ঐতিহ্যসমৃদ্ধ নদীমাতৃক অঞ্চল পাবনা। এর মাটির গন্ধ, শ্যামল প্রকৃতি মনে রেখাঙ্কন করে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন পাবনার অনেক সাহিত্যিক।
মধ্যযুগে পাবনা জেলার যেসব কবির নাম মেলে, তার মধ্যে অদ্ভুত আচার্য বিশিষ্ট প্রতিভার অধিকারী। রামায়ণ অনুবাদক হিসেবে পরিচিত। কবির সময়কাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ষোড়শ শতকের কবি হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে এ জেলার কৃষ্ণ কিশোর রায়, শশধর রায় মধ্যযুগের মতো পাঁচালীর অনুকরণে কাব্য রচনা করেছেন। এ জেলার কবিদের মধ্যে সমকালীন সমাজচিত্রে প্রসন্নময়ী দেবী, স্বাদেশিকতায় রজনীকান্ত সেন, সনেটে প্রমথ চৌধুরী, আধ্যাত্মিকতায় অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তা, শোককাব্যে প্রিয়ম্বদা দেবী, জাতীয় জাগরণমূলক রচনায় ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ঐতিহ্যবিষয়ক রচনায় আবুল হাশেম ও পল্লী কবিতায় বন্দে আলী মিয়ার নাম স্মরণীয়।
সাম্প্রতিক কবিতার ক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, মণীন্দ্র রায়, বাণী রায়, চৌধুরী ওসমান, আব্দুল গনি হাজারী, মযহারুল ইসলাম, তরুণ সান্যাল, আনন্দ বাগচী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, জাহান আরা বেগম, ওমর আলী, মহাদেব সাহা, ফজল-এ-খোদা, মাকিদ হায়দার, জুলফিকার মতিন, দাউদ হায়দার, মজিদ মাহমুদ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে সংখ্যাগত প্রাচুর্য ও সৃষ্টির বিচিত্রায় সবচেয়ে প্রদীপ্ত নাম মণীন্দ্র রায়ের। যুগ যন্ত্রণা ও একই সঙ্গে রোমান্টিকতা তার রচনায় ফুটে উঠেছে। মণীন্দ্র রায় ১৯৬৯ সালে তার ‘মোহিনী আড়াল’ কাব্যের জন্য ‘সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেছেন।
ছড়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই বিশিষ্ট নাম শ্রী রামপ্রসাদ মৈত্র। কয়েকটি ছড়া তিনি লিখেছেন। তার রচিত দুটি ইতিহাস-আশ্রিত ছড়ায় ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকের বিচার ব্যবস্থার ব্যঙ্গচিত্র ফুটে উঠেছে। উপেন্দ্র কিশোর চৌধুরী সম্পাদিত বিখ্যাত শিশু সাময়িকী ‘সন্দেশ’-এ নিয়মিত লিখতেন প্রসন্নময়ী দেবী। রজনীকান্ত সেন বেশকিছু শিশুপাঠ্য কবিতা লিখেছেন।
লোকসাহিত্যে পাবনা জেলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। গ্রামবাসীদের মধ্যে বারমাস্যা, ধূয়া, জাগ গান, বিয়ের গান, মেয়েলি গান, প্রবাদ, প্রবচন, লোককাহিনী ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয়। বারমাস্যা এক প্রকার বিরহ গীতি। একটি উদাহরণ নিম্নরূপ:
‘ওরে
শোন শোন
বলছি পতি
যাইও
না বিদ্যাশে
পতি ছাইড়্যা
সতী নারী
ওরে কেমনে
থাইকপো বোইসে।’
ধূয়া গ্রাম্য কবিয়ালদের রচনা। এ গানে প্রশ্ন, উত্তর, হামদ ও নাত ইত্যাদি থাকে। যেমন-
‘মনরে
লা ইলাহা
পড়
মনরে
নেকপথে চল
বদ পথে
হয়ো না
খাড়া
আযাব
হবে বড়।’
যুগ যুগ ধরে এখানকার সাধারণ মানুষ এগুলোকে আকরে রেখে মহাকালের কড়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করে চলেছে। ‘যুবতি ক্যান কর মনভারী পাবনা থ্যাহা আন্ন্যা দেব ট্যাহা দামের মোটরী’—এসব গান একসময় নৌকার মাঝি ও গাড়িয়ালদের গলায় গলায় ফিরত। এসব গানের মাধ্যমে পল্লী জীবনের প্রাণস্পন্দন অনুভব করেছেন কবি সাহিত্যিকগণ।
লোকসংগীতেও পাবনার অবদান রয়েছে অনেক। বিয়ে বাদাইতে এসব লোকসংগীত গেয়ে নাচ-গানে মুখরিত করে থাকে তারা। যেমন ‘যা যা মা তোর জামাই বাড়ি আমি যাব না, সখ করে দিছিলা বিয়ে খাগা মা তুই জামাই ধুয়ে।’
গীতিকার হিসেবে দুর্গা নারায়ণ চৌধুরীকে পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। ‘সঙ্গীত কুসুমাঞ্জলি’ নামে তার একটি সংকলন রয়েছে। রজনীকান্ত সেন অনেক গান রচনা করেছেন। কবিতার চেয়ে গানের ক্ষেত্রেই তার প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত। তার রচিত ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’ ঔপনিবেশিক আমলে বিদেশী পণ্য বর্জনের সময় ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ জেলার অন্যান্য গীতিকারের রচিত গ্রন্থের মধ্যে প্রমথ নাথ রায় বিরচিত ‘গীতিকা’, উমাচরণ চৌধুরীর ‘গীতি কৌমুদী’, ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ‘প্রেমাঞ্জলি’, মোহিনী মোহন নন্দীর ‘সঙ্গীত কুসুমাঞ্জলি’, তারিণী শঙ্কর বাগচীর ‘সুরলীলা’ উল্লেখযোগ্য। বেশকিছু পল্লীগীতি লিখেছেন বিমল কৃষ্ণ মজুমদার, আবদুল গফুর ও কাজী নুরুল হোসেন। গজল রচনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নাম আবুল হাশেম। আধুনিক গানের ক্ষেত্রে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, শৈলেন রায়, আবু হায়াত মোহাম্মদ কামাল, ফজলে খোদা ও তরুণ রায়।
ছোটগল্পের ক্ষেত্রে কাহিনীর চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য ও রূপ সৃষ্টির দিক থেকে প্রমথ চৌধুরীর নাম প্রথমেই উচ্চার্য। তার গল্প সংগ্রহ ‘চার ইয়ারী কথা’, ‘নীল লোহিত’। সরলাবালা দাসী রচিত গল্প সংকলন ‘চিত্রপট’। এর একটি গল্প ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ লাভ করে। গিরিবালা দেবী ছোটগল্পে পান ‘নিরুপমা স্মৃতি পুরস্কার’। পরিমল গোস্বামীর বিশিষ্টতা সরস গল্পচিত্র রচনায়। তার গল্প সংকলন ‘ট্রামের সেই লোকটি’, ‘ব্যাক মার্কেট’। সরদার জয়েনউদ্দীন ও মযহারুল ইসলামের গল্পের উপজীব্য বিষয় গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের আলেখ্য। এক্ষেত্রে সরদার জয়েনউদ্দীনের বিশেষ সংযোজন ‘খরস্রোত’, ‘নয়ান ঢুলী’।
উপন্যাসের ক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় গৌরনাথ নিয়োগীর নাম। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বের হয় তার ‘আশা-মরীচিকা’। রোমান্টিক এ গ্রন্থ স্মরণীয়। উপাখ্যান না হলেও ইতিহাসগত কারণে তাৎপর্যবহ। এরপর বাংলা ১২৯৬ সনে বের হয় ‘অশোকা’। রচয়িতা প্রসন্নময়ী দেবী। নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন বেশ কয়েকটি আদর্শভিত্তিক উপন্যাস প্রণয়ন করেন। এর মধ্যে ‘আনোয়ারা’ বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সিরাজী রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘রায় নন্দিনী’। এ জেলার ঔপন্যাসিকদের বিশেষ স্মরণীয় সৃষ্টি রাধাচরণ চক্রবর্তীর ‘মৃগয়া’, হেমেন্দ্রলাল রায়ের ‘ঝড়ের দোলা’, বাণী রায়ের ‘প্রেম’, ‘কনে দেখা আলো’, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ‘কতো ছবি কতো গান’, সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘অনেক সূর্যের আশা’, স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিদ্যা বাউলির বৃত্তান্ত’, ‘আজ রাজা কাল ফকির’, মকবুলা মনজুরের ‘আর এক জীবন’ ও রশীদ হায়দার রচিত ‘খাঁচায়’।
নাটকের ক্ষেত্রে বামাচরণ মজুমদারের নাম স্মরণীয়। তার প্রণীত ‘জমিদার’ নাটকটি অনেকটা দর্পণ জাতীয় নাটক। কৌতুকনাট্য রচনায় পরিমল গোস্বামী বিশেষ সিদ্ধহস্ত। এক্ষেত্রে তার সংযোজন ‘ঘুঘু’, ‘দুষ্মন্তের বিচার’। আবুল হাশেম, বন্দে আলী মিয়া, মণীন্দ্র রায় মূলত নাট্যকার নন। তা সত্ত্বেও একাধিক নাটক এদের রয়েছে। এর মধ্যে আবুল হাশেমের ‘মাস্টার সাহেব’, বন্দে আলী মিয়ার ‘মসনদ’ ও মণীন্দ্র রায়ের ‘ভীষ্ম’ (কাব্যনাটক) ও ‘লখীন্দর’ ইত্যাদির নাম করা চলে।
ভ্রমণবিষয়ক প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা ‘আর্যবর্ত’ (১২৯৫)। লেখিকা প্রসন্নময়ী দেবী। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য সফরের ওপর গ্রন্থ লিখেছেন ইসমাইল হোসেন সিরাজী। সেগুলো হলো: ‘তুরস্ক ভ্রমণ’ ও ‘সিরিয়া ভ্রমণ’। পরিমল গোস্বামীর এক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ‘পথে পথে’। সাংস্কৃতিক মিশনের সদস্য হিসেবে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ আব্দুল আহাদ চীন সফরে যান। এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে ‘গণচীনে চব্বিশ দিন’। স্মৃতিকথামূলক রচনা এ জেলায় কিছু পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বিশিষ্ট নাম প্রসন্নময়ী দেবী। তার রচনা ‘পূর্বস্মৃতি’। এরপর আত্মকথা লিখেছেন প্রমথ চৌধুরী। এছাড়া বাংলা ১৩৩৩ সালের কার্তিক সংখ্যা ‘সবুজপত্রে’ তিনি ‘পাবনার কথা’ নামে একটি প্রবন্ধও লিখেছেন। পরিমল গোস্বামীর স্মৃতিচারণমূলক স্মরণীয় সৃষ্টি ‘পত্রস্মৃতি’ ও ‘আমি যাদের দেখেছি’। ময়েজউদ্দিন আহম্মদের ‘মহাসমরের পটচ্ছায়া’ তার অভিজ্ঞতাপূর্ণ জীবনের আলোকে সমৃদ্ধ ও সুখপাঠ্য। অতীত স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে বন্দে আলী মিয়ার রচনা ‘জীবনের দিনগুলি’ ও অশোক বাগচী রচিত গ্রন্থ ‘পিছু ডাকে’।
স্মৃতিকথার চেয়ে তুলনামূলকভাবে জীবনচরিত এ জেলায় রচিত হয়েছে অনেক। এ জাতীয় গ্রন্থের মধ্যে আলাউদ্দিন আহমদের ‘হযরত বড় পীর সাহেবের জীবনচরিত’, গৌরগোবিন্দ উপাধ্যায়ের ‘আচার্য কেশবচন্দ্র’, প্রসন্নময়ী দেবীর ‘তারা চরিত’, সরলাবালা দাসীর ‘ভগিনী নিবেদিতা’, যোগেন্দ্রলাল রায়ের ‘মোস্তফা কামাল পাশা’, মোহাম্মদ সানাউল্লার ‘হযরত ফাতেমা’, এম সেরাজুল হকের ‘সিরাজী চরিত’, আব্দুল জব্বার সিদ্দিকীর ‘মানুষের নবী’ ও বন্দে আলী মিয়ার ‘জীবনশিল্পী নজরুল’ স্মরণীয়।
অনুবাদের ক্ষেত্রেও এ জেলার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রসন্নময়ী দেবীর ‘বনলতা’ কাব্যের কয়েকটি কবিতা ইংরেজি থেকে অনূদিত। কুমুদনাথ চৌধুরী রচিত ‘Sports
In Jheels And Jungles’ অনুবাদ করেছেন প্রিয়ংবদা দেবী। তার অনূদিত ‘ঝিলে জঙ্গলে শিকার’ সবুজপত্রের কয়েকটি সংখ্যায় বের হয়। শেকসপিয়ারের ‘The Comedy of Errors’ অবলম্বনে হাবিবুর রহমান অনুবাদ করেছেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’। পরিমল গোস্বামী অনূদিত অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘সুখের সন্ধানে’ (মূল: বার্ট্রান্ড রাসেল)। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন রুমীর ‘মসনবী শরীফের’ আংশিক অনুবাদ করেছেন। বাণী রায়ের ‘জুপিটার’ কাব্যের কয়েকটি কবিতা ইংরেজি থেকে অনূদিত গদ্যরচনা ‘মোনালিসা’। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত এপুলিয়াসের ‘Golden
Ass’ অবলম্বনে আবদুল গনি হাজারী অনুবাদ করেছেন ‘স্বর্ণ গর্দভ’। এক্ষেত্রে তার আরেক উল্লেখযোগ্য প্রয়াস ‘মনঃসমীক্ষা’ (মূল ফ্রয়েড)। আর্থার মিলার রচিত ‘Death Of
a Salesman’ অবলম্বনে ফতেহ লোহানীর রচনা ‘একটি সামান্য মৃত্যু’ এবং ইউজিন ও নীলের নাটকের অনুবাদ ‘বিলাপে বিলীন’। মুহম্মদ শামসুল হকের মূল গ্রন্থ অবলম্বনে ‘শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন ড. আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন।
শিশুসাহিত্যেও পাবনা জেলার বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এ জেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশুসাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে। এর মধ্যে প্রসন্নময়ী দেবী, অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্তা, প্রিয়ম্বদা দেবী, হেমেন্দ্রলাল রায়, মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, মোহাম্মদ আবিদ আলী, বন্দে আলী মিয়া ও কাজী গোলাম আকবর প্রমুখের নাম করা চলে। শিশুসাহিত্যে মো. আকবর আলী, শেখ আবদুল হাকিম, শাহ্ ফজলুর রহমান, সরদার জয়েনউদ্দীন ও ড. আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিনের দানও প্রসঙ্গত স্মর্তব্য। এর মধ্যে সংখ্যাগত দিক থেকে বন্দে আলী মিয়ার বইয়ের সংখ্যা পর্যাপ্ত। এক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬২ সালে তিনি ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ লাভ করেছেন।
প্রবন্ধের ক্ষেত্রে পাবনা জেলার অবদান ব্যাপক। প্রথমে সাহিত্য সমালোচনা ও গবেষণামূলক প্রবন্ধের কথা আলোচনা করা যেতে পারে। এতে প্রমথ চৌধুরী, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, ড. মযহারুল ইসলাম, ড. গোলাম সাকলায়েন, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ড. মুহম্মদ আব্দুল খালেক, মনোয়ার হোসেন জাহেদী, ড. এম আব্দুল আলীম, ড. মো. হাবিবুল্লাহ প্রমুখের নাম স্মরণীয়। বাংলা গদ্যের বিবর্তনে ও প্রবন্ধের সাহিত্যের ধারায় প্রমথ চৌধুরীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রবন্ধ সাহিত্যে তার অনবদ্য অবদান ‘বীরবলের হালখাতা’, ‘নানাকথা’, ‘নানাচর্চা’। বাগ বৈদগ্ধ্য তার রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য প্রাবন্ধিকের মধ্যে ড. মযহারুল ইসলাম লোকসাহিত্যের ওপর বিশেষ গবেষণা করেছেন আর আধুনিক সাহিত্যের ওপর গবেষণায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। ড. আবু হেনা রচিত গবেষণা নিবন্ধ The
Bengali press and literary writings, ১৮১৮-১৮৩১
ও প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘শিল্পীর রূপান্তর’-এ মনস্বিতার পরিচয় মেলে। লোকসাহিত্যের ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ড. মুহম্মদ আবদুল খালেক ও ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল।
দার্শনিক প্রবন্ধ রচনায় সবিশেষ খ্যাত শশধর রায়, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ্ ও রফিউদ্দিন প্রমুখ। এক্ষেত্রে স্মরণীয় প্রয়াস মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ‘মানুষের ধর্ম’। ইতিহাসবিষয়ক রচনায় রাধারমণ সাহা, তারিনী চরণ চৌধুরী, বঙ্কিমচন্দ্র রায়, মির্জা আবু ছাঈদ, মোক্তার আহম্মদ সিদ্দিকী বিশিষ্টতার দাবিদার।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গেও পাবনা জেলা বিশেষভাবে জড়িত। করতোয়ার তীরে শাহজাদপুর কুঠিবাড়িতে কেটেছে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য প্রহর। তার রচনায় করতোয়া, ইছামতী, পদ্মা ও যমুনার চিত্র বিশেষভাবে মেলে। এখানে অবস্থানকালে অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প ও চিঠিপত্র লিখেছেন। পাবনায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার এসেছেন। ‘পাবনায় বাড়ি হবে, গাড়ি গাড়ি ইট কিনি’—এ রকম ইচ্ছাও পোষণ করেছেন কবিতায়। পাবনায় অবস্থানকালে ঠাকুর এস্টেটের আইন উপদেষ্টা শ্রী তারকানাথ অধিকারীর কাছে এক সন্ধ্যায় সিঙ্গা শ্মশানের একটি বাস্তব ঘটনা শোনেন। এর সঙ্গে সামান্য কল্পনা মিশিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘জীবিত ও মৃত’ গল্প, যে গল্পে ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই’। পাবনা জেলার সাহিত্য সাধনার সঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামও সম্পৃক্ত। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কবি নজরুল। পাবনায় অবস্থানকালে কয়েকটি কবিতাও তিনি লিখেছেন।
সাহিত্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পাবনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বনমালী রঙ্গমঞ্চকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নাট্য আন্দোলন। উপমহাদেশের অনেক প্রখ্যাত অভিনেতা এ মঞ্চে অভিনয় করেছেন। এ মঞ্চে যারা অভিনয় করেছেন তাদের মধ্যে সুচিত্রা সেন উল্লেখযোগ্য।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান: প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য গবেষক, বিভাগীয় প্রধান (বাংলা), সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা





