১৯২১ সালে ভারতের একটি ছোট প্রতিনিধি দল বার্লিন থেকে মস্কো পৌঁছে। এ দলে ছিলেন কয়েকজন বাঙালি ও মারাঠি অভিবাসী। তারা নিজ দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে সন্ত্রাসবাদী তকমা পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার তারা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন। এদের মধ্যে একজন ছিলেন গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী—পূর্ববঙ্গের সিরাজগঞ্জে ছিল তার বাড়ি।
লুহানীর জন্ম ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে। ১৯১৩ সালে তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনার জন্য লন্ডন যান। সে সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ছাত্রদের মধ্যে তা তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শুরুতে লুহানী বার্লিন কমিটির সংস্পর্শে আসেন। জার্মান সমর্থন নিয়ে এ কমিটি ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার পরিকল্পনা করেছিল। যখন জার্মানি হেরে গেল এবং রাশিয়ায় বিপ্লব শুরু হলো লুহানী তখন কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকলেন।
মস্কোয় ১৪ জনের এ প্রতিনিধি দল মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়। তিনি ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী এবং তিনিও ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন। লুহানীর মতো মানবেন্দ্রনাথ রায়ও ১৯১৭ সালে সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা আনেন। তাকে ১৯২০ সালে কমিন্টার্নের দ্বিতীয় কংগ্রেসে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। তিনি তাসখন্দে বসে ভারতের কংগ্রেস পার্টি গঠনের কাজ শুরু করেন। বার্লিন থেকে আগত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মানবেন্দ্র রায়ের প্রতি অতটা আন্তরিক ছিলেন না। কারণ তারা চিন্তিত ছিলেন যে মানবেন্দ্র রায় সোভিয়েত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের তাদের প্রচেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তারা চাইতেন তাসখন্দে গঠিত সিপিআই (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া) বিলুপ্ত হোক। তবে শেষ পর্যন্ত তারা প্রতিনিধি হিসেবে গৃহীত হননি, বরং তৃতীয় কংগ্রেসে দর্শনার্থী হিসেবে উপস্থিত থাকার অনুমতি পান। এই প্রথম সাক্ষাৎ লুহানী ও রায়ের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের পূর্বাভাস দেয়: পরবর্তী বছরগুলোতে লুহানীর চিন্তা ও কর্মকাণ্ড অনেক সময় মানবেন্দ্রনাথের চিন্তার কাছাকাছি হয়ে উঠলেও তিনি প্রায়ই মানবেন্দ্রর বিরোধিতা করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতেন।
প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে লুহানী, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও পাণ্ডুরাজ খানখোজে লেনিন ও কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী কমিটির (ইসিসিআই) কাছে ‘ভারত ও বিশ্ববিপ্লব সম্পর্কিত থিসিস’ জমা দেন। এম. এন. রায় উল্লেখ করেছেন যে এ থিসিস ভারতীয় কমরেডরা প্রস্তুত করেছিলেন, যাতে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নিজের থিসিসটির পরিবর্তে এটি গৃহীত হয়, যা এর আগে ১৯২০ সালের কমিন্টার্নের দ্বিতীয় বিশ্ব কংগ্রেসে অনুমোদিত হয়েছিল। লুহানী এ থিসিসের খসড়া প্রস্তুত করেন, কারণ যুক্তির গঠন এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে দক্ষ।
এ থিসিসে লুহানী পর্যবেক্ষণ করেন যে যেখানে ইউরোপ সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে রূপান্তর ঘটিয়েছে, সেখানে ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থায় একাধিক রূপ সহাবস্থান করছে। তিনি জাত, শ্রেণী ও ধর্মবিশ্বাসের পারস্পরিক সম্পর্ককে তুলে ধরেন, যা ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সৃষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এ সামাজিক বৈচিত্র্যের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় বহুস্তরীয় দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, যার ফলে ভারতীয় বাস্তবতায় কেবল শ্রেণীভিত্তিক বিশ্লেষণ—যা শ্রেণীকেই প্রধান বিরোধ হিসেবে ধরে—তা খুব একটা কার্যকর ছিল না। তার বক্তব্য বিশদভাবে উদ্ধৃত করা প্রয়োজন:
‘অন্যান্য সমাজের মতোই ভারতীয় সমাজেও, শোষক ও শোষিত শ্রেণি আনুভূমিক বিভাজনের রেখায় বিভক্ত। তবে এ আনুভূমিক বিভাজনের রেখাগুলি—যা শিল্পোন্নত পশ্চিমে অত্যন্ত স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ—ভারতে ইতিহাসের শুরু থেকেই প্রবল উল্লম্ব সামাজিক বিভাজনরেখা এবং পরবর্তীকালে ধর্মীয় বৈরিতার দ্বারা ছেদ করা হয়েছে। হিন্দু সমাজের অন্তর্গত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্য থেকেও একই অর্থনৈতিক শ্রেণিভুক্ত সদস্যরা (যাদের ‘পারিয়া’ বা বংশানুক্রমিক বর্জিত হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যারা মোট জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ) যেভাবে তাদের প্রতি সামাজিক ঘৃণা ও ঘৃণাবোধ পোষণ করে থাকেন, তা শ্রেণি-সচেতনতার ভিত্তিতে কোনো ধরনের সাধারণ স্বার্থবোধ গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু ও ইসলামের মধ্যে ধর্মীয় ভাবনা ও সামাজিক কাঠামোর পার্থক্য এতটাই প্রবল যে, শোষিত মুসলমান ও হিন্দুরা এখনো পর্যন্ত একটি সাধারণ শোষক বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রেণি-সচেতন ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কেবল এই সমস্ত বিভাজনকে নতুন করে উসকে দিয়েছে তা-ই নয়, উপরন্তু, ভারতে এমন সব শর্তের বিকাশেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা একটি বিপ্লবী শ্রেণি-সচেতন সর্বহারা শ্রেণির উত্থান সম্ভব করে তোলে।’
লুহানী মনে করেছিলেন লেনিন তাদের থিসিসের প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু বাস্তবে রুশ বিপ্লবের এ নেতা একটি নতুন থিসিস বা ভারতে বিপ্লব নিয়ে যাওয়ার ধারণা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। সোভিয়েত নেতৃত্ব লুহানী ও তার সঙ্গীদের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।
১৯২১ সালের আগস্টে লুহানী, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও খানখোজে কমিন্টার্নের কাছে ভারতে কাজের একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। তারা ৩০ সদস্যবিশিষ্ট ‘ইন্ডিয়ান রেভল্যুশনারি কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব অনুসারে এটি চারটি কেন্দ্র—রাশিয়া, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত—থেকে পরিচালিত হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় অভিবাসী, নাবিক, সৈনিক ও সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচারমূলক কাজ চালানো। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থানরত ভারতীয় সেনা ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে থাকা ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর।
তারা প্রস্তাব করেন যে পাঁচটি প্রধান ভারতীয় ভাষায় মার্ক্সবাদভিত্তিক পত্রিকা প্রকাশ করা হবে। নিরক্ষর ভারতীয় শ্রমজীবী জনগণকে লক্ষ্য করে সিনেমাকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কথাও তারা বলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত গদর পার্টি এ প্রচারকাজের সমন্বয় করবে। ভারতে চলমান অসহযোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ার প্রস্তাবও তারা দেন।
তবে কমিন্টার্ন সিদ্ধান্ত নেয় যে কোনো ‘রেভল্যুশনারি কাউন্সিল’ গঠন করা হবে না। তার পরিবর্তে পৃথক প্রতিনিধি হিসেবে কয়েকজনকে ভারতে পাঠিয়ে প্রচারমূলক কাজ চালাতে হবে। এম. এন. রায় উল্লেখ করেন যে কংগ্রেস শেষে, কংগ্রেস ও বৈঠকের ফলাফল নিয়ে হতাশ ভারতীয় প্রতিনিধিরা বার্লিনে ফিরে যান। তবে শুধু নলিনী গুপ্ত ও লুহানী যাননি। লুহানী তার বার্লিনের সহকর্মীদের ওপর বিরক্ত ছিলেন এবং এম. এন. রায়ের প্রতি একটু উষ্ণ মনোভাব দেখাতে শুরু করেন। এম. এন. রায়ের পরামর্শে তিনি কিছুদিন কমিন্টার্নের তথ্য বিভাগে কাজ করেন।
পরবর্তী সময়ে কমিন্টার্ন তাকে কিছু অর্থ দেয় যাতে তিনি ভারতে গিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের কাজ করতে পারেন। কিন্তু তিনি কেবল বার্লিন পর্যন্তই যেতে পারেন। সেখানেই ব্রিটিশ কনসাল তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য—অর্থাৎ তার খোঁড়া পা—দিয়ে তাকে শনাক্ত করে এবং তার ভারত যাওয়ার ভিসা বাতিল করা হয়। দেশমাতৃকার মাটিতে ফেরার আরো কয়েকটি ব্যর্থ চেষ্টা করার পর, ১৯২৩ সালে লুহানী মস্কোর উদ্দেশে রওনা হন।
এ সময়ে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। প্যারিসে থাকাকালীন লুহানী ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন। Gandhi et l’impérialisme britannique (গান্ধী ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ) প্রবন্ধে তিনি প্রশংসায় ভরিয়ে দেন গান্ধীকে—ভারতীয় জনগণের চোখে একজন ত্যাগী ও সন্ন্যাসী হিসেবে পরিচিত গান্ধী যেভাবে ব্রিটিশ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ‘নৈতিক শক্তির’ নাম করে জনগণকে সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স বা অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন, তা ব্রিটিশ রাজত্বকে কাঁপিয়ে দেয়। লুহানীর মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় কল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আরেকটি প্রবন্ধে, L’organisation ouvrière aux Indes (ভারতে শ্রমিক সংগঠন) তিনি লেখেন:
‘ভারতীয় সমাজের জাতিগত উল্লম্ব সংগঠন এখনো শ্রমিকদের মানসিকতার পর তার প্রাচীন প্রভাবের একটি বড় অংশ ধরে রেখেছে এবং শোষিত শ্রেণি ও শোষক শ্রেণির মধ্যে একটি স্পষ্ট অনুভূমিক বিভাজনের ধারণার বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এর সাথে একটি নতুন বিভ্রান্তির উপাদান যুক্ত হয়েছে—ধর্মীয় বিভেদ। ফলে দেখা যায়, কোনো শ্রমিক ইউনিয়নের ব্রাহ্মণ সদস্যরা ধর্মীয় কারণে মুসলমান সদস্যদের বিরোধিতা করেন।’
লুহানী বা রায়ের কাঙ্ক্ষিত ভারতীয় বিপ্লব তখনো দৃঢ় কোনো ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি। এদিকে চীনে একটি বিস্তৃত কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠছিল, যা ভারতীয় কমিউনিস্টদের কাছে একটি শিক্ষণীয় মডেল হিসেবে উঠে আসে। ১৯২৭ সালে, চীন থেকে ফিরে এসে এম. এন. রায় ‘ডিকলোনাইজেশন’ বা বিউপনিবেশায়ন তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এটির প্রতি লুহানীও সমর্থন জানান। চীনে মূল প্রশ্ন ছিল—কমিউনিস্টদের কি জাতীয়তাবাদী কুওমিনতাং পার্টির সঙ্গে কাজ করা উচিত কিনা। ১৯২৭ সালের সাংহাই গণহত্যা (Shanghai Massacre) এ সাময়িক সহযোগিতার ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে।
এ ঘটনার পরবর্তী প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। ১৯২৮ সালে এক প্রবন্ধে লুহানী লেখেন যে যুদ্ধ-পরবর্তী ভারতে একটি স্বদেশী পুঁজিপতি শ্রেণী দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যেহেতু একটি বুর্জোয়া সংগঠন, তাই তা ক্রমাগত আপসরফার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওই বছরই সাইমন কমিশন ভারত সফরে আসে ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য। লুহানী প্রস্তাব দেন, শ্রমিক ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি সাধারণ পার্টি গঠন করা উচিত, তবে একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে সহযোগিতার একটি পথও খোলা রাখা যেতে পারে।
তিনি মনে করতেন, ১৯২৫ সালে গঠিত ‘শ্রমিক-কৃষক দল’ (Workers and Peasants’ Party – WPP)—যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম—এবং দেশীয়ভাবে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, এ দুই সংগঠনই এ উদ্দেশ্যে উপযুক্ত। তিনি ভারতের জন্য একটি গণপরিষদ (Constituent Assembly) গঠনের আহ্বান জানান এবং সেই সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির (CPGB) অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন।
কমিউনিস্ট সংস্কৃতির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট মানসিক দ্বন্দ্ব (cognitive dissonances) বিদ্যমান ছিল, যার উৎস মূলত একটি সাধারণ রণরেখার প্রয়োজনীয়তা ও বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে বিরাজমান টানাপড়েনে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যেহেতু কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করত, তাই আন্তঃমহাদেশীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কও ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শাসনের অধীন দেশগুলোর প্রতি রাশিয়ার নীতিকে কিছুটা প্রভাবিত করত।
এছাড়া বিতর্কিত একটি বিষয় ছিল ‘শ্রমিক অভিজাত শ্রেণী’ (labour aristocracy)। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের সমৃদ্ধি এবং মহানগরগুলোতে শ্রমিক শ্রেণীর বিকাশের পারস্পরিক সম্পর্ক এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দেয়, যেখানে এসব কেন্দ্রীয় অঞ্চলের শ্রমিকদের স্বার্থ অনেক সময় ঔপনিবেশিক প্রান্তিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতামূলক বিকাশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।
১৯২৮ সালের জুলাই-আগস্টে অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ কমিন্টার্ন কংগ্রেস। এ কংগ্রেসে উপনিবেশ ও অর্ধ-উপনিবেশের বিপ্লবী আন্দোলনসংক্রান্ত থিসিসে জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া-সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলোকে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যায়িত করা হয়। এতে সর্বহারা শ্রেণীকে আহ্বান জানানো হয়, যাতে তারা বুর্জোয়া সংস্কারবাদীদের বিরোধিতা করে নেতৃত্বের একচেটিয়া কর্তৃত্ব গ্রহণ করে।
ভারতীয় প্রতিনিধিরা একটি সংশোধনী প্রস্তাব করেন—সর্বহারারা যেন জনসাধারণকে এ বুর্জোয়া-সংস্কারবাদী নেতৃত্বের প্রতি-প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্পর্কে বোঝাতে সময় নিতে পারে। এ পর্যায়ে লুহানী ও তার সহযাত্রীরা এখনো দাবি জানিয়ে যাচ্ছিলেন, নিজেদের বক্তব্য প্রচার করছিলেন।
তবে এম. এন. রায় ও লুহানীর আপত্তি সত্ত্বেও ১৯২৮ সালের মধ্যেই, ভারতের রাজনৈতিক বিষয়গুলো, প্রধানত ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির (CPGB) হাতে তুলে দেয়া হয়। এরপর গঠিত হয় একটি ‘ইন্ডিয়ান সাব-কমিশন’, যা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আরপি দত্ত।
১৯২৯ সাল ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কেননা সে সময় সোভিয়েত রাষ্ট্র কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে পরামর্শমূলক গণতন্ত্রের অবশেষকেও চূড়ান্তভাবে ভেঙে দেয়। লিও ট্রটস্কিকে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং নিকোলাই বুখারিনকে পলিট ব্যুরো থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করা হয় দক্ষিণের কমিউনিস্টদের ওপরও। এম. এন. রায় একেবারে পরিত্যাজ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। সোভিয়েত নেতৃত্ব গ্রহণ করে তথাকথিত ‘তৃতীয় পর্যায়’-এর কৌশল, যা জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতাকে নিন্দিত করে তোলে।

(বাম থেকে) লুহানী, বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অবনী মুখার্জি ও এম. এন. রায়
যদিও এ অবস্থান লুহানীর আগের ‘থিসিস’-এর সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক—যেখানে তিনি শ্রমিক-কৃষকের দ্বৈত শ্রেণীভিত্তিক পার্টির মাধ্যমে বুর্জোয়াদের ‘র্যাডিকালাইজ’ করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন—স্তালিনবাদী দমনযন্ত্রের মুখে লুহানী অবশেষে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের সুরে সুর মেলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মেধার এ সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণও তার জীবন রক্ষা করতে পারেনি।
১৯৩৭ সালে তার প্রাক্তন সঙ্গী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও অবনী মুখার্জির ফাঁসির পর, ১৯৩৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মস্কোতে লুহানীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
লুহানীকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অন্ধগলি বা ভ্রান্ত উপপথে খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য তার দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ বাস্তবায়ন কখনো ঘটেনি। জাতীয়তাবাদ থেকে কমিউনিজমে তার মতাদর্শগত স্খলন বা অভিযোজন—যা প্রতিনিয়ত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা ছিল—তা নির্মিত মতাদর্শগুলোর মধ্যকার অবশ্যম্ভাবী ফাঁকফোকর ও দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দেয়।
তবে কেন্দ্রাভিমুখী কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যকার যে যুক্তিনির্ভর ও তুলনাভিত্তিক বিশ্লেষণের কাঠামো ছিল, তা প্রায়ই এমন জায়গায় বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করত যেখানে তা একেবারেই প্রয়োজন ছিল না। অন্যদিকে নৈতিক ও বিশ্লেষণগত দুর্বলতাগুলোকে ঢেকে রাখত। কমিন্টার্নের অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠানগত এবং অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত কাঠামো, বিশেষত স্তালিনবাদী রূপান্তরের পর, মতানৈক্য বা ভিন্ন কণ্ঠকে দমন করেছে এক অপূর্ব মিশ্রণে যেখানে ছিল জ্ঞানের ঔদ্ধত্য ও বাস্তব দমন-পীড়নের সহাবস্থান।
পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার জাতীয়তাবাদের ইতিহাস দেখায়, লুহানীর বিশের দশকে করা কিছু অন্তর্দৃষ্টি এতটাই সত্য ছিল যে সেগুলো উপেক্ষা করা যায় না।
তাহমিদাল জামি: ইতিহাস গবেষক
অনুবাদ: আসরার আবেদিন









