বিজিতের রাজপাটের হকদার বিজয়ী শাসক। হকদার তার শাহি হারেমেরও। হারেম কন্যারা জানতেন সে কথা। এই অলিখিত নিয়মের অন্যথা হয় না কখনো। অতএব মেনে নিতে হয়। মেনে নিয়েছিলেন প্রত্যেকেই। আবার অনেকেই প্রতিবাদ করেছেন। অইসান দৌলত বেগম—বাবরের নানি যেমন। কিংবা দারার বেগম রানাদিল, মালবরাজ বাজবাহাদুরের বেগম রূপমতী। এরা বিরোধিতা করেছেন। লড়াই করেছেন এ নিয়মের বিরুদ্ধে। লড়াইতে কেউ বা বিজয়ী, কেউবা শহীদ। রানাদিল, রূপমতীরা শহীদের দলে। ঔরঙ্গজেব হাজার চেষ্টা করেও রানাদিলের মন জয় করতে পারেননি। পারেননি আদম খানও। আকবরের দুধ ভাই আদম খান। তার দাই-মা মাহম আঙ্গার ছেলে। মালব জয় করার পর তার চোখ পড়েছিল রূপমতীর ওপর। ধরা দেননি রূপমতী। আত্মহত্যা করেছিলেন।
আত্মহত্যা করেছিলেন রানাদিলও। ঔরঙ্গজেব—দিল্লির বাদশা। যার সামনে আনত হিন্দুস্তানের তাবড় তাবড় বীর—সেই আলমগির পর্যন্ত অসহায় এই নারীর সম্মুখে। দারা প্রয়াত। জাহানারা-শাজাহান বন্দি। পাশে তার দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। তবু নতি স্বীকার করেননি। কন্যার সাহস দেখে ভড়কে গিয়েছিলেন আলমগির। অসহায়ের মতো প্রত্যক্ষ করেছিলেন রানাদিলের মৃত্যু। তবে অইসান বেগম, রানাদিল, রূপমতীরা ব্যতিক্রমই।
ব্যতিক্রমী লুত্ফাও। নৃশংস মিরনও তার সামনে জব্দ। চিরশত্রু সিরাজকে টুকরো টুকরো করে কেটে সেই টুকরোগুলো হাতির পিঠে চাপিয়ে সমস্ত মুর্শিদাবাদের মানুষকে ডেকে দেখিয়েছিল সে তার প্রতাপ। সিরাজের মৃতদেহ কবর দেয়ার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি সে। তার অনুচরেরা হাতির পিঠ থেকে সেদিন ছুড়ে ছুড়ে ফেলেছিল সিরাজের দেহের সেই কাটাছেঁড়া মাংসপিণ্ডগুলো। এক ওমরাহ্, মির্জা জৈন-উল-আবেদিন তার নাম, সেদিন সেই কাটা ছড়ানো টুকরোগুলো একটা কফিনে ভরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন খোশবাগে। নিজের আম্মিকে এ খোশবাগেই কবর দিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি। পরে তারও ঠাঁই হয় আম্মিজানের পাশে। সেখানে আলিবর্দির পাশেই দাফন করেন তিনি সিরাজকে।
লুত্ফা, লুৎফুন্নেসা—জানেন সে কথা। ঘসেটি-আমিনাকেও মিরন হত্যা করেছিল নৃশংসভাবে। তবু লুত্ফার প্রাণে ডর-ভয় নেই কোনো। মিরন তাকে নতুন শওহর বেছে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তুরন্ত জবাব মেলে, ‘হাতির পিঠে ঘুরে বেড়ানো যার অভ্যেস, গর্ধভ-বাহনে কি আর মন মজে তার!’
কোলে শিশুকন্যা ওম্মতজহুরা। মাথার ওপর কোনো ছায়া নেই। তবু অকুতোভয় লুত্ফা। বলছেন, রসসাগর কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ী। কৃষ্ণকান্ত রাজা গিরিশচন্দ্রের সভাকবি। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র এই গিরিশচন্দ্র। সিরাজের পতনে হাত ছিল নদিয়া-রাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরও। সিরাজের পতনের সঙ্গে জড়িত সমস্ত সংবাদ জানত তার রাজ-মহল। সেই সব গল্পকথা পুরুষানুক্রমে শুনে বড় হয়েছে এই রাজপরিবার। শুনেছিলেন গিরিশচন্দ্রের সভাকবি কৃষ্ণকান্তও। তার কাব্যে লিখছেন সে কথা—
লুত্ফ উন্নিসার
মত না
ছিল রূপসী
চিরদিন সিরাজের
প্রেয়সী মহিষী।
কারঘরে গিয়া
ঘর করিলে
এখন
সিরাজ মহিষী!
রবে তুষ্ট
তব মন?
মিরন যখন
এই প্রশ্ন
জিজ্ঞাসিল
সিরাজ মহিষী
এই কথাটি
বলিল
‘করি
পৃষ্ঠে চিরদিন
বিরাজ যাঁহার
গর্দভের পৃষ্ঠে
রুচি হয়
কি তাঁহার?
সামান্য বাঁদির এই অহংকার সহ্য হয়নি মিরনের। ‘বাঁদি’—হ্যাঁ, মিরন তাই মনে করে। সিরাজের ‘গদিনাশিন’—তাঁর পাটরানি তো আর নয় সে। তবু সিরাজের প্রণয় তার অহংকার। মিরনের সহ্য হবে কেন? আমিনা আর ঘসেটির সঙ্গে লুত্ফাকেও ঢাকায় পাঠিয়ে দেয় সে। নির্বাসনে। বন্দি জীবনে। হয়তো ঘসেটি-আমিনার মতো হত্যাই করত, সে সম্ভব হয়নি সাগরপারের সাহেবদের জন্য। তাদের হুকুমে লুত্ফাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল সে। এর পরের ইতিহাস? সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। এর আগে লুত্ফার এই বাঁদি পরিচয়ের ব্যাপারটা খোলাসা করে নেয়া যাক।
‘সিয়ার-উল-মুতাখিখরিন্’। বাংলার নবাবি আমলের ইতিহাস জানতে হলে যে বইটি খুলে বসতেই হয়, সেই বইয়ের লেখক গোলাম হোসেন বলছেন লুত্ফা ছিলেন ‘জারিয়া’—বাঁদি। তবে সামান্যা বাঁদিদের তুলনায় জারিয়াদের স্থান কিছুটা ওপরে। গোলাম হোসেন এবং তার পরিবার ছিলেন নবাব আলিবর্দির ঘনিষ্ঠ। সুতরাং তার দেয়া এই তথ্য সত্য বলেই মেনে নিতে হয়।
আবার বেভারিজ সাহেব বলছেন, সিরাজের বক্সি মোহনলালের বোন ছিলেন এই লুত্ফা। হিন্দু মোহনলাল নাকি নবাবের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধে আদায় করার জন্য তার এই ডাকসাইটে রূপসী বোনটিকে তুলে দিয়েছিলেন নারীলোলুপ সিরাজের হাতে। আর এই বোনের দৌলতেই সিরাজ-শাসিত মুর্শিদাবাদে ছিল মোহনলালের মস্ত বোলবোলাও—
He was accompanied in his flight by his favourite concubine
Lutfunnissa. I am informed that this lady was originally a Hindu and none other
than the sister of Mohan Lal.
আবার কোনো কোনো লোকগাথা বলছে ‘মোহনলালের বেটি’ এই লুত্ফা—
‘কি হলরে জান,
পলাশীর ময়দানে নবাব হারালো পরাণ।
মীরজাফরের দাগাবাজী নবাব ধরতে পাল্ল মনে
সৈন্য সমেত মারা গেল পলাশী ময়দানে।
ফুলবাগে মলো নবাব খোসবাগে মাটি।
চাঁদোয়া টানায়ে কাঁদে মোহনলালের বেটি।’
এদিকে ‘সিয়ার-উল-মুতাখিখরিন্’-এর অনুবাদক তাকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন দিল্লির কাঞ্চনি ফৈজির সঙ্গে। তবে সেসব ভুল তথ্য। সঠিক বলেছেন গোলাম হোসেনই। মুর্শিদাবাদে আলিবর্দি বেগমের মহল ছিল ‘জারিয়া’ লুত্ফার আবাস। অপরূপ রূপসী এ কন্যা। রূপের ছটায় তার দশদিক আলো। সিরাজ প্রথম দর্শনেই দিওয়ানা, সেই রূপ দর্শনে। তবে সহজে ধরা দেননি লুত্ফা। শাহজাদার কাছে এক শর্ত ছিল তার। নিকা করতে হবে তাকে। তবেই পূর্ণ হবে সিরাজের খোয়াব। অন্তত কিংবদন্তি এমনটাই বলে।
নিশ্চিত, এহেন শর্ত আরোপ সিরাজের পছন্দ হয়নি। নারীবিলাসী তিনি। নারী তার কামনার সঙ্গী। সে প্রথম কৈশোর থেকেই। লুত্ফার শর্ত মানতে বয়েই গেছে তার! তাছাড়া বাঁদিদের শর্ত আরোপের অধিকার কোথায়? আসলে সিরাজ-উত্তর জীবনে লুত্ফার সিরাজ-প্রেম প্রত্যক্ষ করেছিলেন যারা, তারা লুত্ফার প্রণয়কে সম্ভ্রমের চোখে দেখতে বাধ্য হয়েছিলেন। তখন থেকেই লুৎফুন্নেসা কিংবদন্তির নায়িকা। বাঁদির সাধারণ জীবন কি আর এমন নায়িকাকে স্পর্শ করতে পারে!
পারে না। কারণ তিনি অসাধ্যসাধনপটীয়সী। বহুগামী সিরাজ একমাত্র লুত্ফার কাছেই আনত হয়েছেন প্রেমে, ভরসায়। আর তা সম্ভবত সম্ভব হয়েছিল ফৈজির মৃত্যুতে। সিরাজের তখন প্রণয়-শুশ্রূষার বড়ই প্রয়োজন ছিল। ফৈজিতে মুগ্ধ সিরাজ আঘাত পেয়েছিলেন এই তন্বী বাইজির বিশ্বাসঘাতকতায়। সে মস্ত আঘাত। সেই আঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য আঁকড়ে ধরেছিলেন লুত্ফাকে। লুত্ফার ছায়া তাকে শান্ত করে। তার প্রণয়-প্রলেপে ভাঙা মন জোড়া লাগে সিরাজের। গাঢ় হয় তার লুত্ফার প্রতি প্রেম। আলিবর্দি বেগমের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। ‘জারিয়া’ লুৎফুন্নেসাকে নিকা করার জন্য নবাব আর বেগমের অনুমতি যাচ্ঞায়।
প্রস্তাব শুনে আঁতকে উঠেছিলেন বেগম সাহিবা। তার এই আদরের পোতা বাংলার ভবিষ্যৎ নবাব। সামান্য এক জারিয়াকে বিয়ে করা কি আর তার শোভা পায়? সিরাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। অজ্ঞাতকুলশীল কোনো কন্যা কি আর শাহি ঘরানার বহু হতে পারে! এতে প্রজাদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে যে! চাইলে সিরাজ তাকে মুৎআ বেগম করে হারেমে রাখতেই পারেন। এমন হাজারো বেগম থাকে নবাবজাদাদের হারেমে। এই নিয়ে কেউ কখনো কোনো প্রশ্ন তুলতে যাবে না। কিন্তু নিকা! সে নৈব নৈব চ।
সিরাজ মানবেন কেন! নিকা করবেন তিনি লুত্ফাকেই। এর জন্য মসনদ ছাড়তেও রাজি তিনি। এর পরও যদি বেগম সাহিবা তার আরজি মঞ্জুর না করেন, তবে নিশ্চিত ফকির হবেন তিনি।
ভয় পেয়েছিলেন আলিবর্দি বেগম। এই সিরাজকে তিনি চেনেন না। নবাবকে বলেছিলেন কথাটা। শুনে আলিবর্দির সেকি গোস্সা! বেগম শান্ত করেন তাকে। বোঝান, সিরাজকে নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। ‘গুর্বিনীর গর্ভ বিদারণ, জলে জনপূর্ণ পোত নিমজ্জন’—লোকমুখ সিরাজকে নিয়ে তৈরি করেছে এহেন প্রবাদ। সিরাজের এই নারীবিলাস যে একদিন তার পতনের কারণ হবে না, সে কে বলতে পারে! লুত্ফা জারিয়া হলেও মিষ্টি মেয়ে। সিরাজ তার বশ। এতে হয়তো প্রজাদের অন্তঃপুরেও স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়বে। অতএব এই বিয়েতে মঙ্গল হবে শাহজাদারই।
বেগমের এই যুক্তি, তার আরজি ফেলতে পারেননি আলিবর্দি। রাজি হয়েছিলেন বিয়েতে। সম্ভবত বিয়ের পরই শাহি রীতি মেনে সিরাজের এই প্যায়ারের বেগমের নতুন নামকরণ হয় লুৎফুন্নেসা। লুত্ফা, অর্থ ভালোবাসা। আর নেসা, বেগম।
কিংবদন্তি এমনটাই বলে। ঐতিহাসিকরা অবশ্য বলেন লুত্ফা সিরাজের মুৎআ বেগম। কারণ সমসাময়িক কোনো দলিল-দস্তাবেজে এই বিয়ে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য পাওয়া যায় না। সিরাজের গর্দিনাশিন বেগম ওমদাতুন্নেসার সঙ্গে নিকার বর্ণনা কিন্তু বেশ ঘটা করেই বর্ণনা করেছেন ঐতিহাসিকেরা। তা লুত্ফা মুৎআ বেগম হলেই বা কী! লোকে তো তাকেই সিরাজের বেগম বলে জানে। ওমদাতুন্নেসার নাম আর জানে ক’জনা! শাহি ঘরানার নিয়ম মেনে অল্পবয়সেই এই খানদানি কন্যার সঙ্গে নিকা হয়েছিল সিরাজের। মির্জা ইরাজ খাঁ ছিলেন এই কন্যার পিতা। এর আগে আলিবর্দির বড় ভাই হাজি আহম্মদের দামাদ আতাউল্লা খাঁর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার। বিয়ের আগেই মেয়েটি মারা যায়। সেদিক থেকে সিরাজের নিকা করা বেগম ওই একজনই, ওমদাতুন্নেসা।
সিরাজের দুর্দিনে ওমদাতুন্নেসার আব্বাজান, সিরাজের শ্বশুর ইরাজ খাঁ ত্যাগ করেছিলেন সিরাজকে। পাশে দাঁড়াননি তার। পলাশীর যুদ্ধে হারের পর তার সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন সিরাজ। প্রচুর অর্থের বিনিময়ে অবশ্যই। সাড়া দেননি ইরাজ খাঁ। নিজের আখের গুছিয়ে সিরাজকে একা ফেলে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
লুত্ফা কিন্তু ত্যাগ করেননি তার শওহরকে। আমৃত্যু তার স্মৃতি আঁকড়ে থেকেছেন। সিরাজের মৃত্যুর পর কোম্পানি তাঁর গর্দিনাশিন বেগমকে পাঁচশ টাকা পেনশন দিয়েছিল। নিজামত দলিলে বেগমের জায়গির আর এই পেনশনের উল্লেখ পাওয়া যাবে। হেস্টিংসের আমলে এই টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়ায় চারশ পঞ্চাশে। পরবর্তী সময়ে সেই টাকা কমতে কমতে যখন তিনশ পঁচিশ, তখন বেগম সাহিবা বাধ্য হয়ে পেনশন বাড়ানোর আরজি জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইংরেজ শাসকদের কাছে। লাভ হয়নি।
পেনশন দেয়া হয়েছিল লুৎফুন্নেসাকেও। তবে সে মাত্র একশ টাকা। এটাই প্রমাণ, মুৎআ বেগম ছিলেন তিনি। নয়ত পেনশনের পরিমাণ বাড়ত। এই একশ টাকার অতিরিক্ত আরও তিনশ পঞ্চাশ টাকা বাড়তি রোজগার ছিল তার। খোশবাগে আম্মিজানকে দাফন করার পর সমাধিভবনের খিদমতগারের জন্য তিনশ পঞ্চাশ টাকা তনখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আলিবর্দি। সেই তন্খা পরবর্তী সময়ে ভাত-কাপড় জুগিয়েছে তার নাতবউকে। ঢাকা থেকে তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসার পর ইংরেজদের সুপারিশেই খোশবাগের খিদমতগারের চাকরি জুটেছিল তার।
গ্যাস্ট্রেল সাহেব অবশ্য বলছেন, একশ নয়, এক হাজার টাকা পেনশন ছিল তার। নিখিল সরকার আবার সিরাজ-লুত্ফার কন্যা জহুরার উত্তরাধিকারীদের কাগজপত্র ঘেঁটে নিশ্চিত হয়েছেন লুত্ফার বৃত্তি ছিল একশ টাকাই।
সিরাজের প্যায়ারের বেগম লুত্ফা। এককালে লাখ লাখ টাকার জেবরাত ছিল তার। সেই জেবরাত কেড়ে নিয়েছিলেন মীর কাশেম। দানশা ফকিরের চক্রান্তে পলাতক সিরাজ তখন মীর কাশেমের বন্দি। পলাশীর যুদ্ধে হারের পর প্রাণ বাঁচাতে সিরাজ পালিয়েছিলেন রাজমহলের দিকে। যাওয়ার আগে হারেমের অন্যান্য বেগমদের তুলে দিয়েছিলেন ডুলিতে। সঙ্গে তাদের পঞ্চাশটা হাতি। সেই হাতির পিঠে বোঝাই করা সব ধনরত্ন।
বেগমদের কাফিলার অনুসরণ করেননি সিরাজ। তার যাত্রাপথ ভিন্ন। ভিন্ন তার সাজপোশাকও। শত্রুপক্ষের নজরে এড়াতে সামান্য এক ফকিরের ছদ্মবেশে পথে নেমেছেন তিনি। গন্তব্য রাজমহল। সঙ্গে বেগম লুৎফুন্নেসা আর তিন বছরের কন্যা ওম্মত্জহুরা। আবার অনেকে বলেন, ওম্মত্জহুরার বয়স তখন চার। বেগম আর কন্যা ছাড়াও সিরাজের সঙ্গে ছিল তার এক বিশ্বস্ত খোজা। ছিল এক পিটারাও। বহুমূল্য সব হিরে-জহরতে ভর্তি। স্থলপথে এগোননি তিনি। হীরাঝিলের পাশেই কোনো এক ঘাট থেকে নাওয়ে ভেসে ছিল তার রাজমহলের দিকে।
মহানন্দায় ভাসতে ভাসতে সিরাজের নাও এগোয়। মহানন্দা থেকে ভাসতে ভাসতে কালিন্দী। রাজমহলের ওপারে বড়ালে এসে থেমে যায় নৌকার গতি। সামনে নজিরপুরের মোহনা। এই পার হলেই গঙ্গা। তার নাও রাজমহল ছুঁয়ে ফেলল বলে।
কিন্তু কপাল মন্দ। নাও আটকে যায়। সামনে বিশাল চড়া। ভয় পেয়েছিলেন সিরাজ। মীর জাফর আর ক্লাইভের চররা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তিনদিনের ভুখা নবাবের চোখে জল। মাঝিরা ডাঙায় নাও ভিড়ায়। পথের সন্ধান জানতে ঘাটে নামে তারা। কোলে কন্যা জহুরা, পাশে লুত্ফাকে নিয়ে সিরাজ এগোন জনবসতির দিকে। সামান্য খিচুড়ির ব্যবস্থা হলেই সন্তুষ্ট তিনি।
চলতে চলতে এক মসজিদের সামনে এসে পা থমকায়। সেখানেই আশ্রয় নেয়া। এ মসজিদ ছিল দানশা ফকিরের। তাঁকে নিয়ে অনেক কিস্সা। জনশ্রুতি, সিরাজ অত্যাচার করেছিলেন তার ওপর। ‘তারিখ-ই-মনসুরি’ লেখক বলছেন, সিরাজ নাকি দাড়িগোঁফ কেটে দিয়েছিলেন তার।
কয়েকজন ইংরেজ ঐতিহাসিক আবার বলছেন, দাড়ি নয়, নাক। সেই থেকে সিরাজের ওপর দানশার মস্ত রাগ। অতএব দুর্দিনে সিরাজ তার আস্তানায় আশ্রয় নিলে দানশা প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগটি হাতছাড়া করেননি। ভুলে গেলেন তিনি ফকির। ভুলে গেলেন রহম করাই হচ্ছে ফকিরের ধর্ম।
ব্যস, খবর চলে গেল মীর কাশিম আর মীর দাউদ খাঁর কাছে। মীর দাউদ খাঁ মীর জাফরের ভাই। রাজমহলের ফৌজদার। মীর কাশিম আগে থেকেই সিরাজের সন্ধানে ছুটে এসেছিলেন রাজমহলে। দানশার সন্দেশ পেয়ে মীর দাউদকে নিয়ে তিনি ছুটে এলেন তার আস্তানায়। বন্দি করলেন সিরাজকে।
আর দানশাকে ইনাম দেয়া হলো বিশাল এক জায়গির। বলছেন হান্টার সাহেব। সেই থেকে নাকি দানশার সুভামার বা সুবামার নামে খ্যাতি। এদিকে বিভারিজ বলছেন, এসব গালগল্প। কারণ অনেকের মতে সিরাজের চরিত্র যেমনি হোক, ধর্মানুরাগী ছিলেন তিনি। তার দ্বারা কোনো ফকিরকে এভাবে অপমান করা সম্ভব নয়। আর অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় দানশার সমাধি-মন্দিরের ফলকলিপি আর বংশধরদের সঙ্গে কথা বলে প্রমাণ করে দিলেন যে সেই সময় মুর্শিদাবাদের নবাব বংশের এই মুরশিদ আদৌ জীবিত ছিলেন না। ছিলেন তার নাতিপুতিরা।
তবে সিরাজের বন্দিত্বের সঙ্গে দানশার নাম এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে অনেকেই মনে করেন সিরাজকে বন্দি করা হয়েছিল মৃত দানশার মাজার থেকেই। এসব বিবৃতি থেকে আলাদা বক্তব্য ই এইচ নোলানের। ‘দি ব্রিটিশ এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড দি ইস্ট’ গ্রন্থের লেখক তিনি। তা এই নোলান সাহেব বলছেন, এক অত্যাচারিত হিন্দুই নাকি সিরাজকে তুলে দিয়েছিলেন মীর কাশিমের হাতে।
হতেই পারে। এই একটি ঘটনাই পাল্টে দিল বাংলার ভবিষ্যৎ। সেদিন সিরাজ ধরা না পড়লে হয়তো বাংলার ইতিহাস অন্য রকম হতো। সিরাজ বন্দি হলেন। প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন মীর কাশিমের কাছে। জড়িয়ে ধরেছিলেন তার পা। লাভ হয়নি। কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাঙ্গলার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এক্ষণে কেহই তাঁহার অনুনয়-বিনয়ে কর্ণপাত করিলেন না। লুৎফুন্নেসা বেগম মীর কাশেমের হস্তগত হইলেন। মীর কাশেম ভয় প্রদর্শন করিয়া তাঁহার বহুমূল্য অলঙ্কার ও মুক্তাদির বাক্স হস্তগত করিলেন। দেখাদেখি মীর দাউদ ও অপর সকলেই অন্যান্য রমণীগণের ও সিরাজদ্দৌলার সমস্ত ধনরত্ন লুণ্ঠন করিয়া লইল। গোলাম হোসেন বলেন, মীর কাশেমের হস্তে যে জহরতের বাক্স পড়ে, লক্ষ ভিন্ন তাহার মূল্য নির্ণীত হয় না। উত্তরকালে ইহা মীর কাশেমের অর্থবলের প্রধান কারণ।’
ধরা পড়েছিলেন সকন্যা লুত্ফাও। দুর্ব্যবহার করেছিলেন মীর কাশিম তাদের সঙ্গে। ধরা পড়েছিলেন নবাবের হারেমের অন্যান্য বেগম। এর আগেই। তাদের ঠাঁই হলো আমিরদের হারেমে। লুত্ফা এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করায় তাকে দেয়া হলো নির্বাসন। ঢাকায়।
ধরা পড়েছিল পঞ্চাশটি হাতিও। সিরাজের সমস্ত সম্পদের মালিকানা তখন মীর জাফরের। দরবারি কোষাগার থেকেও উদ্ধার হয়েছিল প্রচুর টাকা। এই সমস্ত সম্পদের হিসাব দাখিল করা হয়েছিল ক্লাইভের কাছে। আর বেগম মহলের কোষাগার থেকে যে ৮ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়, সে সম্পদের সন্ধান ঘুণাক্ষরে জানতে দেয়া হয়নি ইংরেজদের। মীর জাফর, আমীর বেগ, রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ মিলে হাপিশ করেছিলেন সমস্ত টাকা।
একদিন এসব ঐশ্বর্য ছিল লুৎফুন্নেসার শওহরের। প্রিয়তমা বেগম হিসেবে এই সম্পদের ওপর ছিল তারও একচ্ছত্র অধিকার। কিন্তু শওহরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার প্যায়ারের বেগম হলেন বাঁদি। বাঁদি তবে অন্য কারো নয়। শ্বশুর বংশের সমাধিস্থলের সেবিকার জীবন বেছে নিলেন তিনি। কাজটা জুটেছিল ইংরেজদের অনুগ্রহেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন সিরাজের বেগম। চাইলেই খানদানি রইসদের হারেমে শানদার জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু বেগম থেকে পথের ভিখারি হলেও আলগা হয়নি তার আত্মসম্মান। কারো অনুগ্রহে বেঁচে থাকতে রাজি নন লুত্ফা। তাই খোশবাগের সেবিকার কাজটা মিলে যাওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন সিরাজের প্যায়ারের বেগম সাহিবা।
খোশবাগে আলিবর্দির নিজস্ব সমাধিস্থল দেখভাল করে পাওয়া সামান্য তন্খাতেই মা-মেয়ের দিন চলে যেত ভাত-কাপড়ে। সিরাজের মৃত্যুর পর আরো ত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন লুত্ফা। এই ত্রিশটি বছর তার ছায়া সিরাজের সমাধির কাছছাড়া হয়নি কখনো। শেষ দিন অব্দি। বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। মৃত্যুর পর তার ঠাঁই হয় সিরাজের সমাধির পাশেই।
সিরাজ পরবর্তী লুৎফুন্নেসার এই যাপনচর্যার বর্ণনা পাওয়া যাবে নিখলনাথ রায়ের ‘মুর্শিদাবাদ কাহিনী’তে। নিখিলনাথ রায় লিখেছেন, ‘কিছুকাল ঢাকা-বাসের পর লুৎফুন্নেসা ইংরেজদিগের যত্নে মুর্শিদাবাদে পুনরায়ানীতা হইয়া নবাব আলিবর্দি ও সিরাজের সমাধি খোশবাগের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হন। উক্ত তত্ত্বাবধানের জন্য মাসিক ৩৫০ টাকা নির্দিষ্ট ছিল। তদ্ভিন্ন তিনি ১০০ টাকা বৃত্তি পাইতেন।...সেই সময়ে তাঁহার শোচনীয় অবস্থার কথা স্মরণ করিলে পাষাণেরও হূদয় বিগলিত হয়। তাঁহার প্রিয়তম স্বামী এক্ষণে ধরণীগর্ভে শায়িত, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনও একে একে অনন্তপথে যাত্রা করিয়াছেন। তিনি এই বিশাল বিশ্বে একাকিনী। একটিমাত্র বালিকা অবলম্বন। এইরূপ অবস্থায় তিনি প্রতিদিন স্বামীর সমাধিপূজা করিতে আসিতেন। রৌপ্য ও স্বর্ণময় পুষ্পখচিত কৃষ্ণবর্ণ বস্ত্রদ্বারা সে-সমাধি আচ্ছাদিত ছিল। তিনি তথায় প্রতিনিয়ত দ্বীপ প্রজ্বলিত করিয়া দিতেন। এবং উদ্যানের সুগন্ধী কুসুম সকল চয়ন করিয়া অশ্রুজলসিক্ত সেই কুসুমরাশি প্রিয় পতির সমাধির উপর নিক্ষেপ করিতেন। সেই সময়ে বক্ষে করাঘাত করিতে করিতে তিনি ভূতলশায়িনী হইয়া পড়িতেন এবং অশেষ প্রকার করুণাদ্দীপক ক্রিয়া সম্পন্ন করিয়া শোকভার লাঘব করিতে চেষ্টা পাইতেন। এইরূপে স্বামীর সমাধিপূজা করিতে করিতে তাঁহার অন্তিমকাল উপস্থিত হইলে, লুৎফুন্নেসা স্বামীর চরণে মনোনিবেশ করিয়া, তাঁহারই পদতলে চিরদিনের জন্য সমাহিত হইলেন।’
একটি অধ্যায় ফুরোয়। আবার ফুরোয় না। বেঁচে থাকেন লুত্ফা। লোকের স্মৃতিতে। কিংবদন্তিতে। তাকে নিয়ে চারণ কবিরা গান বাঁধেন। সিরাজের প্রতি লুত্ফার প্রণয় লোকমুখে শাশ্বত হয়। তৈরি হয় রূপকথা। সেই রূপকথার নায়িকা লুত্ফা বেঁচে থাকেন সম্ভ্রমে, ভালোবাসায়। মানবহূদয়ে...
জয়িতা দাস: অধ্যাপক, গবেষক ও নন-ফিকশন লেখিকা




