রক্তাক্ত মাটিতে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার নিথর দেহ যখন লুটিয়ে পড়েছিল, তখন পলাশীর প্রান্তর শুধু এক তরুণ শাসককে হারায়নি। ডুবে গিয়েছিল এক গৌরবময় বংশের সর্বশেষ প্রদীপগুলোও। মৃত্যু এসেছিল নিঃশব্দে, প্রতারণার বিষাক্ত নিশ্বাসে। সিরাজের পতনের মুহূর্তে যাদের চোখে ছিল শেষ আশা, তারা একে একে নিভে গিয়েছিল—মা আমিনা বেগম, ভাই ফজল কুলি খান, সর্বকনিষ্ঠ মির্জা মাহদী। তাদের অপরাধ ছিল কেবল একটি বংশের উত্তরাধিকার হওয়া।
আমিনা বেগমের জন্ম আনুমানিক ১৭২০-২২ সালে মুর্শিদাবাদে। নবাব আলিবর্দি খানের প্রভাব আরো মজবুত করার কৌশল হিসেবে আমিনার বিয়ে হয় পাটনার গভর্নর জয়েন-উদ-দীন আহমদের সঙ্গে, যিনি সম্পর্কে ছিলেন তার চাচাতো ভাই। এ দম্পতির তিন পুত্র মির্জা মুহাম্মদ (পরবর্তী সময়ে সিরাজ-উদ-দৌলা), ফজল কুলি খান (ইকরাম-উদ-দৌলা) ও মির্জা মাহদী। রাজনীতির সূক্ষ্ম বোধ আর দরবারি কূটনীতির দক্ষতা ছিল আমিনা বেগমের।
ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা ও ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল চার্লস হিল (এসসি হিল) তার ‘বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-৫৭’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘আমিনা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী নারী—রাজনীতির জটিল অংকে পারদর্শী।’ অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি তখনকার পুরুষপ্রধান রাজনীতিতে বিস্ময়কর ছিল। পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের পরাজয় ও হত্যার পরই মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে আমিনা বেগমকে বন্দি করা হয়। মীরন আশঙ্কা করেছিলেন, সিরাজের পরিবারের অন্য সদস্যরা বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে তারা বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। ফলে বাংলার একসময়ের মহীয়সী রানী পরিণত হন এক ভগ্নপ্রায় কারাকক্ষে থাকা বন্দিনীতে। বন্দিদশায় তার জীবন হয়ে ওঠে অসহনীয়। সাধারণ দাসীর মতো খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো তাকে। এসসি হিল লিখেছেন, ‘একসময়ের মহিমান্বিত রানী আমিনা শেষ দিনগুলোয় সাধারণ চাকরানীর মতো খাবারের জন্য অপেক্ষা করতেন। এমনকি তার কান্না শোনার কেউ ছিল না।’
কেউ বলেন আমিনা বেগমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়, কোনো কোনো সূত্র মতে নৌকা ডুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও তার হত্যা নিয়ে নানা তথ্য মেলে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোপন নথির (ফোর্ট উইলিয়াম লেটার্স) বিবরণে বলা হয়েছিল, ‘সাবজেক্ট নং ১-কে ডিনারে আর্সেনিক মিশ্রিত মিষ্টান্ন দেয়া হয়েছিল। মৃত্যু ঘটে ১২ ঘণ্টা পর।’ প্রসঙ্গত এটি ছিল ব্রিটিশদের পছন্দের পদ্ধতি। অনেকে মনে করেন এখানে সাবজেক্ট নম্বর ১ বলতে আমিনা বেগমকে বোঝানো হয়েছে।
প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার তার ‘দ্য ফল অব দ্য মুঘল এম্পায়ার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমিনা বেগমকে মিরনের নির্দেশে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুর পর কোনো সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়নি, প্রথাগত দাফন-কাফনের ব্যবস্থাও করা হয়নি।’ তবে ভিন্ন একটি বর্ণনাও পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, সিরাজের পতনের পর আমিনা বেগমকে মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকা নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। পরে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ নেয়ার পথে তার নৌকা ডুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন নৌকাডুবির গল্পটি অনেকটাই লোককথানির্ভর। সমসাময়িক প্রমাণের অভাবে একে ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গণ্য করেন না অনেকেই।
প্রথাগত মোগল রীতি অনুসারে, রাজপরিবারের সদস্যদের ‘সম্মানজনক’ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো শ্বাসরোধের মাধ্যমে। গোলাম হোসেন সালিম তার ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’-এ নবাব-পরিবারের অনেক সদস্যের মতো আমিনা বেগমের মৃত্যুও অন্ধকারে ঢাকা। কিছু মুখরোচক গল্প শোনা যায়, কিন্তু সেগুলো নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি।
আমিনা বেগমের আরেক পুত্র ফজল কুলি খানের জন্মের বছরটি সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয় তিনি ১৭৩৫-৩৭ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে। ছোটবেলা থেকেই তাকে রাজকীয় রীতিনীতি ও প্রশাসনিক শিক্ষার মধ্যে বড় করা হয়েছিল। সিরাজের তুলনায় ফজল কুলি খান ছিলেন অনেক বেশি শান্ত, বিচক্ষণ ও সংযত। তিনি কখনো আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নিতেন না, বরং ধীরে বিবেচনা করেই কাজ করতেন, যা তাকে দরবারের প্রাজ্ঞদের কাছে বিশেষ সম্মাননীয় করে তুলেছিল। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সিরাজের স্থলে যদি তিনি নবাব হতেন, তাহলে হয়তো বাংলার ইতিহাসের ধারা ভিন্ন হতে পারত।
সিরাজের পতনের পর মীর জাফর ও মীরনের কূটচক্রের নজরে পড়েন ফজল কুলি খানও। তাকে মুর্শিদাবাদের রাজপ্রাসাদে বন্দি করে রাখা হয়। ছোট কক্ষে একাকী তাকে রাখা হয়েছিল। তার ওপর কঠিন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। কোনো আত্মীয় বা সমর্থকের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি ছিল না। খাদ্য-পানীয় ছিল অত্যন্ত সীমিত। এ পরিস্থিতিতে ফজল কুলির স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফজল কুলি খানের স্বাস্থ্য এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে তিনি আর চলাফেরা করতে পারতেন না। যদুনাথ সরকারের বর্ণনায়, ‘ফজল কুলিকে ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়, যেন তার মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হয়।’
এসসি হিলের বর্ণনায়, ‘ফজল কুলি খানকে ধীরে ধীরে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়েছিল।’
রাতের অন্ধকারে গোপনে তার দেহ দাফন করা হয়েছিল। কোনো জানাজা, কোনো স্মৃতিচিহ্ন, কিছুই রাখা হয়নি। প্রখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও গবেষক রোজি লিউয়েলিন-জোন্স লিখেছেন, ‘একজন সম্ভাবনাময় রাজপুত্রকে রাতের অন্ধকারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল, যেন কোনোদিন পৃথিবীতে তার অস্তিত্বই ছিলই না।’ (সূত্র: দ্য লাস্ট নবাব অব বেঙ্গল)
সিরাজের সর্বকনিষ্ঠ ভাই মির্জা মাহদীর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ছিলেন সাদাসিধে ও ধর্মপরায়ণ। রাজনীতির জটিল কূটচাল থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন, ব্যস্ত থাকতেন সাহিত্যচর্চায়। মির্জা মাহদী যে কবিতা লিখতেন তা প্রমাণিত। ঠিক কতটি কবিতা তিনি লিখেছিলেন তার নির্ভরযোগ্য সংখ্যা বা সংগ্রহ ইতিহাসে টিকে নেই। মাহদী ছিলেন রাজপ্রাসাদের নিষ্ঠুর রাজনীতির জগতে বেড়ে ওঠা শেষ নির্মল আত্মা।
কিশোর মাহদী ছিলেন সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতির শিকার। তাকে হত্যার জন্য ক্ষমার অজুহাতে ডেকে আনা হয়। এসসি হিল লেখেন, ‘মাহদীর মুখ থেকে একটি শব্দ বের হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। এ নির্মমতায় মানবতার সকল সীমা লঙ্ঘন করেছিল মীরন।’
মির্জা মাহদীর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা সামরিক প্রস্তুতির অভিযোগ ছিল না, তবু কেবল তার রক্তের কারণে তাকে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এসসি হিল উল্লেখ করেছেন, ‘যদি রক্তের সূত্রে সামান্যতম সম্ভাবনাও থেকে যায়, তবে সে সম্ভাবনাকেও নির্মূল করতে হবে—এই ছিল মীরনের দৃষ্টিভঙ্গি।’
তার মৃত্যুর পরে কোনো নিয়মনীতি মেনে দাফন করা হয়নি। গভীর রাতে তার মরদেহ গোপনে সমাহিত করা হয়েছিল।
ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের গোপন নথিপত্রে মির্জা মাহদীকে নিয়ে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য মন্তব্য পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছিল, ‘মির্জা মাহদী তার ভাইয়ের চেয়েও বিপজ্জনক। নবাব তলোয়ার দিয়ে লড়েন। কিন্তু এই মানুষটি এজন্য তার কলম ও যোগাযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।’ তাকে গুপ্তচর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল নথিগুলোয়। ফোর্ট উইলিয়াম রেকর্ডস থেকে স্পষ্ট যে মির্জা মাহদী ছিলেন ব্রিটিশদের জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক হুমকি। মির্জা মাহদীর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিল আঠারো শতকের বাংলার সবচেয়ে মূল্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। ফার্সি, আরবি ও সংস্কৃতে রচিত চার হাজারের বেশি দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি এ সংগ্রহে ছিল। ব্রিটিশরা ১৭৫৮ সালে এ গ্রন্থাগার পুড়িয়ে ফেলেছিল।
আমিনা বেগম, ফজল কুলি খান বা মির্জা মাহদী কোনো যুদ্ধ করেননি, কোনো ষড়যন্ত্র আঁটেননি; তবু রক্তের অপরাধে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। হয়তো ভাগীরথীর জল আজও কাঁপে সেসব রাতের স্মৃতিতে। আমিনা বেগমের শেষ কান্না, ইকরামের রুদ্ধপ্রাণ আর্তনাদ, মির্জা মাহদীর ছিঁড়ে যাওয়া কবিতার পাতা হয়তো প্রতিটি বর্ষায় ফিরে আসে রক্তের গন্ধ নিয়ে। কে জানে হয়তো মুর্শিদাবাদের প্রাসাদের দেয়ালে আজও লেগে আছে সে রাতের আর্দ্রতা। কখনো কখনো বৃষ্টির রাতে শোনা যায়—কার যেন রেশমের খসখস শব্দ, কার যেন বিষাদমাখা কোরান তিলাওয়াত। ইতিহাস লিখেছে বিজয়ীরা, কিন্তু ভাগীরথীর তীরে আজও লেখা হয় পরাজিতদের অশ্রু দিয়ে।
মাহফুজ রাহমান: সাংবাদিক, বণিক বার্তা








