‘আপনি
কোথা থেকে
এসেছেন?’
আসলে খুব
বেশি চিন্তা
না করেই
আমরা অন্যদের
এমন প্রশ্নটি
সচরাচর করে
থাকি। এটি
জিজ্ঞেস করার
সময় সচরাচর
আমরা অন্য
কোনো কিছুর
প্রতি ইঙ্গিতও
করি না
এবং আমরা
স্বাভাবিকভাবেই জানতে
চাই ওই
ব্যক্তিটি কোথায়
থাকেন। এটা
আমাদের জন্য
বেশ অকপট
শোনালেও কিছু
সম্প্রদায়ের মানুষের
জন্য হয়তো
নয়, যারা
এখন আর
কোনোভাবেই নিজেদের
জন্মভূমির সঙ্গে
সম্পর্কযুক্ত নন।
যেসব মানুষ
দীর্ঘ সময়
ধরে তাদের
জন্মভূমি থেকে
দূরে থাকেন,
তারাই এমন
পরিস্থিতির মুখোমুখি
হন। এটা
শুধু ভূমি
বা বাসস্থানের
সঙ্গে সম্পর্কিতই
নয়, এটা
তাদের সংস্কৃতি
ও স্বকীয়
অনুশীলন এবং
পরিচয়ের ব্যাপারও,
যা জন্মস্থানের
সঙ্গে সম্পর্ক
কেটে যাওয়ার
পর তারা
পেছনে ফেলে
এসেছেন। আমাদের
অনেককেই নিজেদের
পরিচয় হারানোর
অনুভূতির মুখোমুখি
হতে হয়
না এবং
আমরা কখনই
এ সমস্যায়
পড়বও না।
কিন্তু এমন
একটি সম্প্রদায়
রয়েছে, যারা
নিজ ভূমে
পরবাসী। এসব
মানুষ বিশ্বের
যেকোনো জায়গায়
যেতে পারেন,
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক
হলেও সত্য,
ঘরে ফেরা
তাদের জন্য
সুদূরপরাহত এক
স্বপ্ন। তারা
তাদের জন্মভূমি
সফর করতে
পারেন, কিন্তু
সেখানে আর
কখনই থিতু
হতে পারেন
না। তারা
উদাসীনতার শিকার,
তারা চরমপন্থার
শিকার, তারা
পরিস্থিতির শিকার;
তারা হলেন
কাশ্মীরি পণ্ডিত।
এ গবেষণাপত্রে
আমি কাশ্মীরি
পণ্ডিতদের দুর্দশার
বিষয়টিতে দৃষ্টি
দেয়ার চেষ্টা
করেছি। আমি
কাশ্মীরের ইতিহাস
বুঝবার চেষ্টা
করেছি এবং
গোটা বিষয়টিতে
রাজনীতির ভূমিকা
কতখানি তা
দেখতে চেষ্টা
করেছি।
আসলে চৌদ্দ
শতকের আগ
পর্যন্ত হিন্দুদের
জন্য বেশ
নিরাপদ ভূমি
হিসেবে টিকে
ছিল কাশ্মীর
উপত্যকা। চৌদ্দ
শতকের শেষ
দিকে কাশ্মীরের
রাজা হলেন
সুলতান সিকান্দার
এবং সেই
থেকে হিন্দু
ধর্মীয় বিভিন্ন
প্রতীক ধ্বংসেরও
সূত্রপাত হয়,
এর মধ্যে
অন্তর্ভুক্ত রয়েছে
ধর্মীয় পুস্তক
থেকে শুরু
করে মন্দির,
বিগ্রহ।
১৯৯০ সালে
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গণপ্রস্থান
কালানুক্রমিকভাবে
গল্পটা পুনরায়
বলে যাওয়ার
কোনো মানে
হয় না।
সবাই জানেন
যে পণ্ডিতদের
তাদের বাড়িঘর
ছেড়ে যেতে
বাধ্য করা
হয়েছে এবং
তারা দেশের
অন্য কোনো
জায়গায় আশ্রয়
নেন। এক
বা দুই
বছরের মধ্যে
কিন্তু এটি
ঘটেনি। এটা
বহু ঘটনার
পুঞ্জীভূত ফল,
যা ঘটেছে
বহু বছর
ধরে। ১৯৮৯
সালের শেষ
ভাগে কাশ্মীরের
বিশাল জমায়েতে
সেখানে ইসলামী
শাসনের পক্ষে
স্লোগান ওঠে।
ওই সময়
যা কিছু
ঘটছিল তা
কেবলই উত্তেজনার
বশে নয়,
এটা ছিল
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
বিরুদ্ধে পরিকল্পিত
আক্রমণের প্রস্তুতি।
রাহুল পণ্ডিত
তার বইয়ে
স্মৃতিচারণ করেছেন,
জম্মু ও
কাশ্মীরে যে
বার প্রথম
কোনো আন্তর্জাতিক
ক্রিকেট ম্যাচ
অনুষ্ঠিত হলো,
তখন স্টেডিয়াম
‘পাকিস্তান
জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে
প্রকম্পিত হলো,
এটা তাকে
ভীষণভাবে অবাক
করেছে।
এটা জেনে
রাখা বেশ
গুরুত্বপূর্ণ যে
এর সাত
বছর আগে
১৯৮৩ সালেই
পণ্ডিতদের প্রস্থান
দেখছিল কাশ্মীর।
নিউ ভারত
টাইমস পত্রিকার
এক প্রতিবেদন
মতে, ১৯৮৬-৯২
পর্যন্ত ছয়
বছরে উপত্যকার
অন্তত ৯২টি
মন্দির সাম্প্রদায়িক
হিংসার মুখোমুখি
হয়।
ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছিল, তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি। ফারুক আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার পদত্যাগ করলে সেখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরের দিনই জগমোহনকে গভর্নর করে পাঠায় কেন্দ্র সরকার এবং সেখানে গভর্নরের শাসন চালু হয়। কিন্তু তার আগে ১৯ জানুয়ারি রাত দেখেছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। মাইক থেকে পণ্ডিতদের প্রতি হুমকিস্বরূপ নানা বার্তা দেয়া হচ্ছিল। পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নারীদের প্রতি হুমকি ছিল উল্লেখ করার মতো। সে সময়ে স্লোগান ঘেঁটে দেখলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
এই সব
বিদ্বেষপূর্ণ বার্তা
আসলে কাশ্মীরি
পণ্ডিতদের জন্য
ছিল বড়
হুমকিস্বরূপ। বার্তা
ছিল খুবই
পরিষ্কার—সেখানকার
মুসলিমদের একটি
অংশ উপত্যকায়
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
চাইছিল না।
তারা তখনই
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
প্রস্থানে পাঠানো
শুরু করে।
হারিয়ে যাওয়া
পরিচয়
১৯৯০-এর
দশকে প্রস্থান
শুরু হলে
পণ্ডিতরা কল্পনাও
করতে পারেননি
যে তারা
তাদের জন্মভূমিকে
চিরতরের জন্য
হারাতে চলেছেন
এবং এখন
তারা নিজেদের
ভূমিতে যেতে
পারেন শুধুই
পর্যটক হিসেবে।
সহমর্মী মুসলিম
প্রতিবেশী ছিল
বলে কিছু
পণ্ডিত সত্যিকার
অর্থেই ছিলেন
ভাগ্যবান। ওইসব
প্রতিবেশী তাদের
জায়গাজমি থেকে
শুরু করে
অন্যান্য সম্পত্তির
দেখভাল করেছেন।
যদিও পণ্ডিতদের
বেশির ভাগই
ছিলেন দুর্ভাগা,
কেননা নির্বাসনে
যাওয়ার পর
পরই তাদের
বাড়িঘর লুটপাট
করা হয়েছে,
সবকিছু জ্বালিয়ে
দেয়া হয়েছে
ও অবৈধভাবে
দখল করা
হয়েছে। অনেক
মানুষ দুর্ভিক্ষের
সময়ের মতো
খুবই অল্প
দামে তাদের
সম্পত্তি বিক্রি
করে দিতে
বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু ঘরবাড়ি
ছেড়ে যাওয়ার
সময় পণ্ডিতরা
যে শুধুই
তাদের সম্পত্তি
হারাচ্ছিলেন তা-ই
নয়, তারা
হারাচ্ছিলেন তাদের
আত্মপরিচয়ও। অধ্যাপক
ইন্দু কিলাম
তার গবেষণাপত্রে
একটি কবিতা
লিখেছেন, যার
মধ্যে পরিচয়
সংকট দারুণভাবে
ফুটে উঠেছে—
আমি আমার
পরিচয় ফেলে
এসেছি
যখন পালাতে
বাধ্য হয়েছি
এবং আমাকে
বংশপরিচয় প্রমাণ
করতে হয়েছে
এখন আমি
একজন শরণার্থী
আমার নেই
রেশন কার্ড
না আছে
আমার স্কুল
ডিপ্লোমা
না আছে
রাজ্য সনদ
না আছি
ভোটার তালিকায়
আমার নিজের
কিংবা পরিবারের
আমার মর্যাদা
এখন প্রশ্নের
মুখে
আমার পরিচয়
সন্দেহের চোখে
কেননা প্রমাণস্বরূপ
নথি দেখাতে
আমি ব্যর্থ
কিংবা প্রমাণ
করতে পারি
না
এই ভূমিতে
পাঁচ হাজার
বছর ধরে
বসবাস করে
এসেছেন আমার
পূর্বপুরুষ
এখানে তিন
লাখ পঞ্চাশ
হাজার আছে
যারা আমাকে
সমর্থন করবেন
কিন্তু তাদের
সাক্ষ্য কাজে
লাগবে না
কারণ তারাও
যে আমার
মতো
ঘুরছে আত্মপরিচয়
ছাড়া।
আমি কে?
প্রায়ই আমি
নিজেকে প্রশ্ন
করি
এবং অন্যদেরও,
কিন্তু উত্তর
পাওয়াটা
খুব কঠিন।
একজন শরণার্থীর
মনের আবেগটা
বেশ ভালোভাবেই
ফুটে উঠেছে
এ কবিতায়।
একজন বন্ধুর
সঙ্গে কথা
বলে আমি
বুঝতে পেরেছি,
নিজের ভূমি
ছেড়ে চলে
আসতে বাধ্য
হওয়ার কষ্টটা
কেমন। সে
বলছিল—‘হ্যাঁ,
আমি কাশ্মীর
যাই। সেখানে
আমাদের একটি
বাড়ি আছে।
আমি সেখানকার
সব রাস্তাঘাট,
অলিগলি চিনি,
যদিও আমি
আর সেখানকার
কেউ নই।
সেখানে একজন
পর্যটক হিসেবে
যাই আমি,
আমি আর
কোনোভাবেই নিজের
বাড়ি ফিরে
যেতে পারি
না।’
গবেষণাটি করা
সময় আমি
তিনজন মানুষের
সঙ্গে কথা
বলেছি, যাদের
বয়স যথাক্রমে
৪৫, ২০
ও ১৮
বছর। সুনির্দিষ্ট
কারণেই আমি
এসব বয়সের
মানুষ বেছে
নিয়েছি। তরুণ
প্রজন্মের মধ্যে
এই হারানোর
অনুভূতি কিংবা
যে অনুভূতিগুলো
ক্রমেই দূরে
চলে যাচ্ছে,
তা নিয়ে
তাদের ভাবনা
কী, তা
জানার চেষ্টা
ছিল আমার।
৪৫ বছর
বয়সী ব্যক্তিটির
কষ্ট ছিল
অনেক গভীর,
কেননা তিনি
যা কিছু
গড়েছেন তা
নিজের চোখের
সামনে হারাতে
দেখেছেন। এটা
ছিল তার
পূর্বপুরুষদের ভিটা
এবং তিনি
এ উপত্যকায়
জীবনের সোনালি
সময়টা পার
করেছেন, কাজেই
তার ক্ষতিটা
ছিল সীমাহীন।
তরুণদের মধ্যে
হারানোর অনুভূতি
অতটা প্রবল
নয়, কেননা
নির্বাসনের আগে
তারা কাশ্মীর
দেখেননি। তাদের
মধ্যে হারানো
যে অনুভূতিগুলো
কাজ করে
তা মূলত
শোনা গল্প
থেকে।
এটি ছাড়াও
কাশ্মীরি পরিচয়
ধরে রাখার
প্রশ্ন এলে
এই সময়ে
তা কঠিনতর
হয়ে উঠেছে।
কিছু পণ্ডিত
ভারতের বিভিন্ন
প্রান্তে স্থানান্তরিত
হয়েছেন, যাদের
সেখানে বন্ধুবান্ধব
কিংবা আত্মীয়স্বজন
ছিল, আর
যাদের যাওয়ার
এমন কোনো
জায়গা ছিল
না তারা
আশ্রয় নিয়েছেন
শরণার্থী শিবিরে।
নির্বাসনের সময়
যে ছোট
শিশু ছিল
কিংবা কেবলই
ভূমিষ্ঠ হয়েছে,
এমন তরুণ
প্রজন্ম উপত্যকায়
ফেরার কোনো
কারণ দেখেন
না। আমি
যাদের সঙ্গে
কথা বলেছি
তাদের মধ্যে
একটি মেয়ে
প্রশ্ন করল,
কেন সে
উপত্যকায় ফিরে
যাবে? সেখানে
কোনো ভবিষ্যৎ
নেই।
তার কথাটি
সঠিক। সেখানে
কোনো শিল্পকারখানা
নেই, কোনো
চাকচিক্যময় জীবন
নেই এবং
সর্বোপরি সেখানে
খুব বেশি
নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ
করছে।
প্রশ্নটির অর্থ
খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ওই মেয়েটি
আর কোনোভাবেই
তার জন্মভূমির
সঙ্গে নিজেকে
জড়াতে চায়
না এবং
এখন যেখানে
আছে সেখানেই
থেকে যেতে
চায়। যদিও
মধ্যবয়সী ব্যক্তিরা
এখনো উপত্যকায়
থিতু হওয়ার
স্বপ্ন দেখেন।
এটা পরিষ্কারভাবে
সাক্ষ্য দিচ্ছে,
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
তরুণ প্রজন্ম
তাদের আত্মপরিচয়
ধরে রাখতে
খুব একটা
আগ্রহী নয়,
আবার অন্য
জাতির সঙ্গে
বিয়ে-শাদিতে
জড়ানোয় তাদের
পরিচয় আরো
ভঙ্গুর হয়ে
পড়েছে।
নির্বাসন ঘটেছে
২০ বছরের
বেশি সময়
আগে। স্মৃতি
ধূসর হওয়ার
জন্য এটা
বিরাট সময়ই
বটে। নয়াদিল্লিতে
কাজ করা
গাইনোকোলজিস্ট ড.
শক্তি ভান
একজন কাশ্মীরি
পণ্ডিত। তিনি
স্বীকার করলেন
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
পরিচয় খুব
দ্রুতগতিতে হারিয়ে
যাচ্ছে।
বিভিন্ন আচার,
সংস্কৃতি ও
ভাষা প্রায়
হারিয়ে যেতে
বসেছে এবং
উপত্যকার সঙ্গে
এ জাতিগোষ্ঠীর
ভেঙে পড়া
সম্পর্কটা পুনরায়
জোড়া না
লাগালে এসব
রক্ষা করারও
কোনো উপায়
নেই।
এনডিটিভির এক
প্রতিবেদন বলছিল,
এতটা বেশি
সময় অতিবাহিত
হয়ে গেছে
যে মুসলমান
সম্প্রদায় ও
কাশ্মীরি পণ্ডিতরা
উভয়ই একে
অন্যের সঙ্গে
মিটমাট করার
বিষয়টিও হয়তো
ভুলে গেছেন।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
একটি গোটা
প্রজন্ম ও
মুসলমানদের একটি
গোটা প্রজন্ম
একে অন্যের
উপস্থিতি ছাড়াই
বেড়ে উঠেছে
এবং এখন
নিজেদের পুরনো
ভিটেবাড়িতে ফেরা
পণ্ডিতদের জন্য
অনেকটাই অসম্ভব,
কারণ সেসব
ভিটেবাড়ি কোনোটাই
আর আগের
মতো নেই।
সামাজিক বন্ধনটা
এরই মধ্যে
ভেঙে গেছে,
এখন পণ্ডিতদের
সঙ্গী শুধুই
স্মৃতি এবং
তাও খুব
অচিরেই হয়তো
বিবর্ণ হয়ে
যাবে এবং
জন্মভূমি থেকে
আরো কয়েকটি
প্রজন্ম দূরে
থাকলে স্মৃতি,
পরিচয়, সংস্কৃতি
সবই হয়তো
হারিয়ে যাবে।
পরিশেষে বলা
যায়, কাশ্মীরি
পণ্ডিতদের পরিচয়
এখন গুরুতর
হুমকির মুখে,
কেননা তারা
এখন উদ্বাস্তু
এক সম্প্রদায়।
যদিও তারা
অনলাইন কমিউনিটি
তৈরি করেছে
এবং নিজেদের
পূর্বপুরুষদের গল্পগুলো
হয়তো অনলাইনে
শেয়ার করে
তারা বাঁচিয়ে
রাখতে পারবেন।
সূত্র: রিসার্চগেট




