গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী নামটি তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগের কাছেই অপরিচিত। ১৮৯২ সালের ২ ডিসেম্বর তার জন্ম। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ থেকে লন্ডন হয়ে প্যারিস, বার্লিন, জেনেভা প্রভৃতি শহরে বসবাস ও নানা কর্মে লিপ্ত এ বিপ্লবী শেষ পর্যন্ত ১৯২৫ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কোয় স্থায়ী হয়েছিলেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মানুষটির শেষ পরিণতি হয়েছিল করুণ। তার জীবন ও কর্মের প্রতি নজর দিলেই বোঝা যায়, কেন আজও তিনি প্রাসঙ্গিক। ভারতের স্বাধীনতার জন্য নিরলস সংগ্রাম করা বিপ্লবী লুহানীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বগাথা, যা ভারতীয় উপমহাদেশসহ সারা দুনিয়ায় ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামরত সব মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার।
বিদেশের সহায়তায় ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যেসব বিপ্লবী আত্মোৎসর্গ করেছেন, তাদের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র বসু আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত নাম। তবে তারও অনেক আগে একদল ব্যক্তি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন। শুরুতে তারা জার্মানি এবং পরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন। তাদেরই একজন ছিলেন গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী। তিনি একা নন—মস্কোয় আরো দুজন বাঙালি বিপ্লবী লুহানীর মতো একই ভাগ্য বরণ করেছিলেন। একজন তৎকালীন বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ) বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যজন সাতক্ষীরার অবনী মুখোপাধ্যায়।
সম্প্রতি প্রকাশিত গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী: এক অজানা বিপ্লবীর কাহিনি শিরোনামের বই থেকে বিপ্লবী লুহানীর বর্ণিল জীবন ও বহুমুখী কার্যকলাপ সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া যায়। বইটির লেখক, প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান লুহানীর জীবন ও কর্ম উদ্ঘাটন করেছেন তার ৪২ বছরের নিরলস সাধনায়। বইটি থেকে জানা যায় যে লুহানী ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত মিডিয়া ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ফতেহ লোহানী ও ফজলে লোহানী এবং তাদের বোন, বিশিষ্ট গায়িকা ও অধ্যাপক হুসনা বানু খানমের মামা। ফজলে লোহানীর মাধ্যমে মতিউর রহমানের যোগাযোগ ঘটে গোলাম আম্বিয়া খান লুহানীর ভাগ্নে মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদের সঙ্গে, যিনি বহু বছর ধরে পারিবারিক চিঠিগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। উল্লেখ্য, তাদের পরিবারের সবাই নামের শেষে ‘লোহানী’ লিখলেও গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী নিজের নাম ‘লুহানী’ লিখতেন।
লুহানী লন্ডনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও শ্রমিক আন্দোলন এবং সোভিয়েত বিপ্লবের সমর্থনে কাজ করেছেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি সাংবাদিক ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯২০-২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ফ্রান্স, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে বসবাস করেন এবং সেখানকার সংবাদপত্রগুলোয় ভারতের রাজনৈতিক ও শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি করেছেন। ইংরেজি ছাড়াও তিনি ফরাসি, ফারসি, জার্মান ও হিন্দি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।

রুশ ভাষায় লুদি ই সুদবি (পিপল অ্যান্ড ফেইটস) শিরোনামের জীবনী অভিধানে লুহানীর তথ্যসংবলিত পৃষ্ঠা। সংকলক: ইয়া ভে ভাসিলকোভ এবং এম ইউ সারোকিনা
১৯২১ সালে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে লুহানী প্রথম একটি প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী দলের অংশ হিসেবে মস্কো সফর করেন। কিন্তু দলটি কমিন্টার্নের সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। তবে লুহানী কিছু সময়ের জন্য সেখানে থেকে কমিন্টার্নের প্রচার বিভাগ অ্যাজিটপ্রপে কাজ করেন। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশনা দ্য মাসেস অব ইন্ডিয়া সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া তিনি কমিটি প্রো-হিন্দুর (ভারতীয় অর্থে) সঙ্গে কাজ করেছেন। এ কমিটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে কাজ করত। ফরাসি লেখক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী ওঁরি বারবুস ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। বারবুসের লেখার মাধ্যমে ‘লস্ট জেনারেশন’-এর বহু লেখক প্রভাবিত হয়েছিলেন, যার মধ্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও এরিখ মারিয়া রেমার্ক অন্যতম।
প্যারিসে থাকাকালীন লুহানীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ উঠলে সেখানে তার থাকার অনুমতি বাতিল করা হয়।
মজার ব্যাপার এ বছর জুলাইয়ে ব্যক্তিগত ভ্রমণে আমি প্যারিসে গেলে মোঁপানাস এলাকায় লুহানীর সে বাড়ির ঠিকানায় পৌঁছি। বাড়ির উল্টো দিকে থাকা একটি ক্যাফের লোকদের সঙ্গে লুহানীর কাহিনী শোনালে তারা অবাক হন। ক্যাফের একজন জানান, বাড়িটি এখনো আবাসিক ভবন হিসেবেই আছে। কিন্তু কোনো বাঙালি থাকেন বলে তারা জানেন না। অপ্রত্যাশিতভাবে পাশের সড়কেই পেয়ে যাই লুহানীর স্ত্রীর পোর্ট্রেট আঁকা প্রখ্যাত শিল্পী আমেদেও মোদিলিয়ানির বাড়ি। যদিও লুহানীর সঙ্গে তার স্ত্রীর পরিচয়ের অনেক আগেই মোদিলিয়ানি সেই পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন। বাড়ির ভেতর ঢুকে বুঝতে পারলাম এটি এখন আবাসিক হোটেল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
১৯২৫ সালের অক্টোবরে লুহানী স্থায়ীভাবে মস্কো চলে যান। ১৯২৮ সালে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ এবং ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত নাগরিকত্ব দেয়া হয়। এ সময়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের বৈশ্বিক কেন্দ্র কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে (কমিন্টার্ন) বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
মস্কোয় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ কমিন্টার্ন কংগ্রেসে লুহানী ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে তিনি এম. এন. রায়ের সঙ্গে তার মতপার্থক্য প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। ১৯৬৪ সালের ৩০ আগস্ট, লিংকের মস্কো সংবাদদাতা পি উন্নিকৃষ্ণান একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেন যে লুহানী জাতীয় ঔপনিবেশিক বিষয়ে কমিন্টার্নের একজন পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন।
স্তালিন আমলের বিচার সংশোধন
মতিউর রহমানের বইয়ে ব্যবহৃত সোভিয়েত গোয়েন্দা নথিপত্র থেকে জানা যায়, স্তালিনের শাসনামলে লুহানী সন্দেহ ও অবিশ্বাসের শিকার হয়েছিলেন। সে সময়ে অনেককে ভিন্নমতের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। এ করুণ পরিণতি থেকে লুহানীও রেহাই পাননি। ১৯৩৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্তালিনের নির্দেশে মস্কোর কাছে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা এনকেভিডির প্রশিক্ষণ মাঠ কমিউনারকায় তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে নতুন রাজনীতি শুরু হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে স্তালিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও ভিন্নমতের কারণে অসংখ্য মানুষ হত্যার দায়ে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের বক্তৃতা ব্যাপক আলোচিত হয়। সে বক্তৃতায় তিনি স্তালিনের আমলে দমন-পীড়ন ও সাজানো বিচারের কড়া নিন্দা জানান। এ বক্তৃতার পর স্তালিন আমলের বিচারে দণ্ডিত ও হত্যার শিকার লাখো ভুক্তভোগীকে সসম্মানে পুনর্বাসন করা হয়। একইভাবে ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত সুপ্রিম কোর্টের সামরিক কলেজিয়াম লুহানীর বিচারকেও ভুল বলে ঘোষণা করে এবং তাকে মরণোত্তর সম্মান প্রদান করে।
লুহানীর কাহিনী থেকে একজন বাঙালি বিপ্লবীর করুণ পরিণতি সম্পর্কে যেমন জানা যায়, তেমনি বিচরণ করা যায় ইতিহাসের এক নির্দিষ্ট কালপর্বে, যার প্রভাব আজও ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজ রাজনীতির নানা স্তরে।
খলিলউল্লাহ্: লেখক ও সাংবাদিক








