ভারতের উত্তরে
হিমালয় রাজ্য
কাশ্মীরের নাম
শুনলেই প্রথমে
মনে আসে
সেখানকার অপার
সৌন্দর্যের কথা।
সোনমার্গ, গুলমার্গ,
অনন্তনাগ, শ্রীনগর,
ডাল লেক—এসব
নাম বহুল
পরিচিত পর্যটকদের
কাছে। কিন্তু
কাশ্মীরে হিমালয়ের
সৌন্দর্য ছাড়াও
আছে তার
পুরনো সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্য, যার
মধ্যে সবচেয়ে
বড় আকর্ষণ
হলো কাশ্মীরের
রান্না।
কাশ্মীরি রান্না
প্রধানত দুই
ভাগে বিভক্ত
করা হয়:
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
খাবার (কাশ্মীরি
পণ্ডিতদের রান্না)
আর কাশ্মীরি
মুসলিমদের খাবার
(কাশ্মীরি ওয়াজওয়ান)।
এ দুই
রন্ধনপ্রণালির প্রধান
তফাত হলো
কাশ্মীরি পণ্ডিতরা
রান্নায় দেয়
হিং আর
দই, আর
কাশ্মীরি মুসলিমরা
ব্যবহার করে
পেঁয়াজ আর
রসুন। আজ
আমার লেখা
এই কাশ্মীরি
পণ্ডিতদের রান্না
নিয়ে।
ঋষি কাশ্যপ
ও দেবী
সারদার (দেবী
সরস্বতীর আরেক
নাম) দেশ
কাশ্মীর; এখানকার
স্থানীয় হিন্দুদের
মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ
সম্প্রদায়ের নাম
কাশ্মীরি পণ্ডিত
অর্থাৎ সারস্বত
ব্রাহ্মণ (যাদের
নাম দেবী
সরস্বতীর থেকে
প্রাপ্ত)।
পণ্ডিত ছাড়া
বাকি দুটো
সংখ্যালঘু কাশ্মীরি
হিন্দু সম্প্রদায়
হলো বুহের
আর পুড়িব।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
প্রধান পেশা
ছিল অধ্যাপনা,
তারা নিজেদের
অবশিষ্ট ভারতের
সারস্বত ব্রাহ্মণদের
থেকে আলাদা
বলে মনে
করতেন। ১৯৯০-তে
রাজনৈতিক ও
মৌলবাদীয় পরিস্থিতির
চাপে কাশ্মীর
ছাড়তে হয়
এই পণ্ডিতদের।
কাশ্মীর ছেড়ে
আসা এই
সারস্বত ব্রাহ্মণদের
সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা
ইত্যাদির আমূল
পরিবর্তন হলেও
এদের রান্নায়
খুব বেশি
পরিবর্তন হয়নি।
কাশ্মীরি রান্নায়
ব্যবহূত হয়
নানা ধরনের
বাদাম ও
জাফরান, তার
সঙ্গে স্থানীয়
কাশ্মীরি চাল।
আগে সর্ষের
তেলে রান্না
হলেও এখন
মূলত সূর্যমুখী
তেলই ব্যবহার
হয়। মাংসের
বদলে অনেক
রান্নায় পনিরের
ব্যবহার শুরু
হয়। এছাড়া
ধনে পাতা
দিয়ে রান্নাটিকে
দর্শনীয় করে
তোলা হয়
(যাকে বলে
‘গারনিশ’)।
এই একবিংশ
শতাব্দীতে যেখানে
প্রায় সব
জিনিসই সব
জায়গায় পাওয়া
যায় তখন
অনেকেই আবার
পুরনো রান্নার
পদ্ধতিতে ফিরে
যাওয়ার চেষ্টা
করছে।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
খাদ্য সংস্কৃতির
ইতিহাস ঘাঁটলে
দেখা যায়
এরা ব্রাহ্মণ
হলেও নিরামিষাশী
নন। কথিত
আছে, এই
কাশ্মীরি ব্রাহ্মণদের
আদি পুরুষ
সারস্বত মুনি
একদা এক
ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের
হাত থেকে
রক্ষা পান
মাছ খেয়ে,
যাকে দেবী
সরস্বতীর আশীর্বাদ
বলে ধরে
নেয়া হয়।
সেই থেকেই
শুরু হয়
এই সম্প্রদায়ের
আমিষ খাওয়া।
তবে শুধু
মাছ নয়,
মাংস খাওয়ার
রেওয়াজও আছে
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
মধ্যে। এদের
প্রিয় রান্নাগুলোর
অন্যতম হলো
‘রোগন-জোশ’,
খবরগাহ (ঘিয়ে
ভাজা পাঁঠা
বা খাসির
পাঁজরের মাংস)
এবং আখনি
মুরগি (দই
দেয়া রসা)।
এছাড়া আছে
মাস্ক (মাংসের
মণ্ড দেয়া
কারি), মাটন
কালিয়া ও
চক-চারওয়ান
(মেটের কলজে)।
শহুরে কাশ্মীরি পণ্ডিতের একটি প্রাচীন প্রথা আজও বহুলাংশে প্রচলিত। তা হলো ‘নানহাই’ নামক একটি রুটি দিয়ে জলখাবার খাওয়া। তবে নানহাই রুটি শুধু কাশ্মীরেই পাওয়া যায় বলে অনেকে এখন জলখাবারে তার বদলে হাতরুটি বা পরোটা খেয়ে থাকেন। গ্রামে বসবাসকারী কাশ্মীরি পণ্ডিতরা জলখাবারে খেতেন মাক্কি আটার রুটি বা চালের রুটি; যার রেওয়াজ এখনো অক্ষুণ্ন। এছাড়া কাশ্মীরি রুটিওয়ালারা (যাদের কান্দুরয়ান বলা হয়) তৈরি করেন লাভাসা (‘নান’ ধরনের রুটি), কুলচা (ঈষৎ মিষ্টি শক্ত রুটি, কিছুটা বিস্কুট ধরনের), কাটলাম (মিষ্টি রুটি) এবং তেলভোর (বাগেট ধরনের রুটি)। তবে এ সবই মূলত প্রাতরাশের খাবার; দুপুর বা রাতের খাবারে কালেভদ্রে রুটি খাওয়া হলে শেষ পাতে একটু ভাত থাকেই।
কাশ্মীরিদের ভাত
তৈরি হতো
কাশ্মীরের এক
বিশেষ ধরনের
চাল থেকে।
এই চাল
ছিল আকারে
ছোট, মোটা
এবং মিষ্টি।
একে একবার
ফুটিয়ে নিয়ে
জল ফেলে
আবার ফোটাতে
হতো পুরো
সেদ্ধ করার
জন্য। এছাড়া
বাসমতি চাল
তো আছেই।
আর আছে
কাজু-কিশমিশ
মেশানো কাশ্মীরি
পোলাও, নুন-হলুদ
দিয়ে সর্ষের
তেলে সামান্য
নাড়াচাড়া করা
‘তেহর’
আর মাংসের
পোলাও (অর্থাৎ
আক্ষরিক অর্থে
পলান্ন)।
কাশ্মীরি বিয়ের
অনুষ্ঠানে ভাতের
সঙ্গে থাকে
আলুর দম,
দুটি বা
তিনটি পনিরের
তরকারি ও
মাংস। বড়লোক
বাড়ি হলে
পনির আর
মাংস মিলিয়েই
১০টি পদ
হতে পারে।
মাংস বলতে
আগে ব্যবহার
করা হতো
ভেড়ার মাংস,
এখন অবশ্য
খাসির মাংসই
দেয়া হয়।
আমিষ ছাড়া
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
নিরামিষ রান্নার
মধ্যে যেগুলো
বহুল প্রচলিত
সেগুলো হলো
মঞ্জ-এ-হাখ
(ঝোল ঝোল
শাকের তরকারি),
নাদ্রু আখনি
(দই দিয়ে
রান্না করা
পদ্মডাঁটা), মুঝি
(মুলো), গোগজি
রাজমা (সরু
সরু রাজমা)
ও কাশ্মীরি
আলুর দম
(লাল লাল,
ঝাল ঝাল
একটি পদ;
অধিকাংশ হোটেলে
যে সাদা
সাদা আলুর
দমটি কাশ্মীরি
আলুর দম
বলে পরিবেশন
করে তার
থেকে একেবারেই
আলাদা)।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
রান্নায় এছাড়া
যেসব মসলা
দেয়া হয়,
তা হলো
বাদয়ান (মৌরি),
জাভ্যুল মসলা
(কাশ্মীরিদের গরম
মসলা, একাধিক
মসলার মিশ্রণ
যা বহু
কাশ্মীরি গৃহিণীর
‘সিক্রেট
রেসিপি’), ল্যেদার
(হলুদ), শন্থ
(শুকনো আদা
গুঁড়ো), ইয়েঙ্গা
(হিং), ভের
(মসলা-কেক;
একাধিক মসলা
থাকে, যার
মধ্যে লংকা
ও মেথি
অন্যতম) ইত্যাদি।
কাশ্মীরে যেহেতু
জাফরানের চাষ
হয়, সেজন্য
এর অপর্যাপ্ত
ব্যবহার দেখা
যায় বিভিন্ন
রান্নায়। যথা
পোলাও ও
নানা মিষ্টিতে।
শুকনো ভেজে
নিয়ে জাফরানটা
দুধে ভিজিয়ে
নিয়ে তারপর
রান্নায় ব্যবহার
করা হয়।
এর সঙ্গে
আছে কাশ্মীরি
লংকা—ঝালবিহীন,
কিন্তু স্বাদে-গন্ধে
অপূর্ব। এসব
মসলা ও
রান্নার প্রণালির
গুণে কাশ্মীরি
রান্নার যে
‘কাই’
বা ‘রসা’টি
তৈরি হয়,
তা ঘন
ও সুবাসিত;
পেঁয়াজ বা
টমেটোর প্রয়োজন
হয় না।
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের
রান্নার অন্যতম
প্রধান বৈশিষ্ট্য
তাই পেঁয়াজ,
রসুন আর
টমেটোবিহীন রান্না।
এদের খাবারের
শেষ পাতে
আসে সুফটা
ও পায়েস।
কাশ্মীরিদের চাও
বেশ অন্য
রকম। ‘শির-চায়’
বা ‘নুন-চায়’
গোলাপি রঙের—এই
চায়ে মেশানো
হয় দুধ,
নুন ও
সোডা। মূলত
এটি প্রাতরাশের
সঙ্গেই খাওয়া
হয়। ‘কাহওয়াহ’
এক ধরনের
গ্রিন টি,
তাতে মেশানো
হয় নানা
মসলা, কাঠবাদাম,
আখরোট ও
জাফরান। একেক
বাড়িতে ‘কাওয়া’
একেক রকমের।
বলা হয়
কম-বেশি
২০ ধরনের
‘কাওয়া’
আছে। এখন
এই চা
নানা ধর্মীয়
অনুষ্ঠানেও পরিবেশন
করা হয়।
গ্রামের দিকে
এই চায়ের
আরেকটি নাম
‘মুঘল
চা’।
রেসিপি
নাদেয়র
বা নাদ্রু
আখনি (দই
দিয়ে রান্না
করা পদ্মডাঁটা)—এই
রান্নার প্রধান
উপকরণ হলো
দই আর
ব্যবহূত প্রধান
মসলা হলো
এলাচ, তেজপাতা
আর লবঙ্গ।
পদ্মডাঁটা ছাড়াও
আখনি রান্না
হয় মাংস
আর লাউ
দিয়ে। আখনি
রান্না হয়
মাটির হাঁড়িতে
আর পরিবেশন
করা হয়
গরম ভাতের
সঙ্গে। পদ্ম
ডাঁটা লম্বাভাবে
তিন চার
টুকরো করে
কেটে নিয়ে
১ ঘণ্টা
ধরে ফোটাতে
হয়। আখনির
গ্রাভি বা
ঝোল তৈরি
হয় শর্ষের
তেলের মধ্যে
দই, দুধ,
হিং, দারচিনি,
আদা এবং
এলাচগুঁড়ো দিয়ে।
এ ঘন
ঝোলের মধ্যে
সেদ্ধ পদ্মডাঁটাগুলো
দিয়ে মিনিট
১৫ ফোটালে
তৈরি হয়ে
যায় কাশ্মীরের
বিখ্যাত নাদ্রু
আখনি।
কাশ্মীরি মটন
কোফতা
কোপ্তা
বানানোর জন্য
প্রয়োজন খাসির
মাংসের পায়ের
অংশের কিমা,
কাশ্মীরি লঙ্কা,
হিং, মৌরিগুঁড়ো,
শুকনো আদাগুঁড়ো,
ধনেগুঁড়ো, নুন,
দই, শর্ষের
তেল।
তড়কা দেয়ার
জন্য দরকার
ছোট এলাচ,
বড় এলাচ,
জিরা, স্টার
আনিস, লঙ্কা
গুঁড়ো আর
জল।
কোফতার সব
উপকরণ একসঙ্গে
ভালো করে
মাখতে হয়।
এটার মাখাটাই
আসল জিনিস
এ রান্নার।
অনেকক্ষণ ধরে
মেখে একদম
মিহি করে
ফেলতে হবে।
তারপর মাখা
হয়ে গেলে
৪৫ মিনিট
সরিয়ে রাখতে
হবে।
মাখা কোফতা
যতক্ষণে রেডি
হচ্ছে, ততক্ষণ
কড়ায় শর্ষের
তেল দিয়ে
তাতে তড়কার
উপকরণগুলো দিয়ে
ভাজতে হবে,
শেষে জল
দিয়ে ভালো
করে ফোটাতে
হবে। তারপর
মাখা কোফতাটা
নিয়ে সেটা
থেকে হাতে
করে ছোট
ছোট লম্বাটে
বলের মতো
বানিয়ে ওই
তড়কার কারির
মধ্যে ছেড়ে
দিতে হবে।
এরপর ঢাকনা
দিয়ে খানিক্ষণ
রাখতে হবে,
যাতে কোফতার
বলগুলো সেদ্ধ
হয় এবং
ভেতরে গ্রাভি
বা ঝোলটা
ঢোকে। রান্না
হয়ে গেলে
গরম গরম
ভাতের সঙ্গে
পরিবেশন করতে
হবে।
খবরগাহ-কাশ্মীরি পণ্ডিত রন্ধন
প্রণালি
এর
জন্য লাগবে
খাসির মাংস,
পাঁজরের অংশ
থেকে কাটা;
ঘন ক্রিমওয়ালা
দুধ, মৌরিগুঁড়ো,
শুকনো আদাগুঁড়ো,
দই, ঘি
আর নুন।
পটলি বানাতে
লাগবে লবঙ্গ,
দারচিনি, জৈত্রী,
জায়ফল, স্টার
আনিস, গোটা
জিরে, গোটা
গোলমরিচ আর
তেজপাতা।
প্রেসার কুকারে
মাংস দিয়ে
সেটাকে দুধ
দিয়ে ঢেকে
দিতে হবে।
পটলির সব
উপকরণ নিয়ে
একটা মসলিন
কাপড়ে বেঁধে
সেটাকে ওর
মধ্যে ডুবিয়ে
দিতে হবে।
তারপর মৌরি
আর আদাগুঁড়ো,
নুন, আর
জাফরান দিয়ে
কুকার বন্ধ
করে বড়
আঁচে দুটো
সিটি দিয়ে
নামিয়ে নিতে
হবে। মাংসের
টুকরোগুলো ঝোল
থেকে আলাদা
করে নিতে
হবে। তারপর
মাংসের গায়ে
ফোটানো দই
লাগাতে হবে।
তারপর কড়াইতে
ঘি গরম
করে এ
মাংসের টুকরোগুলো
ভাজতে হবে।
ভালো করে
ভেজে নিলেই
খবরগাহ তৈরি।
মণিদীপা দে:
ইতিহাস-ঐতিহ্য
ও ভ্রমণবিষয়ক
লেখিকা




