে তিন-ছয় মাস লাগত। সেই ম্যানেজার হিসাব করে দেখে তিনি বুঝলেন, এরই মধ্যে মেয়েটির বিয়েও হয়ে গেছে। চিঠি পড়ার পর তিনি নিজের বাংলোয় গিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ রকম অসংখ্য গল্প আছে ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের, যারা এখানে এসে কষ্ট করে আমাদের দেশে চা শিল্প গড়ে তুলেছেন।

পাকিস্তান আমল

পাকিস্তান সরকার ষাটের দশকে একটি উদ্যোগ নেয়। সিদ্ধান্ত নেয় চা-বাগানে এত ইউরোপীয় ম্যানেজার রাখা যাবে না। দেশীয় ম্যানেজার নিয়োগ দিতে হবে। তখন অনেক ব্রিটিশ ম্যানেজার অবসরে যান। তাদের জায়গায় পাকিস্তানি ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আসেন। পরে পাকিস্তানি অনেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদোন্নতি পেয়ে ম্যানেজার হন।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধিকাংশ পাকিস্তানি কর্মকর্তা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। স্বাধীনতার পরও কিছু ইউরোপীয় ম্যানেজার কিছুদিন ছিলেন, বিশেষ করে বড় বড় কোম্পানিতে। পরে তারাও চলে যান। চা-বাগানে এখন আর কার্যত কোনো ব্রিটিশ ম্যানেজার নেই।

পাকিস্তানি ম্যানেজারদের জীবনযাপন অবশ্য প্রথম দিককার ব্রিটিশ প্লান্টারদের তুলনায় অনেক আরামদায়ক ছিল। কারণ তখন পর্যন্ত বাগান, বাংলো, যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়ে গিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে ডানকানের এক ম্যানেজারের স্ত্রীর লেখা ‘আ ব্রোকেন টি কাপ’ বইয়ের কথা বলা যায়। বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ওখানে কী আছে?’ স্বামী মজা করে বলেছিলেন, ‘আমার মাত্র দুইটা কাপ আছে। একটাতে আমি চা খাই, আরেকটাতে শেভ করার সময় সাবান রাখি। তুমি এলে ওইটাতেই চা খেতে হবে।’

এ কথা শুনে সেই ম্যানেজারের স্ত্রী খুব ভয় পেয়ে যান।

পরে করাচি থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল, তারপর ভোররাতে খারাপ রাস্তা পেরিয়ে বাগানে পৌঁছান তারা। পথে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, চারদিকে অন্ধকার। কিন্তু শেষে বাংলোয় পৌঁছে দেখেন বিশাল ও সুন্দর বাসস্থান। বহু বছর পরে তিনি সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘আ ব্রোকেন টি কাপ’ শীর্ষক বই লেখেন।

কামরান তানভিরুর রহমান: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশীয় চা সংসদ