প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাবনা জেলা। প্রকৃতির রূপ যেমন মনোমুগ্ধকর, তেমনি এখানে আছে অনেক ঐতিহাসিক, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা।
পাবনার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আছে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, শিলাইদহ ঘাট, ঈশ্বরদী রেল জংশন, গাজনার বিল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, চলনবিল, লালনশাহ্ সেতু, জোড়বাংলা মন্দির, ভাড়ারা শাহি মসজিদ, সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা, প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস, ইন্দিরা পট্টি, তাড়াস জমিদার ভবন, শিথলাই জমিদারবাড়ি বা এডরুক লিমিটেড, পাবনার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প, চাটমোহর শাহি মসজিদ, আজিম চৌধুরী জমিদারবাড়ি, তাঁতীবন্দ জমিদারবাড়ি, শ্রীশ্রী অনুকূলচন্দ্র ঠাকুরের আশ্রম, বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদি।
চাটমোহর শাহি মসজিদ
পাবনা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি উপজেলার নাম চাটমোহর। পাবনা জেলাটি দেশের মধ্যভাগে হওয়ার কারণে নদীমাতৃক বাংলাদেশের একসময় ৫৪টি নদী এ জেলার বক্ষ ভেদ করে প্রবাহিত হতো। তার বেশির ভাগই প্রবাহিত হতো চলনবিল অধ্যুষিত চাটমোহরের ভেতর দিয়ে। ফলে বজরা, স্টিমার ও নৌকা চলাচল করত এ উপজেলার ভেতর দিয়ে। সেই সুবাদে ১৫৮১ সালে নেতা সৈয়দ আবুল মোহাম্মদ মাসুম খান তার ছোট ভাই মোহাম্মদ বিন তুর্কি খানকে এ মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেন। মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল সম্রাট আকবরের শাসন আমলে। এজন্য মসজিদের স্থাপত্য শিল্পে সুলতানি আমলের স্থাপনার গঠনশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়। এ মসজিদে রয়েছে তিনটি বড় মাপের গম্বুজ। এটি ৪৫ ফিট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে রয়েছে সাড়ে ২২ ফিট। মসজিদটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নির্মিত হয়েছে জাফরি নামের ছোট ও পাতলা এক ধরনের ইট দ্বারা। তবে এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দেয়ালে প্রাচীন ভাস্কর্য ও বর্ণনাতীত সুন্দর অলংকরণ। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও পুরাতাত্ত্বিক মসজিদগুলোর একটি।
ভাড়ারা শাহি মসজিদ
১৭৫৭ সালে বাদশাহ শাহর রাজত্বকালে দৌলত খার পুত্র আসালত খা ভাড়ারার শাহি মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ যেটা শুধু গম্বুজ দ্বারা বেষ্টিত। অনেক পুরনো মসজিদ হলেও তার আকৃতি ও অবস্থান অনেক সুন্দর। পদ্মা নদীর পাড়ে ভাড়ারা শাহি মসজিদ অবস্থিত ছিল। কিন্তু নদীটি বর্তমানে মসজিদ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে চলে গেছে। মসজিদটির পূর্ব পাশে একটি মাজার রয়েছে। মাজারটি বেশ লম্বা প্রকৃতির। ফকিরশাহ মাজার হিসেবে পরিচিত। লোকশ্রুতি রয়েছে এ মসজিদ এক রাতে নির্মিত হয়েছিল। ভাড়ারা শাহি মসজিদ পুরনো আমলের ঐতিহ্য বহন করছে।
সমাজ শাহি মসজিদ
মসজিদ মুসলিম উম্মার ইবাদত ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বিশ্বব্যাপী শতাব্দীর পর শতাব্দী সংস্কার ছাড়াই রয়েছে অসংখ্য মসজিদ। এ রকমই পরিত্যক্ত একটি মসজিদ হলো পাবনার সমাজ শাহি মসজিদ। ১৫৫২ সালে সম্রাট শের শাহর ছেলে সুলতান সমির বা সেলিমসুরের আমলে বর্তমান পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলায় সমাজ গ্রামে অবস্থিত। ৪৭১ বছরের সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক সমাজ শাহি মসজিদটি করতোয়া নদীসংলগ্ন চাটমোহর থানা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। মসজিদটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পরে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ১৯৮০ সালে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে ১৯৪২ সালে ভারত সরকার এ ঐতিহাসিক মসজিদটি একবার পুনর্নির্মাণ করে। সে সময় মসজিদটির মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে পুনর্নির্মাণ কাজ করা হলেও মসজিদটি প্রাচীনত্ব অনেকাংশেই বিলুপ্ত করা হয়। ৩০ হাত উচ্চতার মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৪ হাত, প্রস্থে ১৫ হাত। ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। এর বারান্দায় কষ্টিপাথরের কালো দুটি স্তম্ভ প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যের নিদর্শন বহন করে। চারপাশে দেয়ালে রয়েছে সুন্দর নকশা, যা খুব সহজেই দর্শনার্থীর নজর কাড়ে। ১৯৪২ সালে মসজিদটি পুনর্নির্মাণের সময় মেহরাবের উপরের একটি ও দক্ষিণাংশের দেয়ালের একটি মোট দুটি শিলালিপি ভারতের জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়। যার একটিতে লেখা ছিল মসজিদ নির্মাণের তারিখ এবং অন্যটিতে পবিত্র কোরআন শরিফের সুরা মুল্ক খোদাই করা ছিল। সমাজ শাহি মসজিদ স্বমহিমায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থেকে ইসলাম ও সভ্যতার স্বর্ণযুগের মহিমা ঘোষণা করছে।
ইন্দিরা পট্টি
একসময় এটি পাবনার বিশিষ্ট ও দর্শনীয় স্থান হলেও বর্তমানে এখানে ইন্দিরার গন্ধও নেই। এখানে গড়ে উঠেছে ট্রাফিক আইল্যান্ড। তবে তবে ইন্দিরাটি মুছে গেলেও নামটি মুছে যায়নি। ব্রিটিশ আমলে এই ইন্দিরার পাশে বসেই কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন তার সতী গল্প। ১৯১৯ সালের দিকে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পাবনা এসেছিলেন তার বন্ধু হরিশ উকিলের বাড়িতে। যে বাড়িটি ছিল ইন্দিরা মোড় থেকে দেড়শ গজ উত্তরে। সে বাড়িটিও এখন এআর কর্নারে রূপান্তরিত হয়ে মার্কেটে পরিণত হয়েছে। এ ইন্দিরার পাশে বসেই তিনি লিখেছিলেন তার সতী শিরোনামের গল্প। ‘সতী’ গল্পের শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘হরিশ পাবনার একজন সম্ভ্রান্ত ভাল উকিল। কেবল ওকালতি হিসাবেই নয়, মানুষ হিসাবেও বটে।’ শরত্বাবুর অতীত স্মৃতিকে দেখতে অনেক দর্শনার্থী কিছু সময় স্থানটি অবলোকন করে থাকেন।
জোড়বাংলা মন্দির
পাবনার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো জোড়বাংলা মন্দির। এটা পাবনা শহরের রাঘবপুর গ্রামে অবস্থিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী জানা যায়, মন্দিরটি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়েছিল। এই মন্দির নির্মাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক তথ্যর শিলালিপি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় তথ্য ও উপাত্ত অনুসারে জানা যায়, মুর্শিদাবাদের নবাবের তহশিলদার ব্রজমোহন ক্রোরই এ মন্দিরের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। মন্দিরের দেয়ালের ধরন পোড়া মাটির ফলক এবং ফলকের উন্মোচিত অলংকরণগুলো অনেকটাই দিনাজপুরের কান্তজি মন্দিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মন্দিরের সামনের দিকে তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে এবং প্রধান রাস্তায় দুটি বিশাল আকারের স্তম্ভ বিদ্যমান। এর প্রবেশদ্বার দেখলেই বোঝা যায়, এটি রাজকীয় ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মন্দিরের প্রধান বেদিটি ইটের তৈরি এবং মন্দিরের পেছন ভাগে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মন্দিরটি সংরক্ষিত।
জমিদার আজিম চৌধুরী
পাবনার সুজানগর উপজেলার দুলাই গ্রামে প্রায় ২৫০ বছর আগে এই জমিদারবাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জমিদার আজিম উদ্দিন চৌধুরীর নামে হলেও বাড়ির মূল গোড়াপত্তন করেন তার পিতা জমিদার রহিম উদ্দিন চৌধুরী। তিনি এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। জমিদারবাড়িটি আজিম চৌধুরীর নামে হওয়ার কারণ হলো তিনি যখন পৈতৃক সূত্রে এই জমিদারি পান তখন তাদের জমিদারিত্ব বিস্তার লাভ করে। তিনি তার শাসন আমলে তিনটি নীলকুঠি স্থাপন করেন দুলাইতে। বাড়িটিতে একটি দোতলাবিশিষ্ট প্রাসাদসহ অনেক দরজা ও গেট রয়েছে। বাড়িটি চতুর্দিকে বিশাল দিঘি দ্বারা বেষ্টিত। বাড়ির ভেতরে একটি পুকুর ও একটি মসজিদ ছাড়াও অন্দর মহলে একটি পুকুর রয়েছে। যেখানে জমিদার পত্নীগণ গোসল করতেন। বাড়িটির নিরাপত্তার জন্য মূল ফটকে দুটি হাতি ও একটি কামান ছিল।
তাড়াস ভবন
দেশের প্রাচীনতম জেলা শহর হিসেবে পাবনার নাম সবার জানা। এ জেলায় ব্রিটিশ স্থাপনা থেকে শুরু করে রয়েছে জমিদারবাড়ি। জেলার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বনমালী রায় বাহাদুরের জমিদারবাড়ি তাড়াস ভবন। প্রাচীন গ্রিক স্থাপনাশৈলীতে তৈরি দুর্লভ এমন ভবন দেশে রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি।
আঠারো শতকে জমিদার বনওয়ারী লাল রায় এই তাড়াস ভবন নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এই ভবন বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সতেরো শতকের প্রথম দিকে বাসুদেব তালুকদার (তার অন্য নাম নারায়ণদেব চৌধুরী) বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াস উপজেলায় এ জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। বাসুদেব ঢাকার সুবাদার ইসলাম খাঁর অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী ছিলেন। সততা ও অনুগত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ইসলাম খাঁ তাকে তাড়াস মহাল বরাদ্দ দেন এবং তাকে রায় চৌধুরী উপাধিতে ভূষিত করেন।
বনওয়ারী লাল রায়কে ব্রিটিশ সরকার রায় বাহাদুর উপাধি দেয়। ১৮৮২ সালে তার মৃত্যুর পরে দত্তক ছেলে বনমালী রায় তাড়াশের পরবর্তী জমিদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আঠারো শতকের কোনো এক সময় তিনি এ ভবন নির্মাণ করান। পূর্বমুখী দ্বিতল এ ভবন প্রায় দেড় একর জায়গার ওপর নির্মিত। চারটি রোমান স্তম্ভের ওপরে আকর্ষণীয় বাড়িটি প্রাচীন কীর্তির সাক্ষ্য বহন করে। বাড়িটির চারপাশে সীমানা প্রাচীর দেয়া রয়েছে। সম্মুখে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, শেষ প্রান্তে প্রধান প্রবেশ ফটক। বিশাল আকৃতির অর্ধবৃত্তাকার ফটক চারটি স্তম্ভ দিয়ে নির্মিত। অপরূপ কারুকাজসমৃদ্ধ এ জমিদারবাড়ি নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় ১৬টি কক্ষ রয়েছে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য ভবনের মোট ৮০টি দরজা ও ৫৩টি জানালা রয়েছে। নিচতলা থেকে ওপর তলায় ওঠার জন্য ভবনের উত্তর দিকে একটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে। তাড়াস ভবনের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।
বনমালী রায় বাহাদুর বৃহত্তর পাবনা জেলার নানা স্থাপনা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মন্দির, দাতব্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি বিনোদন সব স্থাপনা নির্মাণে তিনি কাজ করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রায় বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। বনমালী রায়কে বৃহত্তর পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ জমিদার বলা হয়। পাবনার বনমালী ইনস্টিটিউট তারই অবদান।
অনুকূল ঠাকুর সৎসঙ্গ
পাবনা শহরের কাছাকাছি হেমায়েতপুর গ্রামে শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গটি (আশ্রম-মন্দির) অবস্থিত। অনুকূলচন্দ্রের পিতা ছিলেন হেমায়েতপুর গ্রামের শ্রী শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা ছিলেন শ্রী যুক্তা মনমোহিনী দেবী। সৎসঙ্গ আশ্রমটি আদিতে সাদামাটা বৈশিষ্ট্যে নির্মিত হয়েছিল। এতে কোনো উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়নি। তবে বর্গাকৃতির ভবনটির শীর্ষদেশ চারটি ত্রিভুজ আকৃতির ক্রমহ্রাসমান ছাদে আচ্ছাদিত ছিল। এ মন্দিরের শিখর ক্ষুদ্রাকৃতির কলস ফিনিয়ালে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। মন্দিরের পাশেই শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের পূজার ঘর অবস্থিত। এ ক্ষুদ্র ভবন গম্বুজবিশিষ্ট এবং ধনুক বক্র কার্নিশ ও গম্বুজের চারকোণে চারটি দৃষ্টিনন্দন শিখর ধারণ করে এক বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের অবতারণা করেছে।
শ্রীশ্রী অনুকূলচন্দ্রের পিতা-মাতার স্মৃতি রক্ষায় এ মন্দির নির্মিত। মন্দিরের সম্মুখ প্রাসাদে ‘স্মৃতি মন্দির’ কথাটি পাথরের ওপরে উত্কীর্ণ করা আছে। অনুকূলচন্দ্র ‘সৎসঙ্গ’ নামে একটি জনহিতকর সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। প্রকৃত অর্থে অনুকূল ঠাকুর মানবকল্যাণে তার জায়গা-জমি যথাসর্বস্ব উৎসর্গ করে গেছেন। স্মৃতিমন্দিরটি অন্যান্য ইমারতের তুলনায় এখনো সুসংরক্ষিত অবস্থায় আছে। সম্প্রতি নবনির্মিত সৎসঙ্গ-আশ্রম-মন্দির সমন্বয়ে গঠিত স্থাপত্য নিদর্শনটি সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এখানে শ্রীশ্রী অনুকূলচন্দ্রের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই সময় এখানে দেশ-বিদেশের প্রচুর লোক ও অতিথির সমাগম হয়। প্রায় লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয় বলে জানা যায়। ভারত থেকেও লোকজন এখানে আসেন।
চলনবিল
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হচ্ছে বিল চলনবিল। এই বিল উত্তরবঙ্গের নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার মধ্যে আবস্থিত। দেশের সর্ববৃহৎ এই বিলটি বিভিন্ন খাল দ্বারা সংযুক্ত অনেকগুলো ছোট ছোট বিলের সমষ্টি নিয়ে গঠিত। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে কোনো ঋতুতেই হতাশ করবে না এই বিল। শীতকালে অতিথি পাখির দেখা, বসন্তে চারদিকে সবুজ গ্রাম আর সুনীল আকাশের প্রতিবিম্ব, বর্ষায় আকাশ আর বিল যেন মিলেমিশে একাকার, শরতে বিলের পার ধরে ফোটে কাশবন। তবে ভরা বর্ষাতেই যৌবনপ্রাপ্ত ও অপরূপ সাজে সজ্জিত হয় চলনবিল। বর্ষায় একাকার হয়ে যায় প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা। তখন দর্শনার্থীর সংখ্যাও থাকে ভরপুর।
চলনবিল গঠনকারী ছোট ছোট বিল হলো পিপরুল, পূর্ব মধ্যনগর, লারোর, ডাঙাপাড়া, তাজপুর, নিয়ালা, চলন, মাঝগাঁও, ব্রিয়াশো, চোনমোহন, শাতাইল, খরদহ, দারিকুশি, কাজীপাড়া, গজনা, বড়বিল, সোনাপাতিলা, ঘুঘুদহ, কুরলিয়া, গুরকা, দিক্ষিবিল ও চিরল। চলনবিলের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে বেশ কয়েকটি নদী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো করতোয়া, আত্রাই, গুড়, বড়াল, মরা বড়াল, তুলসী, ভাদাই, চিকনাই, বরোনজা, তেলকুপি ইত্যাদি।
চলনবিল দেখার পর দেখে নিতে পারেন চলনবিল জাদুঘরটিও। গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর গ্রামে এ জাদুঘর। স্থানীয় শিক্ষক আব্দুল হামিদ ব্যক্তিগত চেষ্টায় নিজ বাড়িতে ১৯৭৮ সালে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এ সংগ্রহশালা। চলনবিলে প্রাপ্ত নানা নিদর্শন, মাছ ধরার সরঞ্জাম ছাড়াও এখানে আছে অনেক দুর্লভ সংগ্রহ। নাটোর থেকে বাসে গুরুদাসপুর উপজেলায় এসে সেখান থেকে নদী পার হয়ে রিকশায় আসা যাবে খুবজিপুর গ্রামের এ জাদুঘরে।
শফিউল আলম দুলাল: সাংবাদিক




