অন্যদিকে সেন্ট অগাস্টিনের ইতিহাসচর্চায় মানুষের সমাজে খোদার হস্তক্ষেপ খুবই সাধারণ বিষয়। ইবনে খালদুনের আগ পর্যন্ত এ ধরনের ইতিহাসচর্চার উদাহরণ নেহাত কম নেই। তবে তিনি দুই প্রবণতা থেকেই সরিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। বিশেষ ধরনের মানবতা কিংবা খোদার হস্তক্ষেপের চেয়ে তিনি বরং ইতিহাসের বাঁক খুঁজতে কার্যকারণ তালাশ করেছেন ঐতিহাসিক অনুঘটকের মধ্যেই। এ জায়গায় ইবনে খালদুন পূর্ববর্তীদের থেকে আলাদা। যদিও আর্নল্ড টয়েনবি তার ‘স্টাডি অব হিস্ট্রি’ গ্রন্থে ইবনে খালদুনকে জায়গা দিয়েছেন হেরোডোটাস, থুসিডাইডিস, পলিবিয়াস, জোসেফাস, সেন্ট অগাস্টিন ও গিবনের সঙ্গে। কিন্তু ইবনে খালদুন তাদের সবার থেকে আধুনিক। সম্ভবত এ কারণেই তাকে ঐতিহাসিকরা নিজেদের পূর্বসূরি বলতে চান, সমাজবিজ্ঞানীরা দাবি করেন নিজেদের বলে।

ইবনে খালদুনের কাছে ইতিহাস কেবল অতীত ঘটনার ধারাবিবরণী নয়; সমালোচনামূলক যাচাইয়ের বিষয়। কিতাবুল ইবারের ভূমিকা তথা মুকাদ্দিমায় তিনি ইতিহাসবিদদের অন্ধ অনুকরণ, গুজবনির্ভর বর্ণনা এবং অলংকারমূলক অতিরঞ্জন থেকে সতর্ক করেছেন। ঐতিহাসিকের জন্য সম্ভাব্য ভুল ও তার পেছনের কারণ তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি কোনো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণে প্রস্তাব করেছেন দুটি মানদণ্ড। প্রথমত, সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা; দ্বিতীয়ত, যুক্তিগতভাবে সম্ভাব্য কিনা। এভাবে সম্ভাব্যতাভিত্তিক যাচাই পদ্ধতি তাকে পূর্ববর্তী ইতিহাস বর্ণনাকারীদের থেকে পৃথক করে। ইতিহাসকে তিনি উন্নীত করেছেন একটি বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞানশাস্ত্রে। ফলে তার ইতিহাসচিন্তায় ঘটনা বর্ণনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঘটনার অন্তর্নিহিত কারণ ও কাঠামো অনুধাবন।

গ্রিক ইতিহাসবিদরা আইয়োনীয় বিজ্ঞানের নীতিগুলো ইতিহাস বিশ্লেষণে প্রয়োগ করতে চেয়েছিল। খ্রিস্টীয় ইতিহাসচিন্তাও প্রভাবিত ছিল যিশুর আগমন-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। উভয় ঐতিহ্যেই স্বতন্ত্রভাবে ব্যক্তির অবস্থান ব্যাখ্যা করা অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হতো। ইতিহাসে ব্যক্তিগত ও স্বাতন্ত্র্যের অনুভূতিকে ইবনে খালদুন খুব একটা গুরুত্ব দেননি বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি বরং ইতিহাসের গতিপথকে আঁকতে চেয়েছেন বেশি করে। এ কথা সত্য, তার কাছে মানব ইতিহাসের ঘটনাগুলো মৌলিক প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অবিরাম পুনরাবৃত্তি। এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে অবস্থান করে মানুষ। তার মতে, মানুষ প্রাণিজগতের শীর্ষে অবস্থান করছে। এ অবস্থান সে অর্জন করে তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে। সে বৈশিষ্ট্য যুক্তিবোধের ক্ষমতা। চিন্তাশক্তিই সভ্যতার বিকাশের ভিত্তি। এটি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাকে সম্ভব করে তোলে; যা সভ্য জীবনের মূল লক্ষণ। কিন্তু এ সহযোগিতা যুক্তিনির্ভর বোঝাপড়া বা আচরণের নীতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয় না; বরং এর মধ্য দিয়ে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক তৈরি হয়। এটাই সহযোগিতা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চিন্তা কোনো নীতিগত মূল্যবোধ সৃষ্টি করে না। চিন্তাক্ষমতার স্তরবিন্যাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ফলে ইবনে খালদুনের কাছে যুক্তির লক্ষ্য যতটা না আত্মোপলব্ধি; তার চেয়ে বেশি অন্য মানুষের ওপর ক্ষমতা অর্জন। আর সভ্যতার অগ্রগতির ফলও মানব-অনুধাবনের অগ্রগতি নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার বিস্তার।

ইবনে খালদুনের কাছে শহুরে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত উন্নত জীবনধারা একই সঙ্গে সভ্যতার গন্তব্য ও পতনের কারণ। সেদিক থেকে তার দৃষ্টিতে সভ্যতাগুলো প্রকৃত অর্থে বিকাশ লাভ করে না, বরং বাদওয়াহ তথা বেদুইন জীবন এবং হাদারাহ তথা সভ্যতার মধ্যে দোলায়িত হয়। বাদওয়াহ বলতে ইবনে খালদুন কেবল যাযাবর জীবন বোঝাননি; বরং যাযাবর এবং পশুপালন ও প্রাথমিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল পশ্চাৎপদ গ্রামবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। নগর বলতেও তিনি বোঝাতে চান সেসব মানুষকে, যারা শহরে বসবাস করে এবং কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকানির্বাহ করে। তবে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যকে নগরজীবনের কারণ হিসেবে নয়, বরং ফল হিসেবে দেখেন। মুকাদ্দিমার অনুবাদক ফ্রাঞ্জ রোজেনথালের মতে, মরুভূমি ও নগরজীবনের পার্থক্য গুণগত নয়; এটি মূলত একটি সমাজবৈজ্ঞানিক পার্থক্য। মানববসতির আকার ও ঘনত্বের পরিমাণগত পার্থক্য। পার্থক্যের মানদণ্ড যেহেতু পরিমাণগত, তাই বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তফাত ব্যাখ্যার জন্য মূলনীতি তালাশ করেছেন ইবনে খালদুন। আংশিকভাবে তিনি নীতিটি খুঁজে পান পরিবেশে। মুকাদ্দিমার প্রথম অংশে এ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হেরোডোটাস থেকে মন্টেস্কু পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিক ইতিহাসে পরিবেশের প্রভাব নিয়ে এমন বিস্তারিত লেখেননি। ইবনে খালদুনের দাবি হলো সভ্যতা কেবল সেসব অঞ্চলে বিকাশ লাভ করতে পারে, যেখানে তাপ ও শীতের সুষম সমন্বয় রয়েছে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও মানবজীবনের জন্য সে পরিবেশ উত্তম।

মরুভূমি ও নগরের পার্থক্য ইবনে খালদুনের চোখে আংশিকভাবে পরিবেশগত বৈচিত্র্যের ফল, আংশিকভাবে সাংস্কৃতিক সংযোগ ও সংঘর্ষের ফল। কিন্তু তিনি মূল কারণকে একটি সামাজিক উপাদানে নিহিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। খালদুনের ভাষায় বিষয়টি হলো আসাবিয়া তথা গোত্রীয় বন্ধন। কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বন্ধনের উপস্থিতিই তাদের অন্যদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার শক্তি দেয়। এর মাধ্যমে শুরু হয় সভ্যতাগত চক্র। মরুভূমি থেকে স্থায়ী জীবন এবং সেখান থেকে নিয়ে যায় পতনের দিকে। এ মানসিক ঐক্য গড়ে উঠতে পারে গোত্রগত আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে। তবে প্রকৃত রূপ দেখা যায় ধর্মীয় বিশ্বাসের ঐক্যে। যদি এটি যথেষ্ট শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এটি একটি রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে। ইবনে খালদুনের কাছে আসাবিয়া এমন এক অন্তর্নিহিত শক্তি, যা উপযুক্ত পরিবেশে বসবাসকারী প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান। ইতিহাসের যেকোনো মুহূর্তে উচ্চতর সভ্যতা গঠনের সম্ভাবনা প্রদান করে। সেটি ঘটে অন্য কোনো সভ্যতার সংস্পর্শ ছাড়াই।

সেদিক থেকে দেখলে সভ্যতা কোনো ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া নয়, যা সব মানুষকে সাধারণ মানবতার ধারণায় যুক্ত করে। এটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর অসংখ্য কর্মকাণ্ডের সমষ্টি। প্রতিটি গোষ্ঠীর ইতিহাসের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো রাজনৈতিক কাঠামোর উত্থান ও পতন। কোনো বিজয়ী জাতি অজান্তেই পরাজিত জাতির কারুশিল্প ও চিন্তাধারা গ্রহণ করতে পারে। উল্টোটা ঘটতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানবজাতির সাফল্য উন্নয়নশীলমুখী নয়; বরং তা চক্রাকার ও পুনরাবৃত্তিমূলক। এটি মানব যুক্তি নয়, বরং প্রাণিসুলভ প্রয়োজনের ফল। আসাবিয়া একদিকে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার চালিকাশক্তি, অন্যদিকে এটি সেই নীতিও। ঐতিহাসিক টয়েনবির রচনায় একটি অনুরূপ নীতি দেখা যায় ধীরে ধীরে ধর্মীয় উপলব্ধি উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া আকারে। হেগেলের Geist, উইলহেম দিলথের Erlebnis ও বার্গসোঁর elan vital-এর মতো ইবনে খালদুনের আসাবিয়া একটি বিমূর্ত ধারণা। একে গোত্রীয় জীবনের সহানুভূতিশীল বিশ্লেষণ থেকে উদ্ভূত হয়ে সমগ্র ইতিহাসের ব্যাখ্যায় প্রয়োগ করা হয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আসাবিয়াকে Geist, elan vital ও Erlebnis-এর পাশে স্থান দিতে হয়।

খালদুনীয় ধারাটি সবসময় একই। এক সরল মরুভূমির জনগোষ্ঠী আসাবিয়া দ্বারা চালিত হয়। মরুভূমি থেকে বেরিয়ে এসে অন্য জনগোষ্ঠীকে জয় করে এবং তাদের সহযোগিতায় বাধ্য করে। এর মধ্য দিয়ে সভ্যতার চক্র শুরু হয়। এ মরুভূমির জনগোষ্ঠীর নেতা একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। ইবনে খালদুনের মতে, একটি রাজবংশের সমতুল্য। এখানে তিনি ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের ধারণা আলোচনা করেন। এরপর নবগঠিত রাষ্ট্র তার সীমানা সম্প্রসারণ করতে থাকে, আরো বেশি মানুষকে অধীনস্থ করে। এভাবে তার সভ্যতা বৃদ্ধি পায়। মোট শ্রমশক্তি বাড়ায় এর একটি অংশ বিলাসবহুল দ্রব্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকাশে ব্যবহার হতে শুরু করে। কিন্তু এর সঙ্গে আসে কঠোর মরুভূমির জীবনের থেকে বিচ্ছিন্নতা। আগের সংযমী জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে স্থূল ও অধঃপতিত হয়ে পড়ে। আগের বিলাসিতা পরিণত হয় অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তায়। বিশেষত শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক ধরনের প্রশমক হিসেবে। এভাবে শিগগিরই শাসকগোষ্ঠী প্রজাদের জন্য এক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, কর বৃদ্ধি পায়, নাগরিক ও বাণিজ্যিক উদ্যম হ্রাস পায় এবং বিদ্রোহের জন্ম হয়। এ বিদ্রোহ দমন করা এরই মধ্যে অধঃপতিত রাজবংশের পক্ষে অসম্ভব। তারা বিদেশী ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করে। এ বাইরের বাহিনী হয় দিনশেষে নিজেরাই ক্ষমতা নিয়ে যায়, নয়তো প্রজাদের মধ্যে আরো বিদ্রোহ সৃষ্টি করে। এভাবে স্থায়ী নগরজীবন একই সঙ্গে সভ্যতার চক্রের চূড়ান্ত পরিণতি এবং পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শেষ পরিণতি একটাই। আরো শক্তিশালী ও নগরজীবনের প্রভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত না হওয়া কোনো জনগোষ্ঠীর দ্বারা বিজিত হওয়া। যদিও ইবনে খালদুন নৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কারের মাধ্যমে এ সভ্যতার চক্র দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনা স্বীকার করেন। তবে রাজবংশ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার চূড়ান্ত পতন কোনোভাবেই সম্পূর্ণরূপে এড়ানো সম্ভব নয়।

একটা বিষয় এ সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। ইবনে খালদুনের চোখে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ কেবল জীবিকার উপায় নয়; বরং তা ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তিনি দেখিয়েছেন, উৎপাদনশীলতা, কর ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত সম্পর্ক কাজ করে। এ সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কাঠামোর স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করে। ফলে অর্থনৈতিক অবক্ষয় কেবল একটি পার্শ্ববর্তী ঘটনা নয়; বরং তা ইতিহাসের চক্রাকার গতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি তার কাছে আলাদা কোনো শাস্ত্র নয়, বরং ইতিহাসের অন্তর্গত একটি ব্যাখ্যামূলক উপাদান। এ উপাদান সভ্যতার উত্থান ও পতনের প্রক্রিয়াকে বোধগম্য করে তোলে।

রুশো ও হার্ডারের মতো চিন্তাবিদদের মধ্যে যে মৌলিক আশাবাদ ছিল, তা ইবনে খালদুনের মধ্যে অনুপস্থিত। কারণ তার কাছে প্রকৃতি এমন এক শিক্ষক, যা মানুষের বোধশক্তির কাছে খোদার মতোই দুর্বোধ্য। এ অবস্থান তাকে গ্রিক ইতিহাসচিন্তার মূলধারা থেকেও পৃথক করে। গ্রিক ইতিহাসবিদরা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে শ্রেণীবিন্যাস ব্যবহার করতেন কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজন আকারে। থুসিডাইডিসের কাছে শ্রেণীকরণ ছিল একটি সচেতন মানসিক নির্মাণ, যাতে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায়। তার চিন্তায় যে অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের সম্ভাবনা, তা গ্রিক ইতিহাসচিন্তাকে সম্পূর্ণ চক্রাকার বলে অভিহিত হতে দেয় না। অবশ্য হেসিওডের মতো ঐতিহাসিকদের চিন্তায় একটি চক্রাকার ইতিহাসদৃষ্টি প্রধান হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে দেখলে ইবনে খালদুন হেসিওডীয় ও স্টোইক ইতিহাসচিন্তার সিলসিলায় পড়বেন, হেরোডোটাস ও থুসিডাইডিসের ধারার সঙ্গে নয়। হেরোডোটাস ও থুসিডাইডিস উপলব্ধি করেছিলেন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়শীল। প্রতিটি পরিস্থিতিই উভয় সম্ভাবনা ধারণ করে। যদি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সচেতনভাবে সংরক্ষিত হয়, তবে তা অগ্রগতির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করে। এ গ্রিক মানবতাবাদী ধারণাটিই পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক খ্রিস্টীয় ইতিহাসচিন্তায় প্রবেশ করে। ইহুদি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে খ্রিস্টীয় তত্ত্বকে পার্থিবতা প্রদান করে। কিন্তু ইবনে খালদুনের ইতিহাস-দর্শনে এমন কোনো অগ্রগতি নেই, যা সাময়িক নয়। শূন্যতা থেকে উদ্ভব এবং আবার তাতেই প্রত্যাবর্তন। এমন নিরাশাবাদ হয়তো জন্ম দিয়েছে এক ধরনের হবসীয় ধারণার। থমাস হবসের ভাষ্য অনেকটা এমন যে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো অন্য মানুষকে গ্রাস করা। সহযোগিতা বা সভ্যতা কেবল তখনই সম্ভব, যখন তা শক্তির দ্বারা বজায় রাখা হয়। ফলে সব সংস্কৃতিই মূলত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের কার্যরূপ। কোনো নৈতিক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত নয়, বরং কেবল শক্তির ওপর নির্ভরশীল। ম্যাক্স ভেবারের মতো ইবনে খালদুনের কাছেও রাজনীতি এক ধরনের বিষয়, আর জ্ঞানচর্চা আরেক। এজন্যই কি তিনি বুদ্ধিজীবীদের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, তা নিশ্চিত না।

তবে ধারাবাহিক নিরাশাবাদই ইবনে খালদুনকে এমন কিছু অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে, যা পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের কাছেও অগম্য ছিল। এ অন্তর্দৃষ্টি বিশেষভাবে স্পষ্ট দেখা যায় তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কিত বিশ্লেষণে। সাম্রাজ্য পতনের বিশ্লেষণে ইবনে খালদুনের চিন্তা বরং রোস্তোভৎসেভের কাজের সঙ্গে তুলনীয়। তার মতোই ক্ষমতার ঘটনাগুলোর ওপর মনোনিবেশ তাকে সর্বগ্রাসী ক্ষমতার প্রভাব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। ফলে যখন তিনি নৈতিক শক্তির ফলাফলগুলোর বিশ্লেষণ করেন, তখন সেগুলোকেও তিনি ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন। তার স্থাপত্য ও শিল্পকলার বিশ্লেষণ এ প্রবণতারই উদাহরণ। কেবল কবিতাকেই তিনি প্রকৃত মূল্য প্রদান করেন। যদিও ভিকো ও হার্ডারের মতো তিনি এটিকে মানুষের সৃষ্টির ফল হিসেবে নয়, বরং সভ্যতার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ফল হিসেবে দেখেন।

ইবনে খালদুনের ইতিহাস-দর্শন এ অর্থে ব্যতিক্রমী যে তিনি ইতিহাসকে নৈতিক বা ধর্মীয় বয়ানের সীমা থেকে সরিয়ে এনে কার্যকারণনির্ভর এক বিশ্লেষণাত্মক শাস্ত্রে রূপ দিয়েছেন। তার দৃষ্টিতে ইতিহাস কোনো সরলরৈখিক অগ্রগতির কাহিনী নয়; বরং তা আসাবিয়া, ক্ষমতা, অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও সামাজিক সংহতির জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার ফল। সে প্রক্রিয়ায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত উত্থান ও পতন। এ দৃষ্টিভঙ্গি মানবসভ্যতার সীমাবদ্ধতা যেমন উন্মোচন করে, তেমনি ইতিহাসচর্চাকে প্রতিষ্ঠা করে সমালোচনামূলক ও স্বনির্ভর জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে ইবনে খালদুন পরিণত হয়েছেন আধুনিক ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণের অনিবার্য পূর্বসূরি।

আহমেদ দীন রুমি: রিসার্চ ডিরেক্টর

সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল