প্রকৃত নাম মেহেরউননিসা বেগম। তবে এ নামে খুব কম মানুষই তাকে চেনেন। ইতিহাসে তিনি পরিচিত ঘসেটি বেগম নামে। নামটি শুনলেই কুচক্রী এক নারীর প্রতিকৃতি ভেসে ওঠে মানসপটে। ক্ষোভে ও ঘৃণায় ভ্রু কুঁচকে যায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাংলার স্বাধীনতা পরাহত হওয়ার ষড়যন্ত্রে যে জড়িত হয়ে আছে তার নাম। ইতিহাসের পাতায় তাই তার ঠাঁই হয়েছে খল চরিত্র হিসেবে। খল হলেও বাংলার ইতিহাসে তিনি অন্যতম শক্তিশালী নারী। এক্ষেত্রে মোগল শাহজাদি জাহানারার পর সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে রাজপরিবারভুক্ত নারীদের মধ্যে তার তুলনা বিরল। অষ্টাদশ শতকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার সব গুরুত্বপূর্ণ নায়ক ও শাসকের ভিড়েও যথেষ্ট আলো তিনি নিজের দিকে টেনে নিতে পেরেছিলেন। এতটাই যে তাকে বাদ দিলে নবাবি আমলের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
নবাব আলিবর্দি খানের মহলে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘ছোটি বেগম (ছোট বেগম)’ নামে। নবাবের তিন কন্যার মধ্যে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠা। অন্য দুজনের নাম যথাক্রমে মায়মুনা বেগম ও আমিনা বেগম। নবাবের কোনো পুত্র ছিল না। তিনি তার তিন ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে নিজের তিন মেয়ের বিয়ে দেন। বড় মেয়ে মেহেরউননিসার বিয়ে হয় তার বড় ভ্রাতুষ্পুত্র নওয়াজিস মুহাম্মদ খানের সঙ্গে। আলিবর্দি খান নওয়াজিসকে ঢাকার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই থেকে তিনি ‘ছোটা নবাব (ছোট নবাব)’ হিসেবে অভিহিত হতে থাকেন। আর তার বেগম হিসেবে মেহেরউননিসা ‘ছোটি বেগম’ অভিধা লাভ করেন।
নবাব মহলে ঘসেটি বেগমের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। তার স্বেচ্ছাচারিতা, একরোখা মনোভাব আর রাগের কারণে সবাই তাকে সমীহ করে চলত। স্বয়ং নবাব আলিবর্দি খানের ওপর তার ছিল ব্যাপক আধিপত্য। স্বাধীনচেতা ও উচ্চাভিলাষী ঘসেটি বেগম তার স্বামীর ‘ছোটা নবাব’ হওয়াটা মেনে নিতে পারেননি। তাই তিনি স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় না গিয়ে মুর্শিদাবাদে পিত্রালয়েই থেকে যান। ঢাকায় কিছুদিন থেকে নওয়াজিস খানও বেগমের সঙ্গে থাকার জন্য মুর্শিদাবাদে চলে আসেন।
নবাব আলিবর্দি খানের মসনদের অন্যতম দাবিদার ছিলেন তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতুষ্পুত্র নওয়াজিস মুহাম্মদ খান। উদারতা ও দানশীলতার কারণে প্রজাদের মাঝে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। আর ছিলেন মেজ ভ্রাতুষ্পুত্র সাইয়িদ আহমেদ। তিনি পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা ছিলেন। শওকত জং ছিলেন তার সন্তান, যিনি পরবর্তী সময়ে পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা হন। সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই হয় তার। ছোট ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন জয়নুদ্দিন আহমদ। তিনি সিরাজউদ্দৌলার পিতা। ১৭৪৭ সালে কিছু বিদ্রোহী ভাড়াটে আফগান সৈনিকের হাতে তার মৃত্যু হয়। এ কারণে নবাবের সব স্নেহ প্রবাহিত হয় সিরাজউদ্দৌলার দিকে। তাই তিনি তার জীবিত দুই ভ্রাতুষ্পুত্রকে বঞ্চিত করে সিরাজউদ্দৌলাকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। খুব সম্ভবত এ সময় থেকে সিরাজের সঙ্গে ঘসেটি বেগমের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। এর অন্তত তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথম কারণ, সিরাজের প্রতি নবাবের সীমাহীন আস্থা ও ভালোবাসা। ঘসেটি বেগম নবাব মহলে একচ্ছত্র আধিপত্য ভোগ করতেন। এমনকি কোনো পুরুষেরও তার ওপর গলা উঁচু করার সাহস ছিল না। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা। তাই সিরাজের উত্থানকে তিনি তার জন্য হুমকি মনে করতেন। দ্বিতীয় কারণ, ‘ছোটি বেগম’ থেকে বড় বেগম হওয়ার অভিলাষ ছিল তার। তার স্বামী নওয়াজিস খান যদি নবাব হন, তবেই কেবল পূরণ হয় সে স্বপ্ন। স্বাভাবিকভাবেই নবাব আলিবর্দির ওপর এ বিষয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। তার আগে নবাবের কাছে করা কোনো তদবিরে বিফল হতে হয়নি তাকে। কিন্তু এই প্রথম তিনি উপভোগ করলেন ব্যর্থতার স্বাদ। তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সিরাজউদ্দৌলা নবাব হলে আজীবন ‘ছোটি বেগম’ হয়ে থাকতে হবে তাকে। তার মতো অহংকারী ও উদ্ধত নারীর পক্ষে তা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তৃতীয় কারণ, নবাব আলিবর্দির ওপর তার প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রভূত ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। তার স্বামীর সম্পত্তিও কিছু কম ছিল না। রাজধানী মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠে ‘মতিঝিল’ নামে বিশাল এক দুর্গসদৃশ বাগানবাড়ি ছিল তাদের। ঘসেটি বেগম আশঙ্কা করছিলেন, সিরাজ নবাব হলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবেন। মোট কথা, কারণ যাই হোক না কেন, তিনি সিরাজউদ্দৌলাকে ঘৃণা করতেন। সিরাজ ছিল তার চলার পথে প্রধান কাঁটা। এ কাঁটা তিনি উপড়ে ফেলতে চাইছিলেন। সিরাজ ও ঘসেটি বেগমের মধ্যকার সংঘাতের উত্তাপ ভালোভাবেই লেগেছিল নবাব আলিবর্দি খানের গায়ে। এ বিরোধ মেটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বলা বাহুল্য, তিনি সফল হননি।
সিংহাসনের অন্যতম দাবিদার হিসেবে নওয়াজিস মুহাম্মদ খান তার কার্যক্রম শুরু করেন। তার প্রধান উপদেষ্টা হন হোসেন কুলী খান ও রাজা রাজবল্লভ। হোসেন কুলী খান তো আগে থেকেই মুর্শিদাবাদে অবস্থান করছিলেন। এবার রাজবল্লভও তার পুত্রকে ঢাকার দায়িত্ব দিয়ে মুর্শিদাবাদে চলে এলেন। জনগণের মাঝে তার জনপ্রিয়তা তো ছিলই, এখন হোসেন কুলী খান ও রাজবল্লভের মতো ধূর্ত ও চৌকস মন্ত্রী পেয়ে নওয়াজিসের দল হয়ে উঠল অপ্রতিরোধ্য। রাজনীতিতে তিনি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, প্রবল সম্ভাবনা ছিল যে সিংহাসন তিনিই দখল করবেন। কিন্তু একটি ঘটনায় প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ঘসেটি বেগম ও নওয়াজিস মুহাম্মদ খান দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তারা সিরাজউদ্দৌলার ছোট ভাই ইকরামউদ্দৌলা ওরফে ফজল কুলী খানকে দত্তক নেন। নিঃসন্তান দম্পতির সবটুকু ভালোবাসা ছিল তার প্রতি। ইকরাম বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যান। তার এ মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি নওয়াজিস। শোকে অভিভূত হয়ে জাগতিক সব কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। দ্রুত অবনতি ঘটে তার স্বাস্থ্যের। নবাব আলিবর্দি খান তার ভাইয়ের সন্তানদের নিজের সন্তান হিসেবেই দেখতেন। এরই মধ্যে তিনি একজনকে হারিয়েছেন। নওয়াজিসের অবস্থা দেখে তিনি চিন্তিত হলেন। তিনি তাকে নিজ প্রাসাদে নিয়ে এলেন। সেখানে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। তাকে খুশি করার জন্য নবাব ইকরামউদ্দৌলার শিশুপুত্র মুরাদউদ্দৌলাকে ঢাকার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। নওয়াজিস মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। ঘসেটি বেগমের মনে ভয় ছিল, তার স্বামীর মৃত্যুর পর হয়তো সিরাজউদ্দৌলা তাকে বন্দি করে রাখবেন। তিনি তার স্বামীকে নিয়ে গোপনে আলিবর্দির প্রাসাদ ত্যাগ করেন। পথিমধ্যে ঘসেটি বেগমের মালিকানাধীন একটি অতিথিশালায় নওয়াজিস মুহাম্মদ খান মৃত্যুবরণ করেন।
নবাব আলিবর্দি খান তখন মুমূর্ষু। শাসনক্ষমতা মূলত সিরাজউদ্দৌলার হাতে। নওয়াজিস খান বিগত হয়েছেন। ঘসেটি বেগম আছেন মতিঝিলে। তিনি জানেন, সিরাজউদ্দৌলা নবাব হলে কেবল তাকে অপমানই করবেন না, তার সম্পত্তিও ছিনিয়ে নেবেন। তিনি সিরাজউদ্দৌলার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তার নাতি মুরাদউদ্দৌলার নাম ঘোষণা করেন। স্বামীর রেখে যাওয়া সৈন্যদের তিনি হাতি ও প্রচুর টাকা দেন। এভাবে তিনি নিজের এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। সেনাপ্রধান হন মীর নাজির আলী। রাজা রাজবল্লভ হলেন প্রধানমন্ত্রী।
সিংহাসনে আরোহণের ক্ষেত্রে সিরাজউদ্দৌলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন তার খালা ঘসেটি বেগম ও খালাতো ভাই, পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জং। শওকত সিরাজের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। তাই সিরাজকে ঠেকাতে তিনি ঘসেটি বেগমের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। নবাব আলিবর্দি খান চাইছিলেন, যেকোনো মূল্যে সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনে বসাতে। তাই তিনি স্বীয় প্রভাব খাটিয়ে রাজদরবারের প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সভাসদদের সিরাজের পক্ষে নিয়ে আসেন। তার আত্মীয় মীর জাফরকেও তিনি পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ করিয়েছিলেন, সিরাজকে সমর্থন করার জন্য। সিরাজ-ঘসেটি বিরোধ মেটাতে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টির কোনো মীমাংসা হওয়ার আগেই, ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল নবাব আলিবর্দি খান পরলোক গমন করেন।
আলিবর্দি খানের মরদেহের সত্কার হতে না হতেই সিরাজউদ্দৌলা নিজেকে বাংলার নবাব ঘোষণা করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার তখন প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, যা যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই তিনি ঘসেটি বেগমের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার একটি কৌশল অবলম্বন করেন। মীর নাজির আলীর ছিন্ন মস্তক পাঠানোর জন্য তিনি ঘসেটি বেগমকে আদেশ দেন। সিরাজ অভিযোগ উত্থাপন করেন, মীর নাজির আলী রাজপরিবারের সম্মান নষ্ট করেছেন। ঘসেটি বেগম মীর নাজির আলীকে ভালোবাসতেন। তাই সিরাজের প্রস্তাবে রাজি হলেন না। পাঠকের কাছে মীর নাজির আলীর ব্যাপারটি পরিষ্কার হওয়ার জন্য ঘসেটি বেগমের জীবনের একটি অন্ধকার দিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন।
ঐতিহাসিকদের মতে, ঘসেটি বেগমের নৈতিক চরিত্র সুবিধাজনক ছিল না। একাধিক পুরুষের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িত থাকার অপবাদ আছে তার নামে। তাদের একজন ছিলেন হোসেন কুলী খান। তিনি ঢাকায় নওয়াজিস মুহাম্মদ খানের নায়েব ছিলেন। ঘসেটি বেগম তার সঙ্গে গোপন প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েন। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তিনি মুর্শিদাবাদে স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করলেন। ঢাকার দায়িত্ব পান তার দেওয়ান রায় গোলকচাঁদ। গোলকচাঁদ একপর্যায়ে নবাব আলিবর্দি খানের কাছে হোসেন কুলী খানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে হোসেন কুলী খান পদচ্যুত হন। ঘসেটি বেগম তখন নবাবের ওপর নিজের ব্যক্তিগত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তাকে পুনরায় স্বপদে বহাল করেন। রায় গোলকচাঁদের চাকরি চলে যায়। তার স্থলাভিষিক্ত হন রাজা রাজবল্লভ। হোসেন কুলী খানের সঙ্গে ঘসেটি বেগমের এ সম্পর্ক নবাব মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাছাড়া হোসেন কুলী খান একসময় ঘসেটির ছোট বোন আমিনা বেগমের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আমিনা বেগমকে কেন্দ্র করে হোসেন কুলী খান ও ঘসেটি বেগমের সম্পর্কে ফাটল ধরে। তার মাথার ওপর থেকে ঘসেটির ছায়া উঠে যায়। আলিবর্দি খানের বিবি শরফুন্নেসা বেগমও হোসেন কুলী খানের বিরুদ্ধে ছিলেন। তার কন্যাদ্বয়ের নৈতিক স্খলনের জন্য তিনি তাকে দায়ী মনে করতেন। ১৭৫৪ সালে হোসেন কুলী খান নিহত হন। শোনা যায়, এর পেছনে সিরাজউদ্দৌলার হাত ছিল। হোসেন কুলী খানের বিশ্বাসঘাতকতা এবং মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম নওয়াজিস খানের অধীনস্থ এক সৈনিক মীর নাজির আলীর সঙ্গে প্রণয়ে জড়ান। নওয়াজিস মুহাম্মদ খানের মৃত্যুর পর মীর নাজির আলীকে নিয়ে ঘসেটি বেগম মতিঝিলের প্রাসাদে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ছিলেন ঘসেটি বেগমের অন্যতম প্রধান শক্তি। ঘসেটি বেগমের প্রতি সিরাজউদ্দৌলার নির্দেশে এ প্রণয় আখ্যানের প্রতিই ইঙ্গিত ছিল।
ঘসেটি বেগম সিরাজউদ্দৌলার আদেশ অমান্য করেন। ফলে সিংহাসনে আরোহণের পরদিনই তিনি মতিঝিল অবরোধ করেন। তিনি এমনভাবে তা ঘেরাও করেন, কারো পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। নবাবের প্রতিনিধি হিসেবে তার নানি শরফুন্নেসা এবং সভাসদ জগেশঠ প্রাসাদের ভেতরে যান। তারা ঘসেটি বেগমকে আত্মসমর্পণ করতে প্ররোচিত করেন। তারা তাকে নিশ্চয়তা দেন, তাকে হত্যা করা কিংবা তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কোনো ইচ্ছা সিরাজউদ্দৌলার নেই। ঘসেটি বেগম এক শর্তে রাজি হন। তিনি দাবি করেন, মীর নাজির আলীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং নিরাপদে বাংলা ত্যাগ করতে দিতে হবে। সিরাজউদ্দৌলা দাবি মেনে নেন। তার নির্দেশে মীর নাজির আলীকে নিরাপদে বাংলার সীমান্ত পার করিয়ে দেয়া হয়। ঘসেটি বেগম মতিঝিল থেকে বের হয়ে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে নবাব তাকে বন্দি করেন এবং তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। শুরু হয় নবাব মহলে ঘসেটি বেগমের অন্তরীণ জীবন।
ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা বিনা যুদ্ধে জয়লাভ করেন। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, এ যুদ্ধে ঘসেটি বেগমের জয়ী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। সিরাজের সঙ্গে টক্কর দেয়ার মতো শক্তি ও সাহস, কোনোটিরই কমতি ছিল না তার। তার এ পরাজয়ের কারণ হিসেবে ইতিহাসে কিছু ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যায়। ঘসেটি বেগমের সৈন্যরা রাতারাতি শিবির বদল করে সিরাজের পক্ষে চলে আসে। ধারণা করা হয়, এ ব্যাপারে নবাবের সঙ্গে মীর নাজির আলীর গোপন এক চক্রান্ত হয়েছিল।
ঘসেটি বেগম অধ্যায় শেষ করে নবাব মনোযোগ দেন পূর্ণিয়ার শাসনকর্তা শওকত জংয়ের দিকে। শওকত জং সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। তিনি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। রাজমহলের কাছে শওকতের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হন নবাব। যুদ্ধে শওকত জং পরাজিত ও নিহত হন।
ঘসেটি বেগম ও শওকত জংকে পরাজিত করার পর সিরাজউদ্দৌলার আর কোনো পুরনো শত্রু রইল না। তবে নিজেকে সর্বেসর্বা বানাতে গিয়ে তিনি কিছু নতুন শত্রু তৈরি করে ফেলেন। দরবারের কয়েকজন প্রভাবশালী সভাসদ তার বিরুদ্ধে চলে যান। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মীর জাফর। তারা নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজের সঙ্গে আঁতাত করেন। এ পর্যায়ে পুনরায় নবাবের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ঘসেটি বেগম। তিনি মীর জাফরকে সমর্থন করেন। তার প্রতি ন্যূনতম সমবেদনা আছে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তিনি গোপনে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি তার দুর্দশার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। আলিবর্দি খানের জ্যেষ্ঠা কন্যা ও নওয়াজিস মুহাম্মদ খানের বেগম হিসেবে তিনি তাদের মীর জাফরের পক্ষে যোগ দিতে অনুরোধ করেন। তিনি মীর জাফরকে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেন। বলা হয়ে থাকে, তার কয়েকজন বিশ্বস্ত দাসীর মাধ্যমে তিনি গোপনে কিছু স্বর্ণ ও নগদ অর্থ নিজের কাছে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেগুলো তিনি মীর জাফরের হাতে তুলে দেন।
পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। মীর জাফরের নিষ্ঠুর পুত্র মিরানের নির্দেশে সিরাজউদ্দৌলাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়। ইংরেজদের একনিষ্ঠ ভৃত্য হিসেবে মুর্শিদাবাদের মসনদে আসীন হন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলী খান। কিন্তু ঘসেটি বেগমের শেষ রক্ষা হলো না। উচ্চাভিলাষী ও কুচক্রী ঘসেটি বেগমকে মিরান অন্যতম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। নবাব পরিবারের অন্য নারীদের সঙ্গে তাকেও বন্দি করে নৌপথে ঢাকার জিঞ্জিরা কারাগারে নিয়ে আসা হয়। মিরানের নির্দেশে সেখানে হত্যা করা হয় তাকে। আর এক কুখ্যাত নারী হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই হয় মেহেরউননিসা ওরফে ঘসেটি বেগমের।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক




