যদি হিসাব করতে বসি, তাহলে দেখা যাবে যে উনিশ-বিশ শতকের পরাধীন ও অবিভক্ত বঙ্গদেশের শিক্ষিত অথচ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাঙালি কেরানির জীবনে দুঃখের পাল্লাই ভারি। সুখ তার জীবনে কিঞ্চিৎ তো দুরস্ত—আধ কণার অধিকও কদাপি ছিল না। উপরন্তু, সঙ্গে লেজুড় হিসেবে যোগ দিয়েছিল পরিবারের গঞ্জনা ও সমাজের পক্ষ থেকে অযৌক্তিক সমালোচনা কিংবা সমালোচনার ছদ্মবেশে ধেয়ে আসা নির্মম তাচ্ছিল্য। তবে কেরানির অসহায়ত্বের নেপথ্য কারণ প্রকৃতপক্ষে কী, তা তলিয়ে বিচারের প্রবণতা তখন খুব একটা সুলভ ছিল না। সেকালের সংবাদপত্রে আর লেখকদের কলমে উঠে আসা কেরানিদের জীবনচিত্র মোটের ওপর উপরভাসা; কখনো রঙ্গব্যঙ্গের আড়ালে পুনরাবৃত্তিময় সমালোচনার দেখা মেলে, কখনোবা আবার পাই সেকেলে ভঙ্গিমার ‘ছ্যা ছ্যা’ মার্কা তাচ্ছিল্য। বাঙালি কেরানির জীবন ও নিয়তির দুঃখগাথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে গেছে প্রায় অধরাই।

সেকেলে পশ্চাত্মুখী ভাবনার বশবর্তী হয়ে অনেকে বাঙালির পেশা হিসেবে কেরানিগিরিকে বেছে নেয়ার সমালোচনা করেছেন বৈকি। যারা আগে বংশানুক্রমে ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিল, তারা কেন কেরানির চাকরি করতে গিয়ে উল্টো নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ করবে—এ প্রশ্নও উঠেছিল। কেরানিদের সমালোচনার সঙ্গে মিলেমিশে ছিল ইংরেজি শিক্ষাকে ঘিরে বক্রোক্তিও; কারণ, কেরানির চাকরিলাভের জন্য তখন অনেকেই ইংরেজি ভাষার পাঠ নিতে ইচ্ছুক ছিলেন। ১৮৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ‘সমাচার চন্দ্রিকা’-র এক সংবাদে দেখি, বাঙালিরা যেন কেরানির চাকরি পরিত্যাগ করে ‘বাণিজ্যাদিতে প্রবৃত্ত’ হন সেই পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর বছর দেড়েক পর, ৭ সেপ্টেম্বর ১৮৩৯-এ আরো তীব্র ভাষায় ‘সমাচার দর্পণ’ কোম্পানি আমলের কেরানিবৃত্তিকে আক্রমণ করে লিখল, ‘...এইক্ষণে ইহারা [বাঙালিরা] পূর্ব্বাবস্থা হারাইয়া কেরাণীর কার্য্য করিতেছেন। কেবল যে সেই সকল উপায় [আদি পেশা] হারাইয়াছেন এমত নহে শরীরের যে স্বাধীনতা তাহাও হারাইতেছেন।...’

সাহিত্যে এমন ভাবনার নিদর্শন পাই দুর্গাচরণ রায়ের ভ্রমণকাহিনীর মোড়কে লেখা ব্যঙ্গাত্মক নকশাধর্মী বই ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমণ’-এ (১৮৮০)। মর্ত্য ভ্রমণে আসা দেবতাদের বয়ানে কার্যত কেরানিবৃত্তি সম্পর্কে সেকালের সাবেকি বাঙালি সমাজের ভেতরে তৈরি হওয়া মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। যার মধ্যে কদর্য বর্ণ বিদ্বেষের ছাপও কখনো কখনো নজরে আসে। এ গ্রন্থে ব্রহ্মাদেব তাই কলকাতা শহরে এসে বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘কী আশ্চর্য! যাহাকে দেখি, যাহার সঙ্গে আলাপ পরিচয় করি, সেই কেরাণী। দোকানদার, মহাজন, অধ্যাপক, চিকিৎসক, চামার, কুম্ভকার, কর্ম্মকার আর চক্ষে দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলেই কেরাণী।...’ ব্রহ্মার বিস্ময়ের জবাবে তার সফরসঙ্গী বরুণদেব জানান: ‘...চাকরি করা বাঙ্গালীজাতির সংক্রামক রোগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নচেৎ যে অধ্যাপকের জগত্জুড়ে মানসম্ভ্রম, যাঁহার গৃহে বিদায়ের ঘটি, বাটি, থালা, ঘড়া রাখিবার স্থান হয় না, তিনিও নিজ ব্যবসায়ে ধিক্কার দিয়া পুত্রকে পনের টাকার কেরাণী প্রস্তুত করিতেছেন। যে কবিরাজ ধন্বন্তরি নামে পরিচিত হইয়া অর্জ্জিত ধন বহন করিয়া আনিতে পারিতেন না, তিনিও নিজ ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া পুত্রকে ইংরাজি শিখাইয়া কেরাণী প্রস্তুত করিতেছেন। যে কুম্ভকার উত্তম উত্তম ছবি ও পট আঁকিয়া স্বাধীনভাবে ৪০/৫০ টাকা উপার্জ্জন করে, সেও কাদা ছানা অতি জঘন্য ব্যবসায় বলিয়া নিজ পুত্রকে ইংরাজী শিখাইয়া কেরাণী তৈয়ার করিতেছে। এইরূপে ধোপা, নাপিত, মেথর, মুদ্দফরাস সকলেই কেরাণী হইবার জন্য হাত ধুইয়া বসিয়া আছে।...’

অনুরূপ মনোভাব লভ্য ১৯৩২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত লেখকের নামবিহীন সরস পুস্তক ‘সুরলোকে বঙ্গের পরিচয়’-এও। ‘আপামর সকল জাতি’ কেরানিগিরিতে ‘প্রবৃত্ত হইয়া কায়স্থের সর্বনাশ করিতেছে...’—বইয়ের শুরুতেই মেলে এমন ‘অভিযোগ’। কেরানির চাকরিতে ঢোকার সর্বব্যাপী প্রবণতার কারণেই নাকি বাঙালির সর্বনাশ ঘটছে; সবাই কেরানি হতে চায়, তাই মিষ্টি থেকে ছুরি, সবকিছুর মান পড়তির দিকে—‘মোদক কেরাণী হইয়া, উত্তরকালে সন্দেশ বিস্বাদু করণের উপক্রম করিয়াছে। কৃষকেরা কেরাণী-কর্ম্মচারী হইয়া, উপাদেয় ফল শস্য উৎপাদনের হানি জন্মাইতেছে; পরে যে খাদ্যদ্রব্যের দশা কী হইবে বলা যায় না। দেশীয় অস্ত্র আর পূর্ব্ববৎ তীক্ষ হয় না। হইবে কেন? স্বজাতীয় ব্যবসায়ে আর তাহাদিগের পূর্ব্ববৎ যত্ন নাই।’ ১৮৮০ সালে কেরানি প্রসঙ্গে বরুণদেবের মুখে যে বক্তব্য বসিয়েছিলেন দুর্গাচরণ, তা পাক্কা বাহান্ন বছর পর ছাপা হওয়া ‘সুরলোকে বঙ্গের পরিচয়’-এর অজ্ঞাতনামা লেখকের কলমে উঠে আসা বিশ্লেষণের চেয়ে মোটেও ভিন্নতর কিছু নয়। উল্টো, দুইয়ের মধ্যে মিলই বেশি। অর্থাৎ সময়ান্তরে কি অর্ধশতকের ব্যবধানেও বাঙালির ভাবনার বদল খুব একটা ঘটেনি।

আবার ঔপনিবেশিক জামানায় আপাত শিক্ষিত বাঙালিদের কেরানিগিরির প্রবণতা (যদিও নিতান্ত বাধ্য হয়েও অনেকে তখন কেরানির চাকরি করতেন) ও এতে সৃষ্ট মানসিক পরাধীনতাকেও কষে দুই ঘা দিতে চেয়েছেন কোনো কোনো ‘র্যাডিক্যাল’ চিন্তক ও সমাজ সংস্কারক। এ প্রসঙ্গে উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারক, ব্রাহ্ম সমাজের নেতা ও পেশায় আইন ব্যবসায়ী বিপিনবিহারী বসুর ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘বিটকেলের দপ্তর’ গ্রন্থের ‘কেরাণী রহস্য’ শীর্ষক এক রচনার দিকে চোখ ফেরাই। কেরানিশ্রেণীর ইতিহাস বিচার করতে গিয়ে প্রায় ১৪০ বছর আগে তিনি যে বয়ান হাজির করেছিলেন, ব্যঙ্গের মোড়ক সরিয়ে তা পড়লে উঠে আসে কেরানিকুলের অসহায়ত্ব, মানসিক দাসত্ব ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার চালচিত্র: ‘...এ সম্বন্ধে অনেক তর্কবিতর্ক হইয়া সিদ্ধান্ত হইয়াছে যে, পশ্বাবলির ভিতরে কেরাণী সর্বশ্রেষ্ঠ।... কেরাণী সোজা হইয়া চলিতে পারে ও মনুষ্যের ন্যায় কথা কহিতে পারে। ডারউইন দর্শন মতে, কেরানী বানরজাতি হইতে অনেকাংশে উচ্চশ্রেণীর এবং অনেকটা মনুষ্যজাতির নিকটবর্ত্তী। কেরাণীরা হাসে, কাঁদে, গান গায়, কর্ম্ম কাজ করে, ঘুমায় ও মরে।...’ বস্তুত, সেকালের বাঙালি কেরানির অধিকাংশের জীবনচিত্রই যেন ছিল এই। তাতে চড়াই-উত্রাই বা আনন্দ বিশেষ নেই; নেই জীবনকে উপভোগের বা প্রকৃতরূপে যাপনের সুযোগ। বিপিনবিহারী ওই রচনায় আরো লিখেছেন যে, শাসকশ্রেণীর কাছে ‘প্রকৃত’ কেরানি হয়ে ওঠার একমাত্র উপায় নাকমুখ গুঁজে ‘পড়ালেখা করা’, তবে সত্যিকার জ্ঞানের অধ্যয়ন নৈব নৈব চ। কারণ, ‘সাহিত্য, বিজ্ঞান, রাজনীতি ইত্যাদি পড়িয়া স্বাধীনচিন্তা করিতে আরম্ভ করে’ যদি! তাই সেকালের কেরানিবৃত্তি কার্যত যেন ছিল দাসবৃত্তিরই ‘সুশীল’ রূপ: ‘... কেরাণীর প্রভুভক্তি ভয়ানক গাঢ়। যদি কখনো প্রভু আদব করিয়া কাটুকাটব্য বর্ষণ করেন কেরাণী তন্নিমিত্ত ক্ষুব্ধ হন না কিম্বা কোনোরূপ গোলযোগ করে না।... যদি কখনো প্রভু খাসকামরায় ডাকিয়া বলেন ‘তুমি বড় গাধা’ কেরাণী বাহিরে আসিয়া বলে যে প্রভু তাহার সহিত পরামর্শ করিবার জন্য ডাকিয়াছিলেন।...’ ‘কেরাণী রহস্য’-এ বিবৃত বাঙালির কেরানির ইতিকথায় ভাষিক সহমর্মিতার ঘাটতি আছে, এ কথা অবশ্য কেউ কেউ বলতে পারেন। তবে এও বলা যায়, হয়তো বিপিনবিহারী নানা ভারে ন্যুব্জ সেকালের কেরানিসমাজকেই ‘আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচানোর’ তরিকায় ব্যঙ্গের আঘাতে সচেতন করতে চেয়েছিলেন।

কেরানিদের প্রতি সেকালের তুলনামূলকভাবে সহমর্মী ও সহূদয় বাংলা রচনার উত্তম উদাহরণ ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘কেরাণী পুরাণ’। এর লেখকের নাম জানা যায়নি। বইয়ের শুরুটা উনিশ শতকের আর দশটা রঙ্গব্যঙ্গধর্মী ‘বটতলার বই’য়ের মতো হলেও ব্যতিক্রম এর অন্তের ‘উদ্ধারপর্ব্ব’। বইয়ের এ উপসংহারে অজ্ঞাতনামা লেখক সবিনয়ে জানান, ‘কেরাণীর কষ্টের কথা প্রকাশ করে বড় লোকদের দয়া উদ্দীপন করাই’ বক্ষ্যমাণ পুস্তকের মুখ্য উদ্দেশ্য। উনিশ শতকের গড় বাঙালি মনোভাবের নিরিখে কখনো কখনো ‘কেরাণী পুরাণ’-এর উপসংহারে ‘কেরাণী জীবনের উন্নতিকল্পে’ উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোকে খানিক বৈপ্লবিক মনে হতে পারে। যেখানে অধিকাংশ বাঙালিই আধুনিক শিক্ষাকে কেরানিগিরি ও তাদের অসহায়তা তৈরির মূল কারিগর মনে করতেন, সেখানে ‘কেরাণী পুরাণ’ বলছে—‘যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মেডিকেল কলেজ প্রভৃতি আছে সেইরূপ কেরাণীগিরির কলেজ চাই, যেখানে প্রবেশ করিবার পূর্ব্বে এনট্রান্স পাশ করা চাই, এখানে দুই বৎসর কাল উচ্চ কেরাণীগিরির নিয়মে উপযুক্ত শিক্ষালাভ করিয়া ছাত্রেরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবেন এবং ৫০ টাকার ওপরের মাহিনার কাজ তাঁহারা ব্যতীত আর কেহ পাইবে না।...’ তবে এ বইতে স্ববিরোধী মন্তব্যও কম নয়; ওই উপসংহারে কেরানি-কলেজের কথা বা কেরানিগিরিকে যথেষ্ট মর্যাদা সহকারে উপস্থাপন করার পরও নামহীন লেখক একদম শেষে এসে আবার ‘দুঃখী কেরাণী ভাই’-দের ‘কৃষিকাজে মন’ দেয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বসেছেন: ‘...চাষ আরম্ভ কর... উন্নতভাবে এবং অধিকতর পরিমাণে ধান এবং অন্যান্য শস্যের চাষ কর, শাকসবজির বাগান কর, তেজারাৎ এবং ধান বাড়ি কর... কৃষিকার্য্য বিষয়ক পুস্তক পাঠক কর এবং কৃষি বিদ্যালয় স্থাপন করে ভদ্রলোকের ছেলেদের চাষকার্য্য তত্তাবধারণ করিবার জন্য উপযুক্ত কর... সময় থাকিতে যদি এরূপ চেষ্টা না কর পরে অনেক দুঃখ পাইতে হইবে...তোমাদেরই ছেলেদের সরকার বা কেরাণী হইয়া খাইতে হইবে।...’

কেরানি প্রশ্নে রক্ষণশীল ঘরানার লেখকেরা অবশ্য যতটা জাতপাতের ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ততটা জীবনমান ও জীবিকার সংকটের প্রশ্নকে দেননি। অন্যপক্ষে বিপিনবিহারী বসুর মতো সমাজ সংস্কারকরা ব্যঙ্গের সাহায্যে কেরানির অসহায়ত্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন, কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রাখেননি। আর ‘কেরাণী পুরাণ’-এর লেখকের মতো ব্যক্তিরা কেরানিবৃত্তি ও আদি জীবিকা নিয়ে দ্বিধায় ভুগেছেন। উপনিবেশকালে আদিপুরুষের জীবিকা ছেড়ে বাঙালি দলে দলে কেরানির চাকরিতে যোগ দিয়েছিল রাষ্ট্রনীতির ফেরে পড়েই, নেহাত ভালোবেসে সে কেরানিগিরিকে আপন করে নেয়নি। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেরানির জীবনকে দেখার চেষ্টাও সেকালের বাঙালি সমাজে অল্পস্বল্প হলেও ছিল। নরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রকাশিত-সম্পাদিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘জন্মভূমি’-র সপ্তম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (বৈশাখ ১৩১৬ বঙ্গাব্দ) প্রকাশ পাওয়া নগেন্দ্রনাথ বিদ্যাম্বুধির ‘কেরাণী তত্ত্ব’ শিরোনামের লেখাটি সেই অল্পের মধ্যে একটি। নগেন্দ্রনাথ ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে লিখেছেন, ‘...অন্যান্য দেশবাসী যখন প্রথম এ দেশে আসিয়া ব্যবসার পত্তন করিলেন... [তখন] ইংরাজী শিখিয়া ব্যবসায়ীর দপ্তরে কর্ম্ম করা তখন সাধারণের পক্ষে একটি প্রলোভনের সমাগ্রী হইয়া উঠিল।...ক্রমে যখন কেরাণী সংখ্যায় অতি বৃদ্ধি হইল, তখন কেরাণীবৃত্তির প্রতিযোগিতা ও কেরাণীর প্রতি অসম্মান অবিচার অনাদর আরম্ভ হইল।...’ স্রেফ কাঁড়ি কাঁড়ি অভিযোগ না তুলে, তলিয়ে কেরানির দুরবস্থার হেতু নির্ণয়ের চেষ্টাও এখানে লক্ষণীয়: ‘...কেরাণীর অবস্থা শোচনীয় এ কথা সর্ব্ববাদী সম্মত, কিন্তু কেরাণী নির্বিবাদে লাঞ্ছনা ও অবমাননা সহ্য করে বলিয়া যে সাধারণ লোকে বিশিষ্টরূপে কেরাণীকে হেয় ও অপদার্থ বলিয়া ঘৃণা করে সেটা ন্যায়সঙ্গত কিনা বিচার করিয়া দেখা আবশ্যক। সাংসারিক সামাজিক নৈতিক কার্য্য করিবার, কথা কহিবার, এমনকি চিন্তা করিবারও অবসর হইতে কেরাণী বঞ্চিত... কেরাণী তোষামোদ করে, অবমাননা সহ্য করে নিজের ও পরিবারবর্গের ভরণপোষণের উপয়ান্তর নাই বলিয়া—কেরাণী যদি অপমান সহ্য না করে তাহাতে তাহার নিজেরই ক্ষতি অপরের কোন ক্ষতি হয় না।...’ তাহলে কেরানিজীবন থেকে এ অনাদর-অপমান ঘোচাবার উপায়ই বা কী? তারও খানিক নিদান এ নিবন্ধের অন্তে লেখক দিয়েছিলেন: ‘...উপার্জন-ক্ষেত্রে একটা পথ কণ্টকাকীর্ণ হইলে লোকে অন্যপথে যাইবার চেষ্টা করে কিন্তু যদি দ্বিতীয় পথ উন্মুক্ত না থাকে তবে বাধ্য হইয়া তাহাকে কাঁটাপথেই চলিতে হয়; কাঁটায় বিক্ষতপদ হইলেও সে পথ হইতে আর ফিরিবার জো নাই। কেরাণীরও সেই অবস্থা। তাঁহারা ঐ এক পথ ছাড়া অন্য পথ সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ কাজেই বাধ্য হইয়া কেরাণীকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনারূপ কণ্টকে পদে পদে ক্ষতবিক্ষত হইয়াও সেই পথে চলিতে হয়। যদিও কখনও বর্ত্তমান শিক্ষার স্রোত ফিরিয়া যায়; কেরাণীবৃত্তিই শিক্ষার চরম উদ্দেশ্য না হয়, কেরাণীগিরি ছাড়া অন্য কোনো বৃত্তির শিক্ষালাভ করিয়া বিদ্যালয়ের ছাত্রগণ সংসার-ক্ষেত্রে বাহির হইতে পারে...তবেই কেরাণীর উত্পন্ন হ্রাস হইবে, কেরাণীর আদর বাড়িবে, কেরাণীর লাঞ্ছনা কমিবে, নতুবা কেরাণীর যে দুর্দ্দশা সেই দুর্দ্দশা চিরকালই রহিয়া যাইবে।...’

আদতে রক্ষণশীল বা প্রগতিবাদী—দুই পক্ষই বেশির ভাগ বাঙালি লেখক-বুদ্ধিজীবী কেরানিগিরির সংকটকে ব্যক্তির সংকট হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু কেরানিদের অমর্যাদা ও বেহাল দশার নেপথ্যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ও তার রাজনীতি যে কতটা দায়ী—তা বিচার করে দেখেননি। ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের বৈশিষ্ট্যই ছিল এমন, তার কলকব্জা তথা কেরানি হয়ে যে-ই যেখান থেকে ঢুকুক না কেন—তাকে অসহায়ত্ব ও পরাধীনতাকে কবুল করে নিতেই হবে। এর অন্যথা হওয়ার জো সে আমলে ছিল না। তা সে কেরানি দরিদ্র পরিবার থেকে আসুক কি অভিজাত ঘরের সন্তান হোক। যেমন ধরা যাক, শশীচন্দ্র দত্তের কথা। কলকাতার বিখ্যাত রামবাগানের দত্ত পরিবারের ছেলে শশীচন্দ্র ১৮৪২ সালে সরকারি কোষাগারে কেরানি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ইংরেজি সাময়িকী ‘মুখার্জি’স ম্যাগাজিন’-এ ১৮৭৩-৭৪ সালে চোস্ত ইংরেজিতে ধারাবাহিক আকারে লিখেছিলেন খোদ নিজের কেরানি জীবনের স্মৃতিকথা, Reminiscences of a Keranis life। তার কেরানিজীবনের বিবরণ পড়তে গেলে দেখতে পাই, একজন ‘সাধারণ’ ঘর থেকে আসা কেরানিকে যে যে হ্যাঁপা পোহাতে হতো সেকালে—‘বড়’ ঘরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তেমন সব বিড়ম্বনা থেকে তিনিও রেহাই পাননি। কেরানিগিরিতে ঢোকার পর তিনি প্রথমেই যে কয়টি জরুরি শিক্ষা পেয়েছিলেন, তার অন্যতম—‘কর্তাদের কোনো ভুল হতে পারে না’। একবার এক ইংরেজ ছোট সাহেবের সঙ্গে বসে শশীচন্দ্র হিসেবের খাতা মেলাচ্ছিলেন। এমন সময় তার নজরে এল মোট হিসেবে একটা গরমিল হয়েছে। ‘কিছুটা আন্দাজে আর কিছুটা মকসোর জোরে’ তিনি ভুলটা সাহেবকে দেখালেন। কিন্তু ‘ছোট সাহেব তাতে চটে লাল।’ উল্টো তিনি হাঁক ছাড়লেন, ‘আঁক তিনি ঠিকই কষেছেন, আসলে আমিই হলাম রেওয়ার কাজে অচল।’ কিন্তু কিছু সময় পর যখন শেষমেশ প্রমাণ হলো যে শশীচন্দ্রের ধারণাই ঠিক ছিল—তখন ছোট সাহেব নিজের ভুল স্বীকার না করে পাল্টা গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘এই রকম একটা বেআন্দাজ গাফিলতি, না; বড় বেয়াকুবি হয়ে গেছে। তুমিও দেখছি আজব লোক, এই মামুলি ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারলে না? দু ঘণ্টা আমার সঙ্গে সঙ্গে বসে বসে হিসেব করে যাচ্ছ। আমার যদি ছোট কোনো গলদ হয়েও যায় তুমি তখন সেটা বলবে না?’ শশীচন্দ্র এ ঘটনার উল্লেখ করে খেদসমেত লিখেছেন, ‘...আমার বদনাম করলে যেন নিজের ঘাড় থেকে গাফিলতির দায়টা খালাস হয়ে যায়। কী আর করা, পুরোটাই চুপচাপ বরদাস্ত করতে হয়। এই হল চাকরি করার আঞ্জাম। এখানে বদনামও মুখ বুজে সইতে হয়। চাকরি মাঝে মাঝে তাই অসহ্য হয়ে ওঠে। রোজ এমন ঘটে না ঠিকই তবে খারাপ লাগার রেশ অনেক দিন থেকে যায়। এই রকম মামুলি বেইজ্জত হওয়া যদি তোয়াক্কা না করতে চান তাহলে তার জন্য দরকার দার্শনিক মানসিকতা...।’

এমন পরিস্থিতি দেখেই হয়তো বিনয়কুমার সরকারের মতো পণ্ডিত একদা চেয়েছিলেন, বাংলায় ‘কেরাণীর স্বরাজ’ প্রতিষ্ঠা হোক (‘নয়া বাঙ্গালার গোড়া পত্তন’, ১৯৩২, পৃষ্ঠা ১২১)। কিন্তু তা কি আর হওয়ার?

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক