মুনশি থেকে কেরানির যাত্রা ছিল মধ্যযুগ থেকে ভারতবর্ষের আধুনিক রাষ্ট্র পরিচলন পর্বে প্রবেশ। মোগলদের ছিল মুনশি আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন তৈরি করল কেরানিদের। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে বাতুতার বিবরণীতে ভারতে কেরানির উপস্থিতির কথা জানা যায়। আইন-ই-আকবরিতেও উল্লেখ পাওয়া যায় কেরানির। এ গ্রন্থে আবুল ফজল জানিয়েছেন, এরা জাহাজে হিসাবপত্র রাখতেন। মুনশিদের জীবন কোথাও স্থির থাকত না। কারণ তাকে সবসময় থাকতে হতো তার কর্মদাতার সঙ্গে। অন্যদিকে কেরানির ছিল নির্দিষ্ট দপ্তর, দাপ্তরিক কক্ষ, কপাল ভালো থাকলে চেয়ার-টেবিলও।

ঔপনিবেশিক আমলে মুনশি থেকে কেরানির রূপান্তর সম্পন্ন হয়েছিল। মুনশিরা ছিলেন মূলত ফারসি জানা মুসলিম কর্মচারী। এছাড়া হিসাব ও রাজনীতি নিয়ে তাদের ভালো ধারণা থাকত। এরা ছিলেন মধ্যবিত্ত। নির্দিষ্ট কোনো শাসকের প্রতি তাদের কোনো মোহ-আনুগত্য ছিল না। এ কারণে তারা নানা ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন। ব্রিটিশরা শুরুতে এ মুনশিদের ব্যবহার করেছিলেন কলকাতায় হাজির হওয়া তাদের তরুণ কর্মকর্তাদের ভারতীয় ভাষা শিক্ষা দেয়ার কাজে। প্রতিটি জেলা সদরেই ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বাংলোয় গিয়ে এ মুনশিরা তাদের প্রাইভেট শিক্ষা দিতেন। ১৮২০-৫০ সালের মধ্যে আধা স্বাধীন মুনশি ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিপর্যায়ে ভাষা শেখানো মুনশিদের ধীরে ধীরে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের কেরানি করে নেয়া হয়। তাদের কর্মস্থল হয়েছিল জেলার কাচারিগুলোয়। প্রাথমিকভাবে ফারসি ভাষায় লিখিত জমির দলিল যাচাই, ফারসিতে দাপ্তরিক চিঠি লেখা, অর্থাৎ আধুনিক দপ্তরের দাপ্তরিক কাজে আরো নির্দিষ্টভাবে যুক্ত হচ্ছিলেন তারা। স্বাক্ষর, প্রশিক্ষণ, দক্ষতাভিত্তিক কাজের মতো আধুনিক দাপ্তরিক অনুশীলন বিস্তৃত হতে শুরু করে।

মুনশিদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একসময় দপ্তরগুলোয় তৈরি হয় মুনশিখানা—মুনশিদের কর্মস্থল। এ মুনশিখানাগুলো ছিল জেলা কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা বিচারকের দপ্তর, কোর্টরুম কিংবা রেকর্ডরুমের কাছাকাছি। এ মুনশিখানা ছিল লেখা ও দাপ্তরিক কাগজপত্র নিরাপদে সংরক্ষণের জায়গা। এজন্য এখানে কাগজ রাখার শেলফ থাকত। এর ফলে মুনশিখানায় দেয়াল উঠতে শুরু করে।

১৮৩৭ সালের পর থেকে লর্ড বেন্টিংকের নির্দেশনা অনুসারে ভারতীয়দের দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজের জন্য প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি। এ প্রক্রিয়ায় অফিসে ইংরেজি ও হিন্দুস্তানি ভাষাকে যোগাযোগের মাধ্যম করা হয়। এর পর থেকে মুনশিখানা হয়ে উঠতে থাকে ইংরেজ দপ্তর। কাচারিগুলোয় মুনশিখানার চেয়ে এ রকম ‘ইংলিশ অফিস’ বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এখন কোর্টরুমের কাছে থাকে ইংলিশ অফিস, মুনশিখানা তার পরে।

কেরানির কাজে স্বভাবতই ইংরেজি জানারা ছিলেন সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী। খোদ ইংরেজ ও পর্তুগিজরা এ সময় সাহেবি কেরানিশালায় মুখ্য ভূমিকা নেয়। এরপর বাঙালিরাও ইংরেজি শিখে নেমে পড়ে কেরানি হওয়ার দৌড়ে। কেরানির কাজ ছিল কাগজে কলম পেষা। তাই হাতের লেখা সুন্দর হওয়ার বিশেষ গুরুত্ব ছিল বৈকি! শ্রীপান্থ তার কেরানী-পুরাণ নিবন্ধে লিখেছেন, ‘হাতের লেখা ভাল করার জন্য বাঙালি বাপ-মায়ের যত উদ্যম মনে হয় তার আদিতে রয়েছে অষ্টাদশ শতকের “ক্যালকাটা গেজেট”-এ প্রকাশিত রাইটার-সন্ধানী বিজ্ঞাপনগুলো। সেখানে স্পষ্টাস্পষ্টি বলে দেওয়া হত হাতের লেখা ভাল হওয়া চাই। যার হাতের লেখা ভাল নয় তাঁর দরখাস্ত করা বৃথা! সেই থেকে বাঙালির পণ যেমন করে হোক হস্তাক্ষর ভাল করতে হবে। উৎসাহে কী না হয়, কী না হয় চেষ্টায়? সত্যি সত্যি কিছু বাঙালি কিন্তু কেরানীর চাকরী পেয়েও গেলেন। লঙ সে-রহস্য ভেদ করেছেন ১৭৭৮ সনে এক সাহেবের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে। সাহেব লিখেছেন—নেটিভদের কেরানীর কাজ দেওয়া ভাল। সুবিধা এই ওরা বেশ পরিচ্ছন্ন করে ইংরাজী লেখে অথচ ইংরাজী ভাষা মোটে ভাল বুঝতে পারে না। তাতে গোপনীয়তা রক্ষা করা বেশ সহজ!’

বাঙালি কেরানিরা তখন সবে ইংরেজি শিখেছেন। তাই অন্ধ অনুকরণেই ছিল তাদের ভরসা। মাছিমারা কেরানি খ্যাতি(!) এ সময়েই জুটেছিল তাদের কপালে।

১৮৪০-এ কেরানিশালায় বাঙালির সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সে সময় গ্রিফিন ছদ্মনামে কেউ একজন লিখেছিলেন, কলকাতার অফিস-আদালতে অনেক নেটিভ রাইটার। কেরানি তখনো রাইটার নামে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ১৮৩৩ সালেই আইন করে কেরানি অর্থে রাইটার শব্দের ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছিল।

এমন সময়ের এক বাঙালি কেরানি বিখ্যাত হয়ে আছেন—শশীচন্দ্র দত্ত। হিন্দু কলেজের ছাত্র, ইউরোপীয় সাহিত্যে সমঝদার শশীচন্দ্র ১৮৪২ সালে সরকারি খাজাঞ্চিখানায় কেরানি হিসেবে যোগ দেন। 

ভারতের আইএএস অফিসার ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্য সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় তার এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আলাদা করে একজন সিভিলিয়ান বা একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটকে ইতিহাস চিনতে পারে বা পারত, কিন্তু আলাদাভাবে একজন সরকারি কেরানিকে তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে পাই না, আবার জনতার কাহিনিকারও কেরানিতে অনাগ্রহী। উচ্চবর্গে দমিত ও নিম্নবর্গে প্রবেশাধিকারবঞ্চিত হয়ে কেরানিরা ইতিহাসের অন্ধকারেই থেকে গেলেন।’    

 

এস এম রশিদ: লেখক