গ্রন্থে বর্ণিত ধারণাগুলো নিয়ে ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল লেখেন, ইতিহাসের অন্তর্নিহিত প্রকৃত অর্থ হলো গভীর চিন্তা ও সত্যে পৌঁছার একটি প্রচেষ্টা, বিদ্যমান সবকিছুর উৎস ও কারণের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং ঘটনার ‘‌কেন’ ও ‘‌কীভাবে’ জানার জ্ঞান। তাই ইতিহাস দর্শনের ওপর শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। এটি দর্শনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। মুকাদ্দিমায় বর্ণিত ধারণাগুলো এ প্রক্রিয়ায় বর্ণিত।

তবে এখানে ‘দর্শন’ শব্দটি বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। সাধারণত আরবি ভাষায় ‘‌দর্শন’ বোঝাতে ‘‌ফালসাফা’ এবং ‘‌দার্শনিক’ বোঝাতে ‘‌ফায়লাসুফ’ শব্দটি ব্যবহার হয়। যেমন প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ইবনে সিনা বা আল-ফারাবিদের ক্ষেত্রে শব্দগুলো প্রযোজ্য। কিন্তু রোজেনথাল যে শব্দটিকে এখানে ‘‌দর্শন’ হিসেবে অনুবাদ করেছেন, মূল আরবিতে সেটি ছিল ‘‌হিকমা’।

‘‌হিকমা’ শব্দটির অর্থের ব্যাপ্তি ও ব্যঞ্জনা ‘‌ফালসাফা’ থেকে ভিন্ন। সহজ বাংলায় একে ‘‌প্রজ্ঞা’ বা ‘‌বিচক্ষণতা’ বলা হয়, যা মানুষকে অজ্ঞতা বা মূর্খতাসুলভ আচরণ থেকে দূরে রাখে। তৎকালীন সময়ে হিকমা বলতে এমনসব জ্ঞান বা বিজ্ঞানকে বোঝানো হতো, যা বাস্তবতা থেকে অর্জিত জ্ঞান। এছাড়া রাজা-বাদশাহ, মহাপুরুষ ও দার্শনিকদের জীবন থেকে নেয়া নীতিবাক্য, মূল্যবান পরামর্শ এবং শিক্ষণীয় উদাহরণ সমৃদ্ধ সাহিত্যকেও হিকমা বলা হতো। তাই ইবনে খালদুন যখন ইতিহাসকে হিকমার অন্তর্ভুক্ত করছেন, তখন তিনি প্রচলিত গ্রিক দর্শনের চেয়ে বরং গভীর জীবনবোধ ও বাস্তবভিত্তিক প্রজ্ঞা, নৈতিক প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির কথাই বেশি বোঝাতে চেয়েছেন।

কুরআনের ৩১ নম্বর সুরাটির নাম ‘‌লুকমান। সুরাটি লুকমান নামক এক ব্যক্তির নামে রাখা হয়েছে, যার জ্ঞানগর্ভ কথা ও প্রবাদবাক্য ইতিহাসে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আমি লুকমানকে হিকমা বা প্রজ্ঞা দান করেছি।"যিনি এ প্রজ্ঞার অধিকারী, তাকেই বলা হয় ‘‌হাকিম’। ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমায় প্রায়ই বিভিন্ন হাকিমদের জ্ঞানগর্ভ উক্তি তুলে ধরেছেন। এদের মধ্যে পারস্যের ধর্মগুরু মোবেধান, সাসানীয় শাসক আনুশিরওয়ান, উজির বুজুর্জিমিহর এবং অ্যারিস্টটলের নামে প্রচলিত বিভিন্ন নীতিবাক্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ইবনে খালদুনের ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের মূল ভিত্তি ছিল ধর্মীয় নৈতিকতা এবং গভীর জীবনবোধ। তবে তার বিশেষত্ব হলো তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র আসলে পরিচালিত হয়। সহজ কথায়, মুকাদ্দিমা কেবল কোনো দর্শনের বই নয়, বরং এটি প্রজ্ঞা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

ইবনে খালদুন জানিয়েছিলেন, রাজকীয় ক্ষমতা ও রাজবংশ নিয়ে তার জ্ঞানে দার্শনিক কিংবা কোনো প্রাচীন পারস্যের ধর্মগুরুদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে খোদায়ি সাহায্যে অর্জিত হয়েছে। তার সময়ে উত্তর আফ্রিকা বা মাগরেব অঞ্চলে দর্শনচর্চা সীমিত ছিল। কারণ তৎকালীন শাসক ও আলেমরা দর্শনচর্চাকে ভালো চোখে দেখতেন না। এমনকি মাদরাসার পাঠ্যতালিকায়ও দর্শন অন্তর্ভুক্ত ছিল সীমিত। যদিও যৌবনে তিনি ইবনে রুশদের মতো বড় দার্শনিকদের পড়েছিলেন।

দ্বাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে রুশদ বিশ্বাস করতেন মানুষের জ্ঞান হলো ভিন্ন ভিন্ন। ধর্মের প্রকৃত অর্থ দার্শনিকরা ভালোভাবে বুঝতে পারেন। ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ইবনে রুশদের দর্শন নিয়ে ব্যাপক চর্চা হতো, কিন্তু মুসলিম বিশ্বে তার প্রভাব ছিল তুলনামূলক কম। ইবনে খালদুন ইবনে রুশদের চেয়ে ইমাম গাজ্জালির অনেক যুক্তি পছন্দ করতেন। ইবনে রুশদ মনে করতেন, শহরে বংশপরম্পরায় বাস করলেই মর্যাদা বাড়ে, কিন্তু ইবনে খালদুন এ ধারণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীগত সংহতি বা ‘‌আসাবিয়া’ ছাড়া কেবল শহরে বাস করলেই কেউ শ্রদ্ধার পাত্র হতে পারে না। ইবনে রুশদের চিন্তা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু ইবনে খালদুন তার তত্ত্বে মরুভূমি ও পাহাড়ের কঠিন জীবনকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

তবে তারা দুজনেই একটা বিষয়ে এক ছিলেন। সেটা হলো মানুষের ক্ষমতা ও অর্থের লোভের কারণে কোনো সুশাসনই চিরকাল টিকে থাকতে পারে না এবং একসময় তা স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়। তাদের মতে, ইসলামের প্রকৃত আদর্শ শাসন ব্যবস্থা কেবল মহানবী (সা.) এবং প্রথম চার খলিফার আমল পর্যন্তই ছিল। ইবনে খালদুন উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়ার রাজনৈতিক কৌশলের প্রশংসা করলেও তিনি মনে করতেন পরবর্তী উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকরা অতিরিক্ত বিলাসিতা ও অলসতায় মগ্ন হয়ে পড়ায় তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। তিনি লক্ষ করেছিলেন শাসকরা যখন বিলাসিতার মোহে পড়ে যান, তখন খেলাফতের পবিত্র রূপটি হারিয়ে যায় এবং তা সাধারণ রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। প্লেটো বা ইবনে রুশদের কিছু রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে ইবনে খালদুনের মিল থাকলেও তার চিন্তাধারা ছিল অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও কঠোর জীবনবোধে বিশ্বাসী।

ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’ ও তার ইতিহাসচিন্তা গড়ে ওঠার পেছনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীর প্রভাব ছিল। ইবনে খালদুন তার জীবদ্দশায় উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চলে একের পর এক রাজবংশের উত্থান-পতন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করেন। এ বাস্তব অভিজ্ঞতা তার ইতিহাস বিশ্লেষণকে বিমূর্ত তত্ত্বের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক করে তোলে। এছাড়া আল মাকরিজির মতো ঐতিহাসিকদের রচনায়ও সমসাময়িক সমাজ-অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়, যা সে যুগের অস্থিরতার একটি বিস্তৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।

খালদুনের জীবনে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ও কম ছিল না। শৈশবে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ মহামারীতে তার পরিবারসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নির্বাসন ও কারাবাসের অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। তার সমসাময়িক আন্দালুসীয় পণ্ডিত ইবনে-খাতিবের হত্যাকাণ্ডও সে সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার একটি দৃষ্টান্ত, যা খালদুন প্রত্যক্ষ করেন। তবে এসব অভিজ্ঞতা তাকে নিছক হতাশাবাদী করে তোলেনি; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের গতিশীলতা বোঝার দিকে তাকে আরো মনোযোগী করে।

‘মুকাদ্দিমা’ রচনায় খালদুন আরবি ভাষা, ইসলামী চিন্তা ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণকে সমন্বিত করেন। তিনি লক্ষ করেন, ‘দাওলা’ (রাষ্ট্র বা রাজবংশ) শব্দটির মধ্যেই পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের ধারণা নিহিত। কুরআনের সূরা আল-আরাফে (৭-৩৪) বলা হয়েছে, আর প্রত্যেক জাতির রয়েছে একটি নির্দিষ্ট সময়। অতঃপর যখন তাদের সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্ত বিলম্ব করতে পারবে না এবং এগিয়েও আনতে পারবে না। এ আয়াত খালদুনের চিন্তাকে প্রভাবিত করলেও তার ইতিহাসতত্ত্ব মূলত অভিজ্ঞতালব্ধ সামাজিক বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। খালদুনের মতে, ইতিহাস কেবল ঘটনাপুঞ্জ নয়; বরং এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ নির্দিষ্ট ধাপে বিকাশ লাভ করে এবং পরবর্তী সময়ে অবক্ষয়ের দিকে অগ্রসর হয়।

এ বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে তার ‘আসাবিয়া’ (গোষ্ঠীগত সংহতি) ধারণা। খালদুন দেখেছিলেন, যাযাবর বা উপজাতীয় সমাজে এ সংহতি প্রবল থাকে, যা তাদের ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম করে। কিন্তু নগরজীবনের বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্য সে সংহতিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়, ফলে শাসকগোষ্ঠী অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায় এবং নতুন কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী তাদের স্থান দখল করে। এভাবে ইতিহাসে উত্থান ও পতনের একটি পুনরাবৃত্তির ধারা লক্ষ করা যায়।

ফারাবির মতো দার্শনিকরা যেখানে আদর্শ রাষ্ট্রের কল্পচিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেছিলেন, সেখানে খালদুন বাস্তব সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দেন। তার দৃষ্টিতে মানুষের যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমাবদ্ধ; তাই সমাজ ও ইতিহাস বোঝার জন্য কেবল তাত্ত্বিক কল্পনা নয়, বরং অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণের সমন্বয় প্রয়োজন।

ইবনে খালদুনের ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা ও সামাজিক বিশ্লেষণ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি ‘ইলমে কালাম’ বা ধর্মতত্ত্বকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলো ব্যাখ্যা ও সংরক্ষণের একটি প্রয়োজনীয় শাস্ত্র হিসেবে স্বীকার করলেও এটিকে সীমাহীনভাবে প্রসারিত করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, কালামের ভূমিকা মূলত তখনই গুরুত্বপূর্ণ, যখন আকিদাগত প্রশ্নে বিভ্রান্তি দেখা দেয়; অন্যথায় অতিরিক্ত তর্কবিতর্ক জ্ঞানচর্চাকে জটিল করে তোলে।

খালদুনের দৃষ্টিতে জাগতিক জগতের ঘটনাবলি আল্লাহর ইচ্ছার অধীন, তবে তিনি এ ধারণাকে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ব্যাখ্যারও চেষ্টা করেন। মানুষের যুক্তি দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও তা দিয়ে গায়েব বা অতীন্দ্রিয় সত্য সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়—এমন ধারণা তার লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। এ অবস্থান তাকে একদিকে ধর্মবিশ্বাসে স্থিতিশীল রাখে, অন্যদিকে বাস্তব জগতের বিশ্লেষণে যুক্তিনির্ভর করে তোলে।

ব্যক্তিগত জীবনে খালদুন মালিকি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন এবং উত্তর আফ্রিকা ও মিসরে বিচারক (কাদি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার এ অবস্থান মূলত তার ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে মালিকি ফিকহ প্রচলিত ছিল। তবে আইনশাস্ত্রে তার প্রশিক্ষণ ইতিহাসচর্চায়ও প্রভাব ফেলেছিল। তিনি মনে করতেন, ইতিহাস রচনায় তথ্য যাচাই, বর্ণনার যৌক্তিকতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য—এসব কঠোরভাবে অনুসরণ করা উচিত, অনেকটা উসুলে ফিকহের বিশ্লেষণধর্মী পদ্ধতির মতো।

খালদুনের চিন্তায় নৈতিকতা ও সামাজিক বাস্তবতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি লক্ষ করেন, অতিরিক্ত বিলাসিতা ও ভোগপ্রবণতা সমাজের সংহতি বা ‘আসাবিয়া’কে দুর্বল করে দেয়। ফলে শাসকগোষ্ঠী ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা ও নেতৃত্বগুণ হারায় এবং রাষ্ট্র অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায়। তবে এ পতনকে তিনি কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের ফল হিসেবে দেখেননি; বরং অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সামাজিক সংহতির ক্ষয়—এসবের সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

এভাবে খালদুন ধর্মীয় বিশ্বাস, যুক্তিবোধ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি পরিমিত ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলেন। তার কাছে ধর্ম ছিল নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা, আর ইতিহাস ছিল সে নির্দেশনার আলোকে মানবসমাজের গতিশীল রূপ বোঝার একটি পদ্ধতিগত প্রয়াস।

রুদ্র ইকবাল: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা