আইনে পড়া ছাত্র হাবীব আজাদ উন্নত ইউরোপের একটি শহরের ’ল কলেজে ‘সরকার ও অপরাধ’ বিষয়ে চার মাসের একটি কোর্স শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পর, বন্ধুদের আড্ডায় গলার স্বর গম্ভীর করে, যেন এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা জ্ঞানের সভ্যতায় না থাকলে মানুষের মূর্খতা বেড়ে যাবে, বলল: যে মানুষ অ্যাপেল বা পেয়ারা কামড়ে খায়, সে বর্বর। যে ছুরি দিয়ে কেটে খায়, সে সভ্য।’

বিদেশে যাওয়ার আগে হাবীব বলত, ‘আপেল’। ওর ‘অ্যাপেল’ শুনে বন্ধুরা কিছু বলেনি। একজন বন্ধু, নাম কবির, কোঁকড়ানো চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে চাঁদি চুলকিয়ে বলল, ‘মনে কর তুই যশোর যাচ্ছিস, আরিচা থেকে গোয়ালন্দের দিকে যেতে যমুনা পার হওয়ার সময় ফেরিতে পেয়ারা দেখে খেতে ইচ্ছে করল, কিনলি, তখন কামড়ে খাবি নাকি ছুরি বা দা খুঁজবি?’ হাবীব বলে, ‘আমার কাছে সবসময় ছুরি থাকে।’ বন্ধুরা তাদের আড্ডায় ওকে বলে, ‘ছুরি হাবীব’। কোনো কোনো বন্ধু ওর সঙ্গে চলাফেরার সময় জিজ্ঞেস করে, ‘পকেটের ছুরিটা বড় না ছোট?’

তরুণ আইনজীবী, বয়স তিরিশের কাছে, গায়ের রঙ শ্যামলা, চুলের সিঁথি ডানদিকে, ট্রাউজারের ব্যাক পকেটে কালো চিরুনি রাখে, কোথাও আয়না দেখলেই চুল আঁচড়ায়, প্রায় দুই ঘণ্টা লেগেছিল টাইয়ের বিভিন্ন নট বাঁধা শিখতে, হাবীবের প্রিয় শখ দেশ-বিদেশের ছুরি সংগ্রহ করা। ইউরোপ থেকে ফেরার সময় কয়েকটি ছুরি এনেছে। ছুরি-বিক্রির দোকানের অ্যান্টিক সেকশনে বিদেশবাসের চার মাসে কয়েকবার ঢু মারা নয়, সময় নিয়েই গিয়েছিল বিশেষ ছুরি দেখতে ও কিনতে। চারশ বছরের একটি ছুরি, আফ্রিকার কোনো এক রাজার, পছন্দও হয়েছিল কিন্তু অনেক দাম, তার এক বছরের আয়ের থেকেও অনেক বেশি, ফলে কিনতে পারেনি। তবে ছুরিটির ছবি স্মার্টফোনে তুলে বান্ধবী শাহনাজকে পাঠিয়েছিল। শাহনাজও একটি ছবি পাঠায়, বিষয়: কসাই মাংস কাটছে।

ছুরি সংগ্রহের বিশেষ প্রবণতা বা শখ হাবীবের চিন্তার মধ্যে শিকড় ছড়াতে থাকে কলেজে ছাত্র থাকাকালীন। কলেজ থেকে গিয়েছিল পিকনিকে। এক বন্ধুর কাছে ছিল বিশেষ ধরনের ছুরি। কী সেই বিশেষ ধরন? ছুরির হাতলের দুই পিঠে দুটি বোতাম, একটা বোতামে চাপ দিলে হাতলের ভেতর থেকে সাদাটে একটা ছুরি মুহূর্তে একদিকে বের হওয়ার সময় মিউজিক হয় এবং অন্য বোতামে চাপ দিলে আর্তনাদের স্বরসহ উল্টোদিকে বের হয় লাল রঙের ছুরি। মিউজিকসহ যে ছুরি বের হয়, তার দুই পিঠের এক পিঠে খোদাই করা এক চিত্র দেখা যায়। আর তা হলো, একটি হার্টের ছবিতে বিদ্ধ হয়ে আছে একটি ছুরি। অন্য পিঠে একটি ফুল। এবং যে ছুরি আর্তনাদ করে বের হয়, তার এক পিঠে চিত্রিত বাঘের দাঁতসদৃশ হাঁ মুখ এবং অন্য পিঠে নগ্ন নারী। এমত শিল্পকর্মের সঙ্গে বস্তুটি ধাতবশরীরে, প্রেম, আনন্দ, সৌন্দর্য, হিংস্রতা আর শোকের ধ্বনি একই সঙ্গে ধারণ করে আছে। অন্যভাবে আমরা বলতে পারি, অনেক মানুষ আছে, বিশেষ করে যারা বড় বড় ক্রিমিনাল এবং স্বৈরশাসক, তাদের মধ্যে একই সঙ্গে দেখা যায় ওইসব প্রবণতা। সময় ও প্রেক্ষিত বুঝে তারা জানে, কখন ধরতে হবে প্রেমিক বা প্রেমিকার রূপ এবং কখন হতে হবে হিংস্র।

পিকনিক শেষ। বাসে উঠতে যাবে। সন্ধ্যা আসন্ন। তখন ছুরিটা হাবীব একবার হাতে নিতে চায়। বন্ধু বলেছিল: ‘এই ছুরি সবার হাতে দেয়া যায় না।’ কারণও বলেছিল: ‘ছুরির ব্যবহার শিখতে সভ্য হতে হয়, অবশ্য বেশির ভাগ মানুষ ছুরি দিয়ে খুন করে।’ বন্ধু হয়তো কথাটা মজা করেই বলেছিল কিন্তু হাবীবের আত্মসম্মান মনে রাখার মতো আহত হয়। অপমানবোধ তার মুখে রোদ ফেলে। এবং তার তখন মনে হয়, আরো কায়দা ও কৌশলের ছুরি আমাকে কিনতে হবে।

উচ্চতা ৫ ফুট আট ইঞ্চি, গোঁফ আছে, দাড়ি নেই, হাবীবের সংগ্রহে বিভিন্ন দেশের অন্তত পঞ্চাশ রকম ছুরি আছে। কলেজের পাঠ শেষ হয়েছিল সতেরো বছর বয়সে। গত এগারো বছরে হাবীব ছুরি কিনেছে এবং কোনো কোনো বন্ধু বা আত্মীয়র বাসা থেকে সুন্দর ছুরি চুরিও করেছে। যারা তার এই বিশেষ হবির কথা জানে বা যারা তার ছুরি সংগ্রহ দেখেছে, বলেছে: ‘আরো অনেক রকম ছুরি আছে।’ কেউ কেউ বলেছে, ‘তোর ভেতর হত্যা করার একটা প্রবণতা আছে, ফলে তুই ছুরি সংগ্রহ করিস, আর করিস না।’ হাবীব কারো কথা শোনেনি। মনে হয়, মৃত্যু পর্যন্ত ছুরি সংগ্রহ করে যাবে। এই মনে হওয়া একসময় বিশ্বাসে পরিণত হয়।

হাবীব বিশ্বাস করে, প্রতিটি মানুষের কাছে, প্রতিটি বাড়িতে একটি বা প্রয়োজনে একাধিক ছুরি থাকা উচিত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের পরিচালকদের কাছে অটোমেটিক ছুরি, যার বোতামে টিপ দিলেই হয়ে যাবে উড়ন্ত ঘাতক, না থাকলে রাষ্ট্র যেকোনো সময় মহাবিপদে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা প্রধানমন্ত্রীকে জানানো দরকার। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছানোর রাস্তাটি সহজ নয় বলে হাবীব ভাবে, বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে কাগজে চিঠি লিখবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেকশনের কর্মীরা চিঠির গুরুত্ব না বোঝার কথা নয়।

কতটুকু দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হলে একদিকে বা দুই দিকেই ধারালো একটি বস্তুকে ছুরি বলা যায়? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর হাবীব জানে না। তবে ছুরির আকার অনেক বড় হলে সেটা চাপাতি বা তলোয়ার হতে পারে, এ তথ্য ওর জানা। এই দেশে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা, মৃত নেতাদের সৈনিকরা চাপাতি, দা, কুড়াল যখন তখন ব্যবহার করছে, ঝরাচ্ছে রক্ত। ওই জিনিসগুলোকে ছুরি বলা যাবে না। ছুরির একটি বিশেষ মর্যাদা আছে। গোশত কাটার ছুরি বা কোরবানির পশু কাটার ছুরিকে শিল্পমানসম্মত ছুরি বলতে নারাজ হাবীব। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মানুষরা অপরাধীদের কাছ থেকে মাঝে মধ্যেই উদ্ধার করছে চাপাতি, ছুরি, গুলি এবং বিভিন্ন রকম আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাংবাদিকদের দেখানোর জন্য টেবিলে সাদা কাপড় পেড়ে তার ওপর অস্ত্র ও গুলিগুলোকে ফুটে ওঠা ফুলের মতো করে কেন সাজায়? এ প্রশ্নে হাবীব নিজেই উত্তর দেয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা ওইভাবে সাজানোর কারণ হতে পারে, তারা কার্তুজ আর ছুরি প্রতিদিন পরিষ্কার করে রাখতে রাখতে বাগান করার সময় পায় না বলে ধাতব কার্তুজ আর ছুরি দিয়ে ফুলের আকার বানায়। সব রকম মানুষের মধ্যেই, সে খুনি, কেঁচো গবেষক, গোরখোদক বা অন্য যেকোনো পেশার হোক, কমবেশি সৌন্দর্য-বোধ আছে।

২.

বান্ধবী শারমিনকে ইউরোপ থেকে শেখা জ্ঞান হাবীব বলতেই, স্বাভাবিক স্বরে সে বলল: ‘আমার ঠোঁট কামড়াও কেন?’ তখন বিকাল, দুজনের সামনে কফি, ওরা এক দামি রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসে আছে। হাবীব উত্তর খোঁজে। দুজনের মাঝখানে শূন্যতার এক অদৃশ্য ছুরি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। শারমিন জানে, যথাযথ শব্দের খোঁজে তার প্রেমিকের মাথার কোষগুলো এখন ব্যস্ত। প্রশ্ন করা মানুষের ধৈর্য উত্তর পাওয়ার জন্য অস্থির হয়। শারমিনের তর্জনির চাড়া একটু বড়, লাল রঙের পালিশে দেখাচ্ছে রক্তমাখা দাঁতের মতো, সেই চাড়া দিয়ে হাবীবের হাতের ওপর হালকাভাবে আঁচড় দিয়ে বলল: কি কিছু বলো?’

‘আমরা সবাই জানি, বনে হাজার হাজার বছর ধরে বাস করা মানুষ ছুরি আবিষ্কারের আগে সবকিছু কামড়ে খেত। কামড়ের বিশেষ প্রবণতা মানুষ ধারণ করছে সেই বনচারী অবস্থা থেকে। মানুষের অবচেতনায় পূর্বপুরুষের কাজ বা অভ্যাসের ধারা থেকে যায়। ফলে যারা ফল কামড়ে খায়, তাদের মধ্যে বন্য ভাব বেশি, অবচেতনা থেকে মানুষ কখনো মুক্তি পাবে না, তুমি মনস্তত্ত্ববিদ ইয়ুঙের লেখা পড়ে দেখো। তো, ছুরি আবিষ্কারের পরে ছুরি দিয়ে বন্যপশু হত্যা করে সফল হওয়ার পর মানুষ ছুরিকে ভালোবাসতে শুরু করে। আচ্ছা বলো তো, আমি যখন কামড় দিই, তুমি হাসো কেন? প্রেম করার সময় নারী-পুরুষ বন্যতা ভালোবাসে। আদিমতা ছাড়া প্রাণের জন্ম হয় না।’

শারমিন হাতের ইশারায় কথা থামাতে বলে। বোধ হয়, আদিমতার কথায় মানুষ ভেতর থেকে একটু বেশি উত্তেজিত হয়। ফলে শেষের কথাগুলো একটু জোরে জোরে বলছিল হাবীব। পাশের টেবিলের একটি মেয়ের দিকে শাহনাজের চোখ পড়তেই বোঝে, মেয়েটি কান ফেলে হাবীবের কথা শুনছে। যদিও মেয়েটির মুখ তার সামনে বসে থাকা পুরুষটির দিকে।

নিচু স্বরে শারমিন বলে: তোমার কথা ঠিক আছে, তবে যারা কামড়ায় তারাই বর্বর, যারা ছুরি দিয়ে ফল কেটে খায় তারা সভ্য, এ রকম জেনারালাইজেশন ঠিক না। কাটাকাটি তো হত্যাই, তবে কেউ তা করে একটু সুন্দরভাবে, কেউ করে খুনির মতো। কে কীভাবে ছুরি বা দাঁত ব্যবহার করছে, তার ওপর নির্ভর করবে বর্বর বা সভ্য আচরণ, তুমি একদিন বলেছিলে, পুরুষের তলপেটের নিচে ঝুলন্ত লেজও কিন্তু একপ্রকার ছুরি।’

হাবীব হাসে, বলে, ‘কোথায় যেন পড়েছিলাম, বর্বরতা বা আদিমতা একটি বেসিক ইন্সটিং, এ নামের একটি ছবি আছে না? নায়িকা মিলিত হওয়ার তুঙ্গে যেয়ে তার পুরুষকে ছুরি দিয়ে খুন করে, বিখ্যাত ছবি, মানুষ কিন্তু নগ্ন হয়ে আনন্দ পায়, এক কবি বলেছেন না, ‘বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত’, আমরা তো দেখছি, দেখে দেখে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে, পশুদের নগ্ন মনে হয় না, পাখি পালকে তার নগ্নতা ঢেকে রাখে।’

শারমিন বিরক্ত হয়ে আঙুলের ইশারায় থামতে বলে। এসব পুরনো কথা শুনতে ওর ভালো লাগছিল না। বলে, ‘তোমার এই হবি বন্ধ করো। তোমার বন্ধুরা তোমাকে ছুরি হাবীব বলে। সেদিন আমার বান্ধবী দিলারা নিজে কানে শুনেছে, তোমার ওই বন্ধুকে ও চেনে, তোমার আর আমার কথা তোমার বন্ধুরা তখন বলছিল, ছুরি হাবীবের প্রেমিকা সুন্দরী, এ রকম নরম স্বভাবের একটি মেয়ে ছুরি সংগ্রহ করা ছেলের সঙ্গে কীভাবে প্রেম করে, কবে যেন শারমিনকে রাগের মাথায় ছুরি মারে। অন্য এক বন্ধু বলে, হয়তো শারমিনই ওর ছুরি নিয়ে হাবীবকে খুন করতে পারে। সঙ্গে থাকতে থাকতে সঙ্গদোষ তৈরি হয়।’

হাবীব একটি সুন্দর, হালকা নীল খামের দুই পাশেই ফুল ও পাখি আঁকা চিঠি শাহনাজের হাতে দিয়ে বলে, ‘বাসায় যেয়ে পড়ো।’ ‘হঠাত্ চিঠি দেয়ার কি হলো, আজকাল প্রেমিকাকে কেউ চিঠি লেখে নাকি? ফোনে, এসএমএস বা ফেসবুকে কথা তো হচ্ছেই, প্রায় প্রতিদিন দেখা হচ্ছে।’ শারমিনের প্রশ্নে হাবীব হেসে বলে, ‘বিশেষ প্রেমপত্র, এখানে খুলো না, বাসায় যেয়ে পড়বে।’

৩.

মাসে একবার বন্ধের দিনে ছাদে বসে হাবীব ছুরিগুলো পরিষ্কার করে। কীসব তেল মাখায়। রৌদ্রে রাখে। আকাশের নিচে, ছাদে শায়িত ছুরিগুলোর ছবি তোলে। কখনো ছুরিগুলোকে দাঁড় করিয়ে একটার উপর একটাকে হেলান দিয়ে করজোরের, কখনো গোলাকারভাবে দাঁড় করিয়ে এক তীক্ষমুখের স্থাপত্য বানায়। কখনো বানায় বৃত্তাকার ফুল। তার এই কর্মকীর্তির ছবি তোলে। ছুরিগুলো থেকে রৌদ্রের বিচ্ছুরণ দেয়ালে পড়ে। দেয়ালে ওইসব আলোকচ্ছটার ছবি হাবীব তোলে এবং তখন তার চোখ হাসে। ছবিগুলো শাহনাজের কাছে পাঠায়। ছবির নিচে লেখে: ছুরি থেকে বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটাও খুনোখুনিতে ব্যস্ত।

৪.

প্রিয়তমা,

তুমি জান, আমার শখ ছুরি সংগ্রহ করা। ছুরি সংগ্রহ করতে করতে আমার চিন্তায় একটি কথা দানা বাঁধতে থাকে আর তা হলো, প্রতিটি মানুষ তো কমবেশি বুদ্ধিমান, সে নিরক্ষর বা অক্ষরের ব্যবহারবিধি জানা লোক হোক বা না হোক, সে নিজের মধ্যে হত্যাপ্রবণতা লুকিয়ে রাখে। এবং এই হত্যা কখনো করে বুদ্ধির শিল্পিত আড়ালে। কখনো করে পশুর আচরণে। মানুষের পশুত্ব অন্যান্য পশুর পশুত্ব থেকে অনেক বেশি। একজন মানুষের সবকিছু পর্যাপ্ত থাকার পরও সে প্রতিশোধকামিতা থেকে মুক্ত নয়। আমার এ চিন্তার সঙ্গে ছুরি ব্যবহারের ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব মিলিয়ে ভবিষ্যতে গবেষণা করব।

তোমাকে আমি কোনোদিন ছুরি উপহার দিইনি। কারণ সাধারণ বিশ্বাস হচ্ছে, ছুরি উপহার দিলে গ্রহণকারীর সঙ্গে প্রদানকারীর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। গ্রিসের মানুষরা দুঃস্বপ্ন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য একসময় কালো হাতলের ছুরি বালিশের নিচে রাখত। আমি অবশ্য রাখি না। তবে সেদিন স্বপ্ন দেখলাম, আমার সব ছুরি বাক্স থেকে বের হয়ে উড়ে যাচ্ছে। আমেরিকার একটি বড় ছুরি মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে আটকে গেল। ইসরায়েলের একটি ছুরি ফিলিস্তিনের একটি শিশুর বুকের সামনে স্থির। আইএসএর একটি ছুরি বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের বোঁটা কাটছে। আমাদের ক’জন নেতার হাতে, আমলার হাতে দেখলাম ছুরি। স্বপ্নের মধ্যেই খুব ভয় পাই। জেগে উঠি। ঘামতে থাকি।

তুমি ছুরি-বিষয়ক আরো তথ্য জানতে গুগুলে সার্চ দিতে পারো। কোন কোন ছুরি কী কী কাজে ব্যবহার করতে হয় তার বর্ণনা পাবে। নামও আলাদা। মাংস কাটার, ফলের খোসা ছাড়ানোর, মাখনে ব্যবহার করার, পকেটে রাখার, শিকার করার ছুরির গঠন ও আকার আলাদা। জাপানের সামুরাই যোদ্ধাদের ছুরির ছবি তোমাকে পোস্ট করব। তোমার ভালো লাগবে। ডাইনিবিদ্যার জন্যও ছুরির ব্যবহার করা হয়।

তুমি কী চিঠি পড়ে আমার ওপর রাগ করছ? প্রেমিকাকে কেউ কখনো এ রকম চিঠি লেখে না। যার সঙ্গে তুমি আগামীদিনগুলো কাটাবে, তার কাজকর্মের একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে তোমার জানা দরকার বলেই এ চিঠি লিখলাম।

আমার চুম্বনে পশুর হিংস্রতা নেই। তীব্র ভালোবাসা আছে। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমার মধ্যে খুন করার প্রবণতা নেই।

শুধুই তোমার হবীব।

শারমিন চিঠিটা দুবার পড়ে। মেজাজে আগুন ধরে। একবার মনে হয়, কড়া ভাষায় একটা এসএমএস পাঠাবে। আবার মনে হয়, ফোন করে বলবে, তোমার সঙ্গে সম্পর্ক কনটিনিউ করব না। কী করবে? সে বিষয়ে একটি চিন্তাকে যৌক্তিক স্তরে আনতে না পেরে কেঁদে ফেলল। এবং চোখের পানি মুছতে মুছতেই চিঠিটা আট-দশবার ছিঁড়ল। ফেলে দিল রান্নাঘরে রাখা ময়লার পাত্রে।

৫.

‘এখন সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়’, সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে শারমিন অন্তত ১৫ বার হাবীবকে ফোন করে ধাতবযন্ত্রটি থেকে একই উত্তর শুনেছে। ওই ১ ঘণ্টার মধ্যে দুটো খুদেবার্তাও পাঠিয়েছে। ‘কী হলো তোমার?’ ‘প্লিজ! ফোন করো, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

গত রাতে হাবীবের মনে হয়েছিল চিঠি পড়ার পর তাকে শারমিন ফোন করবে। অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। অপেক্ষার বাঁধ ভাঙার অবস্থার সময় তার মনে হয়, শারমিনকে ফোন করা দরকার, তার চিঠি পড়ে কী মনে হলো শোনা দরকার, ফোন হাতেও নিয়েছিল দু’বার। শারমিনের নামের বদলে লেখা আছে লাভ। ‘লাভ’ খুলে শব্দটির দিকে তাকিয়ে কী মনে করে নিঃশব্দে হেসেছিল হাবীব। হাসিটার রেশ কেটে যাওয়ার পর সে আর ফোন করেনি। রাগ বা অভিমান করার অধিকার মানুষের আছে। প্রেমিক-প্রেমিকার ওই প্রবণতা একটু বেশি থাকে।

আরামবাগের একটি বহুতল ভবনের চিলেকোঠায় একা থাকে হাবীব আজাদ। ছাদে থাকলে নাকি আকাশের নীলকে অনুভব করা যায়, এ রকমই একটি ধারণা তার আছে। ভবনের দারোয়ান শারমিনকে চেনে। শারমিন খোঁজ নিল, হাবীব সকালে বের হয়েছে কি না। হাবীব ঘরেই আছে।

দু’বার বেল বাজার পর হাবীব দরজা খুলল। গা খালি। বুকে কিছু পশম আছে। সবুজ রঙের হাফ প্যান্ট পরা। শারমিন কোনো কথা না বলে ঘরে ঢোকে। হাবীবকে টেনে এনে বিছানায় বসায়। ‘কী হয়েছে তোমার?’ শারমিনের গলার রগ তাজা কৃমির মতো ফুলে উঠল। হাবীবের ঘুমের ঘোর তখনো কাটেনি। শারমিনের মুখের দিকে মলিন দৃষ্টিতে তাকায়। ‘কি, কথা বলছ না কেন?’ ‘কী বলব’? উত্তরের স্বর ফাঁপা। হঠাত্ শারমিন ওকে ধরে চুমু খায়। হাবীব উপভোগ করে এবং বলে: ‘এখন অন্য কিছু করা যাবে না।’

৬.

প্রায় জোর করেই হাবীবকে নেয়া হয়েছে শহরের বড় এক মনস্তত্ত্ববিদের কাছে। সকালে হাবীবের দুই বন্ধুকে বাসার ছাদের পশ্চিম কোনায় ফুটন্ত গাঁদা ফুলের টবের পাশে দাঁড়িয়ে শারমিন ফোন করেছিল। বলেছিল কিছু কথা। কথা বলা শেষ হলে শারমিন ছাদের চারদিকে তাকায়। নতুন টবে বিভিন্ন ফুলের গাছ। সকালের রৌদ্রে ফুলগুলো জীবন্ত। সাতদিন আগে শারমিন এখানে এসেছিল, তখন দেখেনি।

‘হাবীবের ঘরের চার দেয়ালে এবং সিলিংয়ে ঝোলানো আছে কয়েকটি ছুরি। কোনো কোনো ছুরির বাঁট দেয়ালের মধ্যে ঢোকানো। ওর ঘরের মাঝখানে ওর খাট। ঘরে ঢুকেই মনে হয়, যেকোনো সময় যেকোনো একটি ছুরি গোপনে এসে মাথা বুক বা পেটের মধ্যে ঢুকে পড়বে।’

‘প্রায় প্রতিটি ছুরির সুন্দর বাঁটের ওপর কিছু না কিছু লেখা আছে। যেমন— লোকরঞ্জনবাদ, আমেরিকা, আইএস, ইসরায়েল, সৌদিআরব, ঈশ্বর, ধর্মব্যবসা, আমলা, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, যৌনতা, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ইত্যাদি।’

‘ছাত্র বয়স থেকে ছুরি সংগ্রহ করে, প্রয়োজনে চুরিও করে।’

শারমিন আর হাবীরের বন্ধুদের কাছ থেকে কথাগুলো শুনে মনস্তত্ত্ববিদ কামাল মোস্তফা বললেন: ‘এবার আপনারা বাইরে যান, ওনার সঙ্গে আমি কথা বলব।’

ঘণ্টাখানেক পর শারমিন আর অন্য দুই বন্ধুকে কামাল মোস্তফা তাঁর চেম্বারে ডাকলেন। যখন ওরা চেম্বারে ঢুকছিল, শুনতে পায়, হাবীব আর মনস্তত্ত্ববিদের হাসির উচ্চ শব্দ।

৭.

‘জনাব হাবীব একজন সুস্থ মানুষ, কোনো ওষুধ লাগবে না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ওনাকে বেশির ভাগ মানুষ কমিউনিকেট করতে পারে না। প্রতিটি মানুষের হবি আলাদা হতে পারে, হাবীব সাহেব কখনো খুনি হতে পারবেন না।’ কথাগুলো মোস্তফা কামাল লিখেছেন চিকিত্সাপত্রে।