বেগম লুৎফুন্নেসা ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী। সাহস ও আত্মসম্মানের মূর্ত প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। আলো ঝলমল রাজ্য থেকে ফকিরের বেশে মহানন্দার বুকে ভেসে বেড়ানো পর্যন্ত পুরোটা সময় তিনি ছিলেন সিরাজের পাশে। সিরাজের মৃত্যুর পরও তার স্মৃতি আঁকড়েই কাটিয়েছেন বাকি জীবন।
বাংলার নবাবি আমলের ইতিহাস নিয়ে লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন্’। বইয়ের লেখক গোলাম হোসেন বলছেন, ‘লুৎফা’ (লুৎফুন্নেসা) ছিলেন ‘জারিয়া’—বাঁদি।
কিংবদন্তি আছে, সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথম দর্শনেই লুৎফুন্নেসার রূপের প্রেমে পড়ে যান। তবে লুৎফুন্নেসা সহজে তাকে গ্রহণ করেননি; শর্ত দিয়েছিলেন বিয়ে করার। সিরাজ প্রথমে শর্ত মেনে নিতে না চাইলেও পরে নানা ঘটনাপ্রবাহে লুৎফার প্রতি গভীর প্রেম জন্মায় সিরাজের মনে। নবাব আলিবর্দি খানের স্ত্রীর কাছে লুৎফাকে বিয়ে করার অনুমতি চান তিনি। প্রথমে বেগম ও নবাব আপত্তি তুললেও পরে বুঝতে পারেন, সিরাজকে সংযত রাখতে লুৎফার প্রভাব প্রয়োজন।
ঐতিহাসিকরা অবশ্য বলেন লুৎফুন্নেসা সিরাজের ‘মুৎআ বেগম’ কিংবা উপপত্নী। কারণ সমসাময়িক কোনো দলিল-দস্তাবেজে তাদের বিয়ে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য পাওয়া যায় না। অন্যদিকে শাহি ঘরানার নিয়ম মেনে অল্প বয়সেই ওমদাতুন্নেসার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সিরাজের। মির্জা ইরাজ খাঁ ছিলেন সিরাজের শ্বশুর। যদিও নিজের দুঃসময়ে তাকে পাশে পাননি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।
সিরাজের মৃত্যুর পর কোম্পানি তার স্ত্রীকে ৫০০ টাকা পেনশন দিয়েছিল। নিজামত দলিলে বেগমের জায়গির আর এ পেনশনের উল্লেখ পাওয়া যাবে। পেনশন দেয়া হয়েছিল লুৎফুন্নেসাকেও। তবে মাত্র ১০০ টাকা। সে হিসেবে অনুমান করাই যায় যে দালিলিক কোনো প্রমাণ সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার বিয়ের নেই।
বেগম লুৎফুন্নেসার সঙ্গে সিরাজ-উদ-দৌলার কবে বিয়ে হয়েছিল সে সম্পর্কে শতভাগ সঠিক কোনো বর্ণনাও পাওয়া যায় না। তবে এ নারীই যে সিরাজের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন, সে প্রমাণের কোনো অভাব নেই।
সিরাজ-উদ-দৌলা ও লুৎফুন্নেসার উম্মে জোহরা নামের এক কন্যাসন্তান ছাড়া আর কোনো সন্তান ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ নেই। সিরাজের মৃত্যুর পর এ মেয়েকে নিয়ে জিঞ্জিরার দুর্গে লুৎফুন্নেসা বন্দি জীবনযাপন করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
আট বছর বন্দি জীবনযাপন করার পর সিরাজের পরিবারের নারীরা মুর্শিদাবাদে ফিরে যাওয়ার অনুমতি পান। বেগম লুৎফুন্নেসা তার একমাত্র সন্তান উম্মে জোহরাকে সঙ্গে নিয়ে শেষ জীবনে মুর্শিদাবাদেই বসবাস করেছেন।
সিরাজ-উদ-দৌলার কন্যা উম্মে জোহরার বিয়ে হয়েছিল তারই চাচাতো ভাই মুরাদ-উদ-দৌলার সঙ্গে। তবে শাহজাদা মুরাদ ও শাহজাদি উম্মে জোহরার বংশধরদের সম্বন্ধেও শতভাগ সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
পলাশী ট্র্যাজেডির ২৩৪ বছর পর আবদুল হাই শিকদারের লেখা ‘সিরাজউদ্দৌলা: মুর্শিদাবাদ’ বইয়ে সিরাজের একজন বংশধরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সে বইয়ের ৮৭-৮৮ পৃষ্ঠায় লেখক বাংলার তদানীন্তন গভর্নরকে লেখা আহসান মঞ্জিলের নবাব সলিমউল্লাহর এক চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। সে চিঠিতে পত্রবাহক সৈয়দ জাকি রেজা নামক সিরাজ-উদ-দৌলার এক বংশধরের জন্য চাকরির সুপারিশ করেছিলেন স্যার সলিমউল্লাহ।
তৎকালীন গভর্নর মি. সামানকে পাঠানো সে চিঠির শুরুতে লেখা ছিল—
‘পত্রবাহক মি. সৈয়দ রেজা জাকি নামক এই তরুণ ভদ্রলোকটিকে আপনার নিকট পরিচয় করিয়ে দিতে আমার আনন্দের অবধি নেই। আমি তার ভবিষ্যতের ব্যাপারে অতিশয় আগ্রহী এবং আপনি তার বিষয়টা সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করবেন, এই আগ্রহ নিয়ে তার বিষয়টা আপনার কাছে সুপারিশ করছি। এই তরুণ ভদ্রলোক (নবাব) সিরাজ-উদ-দৌলা ও সৈয়দ আহমেদ রেজা খানের সরাসরি বংশধর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য, বিশেষ করে প্রথম দিকে বাঙলায় কোম্পানির রাজস্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই (শেষোক্ত) ব্যক্তির অবদান সুবিদিত ও মূল্যবান...’
আবদুল হাই শিকদার আবার তার সে বইয়ে প্রকাশ করা চিঠিটি প্রসঙ্গে আবদুল হালিম রচিত ‘মুর্শিদাবাদ ও সিরাজ পরিবার’ নামের একটি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকেই বইয়ে সিরাজ-উদ-দৌলার বংশধরদের বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আবদুল হাই শিকদার।
স্যার সলিমউল্লাহর চিঠিতে উল্লেখিত সৈয়দ জাকি রেজা যে সৈয়দ রেজা খান মোজাফ্ফর জংয়ের ভাই সৈয়দ আহমদ খানের একজন অধস্তন বংশধর সে তথ্য পাওয়া গেছে সেখানেই।
আবার সৈয়দ রেজা খান সম্পর্কে ‘সিয়ার-ই, ৩য় খণ্ডে’ বলা হয়েছে, রেজা খানের বড় ভাই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক মোহাম্মদ হোসেন খান। তার ছেলে জাকি খানের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল রেজা খানের মেয়ের। খুব সম্ভবত এদেরই ছেলে ছিলেন নবাব সলিমউল্লাহর পত্রে উল্লেখিত সৈয়দ জাকি রেজার পূর্বপুরুষ। রেজা খানের এ নাতি সম্ভবত নানার নামই গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই সম্ভবত নবাব সলিমউল্লাহ তাকে সিরাজ-উদ-দৌলা ও সৈয়দ রেজা খানের সরাসরি বংশধর বলে অভিহিত করেছেন।
উম্মে জোহরা ও মুরাদ-উদ-দৌলার চার মেয়ে এবং একটি ছেলেসন্তান ছিল। সম্প্রতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বংশধারা সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে, তারা মূলত উম্মে জোহরা ও মুরাদ-উদ-দৌলা দম্পতির পুত্র মির্জা শশমির আলি খানের বংশপরম্পরা।
মির্জা শশমিরের ছেলে মির্জা লুৎফে আলি খান ১৮৩৩ সালে মারা যান। লুৎফে আলির মেয়ে ফাতিমা বেগমের সন্তান সৈয়দ আলি রেজা। সৈয়দ আলি রেজার সন্তান সৈয়দ জাকি রেজা। সৈয়দ জাকি রেজার কথাই চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন নবাব সলিমউল্লাহ।
সৈয়দ জাকি রেজার সাত সন্তানের একজন সৈয়দ রেজা আলি। তার সন্তান সৈয়দ গোলাম মোহাম্মদ ও সৈয়দ গোলাম মোস্তফা।
এছাড়া নিখিলনাথ রায় রচিত ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী’ নামক বইয়ে সিরাজের চার নাতনি তথা উম্মে জোহরার চার কন্যার উল্লেখ পাওয়া যায়—
‘লুৎফুন্নেসার জীবিতকালেই তাহার কন্যা উম্মে জোহরার মৃত্যু হয়। সেজন্য লুৎফুন্নেসার মৃত্যুর পর উম্মে জোহরার চার মেয়ে সরীফন্নেসা, অসামতন্নেসা, সাকিনা ও উম্মতুলা মেহদি বেগম খোশবাগ প্রভৃতির তত্ত্বাবধানের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন।’
বেগম লুৎফুন্নেসা ও তার মেয়ে উম্মে জোহরা ছিলেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জীবনের শেষ আশ্রয় এবং উত্তরাধিকারী। পলাশীর বিপর্যয়ের পরে সিরাজের পরিবার যে দুঃসহ জীবনযাপন করেছে, তা এক করুণ ইতিহাসের সাক্ষ্য। বন্দিত্ব, অবজ্ঞা ও অপমানের মধ্যেও লুৎফুন্নেসা তার সন্তানকে রক্ষা করে গেছেন, বাঁচিয়ে রেখেছেন সিরাজের রক্তধারা। ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম আজ অনেকটাই ম্লান হলেও উম্মে জোহরা ও মুরাদ-উদ-দৌলার বংশধরদের হাত ধরে সিরাজ-উদ-দৌলার উত্তরাধিকারী রক্তের ধারা প্রবাহিত হয়েছে বাংলায়ই।
তথ্যসূত্র: নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া (২০১৫)
শাকেরা তাসনীম ইরা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









