সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা অঙ্গুরির আরেকটি ভূমিকা নিশ্চিত করেছে যে, অঙ্গুরি মিলনের স্মারক, বিষধারক অঙ্গুরি হলে ওষ্ঠে ছোঁয়ানোই যথেষ্ট। অভিমানের খেয়া প্রেমিককে কোথায় যে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে!
যদি নির্বাসন দাও
আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে মরে যাব।
বিষণ্ন আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্তে নির্নিমেষ...
এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও
আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষপান করে যাব।
বহুদিন গা-ঢাকা দেয়া অজ্ঞাতবাসী ‘অঙ্গুরি’ ফিরে এসেছে শামসুর রাহমানের ঘরে। এত দিন খুব ভেবেছেন অঙ্গুরির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ঝাপ্টার কথা, বিস্মৃতি থেকে টেনে আনতে চেয়েছেন।
হে অঙ্গুরি, তোমার শরীরে লতাগুল্ম, বুনো ঘাস
গৃহত্যাগী যুবকের স্বেদ, ধুলো ইত্যাদির ঘ্রাণ
লেগে আছে, সবচেয়ে বেশি আছে ভালোবাসবার
স্বাদ ও ক্ষমতা যা সহজে মুমূর্ষুকে পারে প্রাণ-
শক্তি ধার দিতে আর লহমায় দূরের আকাশ
বুকে এনে স্বপ্ন দেখাতেও পারে ঘর বাঁধবার।
১৮৬৪-এর প্রতিবেদন: কলিকাতার সুবর্ণ বণিকদিগের মধ্যে যিনি দরিদ্র মধ্যে পরিগণিত, তিনিও পঞ্চাশ ভরি সুবর্ণের ন্যূনে সম্প্রদান অব্যাহতি পান না।
দীনহীন অভাজনের বেলায় অন্তত: পঞ্চাশ ভরি।
পঞ্চাশ ভরি মানে পঞ্চাশ তোলা। আশি তোলায় এক সের অর্থাত্ আধাসেরের চেয়ে কিছু বেশি। ধনী স্বর্ণবণিকের কন্যা কিংবা পুত্রবধূর তো স্বর্ণের ভারে মর মর অবস্থা। ঠাকুর বাড়িতে বউদের গায়ে অন্তত ছ-সাত সের স্বর্ণ।
ঠাকুরবাড়ির বউ প্রফুল্লময়ী দেবী বিয়েতে প্রচুর গহনা পেয়েছিলেন। ‘গলায়— চিক, ঝিলদানা, হাতে— চুড়ি, বালা, বাজুবন্ধ, কানে— মুক্তার গোচ্ছা, বীরবৌলি, কানবালা, মাথায়— জড়োয়া সিঁথি, পায়ে— গোড়ে, পায়জোড়, মল ছানলা, চুটকি। সবই ভারী ওজন প্রায় ছ সাত সের। এর উপর কোমরে দশ ভরির গোট পরার নিয়ম ছিল। গহনার ভারে কোনও রকমে বাঁকিয়া চুরিয়া চলিতাম, তাহাতে বাহিরের লোকেরা মনে করিত যে আমি গহনার জাঁকে গুমরে ওইরূপভাবে চলিতেছি।’
এই অলঙ্কারের তালিকায় অঙ্গুরি নেই।
কানবালা, চৌদানি, বাউটি, কজ্জ্বল, পইতে, ছঁদ, কাঠমালা, কোমরের সূর্যিহার, হীরার তাবিজ, বাজু, বালা, কণ্ঠী, মুক্তার সাত নহর আর দোনর নথ, ফুলঝুমকো, পিপুলপাত, মানতাসা, ঝাপটা, জশম, তাবিজ, পৈঁচৈ, কলগি, টিকলি, টায়রা, ইয়রিং, ব্রেসলেট, ব্রোচ, রিস্টলেট, নেকলেস, পেনডেন্ট, মুড়কি, মাদুলি, যবদানা, মরদানা, পলাকাটি, লিচুকাটা, কঙ্কণ, পিন খাড়ু এত কিছু কিন্তু আংটি নেই।
গগন ঠাকুর নিজের হাতের গয়নার নকশা এঁকে স্বর্ণকারকে দিয়েছেন বিয়েতে মেয়ের জন্য বানিয়ে দিতে হবে।
কনে হয়ে উঠে গয়নার গাছ।
আবারও প্রশ্ন আংটি কোথায়?
চিত্রা দেব তার গ্রন্থ ‘বিবাহ বাসরের কাব্যকথা’য় লিখেছেন:
ফুলশয্যার রাতে নববধূকে একটি গয়না দিতেই হয় বরকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেটা হয় আংটি। চিত্তরঞ্জন দাস বাসন্তী দেবীকে দিয়েছিলেন পনের টাকা দামের আংটি। বাসন্তীর বাবা দিয়েছিলেন মেয়েকে সাজিয়ে। গা ভরা গয়না থেকে জুড়ি গাড়ি পর্যন্ত। বাসন্তী সেসব গয়না কখনও পরেননি। কিন্তু স্বামীর দেওয়া আংটিটা তাঁর হাতে থাকত সবসময়।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের নাগিনী কন্যার কাহিনীতে নাও ঠাকুর নিজের কড়ে আঙুল থেকে অষ্টধাতুর আংটিটি খুলে পিঙলার হাতে দিয়ে বলেছিলেন: ‘নে। নাও ঠাকুরের হাতে আংটি। আমার থাকলে তোকে হীরের আংটি দিতাম। কামরুপে মা কামাখ্যার মন্দির শোধন করে এ আংটি পেয়েছিলাম আমি। এ আংটি হাতে রাখলে মনে মনে যা চাইবি তা-ই পাবি।’
মদনকুমার ও মধুমালার প্রণয়ে অঙ্গুরির দেখা মেলে। সাত সমুদ্র পেরিয়ে শত শত প্রহরী এড়িয়ে বিধাতার বর হয়ে মদনকুমার যখন মধুমালার কাছে পৌঁছে লজ্জাবনত তরুণী বলে: এ সেই নীলারসিক বিধাতা-পুরুষেরই ইঙ্গিত যে তুমি আমার বর হও।
মদনকুমার জবাব দেয়: তোমার এই অপরূপ রূপের মালা যার গলায় শোভা পাবে— তাকে বোধ হয় বিধাতা আজও সৃষ্টি করে উঠতে পারেনি।
তখন মধুমালা হাত বাড়িয়ে দেয়: তুমি কি তোমার নিজেকে কোনোদিন দেখেছ? দেখলে এ কথা বলতে না। এই নাও আমার অঙ্গুরি— তুমি নাও, তোমার অঙ্গুরি আমায় পরিয়ে দাও। এই নাও আমার একলব্যের রত্নহার— তুমি দাও তোমার এই পদ্মমণির মালা।
(উদ্ধৃত)
অমিত-লাবণ্য-কেতকী-শোভনলাল
আংটি নিয়ে খুব জমিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে তাঁর শেষের কবিতায়। অক্সফোর্ডে সাত বছর কাটিয়ে ভারতে ফিরে আসা ব্যারিস্টার অমিত রায়ের ‘অমিট রায়ে’ ভাবটা তখনো কাটেনি। লাবণ্যর সঙ্গে অমিতের বিয়েটা যখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র, বিলেতি কেটকি, দেশীয় কেতকীর আবির্ভাব ঘটে— সাত বছর আগে বয়স যখন তার আঠারো, সে আবির্ভূত হয়েছিল অমিতের কিংবা অমিত তার জীবনে।
‘সেদিন এই আংটি অমিত নিজের আঙ্গুল থেকে খুলে ওকে পরিয়ে দিয়েছিল। তখন ওরা দুজনই ছিল ইংল্যান্ডে। অক্সফোর্ডে একজন পাঞ্জাবী যুবক ছিল কেটির প্রণয়মুগ্ধ।
সেদিন আপসে অমিত সেই পাঞ্জাবীর সঙ্গে নদী বান খেলছিল। অমিতেরই হল জিত। জুন মাসের জ্যোত্স্নায় সমস্ত আকাশ যেন কথা বলে উঠেছিল মাঠে মাঠে ফুলের প্রচুর বৈচিত্র্যের ধরণী তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। সেই ক্ষণে অমিত কেটির হাতে আংটি পরিয়ে দিলে।’
সেই আংটি— কেতকীর জন্য লাবণ্যর কাছে পরাজয়ের চিহ্ন, তা খুলে অমিতের হাতে তুলে দিল। এদিকে লাবণ্যও অমিতকে জিজ্ঞেস করল, ‘একদিন একজনকে যে আংটি পরিয়েছিলে, আমাকে দিয়ে সে আংটি খোলালে কেন?’
অমিতের দেয়া আংটি নিজের আঙুল থেকে খুলে লাবণ্য অমিতকেই আবার পরিয়ে দিল, এই বলে, ‘...তোমার সঙ্গে আমার যে অন্তরের সম্বন্ধ তা নিয়ে তোমার লেশমাত্র দায় নেই। আমি রাগ করে বলছিনে, আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়েই বলছি, তুমি আমাকে আংটি দিয়ো না, কোনো চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই।
আমার প্রেম থাক নিরজন; বাইরের রেখা বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।’
শেষ পর্যন্ত অমিত ফিরে গেল কেতকীর কাছে। লাবণ্যের কাছে একদা উপেক্ষিত শোভনলাল লাবণ্যের আকাঙ্ক্ষায় জেগে উঠত। চিঠি পেল অমিত। ‘চিঠির একপাতে শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যর বিবাহের খবর। বিবাহ হবে ছ’মাস পরে, জ্যৈষ্ঠ মাসে রামগড় পর্বতের শিখরে। অপর পাতে:
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও
তারি রথ নিত্য উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে তারার স্পন্দন
চক্রে পিষ্টে আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন...

বাদশাহী আংটি ১
কথিত আছে বাদশাহ আকবর শিকারে গিয়ে সংকটে পড়েছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তায় সংকট থেকে রেহাই পান।
সন্তুষ্ট বাদশাহ তার আঙুল থেকে আংটি খুলে লোকটিকে দিয়ে বলেন, রাজধানীতে এলে তিনি যেন বাদশাহর সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু এই সাধারণ প্রজা তো রাজপ্রাসাদের প্রহরীদের কাছেই ভিড়তে পারবে না। বাদশাহ বললেন, আংটি দেখালেই তারা সিংহদ্বার খুলে দেবে। কিন্তু হলো উল্টো। প্রহরীরা অতি দীনহীন পোশাকের মানুষটিকে আংটি হাতে দেখে প্রথমে ভাবল, ব্যাটা নিশ্চয়ই চোর। বাদশাহী আংটি সামলাতে না পেরে ফেরত দিয়ে মহানুভব সাজতে এসেছে।
তার পর প্রহরীরা মনে করল, ব্যাটা আচ্ছা ফন্দিবাজ। আংটি ফিরিয়ে দিয়ে বড় কোনো দাও কোপ মারার তালে আছে। বাদশাহি এনাম একবার পেলে তাতে দু-তিন পুরুষ পায়ের ওপর পা তুলে খাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত প্রহরীরা এই শর্তে তাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে রাজি হলো, যাওয়ার সময় বাদশাহী এনামের অর্ধেক তাদের দিয়ে যাবে। বেচারার রাজি না হয়ে তো উপায় নেই।
তাকে বাদশাহ আকবরের দরবার শরিফে হাজির করা হলে তাকিয়ায় ঠেস দেয়া বাদশাকে কুর্নিশ করে তিনি পরিচয় দিলেন এবং বললেন তার নিজস্ব কোনো কাজ নেই, কেবল বাদশাহের হুকুম পালন করতেই এসেছেন।
সন্তুষ্ট বাদশাহ বললেন তোমার বুদ্ধিমত্তার কথা আমার মনে পড়েছে। এখন বলো, তুমি কী এনাম চাও।
আজ্ঞে, বাদশাহ নামদার আপনি দুনিয়া জাহানের বাদশাহ। আপনার কোতোয়ালকে হকুম করুন আমাকে প্রাণে না মেরে যেন চাবুকের একশটি ঘা এনাম বকশিশ করেন।
বাদশাহ অবাক হলেন। একশ ঘায়ের পর বেচারা তো মরেই যাবে। তা ছাড়া এমন এনাম তো ইহকালে কেউ চায়নি।
লোকটি মাথা নুইয়ে তাজিমের সঙ্গে বলল, তাতে পঞ্চাশ ঘা আমার পিঠে পড়বে, আর পঞ্চাশ ঘা আপনার দ্বাররক্ষক প্রহরীদের পিঠে। পঞ্চাশ ঘা মারার পরও আমি টিকে থাকব আলমপনা।
তার পর সে বাদশাহী আংটির কাহিনী ও প্রহরীদের দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা শোনাল।
বাদশাহ তার বুদ্ধিমত্তায় আবারো অবাক হলেন এবং বীরবল উপাধি দিয়ে তাকে উপদেষ্টা সভায় রেখে দিলেন।
বাদশাহী আংটি ২
এবার সত্যজিত্ রায়ের বাদশাহী আংটি
ফেলুদা কেবল গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছেন।
ওদিকে পুজোরও ছুটি হয়েছে। তোপসে বিহারীবাবু এদিকে ধীরুকাকা, শ্রীবাস্তব। সাব্যস্ত হলো উত্তর প্রদেশের লক্ষৌই হবে গন্তব্য। লক্ষৌতে সাগরও নেই, পাহাড়ও নেই। তবে হরিদ্বার লছমনঝুলওয়ালা, বড়া ইমামবাড়ার ভুলভুলাইয়া তো আছে। বয়স তখন তোপসের চৌদ্দ আর তার মাসতুতো দাদা ফেলুর সাতাশ।
ইমামবাড়ার ভুলভুলাইয়া হচ্ছে একটা গোলকধাঁধা, বাঙালিরা বলে ওটা খুলখুলিয়া। হীরু কাকা জানিয়ে দিলেন সে আমলে বেগমদের এখানে নিয়ে এসে নবাবরা লুকোচুরি খেলতেন।
বাদশাহী আংটির খবরটা এল শ্রীবাস্তবের কথা থেকে: হ্যাঁ— তবে আওরঙ্গজেব তখনো বাদশা বনেননি। গদিতে শাহজাহান। সমরখন্দ দখল করবেন বলে ফৌজ পাঠাচ্ছেন বারবার— আর বারবার ডিফিট হচ্ছে। একবার আওরঙ্গজেবের আন্ডারে ফৌজ গেল আওরঙ্গজেব মার খেলেন খুব। হয়তো মরেই যেতেনে। এক সেনাপতি সেভ করল। আওরঙ্গজেব নিজের হাতের আংটি খুলিয়া তাকে দিলেন।
সেই আংটি এত বছর পর গায়েব হয়ে গেল।
ফেলুদা ইমামবাড়া থেকে লছমনঝুলওয়ালা ছুটোছুটি করতে করতে শেষ পর্যন্ত তার অতি সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি খাটিয়ে চোর ধরলেন এবং উদ্ধার করলেন বাদশাহী আংটি। অন্যের মুখে ফেলুদার বাদশাহী আংটি উদ্ধারের গপ্পো শুনে মজা নেই। বইটাই পড়তে হবে।
আরব্য রজনীর আলাদিনের আংটি
বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় আঁকরগ্রন্থ হাজার এক রাত্রির গল্পে জীবন বাঁচাতে শেহেরজাদ একটার পর একটা গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। গল্প থেমে গেলে নির্ঘাত্ মৃত্যু।
৭৩১ তম রজনীতে শেহেরজাদ আলাদিনের গল্প শুরু করে। প্রয়াত এক দর্জির অকর্মণ্য পুত্রের ওপর সওয়ার হয় এক বুড়ো মুর জাদুকর। তাকে দিয়ে বুড়ো সেই বিস্ময়কর চেরাগটি উদ্ধার করবে।
বুড়ো নিজের আঙুল থেকে অঙ্গুরি খুলে তাকে দিয়ে বলল, ‘বেটা এক কাজ কর, অঙ্গুরিটি পরে নাও। এটি মন্ত্রপূত তোমাকে যাবতীয় বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। কোনো শয়তানের নজর পড়লেও তোমার অনিষ্ট হবে না। আর তোমার কলিজায় বল-ভরসা বাড়িয়ে দেবে।’
আলাদিনের কাহিনী সবার জানা। অঙ্গুরির শক্তিবলে চেরাগ উদ্ধার করে, তারপর চেরাগের অনুগত- দৈত্য একটার পর একটা বিস্ময়কর কাণ্ড করতে থাকে। আলাদিন শাহজাদীকে বিয়ে করে। চেরাগ হাতছাড়া হলে একসময় রাজপ্রাসাদসহ শাহজাদী উড়ে চলে যায় অন্যদেশে।
কিং সলোমনের আংটি কাহিনীও কম আকর্ষণীয় নয়। অবন ঠাকুরের লেখায় পৃত্থিরাজকে দেখা যায় তিনি তার আংটি বিলি করছেন। পিকাসোর ক্ষুব্ধ প্রণয়িনী ডোনা মার যখন তার নিজের সব অলঙ্কার সিইন নদীতে ছুড়ে ফেলেন শিল্পী পিকাসো নিজেই আংটি তৈরি করে ডোনাকে দিয়ে তার মান ভাঙান।
বিষাক্ত আংটি চুষে কি ঝাঁসির রানী আত্মহুতি দিয়েছেন? নাকি জহরব্রতে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ? মালিক মুহাম্মদ জায়সি সৃষ্ট পদ্মাবতী নারীত্ব রক্ষায় আত্মহুতি দিয়েছেন। কানি আঙুলে পরিধেয় একটি আংটি খননকারীরা পেয়েছেন, যার প্রকোষ্টে থাকত ভয়ঙ্কর বিষ। পানি, শরাব ও শরবতে ঢেলে শত্রু নিধনে মধ্যযুগের ইউরোপে ব্যবহূত হতো বিষকুণ্ড হীরার আংটি।
আংটি ছাড়া কি বিয়ে হয়?
হয় না। বিয়ে মানে তো শরীর ও মন দিয়ে অর্চনা। কিন্তু সেই পূজার সূত্রটি কী? একটি আংটি। ১৬৬২ সালে চার্চ অব ইংল্যান্ডের ‘বুক অব কমন প্রেয়ার’-এ মুদ্রিত বিয়ের মন্ত্র এখনো হুবহু এভাবেই উচ্চারিত হয়ে থাকে:
With this ring I thee wed
With my body I thee worship
and with all my worldly goods
I thee endow:
In the name of the Father and
of the son, and of the Holy Ghost, Amen
এটি প্রটেস্ট্যান্ট পাত্রপাত্রীর বেলায় আর ক্যাথেলিকের বেলায় রোমান চার্চের মন্ত্র:
‘(নারীর নাম) এই আংটি আমার ভালোবাসা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করো— পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মার নামে।’
আংটি বদল হচ্ছে সম্মতি দান, প্রতিশ্রুতি প্রদান। এক কেবল দু’চার বছর বহাল থাকার প্রতিশ্রুতি নয়— ‘যতক্ষণ না মৃত্যু আমাদের পৃথক করে’— সে পর্যন্ত বহাল।
ধরা যাক, মেয়েটির নাম ক্যাথরিন আর ছেলেটি এডওয়ার্ড। এবার পাত্র পাত্রীর আংটিপরা হাত ধরে বলছে:
I, Edward, take you Katherine to be my wife, I promise to be faithful to you, in good times and in bad times, in sickness and in health, to love you and to honor you all the days of my life
ক্যাথরিনও একই কথা এডওয়ার্ডকে শোনাচ্ছে।
প্রিস্ট তখন প্রার্থনা করেন আংটি যেন আশীর্বাদপুষ্ট হয়:
Bless, O Lord bless these rings
which we bless in your name
which you will give to each other
as the sign of your love and fidelity.
যাজকের এই প্রার্থনার পর চার্চে উপস্থিত সবাই বলে ওঠেন, আমেন।
তার পর নবদম্পতির ওপর আশীর্বাদ ও পুষ্পবৃষ্টি।
বিয়ের আংটির প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় ছয় হাজার বছর আগেকার ভূমধ্যসাগরীয় প্যাপিরাসে। সময় পেরিয়ে আংটির দুটি রূপ প্রকাশিত হয়: বাগদানের আংটি ও বিয়ের আংটি। এনগেজমেন্ট রিং ও ওয়েডিং রিং। আংটির জন্য অনামিকা আঙুল। একসময় অ্যানাটমি জ্ঞানের বিকাশের আগে, বিশ্বাস করা হতো যে বাম হাতের অনামিকার সঙ্গে সরাসরি হূদপিণ্ডের যোগাযোগ— ভালোবাসার শিরায় ভেনা অ্যামোরিসের মাধ্যমে। বাগদান আংটি স্বর্ণ ও হিরেরই হয়। আবার টিটেনিয়াম, সিলভার ও স্টেনলেস স্টিল দিয়েও তৈরি করা হয়। বিয়ের আংটিকে স্বর্ণ, হিরে, মণিমুক্তা, প্যালাডিয়াম, প্লাটিনাম, আর্জেন্টিয়াম, সিলভার এবং হালে সিলিকনও উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
কালিদাসের শকুন্তলায় আংটি উদ্ভাসিত হয়েছে, শেক্সপিয়ারের মার্চেন্ট অব ভ্যানিসেও তাই।
ব্যাসানিও যখন পোর্শিয়ার মন জয় করে নিল এবং স্ত্রী হিসেবে তাকে গ্রহণ করল, পোর্শিয়া তার আঙুলে পরিয়ে দিল আংটি এবং বলল, এই আংটির সঙ্গে তার যা কিছু আছে সর্বস্ব দিয়ে দিল ব্যাসানিওকে:
আমি নিজে এবং আমার যা কিছু আছে সব তোমাকে
তোমার হাতে তুলে দিলাম, এতদিন আমি ছিলাম
এই প্রাসাদের মালিক, ভৃত্যদের প্রভু
আমিই আমার সম্রাজ্ঞী, কিন্তু এখন থেকে
এই প্রাসাদ এই ভৃত্য এবং সেই একই আমি
সব আপনার, প্রভু আমার এই আংটির মাধ্যমে
আমি আপনাকেই দিয়েছি।
প্রভু আপনি যদি এই আংটি খোয়ান কিংবা কাউকে দিয়ে দেন, আপনার ভালোবাসার ধ্বংসাবশেষে আমাকে পাবেন। পোর্শিয়ার আংটি কাহিনীকে শেক্সপিয়ার আরো জটিল করে তুলেছেন যখন ব্যাসানিও বালথাসারের ছদ্মবেশ ধারণকারী পোর্শিয়াকে বালথাসার ভেবেই আংটি হস্তান্তর করেন।
আংটির ধ্রুপদ প্রাচীনত্ব রয়েছে। প্লেটোর রিপাবলিকে জাইনোসের আংটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জে জি ফ্রেজারের গোল্ডেন বাউ (খালিকুজ্জামান ইলিয়াস অনুবাদ করেছেন), জে আর আর টলকিনের লর্ড অব দ্য রিংস এমনকি হালের হ্যারি পটারেও জাদুর আংটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
সত্যজিত্ রায়ের বাদশাহী আংটি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আংটি রহস্য, আরব্য উপন্যাসের আলাদিনের আংটি তো রয়েছেই, ঘাসের ডগা দিয়ে বানানো আংটি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ও শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনীতে দুর্লভ হওয়ার কথা নয়।
আংটি নিয়ে চমত্কার গল্প লিখেছেন হেনরি ভ্যান ডাইক (দ্য ওয়েডিং রিং) এবং ন্যাদাইন গর্দিমার (দ্য ফাইন্ড), উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারের উপন্যাস ‘দ্য রোজ অ্যান্ড দ্য রিং’, জে আর আর টলকিনের ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘হবিট’ (যা থেকে নির্মিত হয়েছে লর্ড অব দ্য রিংস)। সুরস ষ্টা রিচার্ড ভাগনারের সুরে তৈরি হয়েছে ‘দ্য ভাগনার রিং’।
রিং থেকে সাফারিং সাইকেল
এই অংশটুকু নেহায়েতই কৌতুক। সিরিয়াসলি নেবেন না:
অপু কম বয়সে একটু বেশি রকম পেকে গিয়ে বাবার সঙ্গে বিয়েশাদি নিয়ে আলাপ জুড়ে দিয়েছে। এই পাকামো অসহ্য, উপায়ও নেই। অপু জিজ্ঞেস করল, বাবা তুমি কেমন করে বিয়ে করেছ?
বাবা বলল, আর দশটা পুরুষ মানুষ যেভাবে বিয়ে করে আমিও ঠিক তাই করেছি। তোমার মাকে দেখার পর যখন পছন্দ হলো, তার হাতে একটা এনগেজমেন্ট রিং পরিয়ে দিলাম।
অপু বলল, তারপর?
বাবা বলল, তোমার মায়ের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেল। ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান করলাম। হাজার মানুষের সামনে তোমার মাকে পরিয়ে দিলাম ওয়েডিং রিং।
তাহলে তুমি দিলে দুটো রিং?
হ্যাঁ, দু’টো
অপুর পাকামো তুঙ্গে। বলল, বাবা প্রেম নাকি অন্ধ?
বাবা ধমক দিল। বাজে কথা বন্ধ কর।
অপু বলল, না বললে জানব কেমন করে?
বাবা বলল, হ্যাঁ প্রেম অন্ধ, চোখ খোলা থাকলে প্রেম হয়, কখনো হয় না।
অপুর পরের প্রশ্ন, বাবা বিয়ে কি অন্ধ?
বাবা বলল, না, বিয়ে চোখ খুলে দেয়— আই ওপেনার।
অপু জিজ্ঞেস করল, বিয়ে করতে খরচ কত হয়?
বাবা বলল, আমি তো এখনো অ্যাকাউন্টস ক্লোজ করিনি খরচ করেই যাচ্ছি।
অপুর প্রশ্ন, বাবা নাস্তিক কারা?
বাবা বলল, যারা ঈশ্বর, স্বর্গ ও নরককে বিশ্বাস করে না।
বাবা তুমি কি নাস্তিক?
সম্ভবত।
অপু বলল, প্রশ্নই আসে না, বিবাহিত পুরুষ মানুষ নরকে বিশ্বাস করে।
অপু বলল, তুমি দিয়েছিলে এনগেজমেন্ট ও ওয়েডিং রিং। কিন্তু তুমি কি পেলে?
বাবা উদাস হয়ে বলল, সাফারিং।




