ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বহুকিছু ব্রিটিশ ভারত থেকে অনুপ্রাণিত। অর্থাৎ ভারতে ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন এখানে যে ধরনের প্রতিষ্ঠান, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল এখনো ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। বলা বাহুল্য, উনিশ ও বিশ শতকে ব্রিটিশ ভারতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল তা এসেছিল ব্রিটেন থেকে। কোম্পানি ও পরবর্তী সময়ে মহারানীর শাসনে যে ধারার কর্মী তৈরি হয়েছে তাও ছিল ওই লন্ডনের আদলে। ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতায় যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কেরানি সমাজ তৈরি হয়েছিল, প্রায় একই ধারার কেরানি সমাজ ছিল ব্রিটেন, তথা লন্ডনে। এখানকার বাবু বা ভদ্রলোকদের মতো সেখানেও একটি ‘জেন্টলম্যান’ গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল।
ব্রিটেনে কেরানিপ্রথা বহুদিন ধরে প্রচলিত। সময়ের সঙ্গে তাদের কাজ, জীবন সবই বদলেছে। লন্ডনের ক্লার্কদের তাই কাল অনুসারে ‘ভিক্টোরিয়ান’, ‘এডওয়ার্ডিয়ান’
প্রভৃতি ভাগে ভাগ করা হয়। তবে সব কালেই তা ছিল একটি কাঠামোবদ্ধ সিস্টেমের অংশ। কেরানির কাজ এখনকার দিনে একই কাজের পুনরাবৃত্তির উদাহরণ বলে ধরা হয়, কিন্তু এককালে লন্ডনে এ কাজকে শিল্পের সঙ্গে তুলনা করা হতো। প্রধান ক্লার্ক বা বুককিপারদের শিল্পী বা কারিগর উপাধি ছিল। কার্যালয়ে এরা ছিলেন অভিভাবকের মতো। তাদের অধীনে কাজ করতেন জুনিয়র ক্লার্করা। এদের মধ্যেও কিছু ভাগ ছিল—সাধারণ ক্লার্ক, কপি ক্লার্ক, অফিস বয় ইত্যাদি। শিক্ষানবিশী এবং পরবর্তী সময়ে কাজের মধ্য দিয়ে এরা দক্ষতা দেখাতে পারলে পদোন্নতি লাভ সম্ভব ছিল।
লন্ডনে কারা কেরানি হতো তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বলতে হয় অনেকে বংশগতভাবে কেরানির চাকরি করত। ক্লার্কের চাকরি ছিল তুলনামূলক সহজ। এ চাকরির জন্য যোগ্যতা কী লাগে তা নিয়ে Houlston’s Industrial Library থেকে
পাওয়া যায়:
A
little instruction in Latin, and probably a very little in Greek, a little in
Geography, a little in Science, a little in arithmetic and book-keeping, a
little in French, with such a sprinkling of English reading as may enable a lad
to distinguish Milton from Shakespeare are considered enough preparation for
aught that may turn up in the way of employment.
চাকরি করতে মূলত আসত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণমানের ছেলেরা। তখনো নারীদের চাকরি করার রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্লার্কদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি না হলেও দপ্তরে তাদের প্রয়োজন ছিল। ক্লার্কদের শিল্পী বা craftsman বলার
কারণ মূলত কাজের দক্ষতা ও নিপুণতা। দিনে দিনে তারা নিজেদের কাজ এবং কর্মস্থলের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলতেন। কর্মস্থলে পারস্পরিক সহায়তা এবং সম্মানের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হতো এবং মূলত কাজের এটিই ছিল রীতি। এর মধ্যে কেউ কেউ নিজেকে দক্ষ করে তুলতেন। এমনো হতো একজন ক্লার্ক সারা জীবন চাকরি করে বৃদ্ধাবস্থায় নিজেকে এতটা দক্ষ ও প্রয়োজনীয় করে তুলতেন যে কর্তারা তার বিকল্প খুঁজে পেতেন না। এ অবস্থায় সেই কেরানিই হয়তো নিজ পুত্র, ছাত্র বা আত্মীয়কে তার জায়গায় বসিয়ে দিত।
এমন প্রভাব সবার ছিল না। দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে প্রভাব তৈরি করতে হতো। এসব কারণে মজুরিতেও পার্থক্য ছিল। প্রত্যেক ক্লার্কের যোগ্যতা অনুসারে মজুরি নির্ধারিত হতো। আবার যোগ্যতা যাদের বেশি ছিল তারা কেরানিগিরিতে আটকে থাকতেন না। কর্মস্থলের ব্যবস্থাপনার নানা দায়িত্ব তাদের দেয়া হতো। যোগ্যতার পাশাপাশি কর্মস্থলের উচ্চপদস্থদের সঙ্গে যোগাযোগ, সুসম্পর্কও এখানে ভূমিকা রাখত।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে লন্ডনের কেরানিদের দুটি শ্রেণী চিহ্নিত করা যায়। এদের মধ্যে ব্যাংকিং, সিভিল সার্ভিস, ইন্স্যুরেন্স ও মার্কেন্টাইল ক্লার্করা তুলনামূলক সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারত। রোজগারের ভিত্তিতে এদের মূলত মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের উপায় ছিল। কিন্তু এ পর্যায়ের কেরানির সংখ্য ছিল কম। বেশিরভাগ কেরানির যা রোজগার ছিল তা দিয়ে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করা সম্ভব হতো না। এর বাইরে তৃতীয় একটি শ্রেণী ছিল, যারা স্বজনপ্রীতি এবং নানা প্রকারের যোগসাজসের মাধ্যমে চাকরি হাতিয়ে নিত এবং কাজের ক্ষেত্রেও অনেক সময় কম যোগ্যতা নিয়ে টিকে যেত।
লন্ডনের কেরানিদের জীবনে অন্যতম কাজ ছিল প্রতিষ্ঠানের নানা তথ্য গোপন রাখা। বলা হয়, একজন কেরানির অন্যতম গুণ হলো গোপনীয়তা রক্ষা করা। এদের জীবনের অনেকটা সময় কেটে যেত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং চাকরি চলে যাওয়ার ভয় নিয়ে। কিন্তু যে চাকরি হারানোর ভয় তারা করতেন, সেখানে সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার উপায় ছিল না। কোনো কোনো কেরানির বেতন ছিল সপ্তাহে মাত্র ১ পাউন্ড। ১৮৭৬ সালে পারসন্স লেখেন, I have seen
sober, well-educated, well-recommended clerks, possessed of first-rate business
qualifications, and conversant with one or two foreign languages, walking the
streets of London almost barefoot, reduced to the lowest depths of genteel
poverty, and have known such men calling at upwards of sixty offices a day in
the hope of obtaining employment, but without success.
এতকিছুর পরও কেরানি হতে চাওয়ার ইচ্ছায় কারো কোনো ঘাটতি ছিল না। বহুজন ক্লার্কের চাকরি গ্রহণ করে ‘ভদ্রস্থ’ জীবনযাপন করার ইচ্ছা রাখতেন। এমন না যে ক্লার্ক মানেই কোনো দপ্তরে চাকুরে। তিনি হতে পারেন কোনো ব্যক্তির সহকারী। ১৮৭৮ সালে লেখা প্রহসন Off the Track এ বিষয়ে আলোকপাত করে। বইয়ের চরিত্রটি নানাভাবে কেরানির চাকরি পেতে আগ্রহী। তার মতো আগ্রহী ব্যক্তির তখন কোনো অভাব ছিল না। কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় ছিল সে সময় কেরানির চাকরিকে কেন্দ্র করে ঠগ ও দালালদের উত্পত্তি হয়। চাকরি পাইয়ে দেয়া, সুপারিশ এমনকি মূল নিয়োগ কর্তার সঙ্গে সাক্ষাত্কারের জন্য দালালের মাধ্যমে আবেদন করতে হতো। এর পরও চাকরি পাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হতো না। বইয়ের চরিত্রটিও পায়নি। তাই শেষ অবধি সে বলে, ‘আমার
জীবনের সব সময়ের দারিদ্র্য কোনো এক দূরদর্শিতার কারণে হতে পারে। সম্ভবত আমার জীবনের এ একটি বিষয় আমি বহন করতে পারি। কেননা সকলেই প্রতিকূলতা বয়ে বেড়াতে পারে; সাফল্য সকলের জীবনে আসে না।’
এতসব প্রতিকূলতার পরও লন্ডনে ক্লার্কের চাকরির আবেদন কমেনি। বলা হয়, ১৪-৪৫ বছর পর্যন্ত সব বয়সের পুরুষ এ চাকরির আশা করতেন। কলকাতয় যখন ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর উদ্ভব হচ্ছে, তার আগ থেকেই লন্ডনে কোট-প্যান্ট পরে সময়মতো অফিসে হাজিরা দিয়ে টেবিল-চেয়ারে বসে নিয়মমাফিক কাজ করার মতো কর্মচারী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তার অবস্থা যেমনই হোক না কেন সেজেগুজে অফিস করা ছিল তার জন্য বাধ্যতামূলক। ঘরে বাইরেও সমানে ঠাট বজায় রেখে চলতে হতো। এরাই ছিলেন লন্ডনের ‘জেন্টলম্যান’। কেরানিরা কেমন ছিলেন সে সম্পর্কে লকউডের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করি। তিনি লিখেছেন—
একজন
ক্লার্ক
একজন
কারিগরের
তুলনায়
সম্পূর্ণ
ভিন্ন
জীবনযাপন
করেন—ভিন্ন
ধরনের
নারীকে
স্ত্রী
হিসেবে
গ্রহণ
করেন—তার
থাকে
ভিন্ন
চিন্তা,
ভিন্ন
সম্ভাবনা
এবং
ভিন্নধারার
কল্পনা।
একজন
ক্লার্কের
সঙ্গে
কারিগরের
পার্থক্য
হলো
তাদের
প্রতি
সমাজের
দাবি
এক
হলেও
সমাজের
প্রতি
তাদের
দাবি
আলাদা।
এটা
পোশাকের
বিষয়
না
যে
একই
সাদা
শার্ট
রোজ
পরা
হচ্ছে
কিনা,
বরং
জীবনের
সকল
ক্ষেত্রে,
এমনকি
পরিবারের
বাজেট
তৈরির
সময়েও
তারা
ভিন্ন।
নিঃসন্দেহে
কারিগরের
তুলনায়
ক্লার্কের
কাছে
বেশি
আশা
করা
হয়।
তার
উপার্জনও
ভালোভাবে
খরচ
করা
হয়।
সংক্ষেপে—অন্তত
একজন
মোহগ্রস্ত
কেরানি
বিষয়টি
বুঝতে
পেরেছে—‘বোকা
অভিভাবকেরা
তাদের
সন্তানদের
সাধারণ
পোশাকের
বদলে
জবরজঙ
পোশাকে
দেখতে
চায়;
তারা
মনে
করে
কেবল
কেরানিরাই
ভদ্রলোক,
কারিগররা
নয়।’
সূত্র:
The Calcutta
Kerani and the London Clerk in the Nineteenth Century: Life, Labour, Latitude
by Sumit Chakrabarti
আলী আমজাদ: প্রাবন্ধিক




