প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ

(ষোড়শ কিস্তি)

 

(দ্বিতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকবৃন্দ এবং জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ’

সুইডিশ ভাষার ক্রমবিকাশ (শেষাংশ)

বিকাশের পরবর্তী ধাপে সুইডিশ ধর্মসংস্কারকদের বিভিন্ন অনুবাদ-প্রচেষ্টা সুইডিশ ভাষাকে উপকৃত করেছিল। তাঁদের প্রথম কৃতিত্ব ছিল ‘নিউ টেস্টামেন্ট’ (১৫২৬)। যেখান থেকে গ্রন্থটি অনুবাদ করা হয়েছিল, সেটা সম্ভবত ইরাযমাসের রেনেসাঁর লাতিন সংস্করণ। ভাসা রাজবংশের রাজা প্রথম গুস্তাভ (আনুমানিক ১৪৯৫-১৫৬০) তাঁর দেশে একটি লুথারান স্টেট চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁর কারণেই সবচাইতে প্রাচীন সুইডিশ বাইবেল, বা তথাকথিত ‘ভাসা বাইবেল’টি রচিত হয়েছিল। ওলাভ ও লরেন্ট পেট্রি অনূদিত এ বাইবেলটি ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দে উপসালাতে মুদ্রিত হয়েছিল এবং মনে করা হয় এটি মূলত মার্টিন লুথারের সমসাময়িক হাই জার্মান অনুবাদটিকে ভিত্তি করেই অনূদিত হয়েছিল। এ ষোড়শ শতকীয় সংস্করণটি সুইডিশ স্টেট চার্চ কর্তৃক প্রামাণ্য বলে ঘোষিত বাইবেলের মর্যাদা লাভ করেছিল এবং ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে একটি নতুন দাপ্তরিক অনুবাদ সেটিকে প্রতিস্থাপিত করার আগ পর্যন্ত সেটি বহুল ব্যবহূত ছিল।

সুইডিশ সাহিত্যিক এবং ভাষাতাত্ত্বিক সংস্কৃতিতে এ ‘ভাসা বাইবেল’ একটি অনন্য অবস্থানের অধিকারী। প্রায় চার শতাব্দী ধরে প্রথাগত চার্চের এ মৌলিক, স্বীকারোক্তিমূলক দলিলটির নানা কথা মানুষের উদ্দেশে বেদি থেকে উচ্চারিত হয়েছে, স্বাক্ষর মানুষ তা পড়েছেন, সাহিত্যে এবং দৈনন্দিন জীবনে সেখান থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, সেটার কথা নানা স্থানে বলা হয়েছে। লিখিত ভাষার প্রমিতকরণের প্রধান উদাহরণ হিসেবেও সেটা স্বাভাবিকভাবে কাজ করেছে। ভাষার ইতিহাসের দিক থেকে এ অনুবাদটি সুইডিশ ভাষায় এ-যাবত্কালে লেখা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রচনা।

১৫৪১ সালের এ রচনাটিতে সুইডিশ ধর্মসংস্কারকরা শৈলীগত অনুপ্রেরণার বিভিন্ন ধাঁচের মধ্যে দক্ষভাবে ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। ভাষার বিভিন্ন স্তরে প্রাচীন সুইডিশ ভাডস্তেনা ঐতিহ্য সুুস্পষ্টভাবে ফুটে আছে, বিশেষ করে বানানতত্ত্ব আর শব্দার্থতত্ত্বের দিকগুলোয়। পদবিন্যাসের ক্ষেত্রে, অংশত এমনকি শব্দভাণ্ডারেও (lexicon), কিছু কিছু গঠন মূল জার্মান থেকে আগত। সমসাময়িক ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, বাইবেল অনুবাদকরা বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে এনেছিলেন। তার মানে, পরবর্তী শতকগুলোর স্বাভাবিকীকরণ প্রচেষ্টাগুলোকে তাঁরা আগেভাগেই তাঁদের মধ্যযুগীয় আশ্রমিক পূর্বসূরিদের চাইতে অনেক বেশি সুস্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছিলেন। বিশেষ করে, বাইবেলের বানান পদ্ধতির তুলনামূলক সামঞ্জস্যবিধান ছিল একটা যুগপ্রবর্তনকারী কৃতিত্ব এবং তা আধুনিক সুইডিশ বানানের ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। মোটের ওপর সুইডিশ ধর্মসংস্কার বাইবেল হচ্ছে, একটি অনুবাদকেন্দ্রিক সাফল্যের খুবই বাস্তব এক উদাহরণ, যা প্রত্যক্ষ এবং নিশ্চিতভাবে ভাষার বিকাশকে প্রভাবিত করেছিল।

অনুবাদ, তাহলে, ব্যতিক্রমধর্মী কোনো লেখা বা রচনা নয়, বরং টেক্সট নির্মাণের সাধারণ প্রক্রিয়ারই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনুবাদের মাধ্যমে লিখিত টেক্সট খুব স্বাভাবিকভাবে এবং ঘনঘনই নির্মিত হয়। সুইডিশ ভাষার ইতিহাসে এটি যে ভূমিকা পালন করেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুইডিশের মতো একটি ভাষা, যে ভাষা তুলনামূলকভাবে কম মানুষই ব্যবহার করে, এবং যে ভাষা এমন এক দেশে ব্যবহূত, যেটি সবসময়ই ইউরোপীয় সভ্যতার প্রান্তবর্তী— সেখানে অনুবাদ সম্ভবত অন্য যেকোনো স্থানের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বা কেন্দ্রীয়। মধ্যযুগে এবং আধুনিক কালের গোড়ার দিকে বেশির ভাগ সুইডিশ রচয়িতাই ছিলেন অনুবাদক, ‘লেখক’ নন। এবং সত্যি বলতে, এমনকি এখনো, সাহিত্যিক টেক্সট নির্মাণে মৌলিক লেখকদের কিন্তু সে রকম আধিপত্য নেই।

ক্যামেরুনের জিবায়া (Gbaya) ভাষার বিবর্তন (প্রথমাংশ):

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, অনুবাদ আফ্রিকাতে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় টেক্সটগুলোর অনুবাদ মহাদেশজুড়েই একটা দীর্ঘমেয়াদি ও বহুল প্রচলিত চর্চা হিসেবে বলবত্ রয়েছে। তারই একটা উদাহরণ হচ্ছে সেপ্টুয়াজিন্ট, যা কিনা মিসরে আনুমানিক ২৫০ থেকে ১৩০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের মধ্যে করা হিব্রু থেকে গ্রিক ভাষায় ধর্মীয় টেক্সটগুলোর একটি অনুবাদ। কপ্টিক ভাষাগুলোতে স্ক্রিপচারের অনুবাদ সেই তৃতীয় শতকেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং ‘গিয়ায’ নামে একটি ইথিওপীয় ভাষায় সেটা করা হয়েছিল চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই গিয়ায ও আরবি এ দুটো আফ্রিকান ভাষায় পূর্ণাঙ্গ বাইবেল পাওয়া যেত, অন্যদিকে কপ্টিক ভাষায় লভ্য ছিল নিউ টেস্টামেন্টের অনুবাদ। ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে ক্রমবর্ধমান খ্রিস্টীয় মিশনারী কর্মকাণ্ডের কারণে ‘বাইবেলের বিভিন্ন সংস্করণের একটি চলমান প্রবাহের’ সৃষ্টি হলো। অনূদিত বাইবেলের সবচাইতে প্রাচীনগুলো ছিল মালাগাসিতে, ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে এবং ইথিওপিয়ায়, ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে। এখন ১৭০টিরই বেশি আফ্রিকান ভাষায় বাইবেলের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ পাওয়া যায়।

{ইউনাইটেড বাইবেল সোসাইটির ভাষ্যমতে, বর্তমানে ৪৬৯টি ভাষায় সম্পূর্ণ বাইবেল পাওয়া যায় এবং তার মধ্যে, ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭৩টিই ছিল বিভিন্ন আফ্রিকান ভাষায়।}

আফ্রিকায় জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ এবং অনুবাদের বিবর্তন পরস্পর সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ক্যামেরুনের গোড়ার দিককার মিশনারী অনুবাদকদের কল্যাণে ইসুবু, দৌয়ালা, ইওন্দো, বুলু, ফুলফুলদে, মুঙ্গাকা এবং বামৌন নামের জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ সাধন করা হয়েছিল এবং সুসমাচারগুলো (গসপেল) ছড়িয়ে দেবার কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। আফ্রিকার আরো অনেক দেশেই এ ঘটনা ঘটেছে। অনুবাদকদের হাতে পরিপুষ্ট এবং তাঁদের সমর্থনপ্রাপ্ত জিবায়া ভাষাটির ঐতিহাসিক উত্স এবং বিবর্তনের কথা এ পর্বে তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে, জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্র (বর্তমানে যার নাম জিবায়া সাহিত্য কেন্দ্র) অনুবাদতত্ত্ব ও চর্চার বিবর্তনে, জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশে এবং জিবায়া সংস্কৃতি ও দর্শনের বিস্তার ও সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ক্যামেরুনস্থ মবোলার আমেরিকান ইভাঞ্জেলিকাল লুথারান মিশনারীদের হাতে ১৯২৩ সালে গড়া তথাকথিত ‘সুদান মিশন’ থেকেই কেন্দ্রটির সূত্রপাত। নগাউন্দেরেতে ১৯৭১ সালে কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল, পরে সেটি মেইগাঙ্গাতে স্থানান্তর হয়।

ক্যামেরুনের পুব এবং আদামাওয়া প্রদেশগুলোর কিছু অংশে, মধ্য আফ্রিকান রিপাবলিকে এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক রিপাবলিকে জিবায়া জনগোষ্ঠীর বাস। আফ্রিকার তিনটি দেশে অন্তত বিশ লাখ মানুষ জিবায়ার নানা উপভাষায় কথা বলে। জিবায়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ক্যামেরুনের অধিবাসী যারা, তারা শিকারি, যাযাবার, ও কৃষক। এখন যা মধ্য আফ্রিকান রিপাবলিক নামে পরিচিত; মূলত সেখান থেকেই তারা আদামাওয়া মালভূমিতে এবং ক্যামেরুনের পূর্বাঞ্চলে গিয়ে ডেরা বাঁধেন। আর সে-কারণেই ‘ফুলবে’ জনগোষ্ঠী তাদেরকে বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে সংস্কৃতিগত এবং ভাষাতত্ত্বগতভাবে প্রভাবিত করেছিল। উল্লেখ্য, ‘ফুলবে’ জনগোষ্ঠী ‘ফুলা’ বা ‘ফুলানি’ নামেও পরিচিত, আর তাদের ভাষার নাম ‘ফুলফুলদে’।

{‘ফুলবে’-রা ঊনবিংশ শতকে ওসমান দান ফোদিওর জিহাদি যোদ্ধা হিসেবে উত্তর ক্যামেরুনে প্রবেশ করে। মূলত তারা পশ্চিম আফ্রিকার একেবারে পশ্চিম অঞ্চলের অধিবাসী এবং তারা পশ্চিম আটলান্টিক অঞ্চলের ‘ফুলফুলদে’-ভাষী। দুটো সুস্পষ্ট ভাগে বিভক্ত তারা: নগরবাসী এবং গবাদিপশু পালনকারী। নিজেদের পশুপালের জন্য প্রয়োজনীয় তৃণভূমি ও পানীয়জলের খোঁজে তাদেরকে প্রায়ই স্থানান্তরে যেতে হয়। পশ্চিম আফ্রিকায় এক কোটি বিশ লাখেরও বেশি ফুলবে বাস করেন।}

জিবায়া ভাষাকে নাইজার-কঙ্গো ভাষা-পরিবারের একটি উপগোষ্ঠী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। জিবায়ার রয়েছে অসংখ্য উপভাষা: ইয়াইউউই, লে, মবোদোমো, গাঙ্গিনদা, দুকা, গায়মোনা, মবুসুকু, ইয়াঙ্গেলে ও বাঙ্গানদো। ‘জিবায়া মবেরে’, যে ভাষা-ভেদটি সুদূর মধ্য আফ্রিকান রিপাবলিকের কাছের মবেরে উপত্যকা ও তার আশপাশের লোকজনের ভাষা, সেটি ক্যামেরুনের পুব প্রদেশের রাজধানী বেরতোউয়া ও সন্নিহিত অঞ্চলে ব্যবহূত ‘জিবায়া বেরতোউয়া’ ভাষা থেকে আলাদা। মেইগাঙ্গায় অবস্থিত জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্র অবশ্য কেবল একটি উপভাষা— ‘ইয়াইউউই’— নিয়ে কাজ করে, কারণ এলাকাটির উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারী ইয়াইউউইরা জিবায়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানতম দল। তবে অনুবাদ এবং ইন্টারপ্রিটেশনের ক্ষেত্রে ‘ইয়াইউউই’ ভাষাটিই প্রধান হলেও— বিশেষ করে মেইগাঙ্গায় অবস্থিত জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্রে, জিবায়া সংস্কৃতি ও দর্শনের বিস্তারের সেটিই একমাত্র বাহন নয়। ঊনবিংশ শতকে যখন জিবায়া ভাষায় প্রথম লেখার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন থেকেই জিবায়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুবাদ এবং ইন্টারপ্রিটেশনের বাহন হিসেবে অন্যান্য উপভাষাও নানা মাত্রায় ক্রিয়াশীল রয়েছে।

ইউরোপীয়দের দুটো দল জিবায়া ভাষা, অনুবাদ এবং ইন্টারপ্রিটেশন কর্মকাণ্ড বিকাশের পথ দেখানোর কৃতিত্বের অধিকারী: প্রথমটি হচ্ছে, ইউরোপীয় জাতিবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক এবং অনুবাদকের দল, যাঁরা দেশীয় ভাষা এবং সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের জন্য এসেছিলেন; এবং দ্বিতীয়ত. তাঁদের দল যাঁরা ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকান রিপাবলিক এবং কঙ্গো গণতান্ত্রিক রিপাবলিকের জিবায়াদের মধ্যে খ্রিস্টীয় বিশ্বাস ছড়িয়ে দেবার জন্য এসেছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুদান মিশনের পাদ্রিগণ ১৯২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মবোলা এবং মেইগাঙ্গায় এসেছিলেন এবং জিবায়া ভাষার প্রচার ও প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

ক্রমশ...