তবু পেছনে তাকালে স্পষ্ট ভেসে ওঠে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর। তরুণ এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে তখন প্রথম পা রেখেছিলাম চাম্পারায় চা-বাগানে।
আজ প্রায় তিন দশক পরে দাঁড়িয়ে মনে হয় চা-বেষ্টিত সেই পৃথিবী যেন আমূল বদলে গেছে। একসময়কার ঘন সবুজ অরণ্য অনেকটাই বিবর্ণ; পরিবেশ ও প্রতিবেশও আর আগের মতো নেই। তবে চা-বাগানের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনেক স্মৃতি এখনো অম্লান। ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার কিংবা সুপারিনটেনডেন্ট সবাইকে এক নামেই ডাকা হতো, ‘টি প্লান্টার’।
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট-পূর্ব সে সময়ে চা-বাগানের জীবন ছিল অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল সীমিত। শ্রমিকদের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল টিলা অফিসে রাখা একটি সাদা-কালো টেলিভিশন। ঝাপসা ছবি আর অস্পষ্ট শব্দের মধ্যেও সেটিই ছিল তাদের আনন্দের জানালা। সন্ধ্যায় নিয়ম করে টেলিভিশন চালু করা হতো, আর তদারকের দায়িত্বে থাকতেন লাইন চৌকিদার। শুক্রবারের সিনেমা ছিল বিশেষ আকর্ষণ; শ্রমিকরা একত্র হয়ে সে সময়টুকু উপভোগ করতেন।
চা-বাগানের জীবন মূলত দুটি অংশে বিভক্ত—টিলা ও ফ্যাক্টরি। এ বিভাজন পরিচালকদের পরিচয়েও প্রতিফলিত হতো। মাঠ ও বাগানের কাজের দায়িত্বে থাকা সহকারী ব্যবস্থাপক ছিলেন ‘টিলা সাহেব’; আর ফ্যাক্টরির উৎপাদন ও যান্ত্রিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা পরিচিত ছিলেন ‘মিস্ত্রি সাহেব’ নামে। কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়ই আমি ছিলাম সেই ‘মিস্ত্রি সাহেব’দের একজন।
পাত্রখোলা চা-বাগানের প্রসঙ্গে এলে প্রথমেই মনে পড়ে এর ঐতিহাসিক ম্যানেজার বাংলোর কথা। বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন। পুরু অ্যাজবেস্টস ছাদ, চকচকে সিমেন্টের মেঝে, স্কটল্যান্ড থেকে আনা শক্তিশালী এইচ-বিম, মোটা দেয়াল ও প্রশস্ত বারান্দা সব মিলিয়ে এটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। আজও বাংলোটি অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এ বাংলোর বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে প্রায়ই মনে হয়েছে আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে আছে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস।

এন্ড্রু ম্যাকমিকিন ও লিন চাম্পারায় চা-বাগানের ম্যানেজার বাংলোয়
অনেকের ধারণা, পাত্রখোলা চা-বাগানের সূচনা ১৮৭৫ সালে। কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, এর গোড়াপত্তন আরো আগে—১৮৬৮ সালে। আসামের দুধপাতিল চা-বাগানে সাফল্যের পর ব্রিটিশ ম্যাকমিকিন পরিবার সেই পুঁজি বিনিয়োগ করে আলীনগর, শমশেরনগর ও পাত্রখোলা চা-বাগান প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে তাদের উদ্যোগে মাধবপুর ও কুরমা বাগানও বিকশিত হয়।
ঔপনিবেশিক যুগে উত্তর-পূর্ব ভারতের চা-শিল্পে ম্যাকমিকিন পরিবার ছিল এক সুপরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। অগ্রণী টি প্লান্টার থমাস ম্যাকমিকিনের নেতৃত্বে বৃহত্তর আসাম ও সিলেট অঞ্চলে তারা একাধিক চা-বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। তবে শুধু চা-বাগান স্থাপনের জন্যই নয়, শ্রমিকদের মজুরি প্রদানের উদ্দেশ্যে বিরল পিতলের ‘টি টোকেন’ চালুর কারণেও পরিবারটি চা-শিল্পের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। একসময় এসব টোকেন স্থানীয়ভাবে বিকল্প মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার হতো এবং চা-বাগানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
ম্যাকমিকিন পরিবারের প্রবর্তিত টি টোকেনগুলোর মধ্যে পাত্রখোলা চা-বাগানের টোকেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজও এটি ঐতিহাসিক ও সংগ্রহযোগ্য নিদর্শন হিসেবে বিভিন্ন দেশের টি-মিউজিয়াম, নিউমিসম্যাটিকস সংগ্রহশালা এবং আন্তর্জাতিক নিলাম প্রতিষ্ঠানের আগ্রহের বিষয়। ঔপনিবেশিক শ্রম ব্যবস্থা ও চা-শিল্পের প্রারম্ভিক বিকাশের এক মূল্যবান সাক্ষ্য হিসেবে পাত্রখোলার এই টি টোকেন গবেষক ও সংগ্রাহকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
১৯১০ সাল পর্যন্ত ম্যাকমিকিন পরিবারই পাত্রখোলাসহ তাদের প্রতিষ্ঠিত বাগানগুলোর প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিল। পরবর্তীকালে মালিকানা পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বাগানগুলো ডানকান ব্রাদার্সের নিয়ন্ত্রণে আসে। পাত্রখোলা, মাধবপুর ও কুরমা তিনটি বাগানকে একত্রে ‘ট্রিও গার্ডেন’ নামে সংগঠিত করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ডানকান ব্রাদার্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক এস্টেট হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।
ডানকান ব্রাদার্সের অধীনে পাত্রখোলা চা-বাগানের জীবনযাত্রা, কর্মসংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশের নানা স্মৃতি সংরক্ষিত হয়েছে পিআরএইচ লংলির ‘টি প্ল্যান্টার সাহিব’ গ্রন্থে। এর কিছুদিন পর ১৯৪৭ সালের দেশভাগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রের পাশাপাশি চা-শিল্পের প্রশাসনিক কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোয় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্যবস্থাপক ও প্লান্টারদের অংশগ্রহণ বাড়ে। তাদের অধিকাংশই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও অভিজাত পরিবারের সদস্য। সে সময়ের চা-বাগান সমাজ ও জীবনধারার একটি জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায় পাকিস্তানি টি প্লান্টার ‘আসাদ হাসান’-এর স্ত্রী, লেখিকা ‘রায়হানা এ হাসান’-এর Sips from a Broken Tea Cup গ্রন্থে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পাত্রখোলা চা-বাগানের ইতিহাসেও এক যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। যুদ্ধকালীন অস্থিরতা এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক সংকটের ফলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি প্লান্টারদের অধিকাংশই বাগান ত্যাগ করেন। উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও বিপণন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি ম্যানেজমেন্ট কমিটি (BTIMC) গঠন করে এবং জরুরি ভিত্তিতে চা-বাগানগুলোর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে জাতীয় চা কোম্পানির (NTC) অধীনে পাত্রখোলা নতুন প্রশাসনিক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
যদিও ব্রিটিশ প্লান্টারদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ আমার হয়নি, তথাপি ২০১৩ সালে ইতিহাস যেন হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। পাত্রখোলার প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম ম্যাকমিকিনের উত্তরসূরি এণ্ড্রু ম্যাকমিকিন তার পূর্বপুরুষদের স্মৃতির অনুসন্ধানে বাংলাদেশে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন বান্ধবী লিন, বন্ধু কামাল শেখ ও একজন ব্রাজিলীয় চিত্রগ্রাহক।
তাদের কাছ থেকেই জানতে পারি ম্যাকমিকিন পরিবারের কাছে পাত্রখোলা ছিল তাদের সবচেয়ে প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ বাগান। ধলাই নদীর তীরে অবস্থিত ছিল বিখ্যাত ‘দলই ভ্যালি প্লান্টার্স ক্লাব’, যা ছিল ইউরোপীয় প্লান্টার সমাজের অন্যতম সামাজিক কেন্দ্র। ক্লাবসংলগ্ন বিস্তীর্ণ মাঠে নিয়মিত পোলো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ঘোড়ার গাড়িতে করে দূরদূরান্তের বাগান থেকে প্লান্টাররা পরিবারসহ সেখানে সমবেত হতেন। খেলাধুলা, ব্রিজ, নৈশভোজ ও প্রাণবন্ত আড্ডায় মুখর থাকত ক্লাব প্রাঙ্গণ।
এণ্ড্রুর কাছে সংরক্ষিত একটি পুরনো মানচিত্রে দেখা যায়, তৎকালীন প্লান্টাররা বর্তমান চাতলাপুর সীমান্ত অতিক্রম করে শমশেরনগর ও ভানুগাছ হয়ে পাত্রখোলায় যাতায়াত করতেন। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈশ্বিক চা-বাজারে সংকট দেখা দিলে ১৯১০ সালে ম্যাকমিকিন পরিবার সুরমা ভ্যালির বাগানগুলো ডানকান ব্রাদার্সের কাছে বিক্রি করে দেয়। তবে আসামের দুধপাতিল চা-বাগানের মালিকানা তারা আরো কয়েক দশক ধরে নিজেদের হাতে রাখে।
চায়ের প্রতি পরিবারটির গভীর অনুরাগের এক অভিনব নিদর্শনের কথাও এণ্ড্রুর কাছ থেকে জানা যায়। পরিবারের বহু সদস্যের নামের মধ্যভাগে ‘দুধপাতিল’ শব্দটি যুক্ত থাকত। যেমন উইলিয়াম দুধপাতিল ম্যাকমিকিন। একটি চা-বাগানের নামকে পারিবারিক পরিচয়ের অংশ করে নেয়ার এ রীতি তাদের আবেগ ও আত্মপরিচয়ের এক বিরল প্রকাশ।
পাত্রখোলা বাংলোর এক নীরব সন্ধ্যায় এণ্ড্রু বলেছিলেন, আমার পূর্বপুরুষদের শরীরে রক্তের বদলে যেন চা প্রবাহিত হতো; না হলে পৃথিবীর এ প্রান্তে এসে তারা এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারতেন না। বিদায়ের মুহূর্তে তিনি হাসতে হাসতে আরো বলেছিলেন, আমার শরীরে আর চা নেই, এখন শুধু রক্তই আছে। তার সেই রসিকতার আড়ালেও যেন লুকিয়ে ছিল এক হারিয়ে যাওয়া যুগের প্রতি গভীর মমতা।
সেকালের প্লান্টার জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ ছিল ‘সানডাউন’ সংস্কৃতি। দিনের কাজ শেষে বাংলোর বারান্দায় বসে সহকর্মী ও অতিথিদের সঙ্গে গল্প, চা কিংবা পানীয়ের আসর ছিল এক অলিখিত প্রথা। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও আনুষ্ঠানিক অফিস কক্ষের পরিবর্তে এমন অনানুষ্ঠানিক আড্ডায়ই গৃহীত হতো।
বর্ষাকালে ধলাই নদী ও আশপাশের ছড়াগুলো ফুলেফেঁপে উঠলে এক বাগান থেকে অন্য বাগানে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ত। কখনো ঘোড়ায়, কখনো হাতিতে, আবার কখনো নৌকায় চড়ে প্লান্টাররা বাগান পরিদর্শনে যেতেন। ডাক আসার দিন ছিল বিশেষ প্রতীক্ষার দিন। পরিবার-পরিজনের চিঠির অপেক্ষায় অনেকে দিনের পর দিন অধীর হয়ে থাকতেন। আজকের তাৎক্ষণিক যোগাযোগের যুগে বিষয়টি কল্পনাতীত মনে হলেও তখন একটি চিঠিই ছিল দূর দেশের আপনজনদের সঙ্গে আবেগের সবচেয়ে দৃঢ় সংযোগ।
পাত্রখোলা ও দলই ভ্যালি অঞ্চলে বন্যহাতির আনাগোনাও ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। গভীর রাতে হাতির পাল চা-বাগানের সেকশন কিংবা বাংলোর আশপাশে ঢুকে পড়লে শ্রমিক, চৌকিদার ও প্লান্টাররা মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল বাজিয়ে বা টিন পিটিয়ে তাদের তাড়ানোর চেষ্টা করতেন। পরদিন সেই হাতির পদচিহ্ন, ভাঙা চা-গাছ আর রাতের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠত নতুন গল্পের উপকরণ।
পাত্রখোলার ইতিহাস তাই কেবল একটি চা-বাগানের ইতিহাস নয়; এটি মানুষ, প্রকৃতি, উদ্যোগ, শ্রম, উত্তরাধিকার ও সময়ের দীর্ঘ অভিযাত্রার ইতিহাস। সে ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে আজও যেন প্রতিধ্বনিত হয় পোলো মাঠের ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি, বাংলোর বারান্দার সন্ধ্যাকালীন আড্ডা, ধলাই নদীর কলতান ও সদ্য প্রস্তুত চায়ের অমলিন সুবাস।
মো. শামসুল ইসলাম সেলিম: উপমহাব্যবস্থাপক, লস্করপুর ভ্যালি
ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড









