দক্ষিণে প্রমত্তা পদ্মা নদী। পূর্বে যমুনা। মাঝখানে ছোট-বড় বহু নদী, বিল ও খাল পরিবেষ্টিত অবস্থায় বিদ্যমান ভূখণ্ডটি। পাবনা নামেই তা সবার কাছে পরিচিত। রাজশাহী বিভাগের দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি জেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, পাবনা জেলার উত্তরে নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে পদ্মা নদী, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া জেলা, পূর্বে মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ জেলা ও যমুনা নদী এবং পশ্চিমে নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলা অবস্থিত। এর আয়তন ২ হাজার ৩৭১ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুসারে, পাবনা জেলার অধীনে নয়টি উপজেলা, নয়টি পৌরসভা, ৭৩টি ইউনিয়ন, ১ হাজার ১৮৭টি মৌজা ও ১ হাজার ৫৬২টি গ্রাম আছে। উপজেলাগুলো হলো আটঘরিয়া, ঈশ্বরদী, চাটমোহর, পাবনা সদর, ফরিদপুর, বেড়া, ভাঙ্গুরা, সাঁথিয়া ও সুজানগর। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১ হাজার ৬২। শিক্ষার হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ রচয়িতা রাধারমণ সাহার মতে, মহাভারতীয় যুগে বর্তমান পাবনা জেলা বঙ্গ ও পুণ্ড্রের অন্তর্গত ছিল। তারপর বৌদ্ধ যুগে এ জেলা পৌণ্ড্রবর্ধন বিভাগে ছিল। পাল ও সেন আমলে জেলাটি বরেন্দ্রভূমির অধীন হয়। মুসলমান আমলে বঙ্গদেশ বা সুবা বাংলা সরকার, পরগনা ইত্যাদিতে বিভক্ত হয়। শের শাহের শাসনামলে এ জেলার অধিকাংশ ভূমি সরকার সোনাবাজুদিগরের অধীন ছিল বলে অনুমান করা হয়। আবুল ফজল রচিত ‘আইন-ই-আকবরি’ বইয়ের তথ্য অনুসারে, রাজা টোডরমলের সময় পাবনা জেলা সরকার বাজুহায় (বড়বাজু, সোনাবাজু, প্রতাপবাজু, বাজুচপ্প, বাজুরস, নাজিরপুর প্রভৃতি), সরকার জান্নাতাবাদ (মালদহের কাছ থেকে গঙ্গার পূর্ব-উত্তর প্রদেশস্থ ভূভাগ) ও সরকার বারবকাবাদ (গঙ্গা বা পদ্মার উভয় তীরস্থ ভূভাগ) প্রভৃতি অঞ্চলের অধীন থাকার সম্ভাবনা রাধারমণ সাহা তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। মুর্শিদ কুলি খাঁর নবাবি আমলে ও শাহ সুজার রাজত্বকালে বঙ্গে জমিদারি প্রথা প্রবর্তিত হয়। সে সময় সম্পূর্ণ পাবনা জেলা রাজশাহী জমিদারির অধীন ভাতুরিয়া পরগনার অন্তর্ভুক্ত হয়। ইংরেজ আমলে তা রাজশাহী বিভাগের অধীনে চলে আসে।
পাবনা নামের উৎপত্তির দিকে একটু চোখ ফেরানো যাক। রাধারমণ সাহা আমাদের জানান, ‘বর্তমান পাবনা জেলা পৌণ্ড্ররাজ্য বা বরেন্দ্রভূমির অন্তর্গত ছিল। অনেকের মতে, পৌণ্ড্ররাজ্য বা পুণ্ড্রদেশ হইতে পাবনা জেলার নামকরণ হইয়াছে। সরকার বাহাদুর নিযুক্ত প্রত্নতত্ত্ববিদ কানিংহাম সাহেব বলেন যে পুণ্ড্ররাজ্য বা পৌণ্ড্রবর্ধন বিভাগ হইতে পাবনা নামের উৎপত্তি হইয়াছে।’ বহু আগে থেকে পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে বরেন্দ্র ব্রাহ্মণদের বসবাস। তাদের কিছু তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। মাধাইনগর থেকে লক্ষ্মণ সেনের বেশকিছু তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব তাম্রশাসনের বিবরণ থেকে ধারণা করা হয় যে বর্তমান পাবনা জেলা প্রাচীন পৌণ্ড্রবর্ধনের অন্তর্গত বরেন্দ্রভূমির অন্তর্গত ছিল। এর ভিত্তিতে রাধারমণ সাহা লেখেন, ‘এমতাবস্থায় পৌণ্ড্রবর্ধন ভূভাগ বা পৌণ্ড্ররাজ্যের নামানুসারে আধুনিক পাবনা জেলার নামোৎপত্তি একেবারে অমূলক বা অযৌক্তিক বলিয়া বোধ হয় না।’ অনেকে আবার এর বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, বগুড়া জেলা পৌণ্ড্রদের অধিকারে ছিল। তখন পাবনা জেলার অধিকাংশ স্থান পানির নিচে ছিল। জেমস রেনেলের মানচিত্রে তা স্পষ্ট। পাবনা বলে কোনো স্থান কোনো কারণে বিখ্যাত ছিল না। পৌণ্ড্রবর্ধন থেকে পাবনা নামের উৎপত্তির বিরোধিতাকারীদের বক্তব্য হলো, ‘রাজা টোডরমল যে সময়ে বাংলা দেশকে সরকার, চাকলা প্রভৃতিতে বিভক্ত করেন, তখনো পাবনা বলিয়া কোনো সরকার, চাকলা, কি মৌজার নির্দেশ নাই। সুতরাং তাহার বহু শতাব্দী পূর্বে পৌণ্ড্ররাজ্যের নামানুসারে পাবনা নাম হওয়া অসম্ভব।’ কিন্তু প্রাচীন কালে পাবনার অস্তিত্ব যে একেবারেই ছিল না, তা প্রত্যয় করে বলা যায় না। ‘ঢাকুর’ নামে বারেন্দ্র কায়স্থ সমাজের একটি কুলজী পাওয়া যায়। এর রচয়িতা যদুনন্দন। ঢাকুরে নরসিংহ দাস বংশের বিবরণে ‘পাবনা’ নামের একটি স্থানের কথা বলা হয়েছে।
‘মচমলি,
ময়দান দীঘি,
বিপছিল, চৌপাকি,
পাবনা
মালঞ্চি আদি
স্থান।
কেচুয়াডাঙ্গা
মেহেরপুরে, মানিকদি
গঙ্গাতীরে,
ঘরগ্রাম
স্থানে প্রচলিত।’
ঢাকুরের রচনাকাল সম্বন্ধে মতভেদ আছে। তা সত্ত্বেও এটি যে কয়েকশ বছরের পুরনো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে, বহু আগে থেকেই পাবনা নামে একটি স্থানের অস্তিত্ব ছিল। পাবনা নামক মৌজারও উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন নথিতে। ১৮৫০ সালের জরিপের নকশায় নাজিরপুর পরগনার ৮৬ নম্বরে ‘বাজু পাবনা’ নামে একটি মৌজার উল্লেখ পাওয়া যায়। সে সময়ের বাউন্ডারি কমিশনার’স লিস্টের ১০০ নম্বরে ‘পুদে পাবনা’ নামে একটি মৌজা আছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে রাধারমণ সাহা লেখেন, ‘সুতরাং পাবনা বলিয়া একেবারেই কোনো মৌজার উল্লেখ নাই, এমত বলা যায় না। এই মৌজা বর্তমান পাবনা শহরের সালগাড়িয়া নামক পাড়ায় (মহল্লায়) অবস্থিত। পাবনা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে আরেকটি মত পাওয়া যায়। সে মত অনুসারে, ‘পবনা’ নামক জনৈক ডাকাতের নাম থেকে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে। তবে রাধারমণ সাহা মতটি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি লেখেন, ‘অনুসন্ধানে যতদূর জানা যায়, এই জেলার দস্যু তস্কর সংস্রবে পবনা বলিয়া কোনো ডাকাইতের নাম পাওয়া যায় না। তজ্জন্য এমত অনুমান সমীচীন বলিয়া বোধ হয় না।’ অনেকেই মনে করেন, গঙ্গা নদীর পূর্বগামী একটি ধারার নাম ছিল ‘পাবনী’। আরেকটি ধারা ছিল ‘নলিনী’। পাবনী ও নলিনী উভয় স্রোত মিলিত হয়ে পদ্মায় পরিণত হয়েছে। এই পাবনী নামক ধারা থেকে পাবনা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। রাধারমণ সাহা এ মতটিকে গ্রহণ করেছেন।
প্রাচীনকালে পাবনায় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ছিল। এ জেলার বিভিন্ন স্থানে আবহমান কাল ধরে জৈন ধর্মমতের নানা আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে। খ্রিস্টপূর্ব দুই শতক থেকে বঙ্গে জৈন ধর্মের জনপ্রিয়তা ক্রমশ হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। তখন সারা দেশে বৌদ্ধবিহার, মঠ, সঙ্ঘারাম ইত্যাদি নির্মিত হতে থাকে। বৌদ্ধ যুগের সেসব নিদর্শন পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান। রাধারমণ সাহা লেখেন, ‘পাবনা জেলার উত্তর পশ্চিমাংশে রায়গঞ্জ থানায় স্থানে স্থানে যে সমস্ত উচ্চ মৃত্তিকা স্তূপ ও তদুপরি ইস্টকালয়ের নিদর্শন এবং কোনো কোনো স্থানে দ্বারদেশে সংস্থাপিত বুদ্ধমূর্তিযুক্ত যে সকল কৃষ্ণবর্ণ প্রস্তরখণ্ড দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা উক্ত বৌদ্ধবিহার, মঠ ও চৈত্যের চিহ্ন বলিয়া অনুমান হয়।’ জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও শক রাজত্বকালে বঙ্গে হিন্দু ধর্মই প্রবল ছিল। রায়গঞ্জ থানার তালম গ্রামে প্রায় ৩ হাত উঁচু একটি পাথরের শিবলিঙ্গ আছে। এটি খ্রিস্টপূর্ব দুই শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, রানী ভবানীর মেয়ে তারাসুন্দরী শিবলিঙ্গটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। খ্রিস্টীয় এক শতকে কণিষ্কের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান ও মহাযান নামক দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ও শৈব ধর্মের সংমিশ্রণে এক সমন্বিত ধর্মের আবির্ভাব হয়। সে সময় এ দেশে ব্যাপক আকারে শিবপূজা শুরু হয়। ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ বইয়ে রাধারমণ সাহা লেখেন, ‘রায়গঞ্জ থানায় স্থানে স্থানে বৃক্ষতলে পুঞ্জীকৃত শিবলিঙ্গ এবং পুষ্করিণী ইন্দারাদি খননকালে এদেশে যে সমস্ত প্রস্তরময়ী শিবলিঙ্গ মূর্তি পাওয়া যায়, তাহা ঐ যুগের এতদঞ্চলে পূজা পদ্ধতি প্রচলিত থাকার নিদর্শন।’ তৎকালে এ অঞ্চলে শিবের আরাধনা, শিবের গাজন, শিবের গীতি ইত্যাদি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। খ্রিস্টীয় তিন শতকে বৌদ্ধদের একটি তীর্থস্থানের নাম ছিল ‘শীলবর্ষ’। এটি পাবনা জেলার অন্তর্গত একটি পরগনা ছিল। এটি রায়গঞ্জ থানায় অবস্থিত। তখন গুপ্ত রাজাদের শাসনকাল। গুপ্ত রাজাদের কেউ কেউ বৌদ্ধবিহার, মঠ নির্মাণ এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে উৎসাহ প্রদান করেন। তাদের অনেকেই শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। ঐতিহাসিক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, গুপ্ত রাজারা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। তাদের মুদ্রায় লক্ষ্মী মূর্তির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আবিষ্কৃত পাথরের বিষ্ণু মূর্তিগুলো গুপ্ত শাসনামলে নির্মিত ও প্রতিষ্ঠিত বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। তাছাড়া পাবনার বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে বা দরজায় গণেশ মূর্তি খোদিত বা অঙ্কিত অবস্থায় দেখা যায়।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর পাবনায় ইসলাম ধর্মের বিস্তার শুরু হয়। হোসেন শাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজ্যভুক্ত ছিল এ জেলা। রাধারমণ সাহা লেখেন, ‘তাহার রাজত্ব সময়ের কোনো চিহ্ন এই জেলায় বর্তমান না থাকিলেও, তাড়াস আউট পোস্টের অধীন প্রাচীন করতোয়া তটে নবগ্রামে হিজরি ৯৩২ অব্দে (১৫১৪ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত যে একটি প্রাচীন মসজিদ বিদ্যমান আছে, তাহা হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নসরৎ শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।’ চাটমোহর থানার সমাজ গ্রামে একটি প্রাচীন মসজিদের ভগ্নাবশেষ আছে। মসজিদটিতে সংযুক্ত প্রস্তরফলক থেকে জানা যায়, এটি হিজরি ৯৫৮ সালে (১৫৪৯ খ্রিস্টাব্দ) শের সাহের পুত্র সুলতান সলিম তৈরি করেছিলেন।
‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ অনুসারে, ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর পাবনা জেলা হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি লাভ করে। তার আগে এ জেলার অধিকাংশ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮২৮ সালে পাবনায় প্রথম জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। ১৮৩২ সালে তা স্থায়ী রূপ লাভ করে। জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেপুটি কালেক্টর রূপে নিয়োগ করা হয়। রাজশাহী জেলার পাঁচটি ও যশোর জেলার তিনটি থানা নিয়ে সর্বপ্রথম পাবনা জেলা গঠিত হয়। ১৮২৮ সালের ২১ নভেম্বর যশোরের খোকসা থানা পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নানা পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে পাবনা জেলা তার বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





