আদি ইতিহাসের খোঁজে

নানা সময়ে সংঘটিত ধর্মীয় সংঘাত ও ভূ-রাজনীতির অনিঃশেষ জটিলতায় পড়ে বারবার বিপন্ন-বিপর্যস্ত হতে হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের যে একটি প্রাচীন গোষ্ঠীকে, তারা হলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত। এ অঞ্চলের রাজনৈতিক চাপান-উতোরে তাদের নাম নানাভাবে উঠে আসে বটে, তাদের নাম রাজনীতিতে সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ারও, কিন্তু তাদের ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই আদতে অজানা। কোনো পক্ষ তাদের পক্ষে গরম গরম কথা বলে স্রেফ রাজনীতির মাঠে সুবিধা কুড়াতে চায়, কিন্তু মনে হয়তো পণ্ডিতদের জন্য আন্তরিক সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও নেই। আবার আরেক দল চায় তাদের তাড়িয়ে দিয়ে ভিটেমাটি থেকে সমূলে উচ্ছেদের পর ভূমিটুকু দখল করতে। এসব স্বার্থপর তত্পরতার ডামাডোলে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আদি ইতিহাসের কথা যেন অনেকটা আড়ালে চলে যায় বা ম্রিয়মাণ হয়ে আসে। ধারণা করা হয়, কাশ্মীরি পণ্ডিতরাই হলেন কাশ্মীরের আদিতম অধিবাসী। উনিশ শতকের প্রাচ্য ভাষা বিশেষজ্ঞ মনিয়ার উইলিয়ামস ধারণা করেছেন, কাশ্মীরি পণ্ডিতরা প্রকৃতপক্ষে ওই উপত্যকায় বাস করতে আসা আর্যদেরই শুদ্ধতম বংশধর। কাশ্মীর পণ্ডিতরা আবার ১৩৩টি অসবর্ণ গোত্রে বিভক্ত। প্রতি গোত্রের সদস্যরা নিজেদের একজন বিশেষ ঋষির বংশধর বলে দাবি করে থাকেন, যে ঋষির নাম তারা সারা জীবন ধরেই বহন করে চলেন। তবে আদিকালে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সামাজিক অবস্থান গোত্র অনুযায়ী খুব কমই নির্ধারিত হতো, তার বদলে কে কোন পেশায় নিয়োজিত তা-ই ছিল সামাজিক অবস্থান নির্ণয়ে মূল বিবেচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা রাজসভায় বা প্রশাসনে কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে দুই কি তিন পুরুষ ধরে নিয়োজিত থাকতেন, তাদের সম্মান ছিল সবার ওপরে।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আদি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইতিহাসের অনেক মুহূর্তেই নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে তাদের সমূহ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। প্রাচীন যুগে যখন জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রভাব বিস্তার করতে সচেষ্ট, তখন তারা খানিক মুশকিলেই পড়েছিলেন। সম্রাট অশোকের আমলে বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত শাসন ও সমাজ ব্যবস্থায় বর্ণ প্রথা যখন তেমন আর প্রাধান্য পাচ্ছে না, তখনো তারা নিজেদের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ও চিরাচরিত প্রথা ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তবে কাশ্মীর পণ্ডিতরা তখনো নিজেদের পণ্ডিত বলে সরাসরি পরিচয় দিতেন না। তারা নিজেদের ‘ভট্ট’ বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। তবে তাদের পাণ্ডিত্য ও বৌদ্ধশাস্ত্রে ব্যুত্পত্তি কোনো কোনো বৌদ্ধ শাসককেও মুগ্ধ করেছিল। তারা একাধিক পণ্ডিতকে বৌদ্ধ বিদ্যাচর্চার জন্য তিব্বতেও পাঠিয়েছিলেন।

উপত্যকায় সুলতানি শাসনের আবির্ভাবের পর থেকেই ‘ভট্ট’রা পরিণত হলেন পণ্ডিতে। সুলতানি আমলের প্রথম দিকে, বিশেষত যখন সুলতান সিকান্দার শাহ ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন (আনুমানিক ১৩৮৯ সালে) তখন তাদের নিদারুণ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। সিকান্দার শাহ মন-মেজাজের দিক চূড়ান্তভাবে সাম্প্রদায়িক ছিলেন। পণ্ডিতদের ওপর বাড়তি কর বসানো, তাদের উপাসনালয় ধ্বংস করা ও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ—কোনো কাণ্ডই তিনি বাদ রাখেননি। পরিস্থিতি পাল্টায় ১৪২০ সালে সুলতান জয়নুল আবেদিন কাশ্মীরের শাসনভার নেয়ার পর। জয়নুল আবেদিন চিন্তাচেতনায় যেমন অসাম্প্রদায়িক ছিলেন, তেমনি তিনি জ্ঞানের কদর করতেন। জয়নুল আবেদিন একবার প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন খাবারের বিষক্রিয়ায়, পরে শ্রীভট্ট নামের এক পণ্ডিত সেই সমস্যার উপশম করায় তিনি খুশি হয়ে তাকে উজিরের পদমর্যাদায় সুলতানি দরবারের চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগও দিয়েছিলেন। পরে তার চিকিৎসার জন্য কী পুরস্কার চান তা জানতে চাওয়ায় শ্রীভট্ট সুলতানকে বলেছিলেন, যেন পণ্ডিতদের ওপর চাপানো বাড়তি কর মওকুফ করা হয়। সুলতান জয়নুল তা-ই করেছিলেন। সিকান্দার শাহর আমলে অনেক পণ্ডিতই অত্যাচারের ভয়ে উপত্যকা ছেড়ে পালিয়েছিলেন। জয়নুল আবেদিনের উদারতার সংবাদ পেয়ে তারা আবার ফিরে আসতে শুরু করেন। সুলতান জয়নুল অনেক পণ্ডিতকেই রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছিলেন। তার সহায়তায় বহু পণ্ডিত আগ্রহভরে ফারসি ভাষাও শিখতে শুরু করেন। যদুভট্ট নামের এক সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন জয়নুলের দরবারের অন্যতম সভাসদ, যিনি কিনা ফারসি শিখে ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামা প্রায় মুখস্থই করে ফেলেছিলেন। যদুভট্ট ‘জয়ন-প্রকাশ’ শিরোনামে সুলতান জয়নুলের ওপর একটা কাব্যও রচনা করেন। আরেক কবি নথসোমা পণ্ডিত সুলতানের বন্দনা করে লেখেন ‘জয়ন-চরিত’ কাব্য। জয়নুল পণ্ডিতদের কাছ থেকে শাস্ত্রের বাণী শুনতেও পছন্দ করতেন। পণ্ডিতদের জন্য পরিস্থিতি আবার প্রতিকূলে চলে যায় জয়নুলের মৃত্যুর পর তারই পুত্র হাজি খান ওরফে হায়দার খানের হাতে ক্ষমতা চলে আসার পর। স্বভাবে বদমেজাজি ও মাতাল হায়দার খানের নির্দেশে অনেক পণ্ডিতকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, কারো কারো কান ও নাক কেটে দেয়া হয়। বস্তুত যে পণ্ডিতরা তার বাবাকে পরামর্শ দিয়ে সুশাসন আনতে সহায়তা করেছিলেন, তিনি উল্টো তাদেরই ওপর চড়াও হলেন। হায়দার খানের শাসনামল অবশ্য এক বছরের বেশি টেকেনি। হায়দার খানের পর তার পুত্র হাসান খান সিংহাসনে আরোহণ করলেন। হাসান খান ছিলেন সংগীতানুরাগী ও পিতার তুলনায় উদার মানসিকতার। নিজের শাসনকালের প্রথম কয়েক বছর তিনি পণ্ডিতদের সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও পরে সাম্রাজ্যের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের মুখে তিনি ক্রমে ক্রমে সহনশীলতা হারাতে থাকেন। তার মনে হচ্ছিল, কাশ্মীরি পণ্ডিতরা তাকে লড়াইয়ের ময়দানে বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে না। পনেরো শতকের শেষে  হাসান খানের মৃত্যু হলে তার সাত বছরের শিশুপুত্র মোহাম্মদ শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন হাসান খানের জামাই সাইয়িদ হাসান বলহাকি। রাজদরবারে নানাবিধ দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কোনো পক্ষই পণ্ডিতদের বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে ফের জিজিয়া কর ও নানাবিধ অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে। পণ্ডিতদের অনেকে উপত্যকা ছাড়লেও কেউ কেউ নীরবে মুখ বুজে লেখালেখি ও শাস্ত্র অধ্যয়নে মনোযোগ দেন। রাজদরবারে কী চলছে তা নিয়ে ভাবা বা সেখানকার খবরাখবর জানবার আগ্রহ পণ্ডিতদের মধ্যে উবে যায়।


ষোলো শতকের শেষে কাশ্মীর যায় মোগলদের হাতে। সম্রাট আকবর কাশ্মীর দখল করার পর সেখানে এসে সম্ভবত পণ্ডিতদের সঙ্গে আলাপ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আইন-ই-আকবরিতে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘পণ্ডিতরা কাশ্মীরের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় গোষ্ঠী। তারা নিজেদের রীতিনীতি ও ঐতিহ্য থেকে কখনই নড়তে চায় না। পণ্ডিতদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যারা, তাদের ব্যাপারে পণ্ডিতরা একটিও কটু কথা বলে না। তারা ভিক্ষা করে না বা কাউকে বিরক্ত করে না। তারা নিজেদের জীবিকা অর্জনের জন্য ফলের গাছ লাগায় ও তারা সাধারণত মানুষদের সমৃদ্ধ করার সূত্র হিসেবে গণ্য হয়।’ কথাগুলো আবুল ফজলের লেখা ঠিকই, কিন্তু তা স্বয়ং আকবরেরও মনের কথা পণ্ডিতদের বিষয়ে—এমনটি বললে মনে হয় অত্যুক্তি হবে না। আকবর কাশ্মীরে এসেই পণ্ডিতদের থাকার জন্য আলাদা গ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কাশ্মীরে থাকার সময় তিনি পণ্ডিতদের দ্বারা প্রচলিত ১৩ ভাদ্র পবিত্র ঝিলম নদীর জন্মদিন পালন উৎসবেও অংশ নেন। একাধিক কাশ্মীরি পণ্ডিতকে তিনি আগ্রায় নিয়ে নিজের দরবারে কাজ ও পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। অনেক কাশ্মীরি পণ্ডিত মনসবদার হিসেবে মোগল প্রশাসনে কাজ করার সুযোগও পান। আকবর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের যে উচ্চমর্যাদা দিয়েছিলেন, পরবর্তী মোগল সম্রাটদের সময়েও তার খুব একটা নড়চড় হয়নি। এমনকি তুলনামূলকভাবে অনুদার আওরঙ্গজেবের আমলেও কাশ্মীরি পণ্ডিতরা মোগল প্রশাসনে সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের অস্তগামী পর্বে পণ্ডিতরাও নিজেদের মর্যাদা হারাতে থাকেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কাশ্মীরজুড়ে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়। আফগান আক্রমণের মুখে পণ্ডিতরাও বিপন্ন হতে থাকেন। পরে শিখদের আক্রমণের মুখে আফগানি শাসকদের পতন যখন আসন্ন, তখন পরিস্থিতি অনুকূল হবে ভেবে পণ্ডিত গোষ্ঠী সম্ভাব্য শিখ শাসনকেই সমর্থন করেন। কিন্তু পরে দেখা যায়, শিখরাও কঠোর কম নয়। এরপর ‘প্রিন্সলি স্টেট’ হিসেবে ইংরেজদের নজরদারিতে কাশ্মীরে তারা এক রকম টিকে ছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ ও তারপরের বহু নির্মম, জটিল ঐতিহাসিক ঘটনা কীভাবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জানমাল ও ভূমি হরণ করেছে, সে ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা।

দৈনন্দিন লোকাচার, উৎসব ও পার্বণ

অতীতে যেকোনো কাশ্মীরি পণ্ডিতেরই দৈনন্দিন জীবন সারাক্ষণ নানা রকম লোকাচারে পূর্ণ থাকত। কোনো পুত্রশিশুর জন্মের পরই তা উদযাপন করা হতো একাধিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, কাশ্মীরি পণ্ডিত সমাজে নারীদের মর্যাদা দেয়া হলেও কন্যাশিশুর জন্ম তারা সেভাবে উদযাপন করতেন না। কোনো কোনো ইতিহাসকার ধারণা করেন, মেয়েদের বিয়ে দেয়ার সময় মোটা অংকের যৌতুক প্রদানের প্রথার কারণে কাশ্মীরি পণ্ডিত সমাজে কন্যাশিশুর জন্মের সময় খরচাপাতি করার বেলায় খানিকটা হলেও অনাগ্রহ ছিল। ছেলেদের জন্মের পর এগার দিন পর্যন্ত তার পরিবার বা নিকটাত্মীয়রা কোনো অনুষ্ঠান করতে পারত না। তার আগে পুরো ১০ দিন শিশু ও শিশুর মাকে একটি ঘরেই থাকতে হতো। ১১তম দিনে মা ও শিশু দুজনে অন্য ঘরে যেতে পারত।  ওইদিনে ‘কাহনেতহার’ নামে একটি অনুষ্ঠান পালন করে শিশুর নাম রাখা হতো। মা-শিশুর গৃহবন্দিত্বের ছয় দিন পর তাদের একসঙ্গে স্নান করিয়ে দেয়া হতো, এই প্রথার নাম ছিল ‘সারান সুন্দর’। স্নানের দিন ভূর্জবৃক্ষের ছাল দিয়ে তৈরি মশাল শিশুর মাথার চারপাশে ঘোরানো হতো, তার ভবিষ্যৎ যেন ওই মশালের আলোর মতোই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এ আশায়। এ সময় বাড়ির সব সদস্যের উপস্থিত থাকা আবশ্যক। আর মশাল ঘোরানোর কাজটি ন্যস্ত হতো বাড়ির বয়স্কতম নারীর হাতে। মশাল ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি ‘সখ তা পুনাসুন’ বা ‘আরো সুখ ও সন্তান আসুক’ বাক্যবন্ধটি বারবার উচ্চারণ করতেন।


কাশ্মীরি পণ্ডিত পুরুষদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র ঘটনা গুরুর হাতে উপবীত ধারণ। ওইদিন গুরু কোনো কিশোরের দেহে পবিত্র উপবীত পরিয়ে দেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, এতে ব্রাহ্মণ হিসেবে বালকের পুনর্জন্ম ঘটে। পরে প্রবীণ গুরুর কাছে নবীন ব্রাহ্মণের ভিক্ষা চাওয়ার মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। এরপর ওই ব্রাহ্মণ কিশোরের গৃহে ‘ঘরনাভাই’ (ঘর পরিষ্কার), ‘মানজিরাত’ (কিশোরের হাত মেহেদিতে রাঙিয়ে দেয়া) ও ‘দেবাগন’ (স্নান ও অভিষেক)—এ তিনটি আচার পালন করা হয়। আত্মীয়স্বজন সাধারণত এ উপলক্ষে কিশোরের অভিভাবকদের কাছে উপহার হিসেবে পয়সা দিয়ে যেতেন। আর ঘরনাভাই প্রথা পালনের দিন থেকে বাড়ির কোনো নারী ভক্তিগীতি গাইতেন প্রতিদিনই। আর এসব উৎসব আয়োজনের পর সবকিছু যাতে ঠিকভাবে চলে সেজন্য ‘কুশল হোম’ নামের একটি বিশেষ পূজাও করা হতো। এ পূজা সাঙ্গ হলেই অতিথিরা ঘরে ফিরতে পারতেন। তার আগে নয়।

বিয়ের উৎসবের ক্ষেত্রেও উপবীত অনুষ্ঠানে পালিত কয়েকটি প্রথার পুনরাবৃত্তি করেন কাশ্মিরী পণ্ডিতরা। এক্ষেত্রে সেগুলো পালিত হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের আগে। বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন বরের আচকান, পাজামা ও রঙিন পাগড়ি পরা বাধ্যতামূলক। পরে তার বাড়ির উঠানে লেবু ও রঙ মেশানো কাদা দিয়ে পবিত্র চিহ্ন আঁকা আলপনার ওপর দাঁড়িয়ে বাড়ির প্রবীণতমা নারীর আশীর্বাদ নিয়ে কনের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা হয়। জন্মোৎসবের মতোই এদিনও বরের মাথার চারপাশে জ্বলন্ত প্রদীপ ঘুরিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। ওই সময় বাড়ির অন্য সদস্যরা বরের ওপর মণ্ডামিঠাই ও টাকা ছিটাতে থাকেন। কনের বাড়িতে বরের আগমনের পর ওই একই প্রথা ফের পালন করা হয়। এরপর শুরু হয় বিয়ের আসল পর্ব ‘লগন’। লগনের সময় কনে ও বরের বাড়ির পারিবারিক পুরোহিতরা একসঙ্গে বিয়ের মন্ত্র পড়তে থাকেন, বর-কনে সাতবার অগ্নিশিখা প্রদক্ষিণ করার পর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মৃত্যু-পরবর্তী প্রথা পালন ভারতের অন্য এলাকার ব্রাহ্মণদের মতো হলেও তারা কিছুটা বিস্তৃত আকারে তা পালন করতেন। একালে সাধারণত মৃতদেহকে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে শ্মশানে নেয়ার আগে একটা ছোট শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হয়। কিন্তু আগেকার দিনে মৃতদেহ পোড়ানোর আগে তারা ৫-৭ ঘণ্টা ধরে মৃত্যু দেবতা যমের উদ্দেশে নির্বাণপ্রাপ্তির আশায় প্রার্থনাগীতি গাইতেন ও মন্ত্রপাঠ করতেন। পরে মৃতের পুত্র বা পুরুষ নিকটাত্মীয়দের দ্বারা মুখাগ্নির পর শবযাত্রীরা নদীতে স্নান করে ঘরে ফিরতেন। পরের ১০ দিন শ্মশানঘাটে প্রতি সকালে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পর মৃতের পুত্র বা মুখাগ্নি করা ব্যক্তি নিজের মাথা কামিয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আপাত সমাপ্তি ঘোষণা করতেন। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরের এক বছর ধরেই প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হতো।

শিবরাত্রি কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পালিত প্রিয়তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব নিঃসন্দেহে। ফাল্গুনের কৃষ্ণপক্ষে তারা শিবরাত্রি পালন করেন। কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চম থেকে নবম দিবসে আয়োজনের প্রথম পর্ব চলত। ওই কদিনে ঘরদোর সাফসুতরো ও জামাকাপড় কেচে পাট করে রাখা হতো। দশম দিবসে বাড়ির মেয়েদের জন্য উপহার হিসেবে অর্থকড়ি পাঠানোর রীতি ছিল। ত্রয়োদশতম দিবসে বাড়ির কর্তাকে উপবাস করে শিবের উদ্দেশে পূজা চড়াতে হতো। চর্তুদশতম দিবস উৎসবের দিন। ওইদিন বাড়ির বড়রা ছোটদের মিষ্টি ও ফলমূল উপহার দিতেন। বাড়িতে মাংস-ভাত রান্না করে তা নিজেরা খাওয়ার পর আত্মীয়দের কাছেও পৌঁছে দেয়া হতো। পঞ্চদশতম দিবস উৎসবের দ্বিতীয় দিন। এদিনে শিবের উদ্দেশে নিবেদিত আখরোট পাড়াপ্রতিবেশীর মধ্যে বিলি করার চল ছিল।

বসন্তকালের আগমনও কাশ্মীরি পণ্ডিতরা বিশেষভাবে পালন করতেন। পহেলা চৈত্রের আগের দিন সন্ধ্যায় একটি ঝুড়িতে ধান, রুটি, একটি পয়সা, একটি কলমদানি, এক পাত্র দই, কয়েকটি আখরোট, রান্না করা ভাত ও কিছু ফুল একসঙ্গে করে সারা রাত রেখে দেয়া হতো। বাড়ির প্রত্যেক সদস্য ঘুম থেকে ওঠার পর ঝুড়ির যে জিনিসটি সবার আগে দেখবেন, তা নিজের কাছে রেখে দেবেন। সঙ্গে নেবেন একটি বা দুটি আখরোট। সকালের স্নানের পর ওই আখরোট নদীতে বিসর্জন দিতে হবে। নতুন বছরের প্রথম দিনও কাশ্মীরি পণ্ডিতরা প্রায় একই ধরনের একটি পার্বণ পালন করেন। এছাড়া লক্ষ্মীদেবীর কাছে মিষ্টি রুটি নিবেদনের পান উৎসবও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য পার্বণ।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জ্ঞান ও শিল্পচর্চা

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মধ্যে সংস্কৃত ব্যাকরণচর্চার বিশেষ এক ঐতিহ্য ছিল। সংস্কৃত ভাষার রীতিনীতি ও বিকাশের ইতিহাস তাদের হাতে নানাভাবে লেখা হয়েছে। পাণিনির ব্যাকরণ নিয়ে জয়াদিত্য ও বামন নামের দুই ব্যাকরণবিদ ‘কশিকাভৃতি’ নামের বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থ লিখেছিলেন আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে। ছন্দশাস্ত্র নিয়ে কাশ্মীরি পণ্ডিত পিঙ্গলাচার্যের ‘পিঙ্গল’, কেশমেন্দ্রর ‘সুভৃত তিলক’ বিশেষভাবে স্মরণীয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের বই লেখায়ও কাশ্মীরি পণ্ডিতরা সেকালে পিছিয়ে ছিলেন না। কোকা পণ্ডিতের লেখা ‘রতিরহস্য’, কল্যাণমালার লেখা ‘অনঙ্গ-রঙ্গ’ ও দামোদরগুপ্তর লেখা ‘কুট্টণীমত’ দেহমনের বিচিত্র রহস্য নিয়ে লেখা কয়েকটি গ্রন্থ। প্রাচীন গ্রন্থ ও ধর্মশাস্ত্রের টীকাভাষ্য রচনায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিশেষ আগ্রহ ছিল। যেমন গীতার একাধিক আলোচনা ও টীকাভাষ্যঋদ্ধ গ্রন্থ কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হাতে রচিত হয়েছে। কেশব, বাসুগুপ্ত, আনন্দবর্ধন, রামকান্ত, ভাস্কর, অভিনবগুপ্ত ও আরো অনেক পণ্ডিত গীতা বিষয়ে বই লিখেছেন। এদের মধ্যে বাসুগুপ্ত রচিত ‘বাসবী-টীকা’ গ্রন্থটিকেই কোনো কাশ্মীরি পণ্ডিতের লেখা প্রাচীনতম গীতাবিষয়ক গ্রন্থ বলে চিহ্নিত করা হয়।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চিত্রকলার দিকেও কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে নানা সূত্রে প্রমাণ মেলে। দামোদরগুপ্তর ‘কুট্টণীমত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের নারীদের অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই তরুণ বয়সে ছবি আঁকা শিখতে হতো। এর সঙ্গে অবশ্য পণ্ডিতদের পার্বণের একটা সম্পর্কও আছে। গৌরী-তৃতীয়া বা মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয় দিন বাড়ির প্রত্যেক মেয়ে (কখনো কখনো ছেলেও) বড়দের তরফ থেকে দেব-দেবী ও ফুল বা পশু-পাখির রঙিন চিত্রকর্ম উপহার হিসেবে পাবে, এমনটাই রীতি ছিল। আবার আষাঢ়-সপ্তমী বা আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তম দিবসে হাতে আঁকা উদিত সূর্যের ছবি দিয়ে ঘর সাজানোর প্রথাও ছিল।

 

তথ্যসূত্র:

কালচার অ্যান্ড পলিটিক্যাল হিস্ট্রি অব কাশ্মীর—পিকেএন বামজাই

কাশ্মীর আন্ডার দ্য সুলতানস—মহিবুল হাসান

আ হিস্ট্রি অব কাশ্মীরি পণ্ডিতস—জিয়া লাল কিলাম

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক