১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের কথা। ভারত সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫-২৭ খ্রি.) দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা খুররমের (পরে সম্রাট শাহজাহান ১৬২৭-৫৭ খ্রি.) তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আওরঙ্গজেবের (পরে সম্রাট ১৬৫৮-১৭০৭ খ্রি.) জন্য একজন ধাত্রীমাতা নিযুক্ত করা হয়েছে সমাজের উঁচুতম স্তরে প্রচলিত রীতি অনুসারে। ভারত সম্রাটের পৌত্রকে স্তন্যদান করার জন্য তো যাকে খুশি তাকে নিযুক্ত করা যায় না। তাই তুর্কি আফশার গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় নারীকে বেছে নেয়া হয়েছে অনেক বিচার-বিবেচনার পর। অবশ্য সেই নারীর নামটি কোনো সূত্র থেকেই উদ্ধার করা যায়নি।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রপিতামহের আগে এ বংশের পূর্বপুরুষদের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ইউসুফ আলি খান রচিত তারিখ-ই-বঙ্গালা-ই-মহাব্বত জঙি সংক্ষেপে তারিখ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রপিতামহ ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের ‘কোকলতাশ’ অর্থাৎ সম্রাটের ধাত্রীমাতার সন্তান। কিন্তু সম্রাটের সেই দুধভাইয়ের নামের উল্লেখ সেখানে নেই।
সম্রাটের কোকলতাশের নাম তাৎক্ষণিকভাবে না পাওয়া গেলেও তার একমাত্র পুত্র যে মির্জা মোহাম্মদ ছিলেন, তা তারিখ-এ অতি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে এবং তিনি যে একসময় সম্রাটের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজমের ‘শিলাঞ্চী’ অর্থাৎ ‘খানসামা’ ছিলেন, সে কথাও সেখানে বলা হয়েছে। মোজাফ্ফরনামায় তার নাম যে শাহ কুলি খান ছিল, তার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। একই গ্রন্থমতে তিনি ছিলেন শাহজাদা আজমের স্বর্ণালংকার দপ্তরের অধ্যক্ষ এবং তার স্ত্রী একই শাহজাদার গৃহে ‘পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন।’ তখন তাদের যে পুত্র জন্মগ্রহণ করেন, তার নাম ছিল মির্জা মোহাম্মদ আলি। তারিখ মতে, এই মির্জা মোহাম্মদ আলির জন্ম হয়েছিল দাক্ষিণাত্যের এক স্থানে এবং এর ১০ বছর আগে সম্রাট আলমগীরের রাজত্বের প্রথম দিকে তাদের যে প্রথম পুত্রের জন্ম হয়, তার নাম ছিল মির্জা আহমদ (পরে তিনি হাজি আহমদ নামে পরিচিত হন)। মির্জা মোহাম্মদ ও শাহ কুলি খান—এই উভয় নামই ছিল খুব সম্ভব সিরাজের প্রপিতামহের। সে কারণেই বোধ হয় সিরাজ ‘মনসুর-উল-মুলক মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খান সিরাজ-উদ-দৌলা হয়বত জং বাহাদুর’ নাম ও উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খান ছিলেন বড় ধরনের একজন মনসবদারের পুত্র এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের সেই কোকলতাশ-মনসবদার একসময় (১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে) সুবাহ বাংলার সুবাদারও নিযুক্ত হয়েছিলেন প্রায় এক বছরের জন্য। এ পরিবারের আর্থিক অবস্থা যে প্রথমদিকে খুবই সচ্ছল ছিল, সেই প্রমাণ পাওয়া যায় এ পরিবারে ওপরে উল্লেখিত অনেক উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন গৃহজাত ভৃত্যের অস্তিত্ব দেখে এবং তাদের সামাজিক উঁচু মর্যাদার পরিচয় পাওয়া যায় মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খানের প্রথম স্ত্রীর (হাজি আহমদ ও আলিবর্দি খানের জননী) বাবার বংশপরিচয় দেখে। এই নারীর পিতা ছিলেন অভিজাত বংশীয় সৈয়দ জয়নাল আবেদিনেরও পিতা। মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খান ও তার দুই পুত্র সম্রাটতনয় শাহজাদা আজমের গৃহে সম্মানজনক চাকরিতে নিযুক্ত ছিলেন।
১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের ফলে মির্জা মোহাম্মদ শাহ কুলি খানের পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে চরম দুর্দশায় পতিত হয়। সেই বর্ণনা সমসাময়িক কালে রচিত তারিখ, মোজাফ্ফরনামা, রিয়াজ, সিয়ার প্রভৃতি গ্রন্থে আছে।
১৬৬৪ কি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী হাজি আহমদের বয়সও তখন প্রায় ৪০ বছর। তারও ছিল দুই সংসার। প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত তিন পুত্র ছিলেন মোহাম্মদ রেজা (পরে নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান), মোহাম্মদ সাঈদ (পরে সাঈদ আহমদ খান) ও মোহাম্মদ হাশিম (পরে জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান)। হাজি আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানেরা ছিলেন রাবেয়া বেগম ও আরেকটি কন্যা। মির্জা মোহাম্মদ আলির (আলিবর্দি খান) ছিল তিনটি কন্যা, যথা মেহের-উন-নিসা (ঘসেটি বেগম), মোমেনা বা ময়মনা বেগম ও আমিনা বেগম।
১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধের পর মির্জা মোহাম্মদের জ্যেষ্ঠ পুত্র মির্জা আহমদ হেজাজের পথে বের হয়ে পড়েন এবং সেখানে কয়েক বছর অতিবাহিত করে পরে ফিরে আসার পর হাজি আহমদ নামে পরিচিতি লাভ করেন। হাজি আহমদের চেয়ে ১০ বছরের কনিষ্ঠ মির্জা মোহাম্মদ আলির (আলিবর্দি খান) বয়স ছিল তখন (১৭০৭ খ্রি.) ৩২ কি ৩৩ বছর। তখন তিনি বিবাহিত এবং তখন তার জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহের-উন-নিসার (ঘসেটি বেগম) জন্ম হয়ে থাকলেও অন্য দুই কন্যা মোমেনা বেগম ও আমিনা বেগমের যে জন্ম হয়নি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তিনি যখন ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুর্শিদাবাদ হয়ে ওড়িশার কটকে গিয়েছিলেন, তখন তার কন্যা তিনটি, তাদের জননী ও তাদের খানাজাত ভৃত্য ফকির উল্লাহ বেগ খান ও নূর উল্লাহ বেগ খান যে তার সঙ্গে এসেছিলেন, সে কথা সমসাময়িক ইতিহাসে স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।
১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের সেই ভয়াবহ যুদ্ধের পর সম্রাট শাহ আলম বাহাদুর শাহ প্রায় পাঁচ বছর (১৭০৭-১২ খ্রি.), তার পুত্র মুয়াজ-উদ-দীন জাহান্দার শাহ এক বছর (১৭১২-১৩ খ্রি.), সম্রাটের পৌত্র সম্রাট ফররুখ সিয়ার প্রায় ছয় বছর (১৭১৩-১৯ খ্রি.) রাজত্ব করেছিলেন। এই সুদীর্ঘ ১২ বছরের অধিক কাল মির্জা মোহাম্মদের গোটা পরিবারের আর্থিক, সেই সঙ্গে সামাজিক অবস্থা যে কী চরম সংকটে পড়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের প্রত্যেকেই হয়তো নিজ নিজ অবস্থার উন্নতি বিধানের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে গেলেও তাদের কোনো প্রচেষ্টাই যে সাফল্যের মুখ দেখেনি, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। হাজি আহমদের কথা বিশেষ কিছুই জানা না গেলেও মির্জা মোহাম্মদ আলি (আলিবর্দি খান) যে ওয়ালিশাহিত বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন, সে সম্বন্ধে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এ কাজ তার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে বলে তা তিনি পরিত্যাগ করেন। তিনি এবং তাদের সবাই শাহজাদা আজমের লোক ছিলেন বলে তারা সম্রাটের দরবারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাননি বলে দেখা গেছে।
অভাবের তাড়না আর সহ্য করতে না পেরে মির্জা মোহাম্মদ আলি ভাগ্যান্বেষণে বাংলা ও ওড়িশার দিকে ছুটে যান। এ সম্বন্ধে তারিখ, মোজাফ্ফরনামা প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছু কিছু পার্থক্য দেখা গেলেও মির্জা মোহাম্মদের গোটা পরিবারটাই যে ওড়িশা ও বাংলায় এসেছিল, সে ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য দেখা যায় না।
নবাব মুর্শিদ কুলি জাফর খানের বেগমের উপদেশ অনুসারে মির্জা মোহাম্মদ আলি তার বেগম (শরফ-উন-নিসা), তাদের তিন কন্যা ও ভৃত্যদের নিয়ে কটক অভিমুখে যাত্রা করেন। তারিখ-এ বর্ণিত আছে, তার পিতা মির্জা মোহাম্মদের আমন্ত্রণেই মির্জা মোহাম্মদ আলি মুর্শিদাবাদ হয়ে কটকে গিয়েছিলেন এবং তার পিতা আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন। মোজাফ্ফরনামার বর্ণনায় আছে, [মির্জা মোহাম্মদ] শাহ কুলি খান [দিল্লি থেকে] নবাব সুজা খানের অনুগামী হয়েছিলেন। এ ঘটনা সত্য হলেও তা খুব আগের ঘটনা বলে ধরা যায় না। কারণ সুজা খান কটকের সুবাদারি পেয়েছিলেন এর সামান্য আগে।
কটকে আগমনের পর নবাব সুজা খান মির্জা মোহাম্মদ আলির প্রতি যথেষ্ট সৌজন্য প্রদর্শন করেন। তারিখ-এর বর্ণনামতে, সুজা খান প্রথমে তাকে মাসিক ১০০ টাকা বেতনের একটি চাকরি দেন এবং পরে তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে নিজ রাজ্যের একটি উৎকৃষ্ট অংশে ফৌজদার পদে নিযুক্ত করেন।
পরের বছর অর্থাৎ ১১৩২ হিজরি (১৭২০-২১ খ্রি.) সনে নবাব মির্জা মোহাম্মদের অনুরোধে হাজি আহমদকে সপরিবারে কটকে আগমনের জন্য একটি পরোয়ানা পাঠান।
১৬৬৪ অথবা ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী হাজি আহমদের বয়স ছিল তখন প্রায় ৫৫ বছর এবং তার পিতা মির্জা মোহাম্মদের বয়স তখন ৭৫ বছরের মতো ছিল বলে ধরা যেতে পারে। এ বয়সে মির্জা মোহাম্মদ কোনো চাকরিতে নিয়োজিত হয়েছিলেন কিনা সেই উল্লেখ কোথাও নেই। তবে হাজি আহমদ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এক মতে, তিনি মাসিক ৫০ টাকা বেতনে একটি চাকরি পান। অন্য মতে, ‘নবাবকে দিনরাত সঙ্গদান ছাড়া তার অধীনে কোনো চাকরি গ্রহণ করার ব্যাপারে হাজি সাহেব অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।’ যোগ্যতা অনুসারে তার পুত্রদের চাকরির নিশ্চয়তা বিধান করার পর হাজি আহমদ তার ভাইয়ের উন্নতির জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন।
সে সময়ে হাজি আহমদের বয়স প্রায় ৫৫ বছর ছিল। তার পিতা মির্জা মোহাম্মদের বয়স তখন প্রায় ৭৫ ছিল। তবে হাজি আহমদের তিন পুত্র ও মির্জা মোহাম্মদ আলির তিন কন্যার বয়স তখন কত ছিল, সেই উল্লেখ কোথাও নেই। তবে সিয়ার-এর একটি উক্তি থেকে জানা যায়, সাঈদ আহমদ খান যখন ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণিয়াতে মারা যান, তখন তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। সেই হিসাবে তিনি ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে ধরা যেতে পারে।
সিয়ার রচয়িতা সৈয়দ গোলাম হোসেন খান প্রায় সাত বছর ধরে সাঈদ আহমদ খানের দিওয়ান, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাই তার এই বর্ণনাকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলা যেতে পারে এবং সেই সঙ্গে সাঈদ আহমদের অন্য দুই ভাইয়ের জন্মতারিখ সম্বন্ধেও ধারণা করা যেতে পারে। এই হিসাবে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা মোহাম্মদ রেজা, অর্থাৎ নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান খুব সম্ভব ১৬৯২ কি ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে এবং তাদের সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা মোহাম্মদ হাশিম, অর্থাৎ জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান ছিলেন সাঈদ আহমদ খানের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট।
হাজি আহমদের এই তিন পুত্রের বিয়ে হয়েছিল তার কনিষ্ঠ মির্জা মোহাম্মদ আলির (পরে আলিবর্দি খান) তিন কন্যার সঙ্গে। জ্যেষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদ রেজা, অর্থাৎ নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান শাহাম্মত জঙের বিয়ে হয়েছিল আলিবর্দি খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহের-উন-নিসা ওরফে ঘসেটি বেগমের সঙ্গে। দ্বিতীয় পুত্র সাঈদ আহমদ খানের, অর্থাৎ সওলত জঙের বিয়ে হয়েছিল আলিবর্দি খানের দ্বিতীয় কন্যার সঙ্গে।
আলিবর্দি খানের তৃতীয় ও কনিষ্ঠ কন্যার নাম ছিল আমিনা বেগম। তার বিয়ে হয়েছিল হাজি আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান হয়বত জঙের সঙ্গে। এ বিয়েটা কবে এবং কোথায় হয়েছিল, তা জানা না গেলেও এ ভাগ্যহীন দম্পতির সন্তানই ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নৃপতি হতভাগা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা।
হাজি আহমদের পুত্রদের বয়স সম্বন্ধে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেলেও আলিবর্দি খানের কন্যাদের বয়সের ব্যাপারে সমসাময়িক কালে রচিত ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে নীরব ও নির্বিকার থাকার কারণে এ-সংক্রান্ত জটিলতা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ ব্যাপারে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জন্মতারিখ পরোক্ষভাবে হলেও সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে সেই আলোচনা আগে করা হলো।
সিরাজ-উদ-দৌলার জন্ম সম্বন্ধে সিয়ার রচয়িতা সৈয়দ গোলাম হোসেন খান বলেছেন, আলিবর্দি খান যখন রাজমহলে ফৌজদার পদে নিযুক্ত হয়ে সেখানেই অবস্থানরত, তখন ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে তার তৃতীয় কন্যা আমিনা বেগম একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। শিশুটিকে আলিবর্দি খান নিজের সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই সৌভাগ্যটা ছিল এই যে বিশেষ কোনো কারণে বিহার সুবাহর সুবাদারির দায়িত্বও বাংলা ও ওড়িশার সুবাদার নবাব সুজা খানের ওপর অর্পিত হয় সমাট মোহাম্মদ শাহর এক আদেশে। নবাব সুজা খান আলিবর্দি খানকে বিহার সুবার নায়েব নাজিম পদে নিযুক্ত করেন। এই ঘটনা ঘটেছিল ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে এবং সেই বছরই যে শিশু সিরাজ-উদ-দৌলার জন্ম হয়েছিল বলে সিয়ার রচয়িতা বলেছেন, সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সিয়ার রচয়িতা কর্তৃক প্রদত্ত এ তথ্য অবলম্বন করেই পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকেরা ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দকেই নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জন্মতারিখ বলে ধরে নিয়েছেন।
কিন্তু সিয়ার রচয়িতা কর্তৃক প্রদত্ত এ তথ্য যে ভুল, সেই প্রমাণ পাওয়া গেছে আলিবর্দি খানের একজন নিকটাত্মীয় এবং তারই গৃহে জন্মগ্রহণকারী, বসবাসকারী ও তারই আশ্রয়ে বড় হওয়া একজন ঐতিহাসিকের রচিত গ্রন্থ থেকে। সেই ঐতিহাসিক ছিলেন মোজাফ্ফরনামা রচয়িতা ও পরবর্তীকালে ঘোড়াঘাটের ফৌজদার করম আলি খান। তিনি মোজাফ্ফরনামায় লিখেছেন:
হাজি সাহেবের তিন পুত্র নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান শাহাম্মত জং, সাঈদ আহমদ খান সওলত জং ও জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান হয়বত জঙের জন্মতারিখ সম্পর্কে যে আলোচনা আগে করা হয়েছে, তাতে সেখানে দেখানো হয়েছে, ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণকারী সাঈদ আহমদ খানের জন্ম হয়েছিল ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে ও তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান জন্মেছিলেন ১৬৯১ কি ১৬৯২ খ্রিস্টাব্দে। তাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান খুব সম্ভব সাঈদ আহমদ খানের চেয়ে বেশ কয়েক বছরের ছোট ছিলেন। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বাসঘাতক আফগান সেনাপতিদের হাতে নিহত হওয়ার সময় সিয়ার-এ তাকে তরুণ শাসনকর্তা বলা হলেও তার বয়স তখন ৪০ বছরের ওপরে ছিল বলে ধরা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার জন্ম ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের সামান্য পরে হয়েছিল বলে ধরা যেতে পারে।
মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিত ও তার ২২ জন সেনাপতিকে প্রতারণামূলকভাবে আলিবর্দি খান হত্যা করিয়েছিলেন রাজা জানকীরাম ও আফগান সেনাপতি মোস্তফা খানের সাহায্যে এবং নবাব মোস্তফা খানকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ভাস্কর পণ্ডিতদের হত্যা করার পর তাকে বিহার সুবাহর নায়েব নাজিমের পদ প্রদান করা হবে। কিন্তু কার্যোদ্ধারের পর নবাব তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার কারণে মোস্তফা খান বিদ্রোহী হন এবং মুর্শিদাবাদে কিছু করতে পারবেন না জেনে তিনি আজিমাবাদ-পাটনায় গিয়ে আক্রমণ করেন সেখানকার শাসনকর্তা শাহজাদা সিরাজ-উদ-দৌলার পিতা এবং নবাব আলিবর্দি খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা জয়েন-উদ-দীন আহমদ খান হয়বত জং বাহাদুরকে। তিনি মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত ও হত্যা করেন।
[আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া রচিত নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বই থেকে সংকলিত]








