১৯৬৭ সালে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক সৈয়দ আজিজ আহমেদের আতিথেয়তায় কাটানো তিনটি দিন এবং ১৯৭০ সালে নয়াপাড়া চা-বাগানে সহকারী ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ করিমের সান্নিধ্যে অর্জিত অভিজ্ঞতা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। চা-বাগানের স্বতন্ত্র কর্মসংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে এ পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত আমাকে টি-প্লান্টার হিসেবে কর্মজীবন বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
সে সময়ে চা-বাগানের চাকরি ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। বেতন-ভাতা সরকারি চাকরির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তবে এর বিপরীতে দায়িত্বও ছিল কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন। দিন-রাতের নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা ছিল না; মাঠ ও কারখানা উভয় ক্ষেত্রেই সার্বক্ষণিক নজরদারি অপরিহার্য ছিল। চাকরির প্রথম তিন বছর পূর্ণ না হলে বিয়ের অনুমতি দেয়া হতো না। তৎকালীন কোম্পানি সংস্কৃতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল ইংল্যান্ড সফরের ইনসেনটিভ। জুনিয়র কর্মকর্তারা প্রতি ছয় বছর এবং সিনিয়র কর্মকর্তারা প্রতি চার বছর অন্তর তিন মাসের বেতনসহ ছুটি নিয়ে এ সুযোগ পেতেন। এটি ছিল কর্মীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও আস্থার প্রকাশ। ডানকানের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে কাজের একটি সুবিধা ছিল প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি পাওয়া। তবে দায়িত্বের চাপ ছিল প্রবল। ৪৮ ঘণ্টার ছুটি মানে ছিল ঠিক ৪৮ ঘণ্টাই; এর বেশি সময়ের জন্য প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হতো।
বাংলাদেশীদের চা-বাগানে প্লান্টার হিসেবে প্রবেশ শুরু হয় চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি। তখন সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে এ সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফলাফলধারী তরুণরা চা-বাগানকে তাদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা আরো বিস্তৃত হয় এবং চা-শিল্পের ব্যবস্থাপনায় দেশীয় জনশক্তির অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
চা-বাগানের প্রশাসনিক কাঠামো বরাবরই স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সে সময় মহকুমা প্রশাসনের প্রধান ছিলেন এসডিও এবং পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন এসডিপিও। প্রশাসন ও বাগান কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার একটি সুদৃঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। মৌলভীবাজারের এসডিও নিয়ামত আলী এবং এসডিপিও নুরুল হুদার মতো কর্মকর্তারা শ্রমিকদের রেশন ও অন্যান্য প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতেন।
কর্মজীবনের দীর্ঘ পথে বেশ কয়েকজন বিদেশী টি-প্লান্টারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাদের মধ্যে সবার আগে মনে পড়ে স্কটিশ কর্মকর্তা জেটি ফরেস্টের কথা। কর্মজীবনের শুরুতে তিনিই ছিলেন আমার প্রথম ম্যানেজার। শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন, তবে সে কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক আন্তরিক, সহৃদয় ও বন্ধুবৎসল মানুষ। ১৯৭৭ সালে তিনি স্থায়ীভাবে লন্ডনে ফিরে যান।
পরবর্তীকালে উইলিয়াম মারডকের অধীনে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি নালুয়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক ছিলেন এবং পরে ডানকান ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর চা-শিল্প যখন নানা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি সীমিত সম্পদ এবং পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই কারখানাগুলো পুনর্গঠন করেন। চা-শিল্পের নীতি প্রণয়ন ও চা সংসদের কর্মকাণ্ডে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার সহধর্মিণী পার্ল মারডক ছিলেন অত্যন্ত সহযোগিতাপরায়ণ। চিঠিপত্র টাইপ থেকে শুরু করে নানা প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি স্বামীকে সহায়তা করতেন।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রাস্তাঘাটের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ঢাকা থেকে বিভিন্ন চা-বাগানে পৌঁছতে দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য যাত্রার মুখোমুখি হয়ে একাধিক ফেরি পার হতে হতো। তবু এসব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে সপ্তাহান্তেই তিনি সস্ত্রীক বাগান পরিদর্শনে যেতেন। চা গাছের প্রুনিং বা ছাঁটাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি বিষয় তার কাছ থেকেই হাতেকলমে শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা এবং যুক্তিসংগত পরামর্শ আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতেন। সামাজিক জীবনেও তার আন্তরিকতা ছিল অনুকরণীয়। ইংল্যান্ডে ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসার সময় সহকর্মীদের সন্তানদের জন্য ছোটখাটো উপহার নিয়ে আসা ছিল তার একটি চমৎকার অভ্যাস।
আরেকজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন জেএলসি স্ট্রেংগ। আসামের চা-বাগানে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ও সফল ব্যবস্থাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি চা-বাগান ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হন এবং অবসরের পর সত্তরের দশকের শেষভাগে তিনি লন্ডনে কোম্পানি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। বছরে দুবার তিনি বাংলাদেশে আসতেন। প্রতিবারই প্রায় এক মাস ধরে একের পর এক চা-বাগান ঘুরে দেখতেন। বড় বাগানে তিনদিন, ছোট বাগানে দুদিন অবস্থান করতেন। প্রয়োজন হলে সরাসরি সংশোধনের নির্দেশ দিতেন এবং পরবর্তী সফরে এসে সে নির্দেশনার বাস্তবায়নও যাচাই করতেন। পরবর্তী সময়ে বোর্ড সভায় তিনি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করতেন।
একই সময়ে বাংলাদেশ চা শিল্পে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন পিটার লেগেট এমবিই। তিনি ‘টি রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট’-এ অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তী সময়ে ডানকান ব্রাদার্সের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। টি-প্লান্টার ও শ্রমিকদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ও সহযোগিতামূলক মনোভাব ছিল সুপরিচিত।
এছাড়া এমএস ক্রিস্টি, বাটারউইক, পিটার আর্মস্টিড, এসি কিং, পিটার পেপরিল, ক্লাইভ রবার্টসন, এমসি পারকিন্স, সাইমন টার্নার, মিজ সুসান ওয়াকার, গ্রাহাম ম্যাকলিন্স ও জো প্যান্টারের মতো ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সান্নিধ্যে কাজ করারও সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেশাগত জীবনের নানা শিক্ষা অর্জন করেছি।
তবে এ স্মৃতির ভাঁজে একটি বেদনাময় অধ্যায়ও আছে। দেউন্দি টি কোম্পানির সুপারিনটেনডেন্ট প্যাডি ও’ফ্লিন ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাকে সমাহিত করা হয় লস্করপুর ভ্যালির চাঁদপুর সিমেট্রিতে। সিলেটের চা-বাগানাঞ্চলের এসব পুরনো সমাধিক্ষেত্র নিছক কবরস্থান নয়, বরং ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে এখানে শায়িত হয়েছেন বহু ইউরোপীয় টি-প্লান্টার ও কর্মকর্তা।
চা-বাগানের কর্মসংস্কৃতি নিজস্ব পরিভাষায় সমৃদ্ধ। ব্যবস্থাপক পরিচিত ‘বড় সাহেব’ নামে, সহকারী কর্মকর্তারা ‘ছোট সাহেব’ বা ‘টিলা সাহেব’, আর কারখানার প্রকৌশলী কর্মকর্তা পরিচিত ‘মিস্ত্রি সাহেব’ নামে। অথচ প্রকৃত মিস্ত্রি অর্থাৎ মেকানিক্যাল ফিটার, প্লাম্বার বা দক্ষ কারিগর পরিচিত ‘ইঞ্জিনিয়ার বাবু’ হিসেবে। ফলে প্রচলিত অর্থে ‘মিস্ত্রি’ ও ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দ দুটির ব্যবহার বাগানের ভেতরে উল্টো হয়ে গিয়েছে।
মানু, জুড়ী, বালিসিরা, লস্করপুর, সিলেট ও লংলা—এ ছয়টি ভ্যালি বা ক্লাস্টারভিত্তিক চা-বাগান অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য ক্লাব-সংস্কৃতি। সময়ের প্রবাহে এসব ক্লাব বাগান-জীবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। টেনিস, গলফ, ফুটবল, বিলিয়ার্ড ও ব্রিজ—এসব খেলাধুলা সেখানে শুধু অবসর বিনোদনের উপকরণ ছিল না; এগুলো ছিল শৃঙ্খলা, রুচিবোধ, সৌজন্য ও সামাজিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলনক্ষেত্র। দূরদূরান্তের চা-বাগান থেকেও কর্মকর্তারা নিয়মিত ক্লাবে আসতেন। আমার কর্মজীবনে রবি ও বৃহস্পতিবার ক্লাবে উপস্থিত থাকা প্রায় অলিখিত নিয়মের মতোই ছিল। বছরজুড়ে নানা সামাজিক আয়োজনের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিল নিউ ইয়ার্স বল, মনসুন বল ও ক্রিসমাস পার্টি।
ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় প্লান্টারদের অনেকেই স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। চিকেন কারি ও ডালের স্যুপ ছিল তাদের প্রিয় খাবারের অন্যতম। শীতকালে যাত্রাপালার আয়োজন সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছিল। সে সময় বাগানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর; অনুমতি ছাড়া বাইরের কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও অবাধ চলাচল ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
সত্তর ও আশির দশকে চা-বাগানগুলো ছিল সমৃদ্ধ প্রাণবৈচিত্র্যের এক অনন্য আবাসস্থল। বুনো শূকর, হরিণ, বনমোরগ, খরগোশ, সজারু ও অজগর সাপের দেখা পাওয়া ছিল তখন স্বাভাবিক ঘটনা। চা-বাগানের অনেক অঞ্চল এতটাই ঘন ও প্রাকৃতিক ছিল যে সাধারণ মানুষ সেখানে চলাচল করতে ভয় পেত। ১৯৭৪ সালে শমসেরনগর চা-বাগানে বাঘের গরু শিকারের একটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বনাঞ্চল সংকুচিত হয়েছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে, আর বন্যপ্রাণীর উপস্থিতিও ক্রমে কমে এসেছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল। দুঃখজনকভাবে অনেক স্থানে শেড ট্রি পরিপূর্ণতা লাভের আগেই চুরি হয়ে যাচ্ছে, যা শুধু চা-বাগানের পরিবেশ নয়, সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
একসময় চা-বাগানের জীবন ছিল সীমিত সম্পদে টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম। বাংলো ও কারখানার বিদ্যুৎ নির্ভর করত নিজস্ব জেনারেটরের ডিসি সরবরাহের ওপর, যার আলো গভীর রাতে হারিকেনের শিখার মতো ম্লান হয়ে আসত। ১৯৭৪-৭৫ সালের পর জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছলে চা-শিল্পে আধুনিকতার সূচনা ঘটে। শ্যাফট, বেল্ট ও ফ্লাই-হুইলনির্ভর পুরনো যন্ত্রের জায়গা নেয় পৃথক বৈদ্যুতিক মোটরচালিত আধুনিক মেশিন, ফলে কারখানা হয়ে ওঠে আরো নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ। সত্তর দশকের শেষ ভাগ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ চালু হলে চা প্রক্রিয়াকরণ সহজ ও সাশ্রয়ী হয়। পরবর্তীকালে ভারত থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও চায়ের গুণগত মানে নতুন মাত্রা যোগ হয়। এভাবেই সীমাবদ্ধতার যুগ পেরিয়ে বাংলাদেশের চা-শিল্প ধীরে ধীরে আধুনিকতার পথে অগ্রসর হয়।
এম শাহ আলম: সাবেক পরিচালক, ডানকান ব্রাদার্স ও
সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন










