দামেস্কের বাইরে তৈমুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় খালদুনের। এ সাক্ষাতের বিবরণ খালদুন তার বিশাল ঐতিহাসিক গ্রন্থ কিতাব আল-ইবারের আত্মজীবনীমূলক অংশে লিখেছেন। এটি ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল, যা বিজেতা তৈমুর সম্পর্কে সমসাময়িক একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা প্রদান করে। একই সঙ্গে এটি চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে একত্র করে—একজন বিশ্ববিজেতা এবং অন্যজন একজন প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী।

তৈমুরের সঙ্গে খালদুন নানা বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল উত্তর আফ্রিকার ভূপ্রকৃতি, তাবারির ইতিহাসের নির্ভরযোগ্যতা, খেলাফতের প্রকৃতি এবং ইবনে খালদুনের নিজস্ব ‘আসাবিয়া’ (গোষ্ঠীগত সংহতি) তত্ত্ব। ইবনে খালদুন তার লেখায় এসবের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ফলে এ লেখায় বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে।

মূল লেখাটি কয়েক দশক আগে ওয়াল্টার জে. ফিশেল তার Ibn Khaldun and Tamerlane (বার্কলে ও লস অ্যাঞ্জেলেস, ১৯৫২), পৃষ্ঠা ২৯-৪৭-এ অনুবাদ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইবনে খালদুনের আরবি পাঠের আরো কিছু অনুবাদ হয়। বর্তমানে উপস্থাপিত অংশটি এ সার্বিক পাঠের একটি অনুবাদ। তবে মূল লেখাটির সূচনার কিছু অংশই এখানে এসেছে। পরবর্তী অংশ ইবনে খালদুনের বয়ানে—

মিসরে যখন খবর পৌঁছল যে আমির তৈমুর আনাতোলিয়া জয় করেছেন, সিভাস ধ্বংস করেছেন এবং সিরিয়ায় ফিরে এসেছেন, তখন মামলুক সুলতান নাসির উদ-দ্বীন ফারাজ (১৩৯৯-১৪১২) তার সেনাবাহিনী সমবেত করলেন। সামরিক ভাতার কোষাগার খুলে দিলেন এবং সৈন্যদের সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন।

সে সময় আমি কোনো সরকারি পদে ছিলাম না। কিন্তু সুলতানের দাওয়াদার ইয়াশবাক আল-শা’বানি আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং সুলতানের শোভাযাত্রায় তার সঙ্গে যেতে বললেন। আমি প্রথমে অস্বীকার করতে চাইলে তিনি কোমল ভাষা ও উদার আচরণ বজায় রেখেও দৃঢ় অবস্থান নিলেন। ফলে আমি সম্মত হলাম। আমরা ৮০৩ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের মাঝামাঝি (৩ নভেম্বর ১৪০০) যাত্রা করি। আমরা গাজায় পৌঁছে কয়েকদিন বিশ্রাম করি এবং খবরের অপেক্ষা করি। এরপর আমরা তাতারদের আগেভাগে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে দামেস্কের দিকে রওনা হই। শাকহাবে শিবির স্থাপন করে রাতে যাত্রা করে সকালে দামেস্কে পৌঁছি। এদিকে তৈমুর ও তার সেনাবাহিনী বালবেক ছেড়ে দামেস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

সুলতান কুব্বাত ইয়ালবুঘা প্রান্তরে তার শিবির স্থাপন করেন। তৈমুর শহরটি আক্রমণ করে দখল করতে ব্যর্থ হয়ে ওই প্রান্তরের ওপরের একটি পাহাড়ে এক মাসেরও বেশি সময় অবস্থান করে আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন, আর আমরা তাকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এ অবস্থায় দুই বাহিনী তিন-চারবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। কখনো এক পক্ষ আবার কখনো অন্য পক্ষ সফল হয়।

এরপর সুলতান ও তার প্রধান আমিররা জানতে পারেন যে কিছু আমির বিদ্রোহের ষড়যন্ত্র করছে এবং মিসরে ফিরে গিয়ে বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পনা করছে। তাই তারা মিসরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা শুক্রবার, ২১ জমাদিউল আউয়াল ৮০৩ হিজরি (৭ জানুয়ারি ১৪০১) রাতে গোপনে রওনা হন। কিন্তু সৈন্যরা ভিন্ন ভিন্ন পথে কায়রোর দিকে চলে যায়, কারণ তারা মনে করেছিল সুলতান মূল পথেই গেছেন।

পরদিন সকালে দামেস্কের মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিচারক ও আলেমরা আদিলিয়্যা মাদ্রাসায় আমার কাছে এসে একমত হন যে তারা তৈমুরের কাছে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা (সন্ধি) চাইবেন। দুর্গরক্ষক এতে আপত্তি জানালেও তারা তা উপেক্ষা করেন। কাজি বুরহান আল-দীন ইবনে মুফলিহ এবং সুফি নেতারা তৈমুরের কাছে যান। তৈমুর তাদের নিরাপত্তা দেন এবং শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকার নির্দেশ দেন। পরদিন শহরের দরজা খোলার শর্তে তারা সম্মত হয়।

কাজি আমাকে জানান যে তৈমুর বিশেষভাবে আমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন—আমি কি মিসরের বাহিনীর সঙ্গে চলে গেছি, নাকি শহরেই আছি। তিনি বলেন, আমি এখনো মাদরাসায় অবস্থান করছি। পরদিন আমরা তৈমুরের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই।

রাতে প্রধান মসজিদে কিছু মানুষের মধ্যে আত্মসমর্পণ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। আমি এ খবর শুনে নিজের জীবনের জন্য আশঙ্কা করি। তাই ভোরে বিচারকদের কাছে গিয়ে শহরের দেয়াল বেয়ে নিচে নামার অনুমতি চাই। প্রথমে তারা অস্বীকার করলেও পরে আমাকে নামতে দেয়।

দরজার কাছে আমি তৈমুরের লোকদের পাই, যাদের মধ্যে শাহ মালিক নামে একজন ছিলেন। তিনি আমাকে একটি বাহন দেন এবং আমাকে তৈমুরের কাছে পাঠান। তার তাঁবুর সামনে পৌঁছে আমাকে বসার অনুমতি দেয়া হয়।

আমার নাম ঘোষণা করা হলে ‘মাগরেবি মালিকি কাজি’ উপাধি যুক্ত করা হয়। আমি তাঁবুতে প্রবেশ করে সালাম জানাই। তৈমুর মাথা তুলে আমাকে স্বাগত জানান এবং তার হাত বাড়িয়ে দেন। হাতটি আমি চুম্বন করি। তিনি আমাকে বসতে বলেন এবং একজন পণ্ডিত হানাফি আলেমকে দোভাষী হিসেবে বসান।

তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি মাগরেবের কোন জায়গা থেকে এসেছি এবং কেন এসেছি। আমি বলি আমি হজ পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছিলাম এবং ১৩৮২ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছি, তখন সুলতান আল জহির বারকুক আমাকে সম্মান ও সাহায্য করেছিলেন।

তিনি জানতে চান কীভাবে আমি কাজি নিযুক্ত হয়েছিলাম। আমি বলি সুলতান আমার যোগ্যতা দেখে আমাকে নিয়োগ দেন, কিন্তু তার মৃত্যুর পর আমাকে অপসারণ করা হয়।

তিনি মাগরেবের ভূগোল সম্পর্কে প্রশ্ন করেন—তাঞ্জিয়ার, সেউতা, ফেজ, সিজিলমাসা ইত্যাদি স্থান সম্পর্কে জানতে চান। আমি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করি। শেষে তিনি বলেন, ‘তুমি পুরো মাগরেব অঞ্চল এমনভাবে লিখে দাও যেন আমি নিজ চোখে দেখতে পাই।’ আমি সম্মত হই এবং পরে তার জন্য একটি বিস্তারিত বিবরণ লিখে দিই।

এরপর তিনি আমাকে ‘রিশতা’ নামে এক ধরনের খাবার দেন, যা আমি গ্রহণ করি। খাবারটি আমি পছন্দও করি। এতে তিনি সন্তুষ্ট হন।

এরপর আমি নীরব হয়ে যাই। কারণ আমি ভীত ছিলাম—বিশেষত শাফেয়ি কাজি সদর আল-দীন আল-মুনাওয়ীর বন্দিত্বের কারণে। এই ভয়ের মধ্যে আমি মনে মনে কিছু প্রশংসাসূচক কথা প্রস্তুত করি।

আমি স্মরণ করি, মাগরেবে থাকাকালে আমি তার আবির্ভাব সম্পর্কে বহু ভবিষ্যদ্বাণী শুনেছিলাম। জ্যোতিষীরা বলেছিলেন, বৃহস্পতি ও শনির সংযোগ এক শক্তিশালী নেতার আগমনের ইঙ্গিত দেয়, যিনি উত্তর-পূর্ব অঞ্চল থেকে উঠে এসে রাজ্য দখল করবেন। এমনকি আমার শিক্ষকও বলেছিলেন, ‘তুমি যদি বেঁচে থাকো, এই ঘটনা দেখবে।’

সুফিরাও এমন একজন ব্যক্তির আগমনের প্রত্যাশা করছিলেন। অবশ্য তারা মনে করতেন তিনি ফাতিমীয় বংশের হবেন।

এসব স্মৃতি ও ভাবনা নিয়ে আমি তৈমুরের সামনে বসে ছিলাম—একজন মহান বিজেতা, যার উত্থান যেন বহুদিনের পূর্বাভাসের বাস্তব রূপ।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক